মুসলিম বিশ্বে আদবের অবক্ষয়, জ্ঞানের বিকৃতি ও নৈতিক বিচ্যুতি

সাইয়্যেদ মুহাম্মদ নকীব আল-আত্তাস (Syed Muhammad Naquib al-Attas, জন্ম ১৯৩১) আধুনিক ইসলামী দর্শন, সভ্যতা ও শিক্ষা-চিন্তার অন্যতম অগ্রগণ্য পণ্ডিত ও দার্শনিক। তিনি মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি বুদ্ধিজীবী, যিনি ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব, সভ্যতার ধারণা, এবং আধুনিকতার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে এক মৌলিক ও প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন।তাঁর চিন্তাভাবনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে জ্ঞানের ইসলামায়ন (Islamization of Knowledge)—অর্থাৎ জ্ঞানকে ইসলামি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করা। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে Islam and Secularism (১৯৭৮), The Concept of Education in Islam (১৯৮০), ও Prolegomena to the Metaphysics of Islam (১৯৯৫)।
গবেষক, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। আগ্রহ ধর্ম, দর্শন ও ইতিহাস নিয়ে।

Share:

জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবারের মহামান্য যুবরাজ আল-হাসান বিন তালাল, বিশিষ্ট পন্ডিতগণ, ভদ্র মহিলা ও মহোদয়গণ :

১. ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট অ্যান্ড সিভিলাইজেশন (ISTAC)-এর পক্ষ থেকে আপনাদের স্বাগতম জানাতে পেরে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আপনারা সমবেত হয়েছেন ইসলামি চিন্তার ইতিহাস ও মুসলিম মনীষীদের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র আবু হামিদ আল গাজালির রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে স্মরণ করতে।

২. আবু হামিদ আল গাজালি ছিলেন সত্যজ্ঞানে অলংকৃত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। তাঁর বুদ্ধিদৃপ্তি আলোকবর্তিতা সত্যকে মিথ্যা থেকে, বাস্তবকে মায়া থেকে এবং খাঁটিকে জাল থেকে আলাদা করেছে। ধর্মের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে তাঁর অবদান গভীর। ইসলামি চিন্তা ও সভ্যতার প্রশ্নে প্রত্যেকটি যুগের সচেতন উম্মাহর কাছে তিনি স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। তাঁর সময়ে ধর্মীয় অস্থিরতা ছিল প্রকট। বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তকারী গোষ্ঠীর প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। মুসলিম দার্শনিক ও তাদের অনুসারীদের মাধ্যমে ইসলামবহির্ভূত বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। বর্তমানে আমরা সেকুলার পশ্চিমা বিজ্ঞান, দর্শন ও প্রযুক্তিগত মতবাদ দ্বারা একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন। সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সঙ্গতি রেখে আমাদের মূল্যবোধ, আচরণ পদ্ধতি, এবং আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাসের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করতে আধুনিক বিজ্ঞান ও মতাদর্শ অস্বাভাবিক ভাবে অগ্রসর হচ্ছে। আসলে বর্তমান সংকট আল-গাজালির সময় থেকে বেশি গুরুতর এবং বিস্তৃত। তবুও এধরণের সমস্যার প্রতিকারে তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

৩. আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের উত্থানে নেতৃত্বদানকারী ‘উলামাগণ’ ছিলেন স্বল্প কর্তৃত্বের অধিকারী। এই আন্দোলন মুসলিম ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের এবং আত্মশুদ্ধির সূচনা হিসেবে প্রতিভাত হয়নি। বরং আন্দোলনকে পূর্ববর্তী উলামাদের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত অবমূল্যায়নের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ফলে এর মধ্য দিয়ে আমরা পতিত হয়েছি সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ধর্মীয় কানাগলিতে। তারা এবং তাদের অনুকরণকারী ও অনুসারী প্রথাগত ‘উলামারা’ মূলত পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রভাবিত। ইসলামি চিন্তা ও বিশ্বদৃষ্টির দূষণীকরণ এবং অযোগ্য নেতাদের আবির্ভাবে আমরা সত্যিকার কর্তৃত্ব চিনতে অক্ষম হয়ে পড়েছি। এ অবক্ষয়কে আমি আদবের অবক্ষয় বলি। এমত পরিস্থিতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে যে অরাজকতা তৈরি হয়, তার কারণে অপরিণত ব্যক্তিরাও ধর্মীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সিদ্ধান্তের নির্ধারক হয়ে উঠে। তারা জ্ঞানের বিষয়গুলোয় কর্তৃত্বপরায়ণ হয়। ফলে সত্যিকারের সংজ্ঞাগুলো অকার্যকর হয়। আমরা পরে থাকি অস্পষ্টতা ও বৈপরীত্যের মধ্যে। সমস্যাকে সংজ্ঞায়ন, চিহ্নিতকরণ এবং যথাযথ সমাধানে অক্ষমতার কারণে অযাচিত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান সমস্যাকে নামিয়ে আনা হয়েছে কেবল আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণে। এমন ধর্মীয় জ্ঞানে অপরিণত মানুষের সংখ্যা বিপুল, যারা মূল্যবোধের অবক্ষয়, সাধারণের ওপর আরোপ ও অপরিণতের উত্থান ঘটিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। অবাক হওয়ার কিছু নেই যদি এমন পরিস্থিতিতে পথভ্রষ্ট এবং চরমপন্থীদের উত্থানের ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়; কারণ পথভ্রষ্ট ও চরমপন্থীরা মূলত অজ্ঞতাকেই মূলধন হিসেবে গ্রহণ করে।

৪. সাম্রাজ্যবাদী মতবাদের সাথে সঙ্গতি রেখে ওরিয়েন্টাল গবেষণার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে প্রথমবারের মতো আমরা দেখতে পাই মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার মূল কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে আল-গাজালিকে। গ্রিক দর্শনের প্রতি আল-গাজালির বিরুপ প্রতিক্রিয়ার পর শতাব্দী ধরে এ প্রচেষ্টা প্রতিষ্ঠিত হয়। আল-গাজালির প্রতি তাদের অসন্তোষ সহজেই বোধগম্য, যেহেতু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতিটা অধ্যায়, হোক সেটা যুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞান, শিল্প, রাজনীতি কিংবা ধর্মতত্ত্ব, সকল ক্ষেত্রই গ্রিকদের দ্বারা শুরু হয়। গ্রিক দর্শনই হলো সমস্ত চিন্তার সর্বোচ্চ শিখর এবং যুক্তির চূড়ান্ত প্রতিভূ! পশ্চিমা ধর্মীয় চিন্তা, প্রাচ্যবিদ্যা, জ্ঞানচর্চা এমনকি তাদের চর্চিত বিজ্ঞান পর্যন্ত স্রষ্টা প্রশ্নে খ্রিস্টধর্মের বিপরীতে কাজ করেছে। ওহি ও আকলের যে দ্বন্দ্ব সেখানে দেখা যায়, তা ইসলামে অনুপস্থিত। আধুনিক চিন্তকদের দাবি ইসলামের যা কিছু দর্শনগতভাবে সত্য সেসকল  ধারণা গ্রিক দর্শন থেকে গৃহীত হয়েছে। এমন দাবি অমূলক এবং  ফলে এমন দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। অন্যদিকে গ্রীক দর্শনের অনেক মৌলিক ধারণাই তাদের দার্শনিকরা ধর্ম বা ঐশী সূত্র থেকে গ্রহণ করেছিল অথবা ইবনে রুশদির ভাষায় বলা যায় “ঐশী সূত্রের মতো কিছু” থেকে গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিগোচর হয়না। এই দর্শনগুলো শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা বা যুক্তি থেকে উদ্ভূত হয়নি, বরং ঐশী সাহায্যের মাধ্যমে এসেছে। মূলত এ কারণেই মুসলিম দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও সুফিরা গ্রীকদের চিন্তার সবকিছু প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং গ্রিক দার্শনিকরা যে আধ্যাত্নিক, নৈতিক, এবং রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলেছেন, মুসলিম দার্শনিকরা কোরানে সে সবের উল্লেখ পেয়েছেন।

দুই দার্শনিকের বিতর্ক; ডানদিকে সম্ভবত আবু ইউসুফ আল-কিন্দি। আল-মুবাশশির ইবন ফাতিকের মুখতার আল-হিকাম ওয়া মাহাসিন আল-কালিম পাণ্ডুলিপি থেকে, ১৩শ শতাব্দী, উৎসঃ gettyimages

আল-কিন্দি তার একটি গ্রন্থে আল-মুতাসিমকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, গ্রীক দার্শনিকদের অসম্পূর্ণ কাজ তিনি সম্পূর্ণ করতে চান। সুতরাং এটি প্রমাণিত হয় যে মুসলিম দার্শনিকগণ গ্রিক দর্শনের কেবল অনুকরণকারী হয়ে থাকেননি। বরং বিপরীতটাই ঘটেছে। যদিও তারা গ্রীকদের যৌক্তিক অনুসন্ধান এবং অর্জনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছিল, একই সঙ্গে তারা শুধু যুক্তি কেন্দ্রীক জ্ঞান দিয়েই সত্যকে উপলব্ধি করার যে গ্রিক প্রচেষ্টা, তার ভুল গুলোও চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সত্য সম্পর্কে চূড়ান্ত জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে গ্রীকদের যুক্তি নির্ভর প্রচেষ্টার ব্যর্থতা বাস্তবিকই এটি প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র যুক্তির মাধ্যমে সকল জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। এই বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া উচিত যে মুসলিম এবং গ্রীক দার্শনিকদের বিরুদ্ধে আল-গাজালির অবস্থান দর্শন কেন্দ্রীক ছিলোনা, তাঁর অবস্থান ছিলো হিকমা বা প্রজ্ঞা বিষয়ক যা কুরআনে প্রকাশিত হয়েছে আল্লাহর উপহার হিসেবে। আমি মনে করি ইবনে রুশদ তার গ্রন্থ ‘আল ফাসলুল মাকালে’ হিকমাকে ঐশী সূত্রের মতো কিছু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শুধুমাত্র ধর্মে নয় বরং দার্শনিকতা এবং বিজ্ঞানেও যুক্তি এবং হিকমার প্রয়োগ করা প্রশংসনীয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কোরআনে প্রধান নবীদের শুধুমাত্র কিতাব বা গ্রন্থ নয় বরং হিকমা বা প্রজ্ঞাও প্রদান করা হয়েছিল। আমার মতে হিকমা ঐশী সূত্র এবং যুক্তির মধ্যে সঙ্গতির ব্যাখ্যা দেয়। আল-গাজালি গ্রিক দার্শনিক এবং মুসলমান দার্শনিকদের চূড়ান্ত বাস্তবতা সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে যুক্তি কেন্দ্রিক প্রচেষ্টার অগ্রাধিকার দেয়ার বিপক্ষে অবস্থান করেছিলেন।

৫. কিন্তু আধুনিক মুসলিম চিন্তক, তাদের অনুসারী ও সমমনা ব্যক্তিবর্গ কৌশলী প্রতারণার শিকার হয়ে প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের অনুসরণ করেছেন। এমনকি বর্তমান সময়েও তারা আল-গাজালিকে মুসলিম চিন্তা ও কার্যকলাপের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী করে থাকেন। তাদের মধ্যে শুধু আরব, তুর্কি ও পারস্যবাসী নয়, বরং উপমহাদেশের অন্যান্য চিন্তাবিদরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে ইকবাল যিনি পাশ্চাত্য  খ্রিষ্টান ধর্ম ও দর্শনের সমস্যা সমূহ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং সেগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের সমস্যার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। তারা ইবনে তাইমিয়াকে অনুসরণ যোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং তাদের চিন্তা ও কার্যকলাপে ইবনে তাইমিয়ার মতো বিতর্ক-প্রবণতা ও বৈপরীত্যের প্রতিফলন লক্ষণীয়। তারা বুঝতে ব্যর্থ হন যে আল-গাজালি না থাকলে ইবনে তাইমিয়ার পক্ষে গ্রিক দার্শনিকদের সম্পর্কে অবগত হওয়া অসম্ভব ছিলো। ফলে তিনি মুসলিম দার্শনিকদের বিষয়ে আপত্তি জানাতেও পারতেন না। কারণ, হাম্বলীরা যে যুক্তিবিদ্যা ও কার্যকর পদ্ধতিগত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তার একটি বড় অংশ আল-গাজালির থেকে আহরণকৃত। ইবনে তাইমিয়া মূলত যুক্তির নিন্দা করেছিলেন, ব্যখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কালামশাস্ত্রকে রুদ্ধ করেছিলেন এবং কিয়াসের বিরোধীতা করেছিলেন।

সুতরাং যদি আমরা মুসলিম চিন্তাধারা ও কর্মকান্ডের অবক্ষয়ের জন্য কাউকে দায়ী করতে চাই তাহলে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির প্রধান কারণ হিসেবে ইবনে তাইমিয়ার প্রভাব লক্ষণীয়। একই কারণে সংজ্ঞায়নের অক্ষমতা, সমস্যার চিহ্নিতকরণ ও পৃথকীকরণের অক্ষমতা, কৃত্রিম সমস্যার সৃষ্টি এবং সমস্যাগুলোকে আর্থ-সামাজিক ও আইনি বিষয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলার প্রবণতা বর্তমান সময়ে স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। ইসলামের সঠিক উপলব্ধি ও বিশ্বদর্শনকে শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও আইনি প্রয়োজনীয়তায় সীমাবদ্ধ করে ফেলার ক্ষেত্রেও ইবনে তাইমিয়ার ভূমিকা রয়েছে। এইভাবে ইবাদতের অর্থ সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে কারণ সকল মুসলমানের জন্য অপরিহার্য মৌলিক জ্ঞান অর্থাৎ ফরজ আইনকে কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত ও আইনি প্রয়োজনীয়তার স্তরে নামিয়ে আনার মাধ্যমে অপরিবর্তনীয় এক অপূর্ণতার স্তরে স্থবির করে রাখা হয়েছে। ফরজ আইনের জ্ঞান কেন্দ্রীক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো যা ইবাদতের মধ্যে ভারসাম্য আনে এবং পূর্ণ পরিপক্বতায় পৌঁছানোর জন্য অপরিহার্য সেগুলো ইবাদতের অর্থ সীমাবদ্ধকরণের ফলে উপেক্ষিত হয়েছে। আমলের অর্থকে শুধুমাত্র বাহ্যিক দিকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে এমন এক ধরনের কর্মচাঞ্চল্য দেখা যায় যা সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনি অস্থিরতা এবং সংকীর্ণ মানসিকতার আবির্ভাবের জন্য দায়ী। আধুনিকতাবাদী এবং তাদের অনুসরীদের বুঝতে হবে যে ইবাদত এমন এক কর্মযজ্ঞ যা শুধু দৈহিক নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মও বটে। আমি যে বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মচাঞ্চল্যের কথা বলছি তা আধুনিকতার সাথে সম্পৃক্ত নয়। অন্যদিকে এটিকে আবার ইকবালের ইসলামে যুক্তিনির্ভর ভিত্তি অনুসন্ধানের ধারণার সাথে গুলিয়ে ফেললেও ভুল হবে। পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত কিছু ব্যক্তিবর্গ ধর্মের যুক্তিনির্ভর ভিত্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। তারা অবচেতন মনে পশ্চিমা মতাদর্শের ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যার সাথে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছিলেন। হোয়াইটহেডের কথা আওড়িয়ে ইকবাল বলেছিলেন তার মতে ধর্ম একটি সাধারণত সত্যের ব্যবস্হা যার নির্দিষ্ট দিকগুলো অপরিশোধিত থাকতে পারে না, যা পরবর্তীতে ফজলুর রহমান গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের মতে ধর্ম সিদ্ধান্তমূলক দিক থেকে সাধারণ সত্যের ব্যবস্হা নয়। হোয়াইটহেডের ধর্ম উপলব্ধি তার নিজের ধর্মের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো। ইসলামের ক্ষেত্রে এমন সংজ্ঞায়ণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এছাড়াও, ইসলামের সিদ্ধান্তমূলক দিকের জন্য যুক্তিনির্ভর ভিত্তির প্রয়োজন নেই, কারণ একটি যুক্তিনির্ভর ভিত্তি ইতিমধ্যেই ধর্মের মূলভিত্তি এবং ধর্মের প্রক্ষেপিত বিশ্বদৃষ্টিতে অন্তর্নিহিত।

আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাজ্জালির কিমিয়া-ই সা‘আদাত (“সৌভাগ্যের পরশমণি”), ৩য়- ৪র্থ খণ্ড। ইসলামি আকীদা ও সুফি নৈতিকতা নিয়ে রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থটির পারসিক পাণ্ডুলিপি (পার্চমেন্টে লিখিত)। উৎস, christie

৬. ইবনে রুশদ ও ইবনে তাইমিয়া আল-গাজালিকে সামঞ্জস্যহীন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যদ্বাতা হিসেবে অভিহিত করার পর কিছু প্রাচ্যবাদী ও তাদের অনুসারীরা আল-গাজালিকে বিভ্রান্তিকর চিন্তাবিদ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যাদের মধ্যে মরহুম ফজলুর রহমান উল্লেখযোগ্য। আল-গাজালিকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলতে না পারার অপারগতা থেকে তারা তাকে দুর্ভোদ্য ও বিভ্রান্তিকর চিন্তাবিদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি কি সত্যিই একজন দার্শনিকের ছদ্মবেশী ধর্মতাত্ত্বিক ছিলেন? তিনি কি একই সাথে আশ’আরী এবং সুফি ছিলেন? এভাবেই তারা ‘হয় এটা, নাহয় ঐটা’ ধরনের মতবাদ এমন একজনের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন যিনি সরল বিভাজনকে অস্বীকার করতেন। অথচ তার বিরুদ্ধে যে সামঞ্জস্যহীনতা এবং পরস্পর বিরোধিতার অন্যায় অভিযোগ আরোপ করা হয়েছিল তা কখনো চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আল-গাজালির মতো ব্যক্তি কোনো বিরোধিতায় না জড়িয়ে একইসাথে দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, আশ’আরী ও সুফি হতে পরবেনা? প্রকৃতপক্ষে আল-গাজালি সাধারণ মুসলমানের কাছে ধর্ম ও দর্শনের একত্রীকরণের প্রতিমূর্তি। আল-গাজালি এমন এক সংমিশ্রণ যার কল্যাণ ও মহত্ত্ব মুসলিম বিশ্বের সকল বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে স্বীকৃত। কিন্তু যারা শব্দ তাত্ত্বিক অনুশীলন, গ্রন্থকেন্দ্রিক সমালোচনা এবং ধারণাগত উৎস নির্ধারণে প্রতিনিয়ত গবেষণারত তারা শুধু নিজেদের একাডেমিক অঙ্গনেই আলোচনায় ব্যস্ত। আধুনিক সমস্যা গুলোর সমাধানের ব্যাপারে আল-গাজালিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার বিষয়ে তারা উদাসীন অথবা অক্ষম। এ ব্যাপারে হাতি ও চার অন্ধ পন্ডিতের গল্পের কথা মনে পরে। যেহেতু তারা চোখে দেখেনা সেহেতু তাদের সামনে দাড়ানো হাতিটিকে হাতড়ে হাতড়ে অনুভবের মধ্য দিয়ে কল্পিত রূপ বর্ণনা করতে হয়েছিলো। এদের মধ্যে একজন একটি পা স্পর্শ করে ঘোষণা করলো, ইহা একটি স্তম্ভের মতো প্রাণী। অন্য একজন ব্যক্তি যিনি পেঁচানো শুড় ধরেছিলেন তিনি বলে উঠলেন, “না, ইহা একটি বিশাল সাপ।” তৃতীয় পন্ডিত অমত পোষন করলেন এবং যেহেতু তিনি প্রশস্ত পিঠ হাতড়াচ্ছিলেন তিনি বলে উঠলেন, “ইহা একটি সিংহাসন।” সবশেষে যিনি হাতিটির  কান ধরে বোঝার চেষ্টা করছিলেন তিনি বললেন, “তোমরা সকলেই ভুল, ইহা প্রকৃতপক্ষে একটি কার্পেট।” পরবর্তীতে তারা সকলেই একে অপরের বিরোধিতা করে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করার উদ্দেশ্যে তাদের কল্পিত ধারণার উপর ভিত্তি করে গ্রন্থ রচনা করলেন।

৭. আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান ও মতাদর্শ এবং আমাদের নিজেদের বিভ্রান্ত অবস্থার সম্মিলিত প্রভাবে বুদ্ধির বিকৃতি দেখা দিয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক ধোঁয়াসা সৃষ্টির প্রধান কারণ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর সীমাবদ্ধতা এবং অর্থের পরিবর্তন আনয়ন– যেসকল শব্দ ওহীজাত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করতো। এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি থেকে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্যুতির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যা ধর্মীয় জ্ঞান, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের লক্ষণ। সেকুলারিজমের বিস্তারের ফলে একটি দার্শনিক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে এসকল গুরুত্বপূর্ণ মূল শব্দের অর্থের পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হয়। সত্য ও অস্তিত্ব নিয়ে যারা দ্বিধাগ্রস্ত তাদেরকেই মূলত এসকল পরিবর্তন প্রভাবিত করেছে। এই সংকট পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে এই সংকট আমাদেরকে আমাদের জ্ঞানী ও মহান পূর্বসূরী কর্তৃক ধর্ম দ্বারা সঞ্জীবিত মূল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করতে না পারলেও অনেকটাই বিচ্যুতি ঘটিয়েছে। আমাদের বুঝা উচিত এই সমস্যার প্রকৃতি এতো গভীর যে এটি আমাদের জাগতিক সকল দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক উপাদানকে গ্রাস করে ফেলেছে। এই সংকট সমাধানের জন্য কেবল মুসলিম আধুনিকতার শিরায় প্রবহমান সমাজ-রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টা অথবা আইনগত বৈচারিক গোলকধাঁধার দারস্থ হওয়া যথেষ্ট নয়।

ইমাম গাজ্জালির ইহইয়া উলূম আল-দীন—অধ্যায় ৮–১০ সম্বলিত ১৩শ শতকের একটি পারসিক পাণ্ডুলিপি, উৎসঃ sothebys

৮. আল-গাজালির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণার একটি হলো, ইসলামের জ্ঞানভিত্তিক, বিজ্ঞান সম্পর্কৃত ও প্রশংসিত মূল ধারণাগুলো অর্থের পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধকরণের ফলে অবজ্ঞাযোগ্য  জ্ঞানে পরিণত হয় এবং অন্তিম রূপ স্বরূপ এই সমস্যা জ্ঞান বিভ্রাট ও বিপর্যয় তৈরি করে। মুসলিম পন্ডিত ও প্রাচ্যবাদীরা আল-গাজালির এই ধারণা আবিষ্কার করতে ব্যর্থ ছিলেন। ফলশ্রুতিতে তারা এর উপর  যথোপযুক্ত দৃষ্টিপাত করেননি, যার ফলে বর্তমান সময়ের সংকট নিরসনে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্যের বিষয়ে তারা অবগত নয়। ইসলাম ধর্মের মূল শব্দগুলো একটি আন্তঃসম্পর্কিত অর্থের ক্ষেত্র গঠন করে  যা মুসলিম মনের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিফলিত হয়। আল-গাজালি তার গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন‘তে উল্লেখ করেছেন, তার সময়েও ফিকহ, ইলম, তাওহীদ,  জিকর এবং হিকমার মতো গুরুত্বপূর্ণ শব্দের প্রাথমিক ও প্রকৃত অর্থের পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকৃতি ঘটেছিল। একইভাবে তার গ্রন্থ তাহফাতুল ফালাসিফা তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে দার্শনিকরা নিজেদের দর্শনের সাথে মিলাতে ক্রিয়া ও কর্তার অর্থের পরিবর্তন করেছে। অথচ এমন কাজ ইসলামের বিধান অনুযায়ী আল্লাহ ও সৃষ্টির প্রতি বিরোধের সামিল।  আমরা দেখি যে ইসলামের মূল শব্দগুলোর মাত্র কয়েকটির অর্থের পরিবর্তন ঘটালে অথবা ভুল অর্থ প্রদান করলে শব্দগুলো কর্তৃত্ব হারায় এবং প্রথম যুগের মুসলিম চিন্তার প্রতিফলনে ব্যাঘাত ঘটে। ফলশ্রুতিতে অবশ্যম্ভাবী ভাবে মুসলিমদের মনে ভুল ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয় এবং মুসলিমদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ও অধ্যাত্নিক একতা ব্যহত করে। উপরন্তু এই সমস্যাটি একটা সময় প্রশংসা যোগ্য বিজ্ঞানকে অবজ্ঞাযোগ্য করে তুলবে। ঐক্যের দুটি দিক রয়েছে, প্রথমত বাহ্যিক ঐক্য, যা সমাজে সাম্প্রদায়িক ও জাতীয় সংহতি রূপে প্রতিফলিত হয়। দ্বিতীয়ত অভ্যন্তরীন ঐক্য যা ধারণা ও মননের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্নিক সঙ্গতিরূপে প্রকাশিত হয়, যা সাম্প্রদায়িক এবং জাতীয় সীমানার বাইরে বিস্তৃত । বোঝাপড়া মূলত দ্বিতীয়টির সাথে সম্পৃক্ত যা প্রথমটি বাস্তবায়নের জন্য মৌলিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। দ্বিতীয় দিকের সঙ্গতি নির্ভর করে ভাষার অখণ্ডতা ও গভীরতার উপর যা যুক্তির উপকরণ হিসেবে ব্যবহারকারীর উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চিন্তার দূষণের ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্ত বিশ্বদর্শন ভাষাগত বিষয়বস্তুর অখণ্ডতা ও গভীরতা দ্বিধাগ্রস্ত করে। আমি এখানে এমন কোনো প্রস্তাব দিচ্ছিনা যা ভাষার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে অথবা জীবনযাত্রার সমৃদ্ধ পরিপ্রেক্ষিত অনুসরণ করে ভাষার সম্ভাব্য শক্তি অনুযায়ী প্রকাশের আকাঙ্খাকে বিনষ্ট করবে। কিংবা ভাষাকে বিদ্যমান চিন্তাধারা ও সময়ের গতিপথ অনুসরণ করে বিকশিত হতে দিবেনা। আবার, সত্য ও বাস্তবতা প্রকাশের চরম মূহুর্তগুলো ধারণে ব্যর্থ হয় এমন কিছুও আমি প্রস্তাব করছি না। আমি কেবল সেটাই প্রস্তাব করছি যা আল-গাজালি আমাদের শিখিয়েছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন ইসলামী ভাষার মৌলিক শব্দ ভাণ্ডার শুধুমাত্র এর মূল থেকে বিকশিত হতে পারে। মৌলিক শব্দগুলো কখনো এর মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। সীমাবদ্ধ ও খর্বিত মূল থেকেও বিকাশ অসম্ভব। সেকুলারিজম ও বস্তুবাদী মূল্যবোধ প্রাথমিক ভাবে মানব মননে বিদ্যমান থাকে। তারপর সেগুলোকে ভাষাগত প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে সেগুলো শহুরে এলাকায় উপস্থাপন করা হয় যা ক্রমান্বয়ে মহামারীর মতো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে ছড়িয়ে পরে। ভাষার অর্থগত পরিবর্তন শুধুমাত্র ভাষাগত সমস্যা নয় বরং এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গিগত সমস্যাও বটে। ইসলামের মৌলিক শব্দগুলোর ধারণাগত অপ-ব্যাখ্যা মুসলমানদের মধ্যে কোরআন ও হিকমা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরিতে প্রাভাতিক করে।

৯. আরবিসহ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর মধ্যে একটি মৌলিক শব্দভাণ্ডার রয়েছে যা ইসলামের বাস্তব-দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৃত সত্যকে ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম মনে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থাপন করে। যেহেতু এই মৌলিক শব্দভাণ্ডার কোরআন ও হাদিস থেকে উদ্ভূত শব্দ নিয়ে গঠিত, সুতরাং এই শব্দগুলো আরবিতে এবং সকল মুসলিম ভাষায় একরূপে ব্যবহৃত হয়ে বিশ্ব-মুসলিমদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ঐক্য ধরে রেখেছে। এই মৌলিক শব্দভাণ্ডার এমন কিছু মৌলিক পরিভাষা সমন্বিত যারা একে অপরের সাথে অর্থপূর্ণ ভাবে সম্পর্কিত এবং কোরআনের সাথে সঙ্গতি রেখে বাস্তব ও অস্তিত্বের ধারণাগত কাঠামো নির্ধারণ করে।  ভাষা হলো সত্তার প্রতিবিম্ব। একটি ভীনদেশী ধারণা কোনো ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শব্দগত অনুবাদ যথেষ্ট নয় বরং ঐ ধারণার ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিকী রূপান্তর। এই রূপান্তর এমন একটি ভাষার যে ভাষার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে অপর ভাষাটির কোনো ধরনের সঙ্গতি নেই। যারা এই পরিভাষাগুলোর এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে প্রচলনের সমর্থন করেন তারা হলেন সে সকল পন্ডিত, সাংবাদিক, সমালোচক, রাজনীতিবিদ ও অপরিপক্ক ব্যক্তিবর্গ যারা বাস্তব ও সত্যের প্রশ্নে ধর্মের মৌলিক বিষয়ে দৃঢ় জ্ঞান রাখেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রধান কারণ মূল শব্দগুলোর অর্থের পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধকরণ, যা ওহি থেকে প্রাপ্ত বিশ্বদৃষ্টিকে বিকৃত করে।

স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং আল্লামা ইকবাল সহ আধুনিক কালের চিন্তকগণ, দ্যা ট্রেজারস অব টাইম, সাদেকীন, ১৯৬১ উৎসঃ google arts & culture

১০.  কিন্তু আধুনিক চিন্তকগণ, তাদের প্রত্যক্ষ শিষ্যরা ও পরবর্তী অনুসারীরা কোরআন কেন্দ্রীক আরবি ভাষার প্রামাণিক ও কর্তৃত্ত্বপূর্ণ ব্যবহার উপেক্ষা করেছেন। এমনকি কিছু পরম্পরা নির্ভর চিন্তকও এমন ফাঁদে পা দিয়েছেন। তারা শব্দের বুৎপত্তিগত নীতির লঙ্ঘন করেছেন ভীনদেশী বিকৃত ও পরিবর্তিত অর্থগুলো মূল পরিভাষার মধ্যে আরোপ করার উদ্দেশ্যে। এর ফলে পরিভাষাগুলো তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যের বিপরীতে কাজ করেছে এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিগত কাঠামোকে বিপথগামী করেছে। তাদের কোরআন বিষয়ক ভাষ্য থেকে আরবি ভাষার নতুন রূপ তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে তারা ক্রমাগত ভাবে শব্দার্থগত পদ্ধতির পক্ষে অবস্থান করেছেন যা মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুমান ও ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা নির্ভর। বর্তমানে মুসলিমরা অতিতের মতো একই সংকটের সম্মুখীন, আরবি শব্দ ও পদ গুলোর মূলগত ও কাঠামোগত সমুন্নতি বজায় রেখে এবং ইসলামের ধারনাগত ক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্যকে  অবিকৃত রেখে ভীনদেশী চিন্তাধারার সাথে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এবং কার্যকর পরিভাষা উদঘাটনে বরং এই সংকট অতীতের থেকে আরও গভীর ও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসকল বিষয়ে আধুনিক চিন্তকগণ অবগত নয়। ভীনদেশী ধারণাগুলো না বুঝে আত্তীকরণের তাড়াহুড়ো তাদেরকে বাস্তব ও সত্য সম্পর্কে একটি ভিন্ন মনোভাবের পক্ষে কাজ করাচ্ছে। নিজস্ব চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অজ্ঞ  এসকল আধুনিক চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীগণ মুসলিম চিন্তাধারা এবং ভাষাগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। কর্তৃত্বহীনভাবে ইসলামের বৈষয়িক দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোগত চিন্তা সম্পর্কৃত পদগুলোর পরিবর্তন সাধন এবং ভীনদেশী শব্দের অনুবাদ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে আধুনিক আরবি ভাষা অভিধানে, বিজ্ঞান অভিধানে, সাহিত্যে, সংবাদপত্রে, সেকুলার ও রক্ষণশীল চিন্তকদের লেখনীতে বিদেশি শব্দ সংযুক্তির মাধ্যমে সর্তত্র ছড়িয়ে পরে।

অর্থের পরিবর্তনের পেছনের কারণগুলো হলো— ১. বিভিন্ন অর্থবহ প্রেক্ষাপটে মূল অর্থ-কাঠামোর পরিধিগত  সীমাবদ্ধতা ; ২. বুৎপত্তিগত ও প্রাসঙ্গিকতা বর্জিত নতুন অর্থের প্রবর্তন; ৩. আরবিকরণের নামে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন বিশ্বদর্শন থেকে ধ্যানধারণার প্রবর্তন; ৪. আধুনিক বিজ্ঞানের  দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় ঘটানো; ৫. অন্যান্য মুসলিম ভাষাগুলোর মধ্যে আধুনিকতাবাদী আরবি ব্যবহারের এবং চিন্তাভাবনার অনুকরণ।

সমসাময়িক মুসলিম চিন্তাধারায় সেকুলারিজমের সাথে সম্পৃক্ত দার্শনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন, পরিবর্তন, স্বাধীনতা, এবং সেকুলারিজম সম্পৃক্ত ধারণার সাথে তথাকথিত আরবিকরণ ইত্যাদি মুসলিমদের ধর্মবোধের ক্ষেত্রে ব্যাপক ধোঁয়াশা তৈরি করছে। একইসাথে মুসলিম চিন্তাধারার মূল ভিত্তিগুলো যেমন স্রষ্টার প্রকৃতি, ওহি, নবুয়ত, মানুষ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব, জ্ঞান ও বোধশক্তি, নৈতিকতা ও এর উদ্দেশ্য এবং শিক্ষার অর্থপূর্ণ ধারণা সম্পর্কেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। মুসলিমদের অবশ্যই উপলব্ধি হওয়া উচিৎ, বর্তমান সময়ের সেকুলারিজম কেন্দ্রীক শক্তিশালী দার্শনিক কর্মপ্রচেষ্টার বিষয়ে আজকের সংলাপ এবং এটি কিভাবে দৃষ্টির অগোচরে সত্য ও বাস্তবতার, সত্য ও মূল্যবোধের মধ্যে ব্যবধান তৈরিতে কাজ করছে সে বিষয়েও আজকের সংলাপ। শুধুমাত্র ইসলামের পূর্ণজ্ঞান ও বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি এবং এর সাথে পাশ্চাত্য চিন্তার বিকাশ ও পাশ্চাত্য জ্ঞানতাত্ত্বিক ও ধর্মকেন্দ্রক ক্রমবিবর্তনের ঐতিহাসিক বোঝাপড়ার সমন্বয়ে আমরা একটি গভীর এবং সফল আলোচনায় অংশ নিতে পারি,  যেপথ আল-গাজালি অনুরূপ পরিস্থিতিতে প্রদর্শন করেছিলেন।

Share:

আরো পড়ুন