প্রকৃতিকে মানুষের বাইরে আলাদা সত্তা হিসেবে দেখেননি শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি 

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ

Share:

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা’ বইটি লিখেছেন আরবি ভাষায়। কোরআন নিজেকে হুজ্জাতুল্লাহ বলে দাবি করছে। কারন, জাহিলি যুগের কবিতা ও কাব্যকে ভেঙে কোরআন নিজে স্বাক্ষর রেখেছে। এর ভিতর দিয়ে কোরআন যখন মানুষ এবং জগতকে উপস্থাপন করেছে তখন সে নিজেকেও প্রকাশ করেছে। তো এটা এক ধরনের মুশাহাবা মানে যখন আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বয়ান করছেন এবং মানুষের ভাষার মধ্যে প্রকাশ হচ্ছে তখন মানুষকে তিনি নিজের কুদরত ও মহিমার অংশ করছেন। কোরআনের ভাষার মধ্যে যেভাবে মানুষ ও জগত সম্পর্কে স্পষ্টতা প্রকাশ পেয়েছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ তার নিজের লেখার মধ্যে সেটাকে আত্মীকরণ করেছেন। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন তাঁর সময়কালের মুসনাদুল হিন্দ মানে পুরো হিন্দুস্তানে হাদিস ও উলুমে হাদিসের যে ধারাগুলো গড়ে উঠছে সেগুলোর সূত্রদাতা হিসেবে আমরা উনাকে চিহ্নিত করি। আরবি ভাষার মধ্যে যে আধিবিদ্যিক চিন্তা এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তার পিছনে হাদিসের একটা বিরাট প্রভাব ছিল। হাদীস মানে রসুলের কথা, কাজ ও স্বীকারক্তি মুসলমানদের ভাষা, সাহিত্য ও কল্পনার মধ্যে অসাধারণভাবে ছাপ ফেলেছে। হাদীসের মাধ্যমে মুসলমানরা রসুলের কালের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে এটা মুসলমানদের জন্য একটা বড় ঘটনা যেটা অন্যান্য অন্যান্য ধর্মের ট্র্যাডিশনে পাওয়া যায় না। উলুমে শরিয়া মানে শরীয়তের জ্ঞান বা প্রজ্ঞার ধারাগুলোর মধ্যে হাদীস অন্যতম প্রধান। ফলে হাদীসের বিকাশের সাথে প্রজ্ঞার প্রজ্ঞার সম্পর্ক আছে এবং হাদীস ও প্রজ্ঞার যে ডিসকার্সিভ ডায়লগ তা শাহ ওয়ালিউল্লাহর মধ্যে আমাদের আবিষ্কার করা দরকার ।

আধুনিকতা যখন আসছে তার একটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট হাজির ছিল। এটা বলার কিছু কারণ আছে। ইউরোপীয় সভ্যতা বিস্তার ঘটার পূর্বে পুরো বিশ্বে তিনটা গানপাউডার সভ্যতা ছিল। ঐদিকে ওসমানীয় খেলাফত, এদিকে হিন্দুস্তান এবং চায়না। এ সভ্যতাগুলোর পরস্পরের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব আওতাধীন ভূখণ্ডে স্বাধীন বাণিজ্য ছিল। আবার, আরবরাও পুরো পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। সুমদ্র এবং বাণিজ্যিক বন্দরগুলো তারা আবিষ্কার করছে। ফলে মুসলমানরা এই বাণিজ্যিক ভ্রমণের ভিতর দিয়া পুরো বিশ্বব্যাপী একটা সহযোগিতা ও সামাজিক বোধ গড়ে তুলেছিল। মুসলমানদের সমুদ্র ও ভূখন্ড আবিষ্কারের এই অগ্রগতির সাথে সাম্রাজ্য গড়ার চেতনা আলাদা না; বরং ভালোভাবে সম্পৃক্ত।। আজকে যখন শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত নিয়ে আমরা আলাপ করছি, সেখানে ইরতিফাকাতের চতুর্থ পর্যায়ের চিন্তাটা কিন্তু একটা সাম্রাজ্যের কল্পনা থেকেই গড়ে উঠছে। উনার এই চতুর্থ ইরতিফাকাতটি পলিটিক্যাল ইউটোপিয়া না। যেমনটা আমাদের বামপন্থীরা মনে করে ভবিষ্যতে একটা কমিউনিটি হয়ে আছে। তারা যখন উৎপাদন শক্তির উপরে সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবে তখন কমিউনিটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। যদিও মার্ক্স এমনটা মনে করতো না।

শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত চিন্তাকে বেলায়েতুল ফকিহর পাশাপাশি আহলে সুন্নাহর রাজনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে বুঝার উৎসাহ বোধ করি। উনি ইরতিফাকাত নিয়ে দুই বইয়ে আলাপ করেছেন।  এর মূল থিসিসটা উনি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগার মধ্যে আলোচনা করেছেন। পাশাপাশি ‘বদরুল বাজিগাহ’নামে উনার আরেকটা বইয়ে তিনি এ নিয়ে আলাপ করেছেন। এ বইটি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা থেকে দার্শনিকভাবে আরো বেশি সমৃদ্ধ।  এই বইয়ে তিনি ইরতিফাকাত নিয়ে বলছেন যে, এটা মূলত ইমামত বা নেতৃত্ব নিয়ে আলাপ। এই নেতৃত্ব রাজতন্ত্র না। কারন উনি রাজতন্ত্রকে নবুয়তি ইচ্ছার বাইরে মনে করতেন। যখন নবুয়তি ইচ্ছার বাহিরে গিয়ে রাজতন্ত্রগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আমরা এটাকে ইসলামের ইতিহাস বলতে পারি, কিন্তু এটা তো খোদ ইসলামের মানুষ ও জগত নিয়ে যে অভিব্যক্তি তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না বরং সাংঘর্ষিক। ফলে উনি রাজতন্ত্রকে স্বীকার করতেন না। হিন্দুস্তান একটা সাম্রাজ্য ছিল। কিন্তু, এই সাম্রাজ্য কি আর কখনো হিন্দুত্ববাদীরা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? এই সাম্রাজ্য একমাত্র মুসলমান সুলতানরাই করতে পেরেছিল। মুসলমান সুলতানদের এই অনুপ্রেরণাটা ছিল একান্তই নবুয়তের প্রজ্ঞা। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহ অথবা মোটা দাগে ইসলামের যখন আমরা একটা দার্শনিক পাঠ হাজির করব তখন আমাদের মনে রাখতে  হবে যে এটা আধুনিকতার শর্তাবলীর মধ্যে পড়বে না। আধুনিকতা বলতে আমি গ্রিকো-খ্রিস্টান সভ্যতার কথা বুঝাচ্ছি। কারন শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন ইরতিফাকাত নিয়ে আলাপ করছেন তখন তিনি আল্লাহ, সমাজ ও প্রকৃতিকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে দেখেছেন। পরস্পরের বিকাশ বা ইচ্ছার বাহিরে মনে করেন নাই। তিনি মনে করতেন না, প্রকৃতি বলতে মানুষের বাইরে আলাদা কোন সত্তা আছে। কিন্তু আধুনিকতার মূল অনুমানই হচ্ছে মানুষ থেকে প্রকৃতির ভেদ। শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন মনে করেন যে প্রকৃতি এবং মানুষ অবিভাজ্যভাবেই উপস্থিত। টেকনোক্রেটিক সাইন্স জগতকে ব্যাখ্যা করতে পারে না বরং জগতের সাথে মানুষের নিত্যকার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটা নৈতিক ভিত্তি এবং দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মধ্যে আমরা যে মানুষকে পাই সেটা প্রচণ্ড সামাজিক। 

যারা মাদ্রাসায় পড়েন সারাদিন তারা বেদাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু শাহ ওয়ালিউল্লাহর আগ্রহের জায়গা ছিল মানুষ কিভাবে সমাজে একত্র হচ্ছে এবং সেখানে মিলনের ক্ষেত্র তৈরি করছে। সমাজের মধ্যে যে আনন্দোৎসব তাঁর মধ্যে একটা ঐশ্বরিক ইচ্ছা আছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ চার ধরনের ইরতিফাকাতের কথা বলেছেন। এর ভিতর দিয়ে মানুষ পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরির ইচ্ছার মাধ্যমে সমাজকে সবসময় ব্যক্তির আগে রাখে। সমাজের মধ্যে ব্যক্তি অন্যান্য মানুষ ও প্রানীদের সাথে যুক্তভাবে হাজির হওয়ার ভিতর দিয়ে সমাজ গঠনের কথা বলছেন। সমাজকে নতুনভাবে তৈরি করার একটা কল্পনা লাগবে আমাদের। সমাজের মধ্যে যে মানুষ, পশু-পাখি এবং গাছপালা পরস্পর যুক্ত থাকে এটাকে মানুষের সক্ষমতার অংশ হিসাবে তিনি হাজির করেছেন।  

শাহ ওয়ালিউল্লাহকে মানুষকে ইন্টেশনাল বলেছেন। কারন, মানুষ আল্লাহর দেওয়া ওহীকে প্রতিফলন করে। আল্লাহ জগতকে সৃষ্টির সময় একটা হেকমত দিয়ে তৈরি করেছেন যা মানুষকে অর্থপূর্ণ জীবনযাপনের আহবান করে এবং সেটা কেবল নিজের মধ্য দিয়ে নয়, বরং আমাদের প্রাত্যহিক সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে-ই অনুরণিত হয়। আমরা যখন সামাজিকভাবে একে-অপরের সাথে যুক্ত হই তার একটা উদ্দ্যেশ্য আছে। এ উদ্দেশ্যটাই শাহ ওয়ালিউল্লাহর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

Share: