ক. মুকদ্দমা
বর্তমান দুনিয়ায় মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং এর পরিপ্রেক্ষিত, জ্ঞান অনুসন্ধান ও অনুসন্ধানের চৌহদ্দি একটা সংকট-মূহুর্তে এসে ঠেকেছে। এই মূহুর্তের মূর্তায়িত রূপ দুটো ঘটনাকারে হাজির হয়েছে। একদিকে, কাণ্ডজ্ঞানীয় বিষয়-আশয়কে ভাবা হচ্ছে শুধুই ইন্দ্রিয়ের জগত (sense perception বা الحسية) এর ঘটনা হিসেবে কিংবা শুধুই বুদ্ধির জগত (intellectual বা العقلية) এর বিষয়রূপে এবং অন্যদিকে, ব্যবহারিক (experimental বা التَّجْرِيبِيّ) জ্ঞানকে ভাবা হচ্ছে একটা প্রতিমুহূর্তের ভুল ও সংশোধন–মূলক প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে অগ্রসরমান ক্রম-পুঞ্জীভূত জ্ঞানভান্ড হিসেবে ।
এ দুই ঘটনার ব্যবহারিক তাৎপর্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন ধরণের প্রবণতা আকারে রূপায়িত হয়েছে।
একদিকে, সত্ত্বা বা অস্তিত্বের (being বা وُجود) সুআল নিছক ফিকরি অনুসন্ধানের ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে এবং ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিগত সৃজনশীলতায় স্থানিকায়িত করতে না পারা বিষয়াদিকে প্রতীক হিসেবে এপ্রচ করা বা ব্যাখ্যা করার চল তৈরি হয়েছে। আরও ক্ষেত্রবিশেষে এগুলো নিছক ফ্যান্টাসি, কল্পনা কিংবা ইউটোপিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছে।
অন্যদিকে, পদ্ধতিগত অর্থে ব্যবহারিক জ্ঞানের তাদিল বা প্রচলিত অর্থে নৈতিকতার সুআল লুপ্ত হওয়ায় এটি খুবই উপযোগীবাদী অর্থে কাজ চালানোর উপযোগী জ্ঞানে রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এ রূপান্তরের ঘটনা এই শেষোক্ত জ্ঞানের স্বরূপকে বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়ের পরিসরে ব্যপ্ত সংশয় ও সসীমতা – র আওতায় নিয়ে এসেছে। ফলত, চুড়ান্তভাবে এর অর্থ দাঁড়াইছে, এটি আমাদের ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি জগতের বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে একটা অনুকল্পে ভর করে দাঁড়ানো জ্ঞান দেয়, এ রকম একটা ভাব খোদ ব্যবহারিক-জ্ঞান চর্চাকারীদের মধ্যেও মশহুর হয়েছে।
কিন্তু তজরিবী জ্ঞান মাত্রাগত অর্থেই এক্সটার্নাল রিয়েলিটি – র জ্ঞান আমাদের দেয়। এ পরিসরে, জ্ঞান প্রকরণ বা স্বরূপের জায়গায় পদ্ধতিগত অর্থে, ক্রমধারাবাহিকতার ভুল (error), প্রাপ্ত ফলাফল থেকে সম্ভাব্য প্যাটার্ন বা নিয়ম সম্পর্কে পদ্ধতিগত অগ্রিম অনুমান (prediction), পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ (control) এবং নতুন নিয়ম আবিষ্কার (discovery) ইত্যাদি খুবই ইতিবাচক অর্থে এ বিষয়ে চারপ্রস্থীয় সাবুত (evidence) হিসেবে বিবেচিত হয় (মারিও ব্যুংঙ্গে : ১৯৮১ )। এদিক থেকে, জ্ঞানের এই বিশেষ ধরণটিকে নিছকই কান্টীয় সংশয়ের আওতায় কিংবা ফেনমেনোলজিক্যাল সসীমতায় আলাপ করতে চাওয়ার অর্থ পদ্ধতিগতভাবে এই চারপ্রস্থীয় সবুতকে একীভূতভাবে আমলে না নেয়া।
এ চৌহদ্দি বা হদ গুলিয়ে ফেলা থেকে যে বিপত্তির উদ্ভব ঘটেছে, তার বিবেচনায় একটা প্রজ্ঞাময় মিমাংসার খোঁজে আমরা হাজির হব মধ্যযুগের মুসলিম জ্ঞানী-গুণী ও সাধকদের আলমুল মেসাল (عَالَمُ الْمِثَالِ) সংশ্লিষ্ট ভাবধারায়। সময়টা এমন ভূগোলকে সামনে নিয়ে আসে, যে সময়ে সমস্ত গন্তব্যগুলো মদীনায় গিয়ে মিশে গিয়েছিল। যদিও উল্লেখিত ভাবধারা কিছু নতুন সমস্যাও উস্কে দিয়েছিল। পোস্ট-ক্ল্যাসিক্যাল ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সাথে সংশ্লিষ্ট এ ভাবধারায় চৌহদ্দি বা হদ যেভাবে সীমায়িত হয়েছে, তা থেকে বর্তমান জমানায় উদ্ভূত সমস্যার মিমাংসায় মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি লাভ সম্ভব।
এখন আমরা ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ. ও ইমাম গাযালি রহ. এর ভাবধারায় আলমুল মেসাল সম্পর্কিত বয়ানগুলোর সাথে প্রথমে পরিচিত হব। এরপর আধুনিক পাশ্চাত্য পাণ্ডিত্যে আলমুল মেসাল যেভাবে আলোচিত হয়েছে, সে বিশেষ ধরণটির কিছু পর্যালোচনামূলক বয়ান হাজির করব।
খ. আলমুল মেসাল
হাদীছের অনেকগুলো সহীহ্ রেওয়ায়েতের বর্ণনা সংশ্লিষ্ট আছে এমন কতগুলো বিষয়-আশয়ের সাথে যেগুলো বস্তুজগতের দৃশ্যমান বিষয়-আশয় না। এগুলোকে বুদ্ধিগত সৃজনশীলতা বা নির্মাণের অধিপতিশীল পরিসরে যৌক্তিকভাবে স্থানিকায়িত করা যায় না এবং এগুলো আবার সরাসরি ঈমানের পরিসর হিসেবে আওতাভূক্ত আইটেমগুলোর মধ্যেও পড়ে না। কিন্তু এগুলোকে যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গিতে বোধগম্যতায় নেয়ার সাথে মানুষেরআহলুল হক বা আহলুল বাতেল হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক (শাহ ওয়ালি আল্লাহ : ১৯৯৬ )।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা – র প্রথম খণ্ড: সার্বজনীন মূলতত্ত্ব, যা থেকে মাসলাহা উদগত হয় এবং যা শরীয়ার হুকুম–আহকামে বিবেচনা করা হয়– এর ১ নাম্বার কিতাব : প্রথম অনুসন্ধান (ধর্ম্মীয় বাধ্যবাধকতা ও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনাদি) এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে উপরে উল্লেখিত বিষয়-আশয় সংশ্লিষ্ট ঊনিশটি হাদীছ এনেছেন, যার মধ্যে থেকে দুটি রেওয়ায়েত নিচে উদ্ধৃত হল:
১. “তোমরা দুই উজ্জ্বল সূরা, সূরা বাকারা ও সূরা আলে ইমরান পাঠ করবে। কেননা, কেয়ামতের দিন তারা দুটি মেঘখণ্ড অথবা দুটি শামিয়ানা অথবা দুটি পাখা-প্রসারিত পাখির ঝাঁকরূপে উপস্থিত হবে এবং তাদের পাঠকারীদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে ক্ষমার দরখাস্ত পেশ করবে।”
এই সহীহ্ হাদীছটি সহীহ্ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি ও অন্যান্য হাদীছের কিতাবে ভিন্ন ভিন্ন শব্দে বর্ণিত হয়েছে। সু’আল হল: পবিত্র কুরআন করিমের উপরোল্লেখিত দুটি সূরাকে এই হাদীছে যে অবয়ব-রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোকে আমরা কি আকারে ভাবব?
২. “নবি করিম সা. ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন আমলসমূহ উপস্থিত হবে। প্রথমে সালাত উপস্থিত হবে; তারপর যাকাত, দান-সদকা উপস্থিত হবে; এরপর উপস্থিত হবে সাওম।…”
এটা একটা লম্বা হাদীছ। এখানে শুধু এতটুকু উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট, যাতে নিম্নোক্ত সু’আলটিতে ফোকাস করা যায়: দেহহীন আমলসমূহ কেয়ামতের দিন কি স্বরূপে উপস্থিত হবে?
একই রকম একটা প্যারালাল দেখা যায়, গাযালি রহ. এর ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন-এ। বিশেষ করে এর চতুর্থ ভাগ: মুনজিয়্যাত বা নাজাতের পথ ও নাজাতপ্রাপ্তদের বৈশিষ্ট্য-এ স্থানপ্রাপ্ত ও ৪০ নাম্বার কিতাব : (মওতের স্মরণ ও আখেরাতের জীবন) এর তৃতীয় অধ্যায়ের ‘ফি বয়ানি আযাবিল কাবরি ওয়া সু’ওয়ালিল মুনকারি ওয়ান নাকির’-এ তিনি কবরের যন্ত্রণা ও প্রশান্তি বিষয়ক রেওয়ায়েতগুলো বর্ণনা করেছেন; পরে এ বিষয়-আশয়গুলো কিভাবে বোধগম্যতায় নিতে হবে, সে বিষয়ক পদ্ধতিগত বয়ান হাজির করেছেন।
ইমাম গাযালি রহ. ও ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ. উভয়েই মানহাজ বা পদ্ধতিগত জায়গায় তিনটি দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয়-আশয় বোধগম্য হতে পারে বলে রায় দিয়েছেন।
এ আলাপটা আমরা ইসলামের তুরাসি বিতর্ক – বাহ্যিক অস্তিত্ব (external object বা الوجود الخارجي), ধারণায় তৈরী হওয়া অস্তিত্ব (mental construct বা الوجود الذهني) এবং নফসে আমর (نفس الأمر) এর মধ্যে পার্থক্য সূচক আলোচনা – হিসেবে করব না বরং আমাদের আলাপ আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের উৎকর্ষ যে নতুন ধরণের দরজা-জানালাগুলো খুলে দিয়েছে কিংবা যেসব দরজা-জানালা বন্ধ হয়েও হয় নাই, সে পরিপ্রেক্ষিতগুলো পর্যালোচনায় নিয়ে আগাবে। ফলত, গাযালি রাহ. ও শাহ সাহেব রাহ. এর পদ্ধতিগত প্রস্থান-পিঠে হাজির হওয়ার আগে এ সংশ্লিষ্ট পাশ্চাত্য দর্শনের একটি পুরাতন বয়ানে চোখ ফেরাব।
খ.১ মগরিবী বুদ্ধিবৃত্তির ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির দ্বিবিভাজন বিষয়ে একটি নোক্তা
কান্টকৃত ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির পার্থক্যজ্ঞান বা ইন্দ্রিয়ের জগৎ (De Mundi Sensiblis) ও বুদ্ধির জগৎ (De Mundi Intelligiblis) ফারাক ভিত্তিপ্রস্তরে আধুনিক মানুষের জন্য অনুমিত স্বাধীনতা দাঁড়ানো। যাঁরা এ স্বাধীনতার পরিসরে সৃজনশীলতার স্মারক হিসেবে মানবীয় স্বতঃস্ফূর্ততা (human spontaneity) নিজেদের উপর আরোপ করেন কিংবা এই ধারণায় চলেন, তাঁদের জন্য এই আলাপ একটু বিদঘুটেই ঠেকবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, কান্ট ফারাকের এই ভিত্তিপ্রস্তরগুলোকে যথাক্রমে বিষয় (matter), কাঠামো (form) ও বিশ্বজনীনতা (universality) ইত্যাদি ক্যাটেগরি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (কান্ট : ১৯৯৬)।
আবার, অনেকে কান্টকৃত ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির পার্থক্যজ্ঞান জনিত দৃষ্টিকোণটির সীমাবদ্ধতা বোধগম্যতায় নিয়েছেন। এক্ষেত্রে, তাঁরা হেগেলীয় হোম – কামিং বা দর্শনের আদি ঘরে প্রত্যাবর্তন হিসেবে কান্টের ‘অরিজিনারি সিনথেটিক ইউনিটি’-তে (originary synthetic unity) জোর দেন অর্থাৎ “জগৎ বা প্রকৃতিকে জানার অর্থ হল”একই সাথে “মানুষের নিজেকে নিজে জানা” থিসিসটিও (কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস: ২০০৯)। কিন্তু এটি আরেকটা সমস্যা সামনে নিয়ে আসে।
তাহল: কোনকিছু বোঝার আগে কোনকিছু যেভাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়, তা বা সে প্রক্রিয়া আসলে স্বয়ংম্ভূ কিনা?
স্বয়ম্ভু হলে অর্থাৎ কোন প্রকার মধ্যস্থতা ছড়া অব্যবহিত মূহুর্তের (immediate) দিকে মনযোগী হওয়া একই সাথে একটি বিন্দুক মূহুর্ত (point instant) নির্দেশকও বটে; কাজে কাজেই প্রক্রিয়া ও ফলাফলের দিক থেকে এটা একটা বাছাইকৃত ও বিশেষ ধরণের আবির্ভাবের ইতিহাসও বটে।
আরও বিস্তৃত অর্থে যদি বলা হয়, তাহলে এভাবে বলা যায়: চিন্তার স্বয়ম্ভুতার অর্থ হল চিন্তার নিজের বাইরে আর কোন অথিরিটি না থাকা অর্থাৎ চিন্তা নিজে নিজের দোহাই। এটি একই সাথে সর্বোচ্চ ও চুড়ান্ত আজাদীর বহি:প্রকাশও বটে। এই সর্বোচ্চ ও চুড়ান্ত আজাদী একই সাথে মানুষের দুনিয়ায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাসের দাবী নিয়েও আসে; অর্থাৎ এই আজাদী দুনিয়ায় একটি আজাদ ভিত্তি (free constitution) -র উপর ও এর মাধ্যমেই অস্তিত্বে আসে।
হেগেল সাহেবের এই স্বয়ম্ভু বা বিশুদ্ধ চিন্তার ধারণা, যাকে ব্যবহার করে তিনি ইউরোপীয় বা অন্যান্য সংস্কৃতির মধ্যে যথার্থ দর্শন (philosophy proper) ও প্রাক–দর্শন (preforms of philosophy) খোঁজ করতেছেন এবং এই দুই ক্যাটেগরির মধ্যে সুপষ্ট ফারাকগুলো বিবেচনায় নিয়ে দর্শন করছেন (doing philosophy) (জর্জ উইলহেলম ফ্রিডরিখ হেগেল : ১৯৯০) – এটা অবস্থান হিসেবে নিজেই সোজাসাপ্টাভাবে স্পষ্ট ও নগ্ন।
এছাড়া তাঁর দর্শন ও বিশুদ্ধ চিন্তার ধারণা যথাক্রমে যেভাবে Enzyklopädie der philosophischen Wissenschaften im Grundriß (১৮৩১ ঈসায়ী ) ও Wissenschaft der Logik (১৮১২ থেকে ১৮১৬ ঈসায়ী ) -এ হাজির হয়েছে তা মূলত ঘটেছে ঊনবিংশ ঈসায়ী শতাব্দীর প্রথম তিনদশকের জর্মান ভাষার চমৎকার সাহিত্যিক উম্মেষ ও উৎকর্ষের বিস্তৃত আবহে এবং তিনি ঐ ঐতিহাসিক পর্বের ইউরোপীয় দর্শনের অধিপতিশীল ধারণাদি ও পরিভাষাগুলোও ব্যাপকভাবে কাজে লাগিয়েছেন (হেইণ্জ কিম্যার্লি : ২০১৪)।
তাঁর দর্শনে বিশেষ সংস্কৃতি ও ইতিহাস নির্ভরতার প্রাবল্য বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে সেই মূহুর্তে, যখন তিনি চিন্তার সামগ্রিক অগ্রগতি বা চুড়ান্ত হাজিরার পথকে অব্যবহিত (immediate) ও অমীমাংসিত (undetermined) থেকে চুড়ান্ত মধ্যস্থতা (absolute mediation) ও মিমাংসা (determination) এর মধ্যে ন্যুনীকৃত করে নিয়েছেন (প্রাগুক্ত )। এর অর্থ হল, এখানে তথাকথিত চিন্তা সফরের শুরুতেই হেগেলের মনোচিত ও জানা গন্তব্য মুখীন। মজার বিষয় হল, হেগেলের জন্য চিন্তার এই গতিপথের বাইরে আর কোন পথ নাই কিংবা থাকলেও তা তাঁর নির্ধারিত মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই প্রকরণের একটি বিশুদ্ধ চিন্তার ধারণা দ্বারা এই দাবী করা যায় না যে, যা কিছু চিন্তা করা হবে ও জানা যাবে, তার সবকিছুকেই এ বিশেষভাণ্ড (totality of thought) এর ভিতর স্থানিকায়িত করা যাবে।
চিন্তার নিজে চিন্তা করতে পারা– র এই বিশেষ ধারণা আরেকটি ব্যাপারকে এর সাথে সংশ্লিষ্ট করে এবং তা হল: যা কিছু চিন্তা করা যাবে এবং জানা যাবে, তা আবার একই সাথে কনস্ট্রাকশনের ব্যাপারও বটে। অর্থাৎ বাহ্যিক বাস্তবতা ও আরো সূক্ষ্মভাবে বললে হাকিকতও আমাদের চিন্তার অনুরূপই। সুতরাং বাহ্যিক প্রকাশ বলেন কিংবা হাকিকত বলেন, তা শুধুমাত্র Enzyklopädie der philosophischen এবং der Logik এর আলোকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হইছে, সেভাবেই শুধু চিন্তা করা যাবে।
কিন্তু উল্লেখিত কিতাবদ্বয়ে হেগেল এসব বিষয়-আশয় যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা কোনভাবেই ঐ সময়কার জর্মান ভাষার বাইরে স্বাধীন অস্তিত্বের ঘটনা না। কাজে কাজেই এই বিশেষ দর্শন-যজ্ঞ একটা প্রদত্ত সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক অবস্থার বিষয়ও মানে এটা একটা নির্দিষ্ট মূহুর্তের সাক্ষ্য সাবুতই হাজির করেছে।
তাই চিন্তার নিজেই নিজের আত্মসচেতন হয়ে উঠার প্রক্রিয়াকে সামগ্রিক অর্থে প্রজ্ঞার আবির্ভাব প্রক্রিয়া রূপে বাংলায় তর্জমা (কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস : ২০০৯) একটা অতিরঞ্জনই বটে। এই উল্লেখিত দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণের জন্যও আলমুল মেসালের বয়ান স্বস্তির ঠেকবেনা।
এই বিদঘুটে অনুভূতি আর অস্বস্তি কাটিয়ে উঠার জন্য দরকার বিশেষ ধরণের সংলাপ (dialogue বা حِوَار) এবং তার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা (principles বা أصول)। আমাদের পাবলিক পরিসরে পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় এই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলোর অনুপস্থিতিই প্রকট।
খ.২ গাযালি রহ. ও ওয়ালিউল্লাহ রহ. এর পদ্ধতিগত অবস্থান
যাই হোক, গাযালি রাহ. ও শাহ ওয়ালিউল্লাহ রাহ. বর্ণিত তিনটি দৃষ্টিকোণের প্রথমটি হল: এসব রেওয়ায়েত যে হিসেবে আমাদের পর্যন্ত পৌছাইছে ও বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সেভাবে বাহ্যিক অর্থেই একে গ্রহণ করা এবং মেনে নেয়া। এই পন্থা’ই হল সবচেয়ে দালিলিক (evidential বা بُرْهَان ) , স্পষ্ট (transparent বা صَرِيح) ও নিরাপদ।
আবার, এই দৃষ্টিকোণ দ্বারা একই সাথে বাধ্যতামূলকভাবে আলমুল মেসালের সত্যায়নও হয়ে যায়। শাহ সাহেব রাহ. বলেন, মুহাদ্দিসগণের নীতিমালা চিন্তার এই পদ্ধতি’ই দাবী করে। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এবং তিনি (শাহ সাহেব রহ.) নিজে এই পন্থাই অবলম্বন করেছেন।
দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ হল, এসব ঘটনা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুভূতিতে জাগ্রত হয় এবং তার দৃষ্টিশক্তিতেই তা রূপায়িত হয়ে উঠে, যদিও তার অনুভূতির বাইরে এসব ঘটনার কোন অস্তিত্ব নাই। এটি হল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর পন্থা।
তৃতীয় দৃষ্টিকোণ হল, এসব রেওয়ায়েতগুলোকে আলঙ্কারিক বর্ণনা বা প্রতিকী উপস্থাপন কিংবা উপমা সূচক হিসেবে ধরা যেগুলো আসলে ভিন্ন একটা অর্থ বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে । শাহ সাহেব রহ. বলেছেন, এসব রেওয়ায়েতের ফিকিরে যাঁরা এই তৃতীয় পন্থাকেই যথেষ্ট মনে করেন, তাঁদের তিনি আহলুল হক মনে করেন না।
এখানে একটি সুওয়াল স্বাভাবিকভাবেই আসতে পারে! পোস্ট-ক্ল্যাসিক্যাল মুসলিম দর্শনে আলমুল মেসালের এত সূক্ষ্ম ও উৎকর্ষপূর্ণ আলোচনা থাকতেও কেন আমরা উপরে শুধুই গাযালি ও শাহ সাহেবের এ বিষয়ক পদ্ধতিগত অবস্থান নিয়ে আলাপ করলাম?
খ.৩ কেন গাযালি রহ. ও শাহ ওয়ালি আল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ.?
আল গাযালি রহ.-ই প্রথম ‘ফি বয়ানি আযাবিল কাবরি ওয়া সু’ওয়ালিল মুনকারি ওয়ান নাকির’-এ কবরের আযাব সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির নৈর্ব্যক্তিক অবস্থিতির দাবী করেন ওয়াজুদের সামগ্রিক সূত্রায়নের দিক থেকে দাবী করেন (ড. ফযলুর রহমান : ১৯৬৪)। এর আগ পর্যন্ত এসব বিষয়-আশয়কে একটি বহুল প্রচলিত সূত্রে বলা হত: “আমরা জানি যে, এসব বিষয়-আশয় ‘আছে’, কিন্তু ‘কিভাবে আছে’ সে বিষয়ে আমরা জানি না।” গাযালি শুধুমাত্র এ দাবীটুকু করে ক্ষান্ত হননি; তিনি বলেছেন, আমাদের মধ্যে এসব বিষয়-আশয়ের বোধগম্যতাও তৈরী হয় ‘ভিন্ন ধরণ’ এর মননশক্তির সহযোগিতায়, যাকে কোনক্রমেই ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ড. ফযলুর রহমান আরো বলতেছেন, শেখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী মাখতুল রহ. গাযালি রহ. কৃত এই প্রস্তাবনা ধরেই বাহ্যিক ও রুহানি পরিসরের মধ্যবর্তী তৃতীয় আরেকটি পরিসরকে সূত্রায়ন করেন। এ বিবেচনায় আলমুল মেসাল সূত্রায়নের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণকারী হিসেবে গাযালি রহ.-কে এস্তেমাল করা হয়েছে।
শাহ ওয়ালি আল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ. হাত ধরেই আলমুল মেসাল বয়ানের পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে (ফুয়াদ এস. নাঈম : ২০০৫)। গাযালি রহ. এর পর আলমুল মেসালের বয়ান শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহ., শায়খুল আকবর মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি রহ., দাউদ কায়সারী ও মোল্লা সাদরা প্রমূখদের হাতে মূলত ‘আকলি’ পরিসরের মধ্যেই উত্থিত, এর সাথেই সংশ্লিষ্ট ও এ পরিসরেই প্রধানভাবে সূত্রায়িত বিষয়াকারে ন্যুনীকৃত হয়। কিন্তু শাহ ওয়ালি আল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভি রহ.-ই পরবর্তীতে এ বয়ানকে তার আদি পরিসরের সাথে সংশ্লিষ্ট করে পুনরায় হাজির করেন অর্থাৎ এ বয়ানকে আবার বুনিয়াদি টেক্সট তথা নকলের সাথে সংশ্লিষ্ট করে তুলে ধরেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার মাধ্যমে মূলত আলমুল মেসাল বয়ানের পূর্ণত্বই হাসেল হয়েছে।
গ. মার্টিন হাইডেগার ও দাবোস বাহাস
১৯২৯ ঈসায়ীর বসন্তে পাশ্চাত্য দর্শনের নিউ-কান্টীয় ধারার আর্নেস্ট ক্যাসিরের ও ফেনমেনোলজির অন্যতম পুরোধা মার্টিন হাইডেগার সুইজারল্যান্ডের দাবোস শহরে একটি পাবলিক বাহাসে মুখোমুখি হন (পিটার ই. গর্ডন : ২০১০)। এ বাহাসেই হাইডেগার কান্টের সামগ্রিক দার্শনিক প্রকল্পকে চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেন:
“কান্ট মূলত ও সাধারণভাবে ওয়াজুদের একটি তত্ত্ব হাজির করার কৌশিশ করে গেছেন; এমন তত্ত্ব যাতে প্রদত্ত বিষয় সম্পর্কে কোন পূর্বানুমান নেই। মওজুদ আছে এমন বিষয়াদির জন্য সুনির্দিষ্ট কোন পরিসর ধরে নেয়াও নেই কিংবা নেই এ বিষয়ক কোন পূর্বানুমানও। এক্ষেত্রে মওজুদ বিষয়াদির জন্য পরিসরের বিবেচনা পদার্থিকও হতে পারে, আবার মনস্তাত্ত্বিকও হতে পারে।…” [ “Kant sought a theory of Being in general, wirhout assuming objects that are given, without assuming a determinate region of beings (either psychic or physical)…”] (মার্টিন হাইডেগার : ১৯৯৭)
এটা সুপষ্ট যে, এখানে হাইডেগার মূলত প্রথম ক্রিটিক (১৭৮১ ঈসায়ী) এর শেষ ডিসকোর্স ‘Transcendental doctrine of method’ এর তিন নাম্বার অধ্যায় ‘The architectonic of pure reason’ -কে (কান্ট : ১৯৯৬) মুখতসরে হাজির করেছেন । কিন্তু প্রথম ক্রিটিকের যুক্তিধারাগুলোরে প্রত্যক্ষ, পরিচ্ছন্ন ও সাধারণাকারে হাজির করা কিতাব Prolegomena to Any Future Metaphysics (That Will Be Able to Come Forward as Science) [১৭৮৩ ঈসায়ী]- এ কান্ট ‘ট্রান্সেনডেন্ট প্রশ্ন’ আরো চারটি সুআলের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ধাপে ধাপে উম্মোচনের কথা জানান:
১. বিশুদ্ধ গণিত কিভাবে সম্ভব?
২. বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক বিজ্ঞান কিভাবে সম্ভব?
৩. ওয়াজুদের একটি সাধারণ তত্ত্ব (Metaphysica Generalis) কিভাবে সম্ভব?
৪. উলুম বা বিজ্ঞান হিসেবে ওয়াজুদের তত্ত্ব (Metaphysics as science) কিভাবে সম্ভব?
শেষোক্ত কিতাবটির পূর্ণ নাম এবং এতে উল্লেখিত চারটি সুআলের ক্রম ধারাবাহিকতা থেকে স্পষ্ট হয় যে, কান্টের উদ্দিষ্ট ওয়াজুদের কোন সাধারণ তত্ত্ব অভিমুখীনও ছিল না বরং উলুম হিসেবে ওয়াজুদের তত্ত্বের দিকেই তিনি ধাবিত ছিলেন প্রতীয়মান হয় (কান্ট : ২০০৪)।
শেষোক্ত কিতাবটির মূল জর্মান নাম Prolegomena zu einer jeden künftigen Metaphysik, die als Wissenschaft wird auftreten können এবং এটির ইংরেজি তর্জমায় জর্মান ভাষার Wissenscaft শব্দটির জন্য ইংরেজি Science শব্দটি বাছাই করা হয়েছে। জর্মান শব্দটির মূল অংশ Wissen, যা পুরাতন জর্মান ভাষার শব্দভাণ্ডারে প্রজ্ঞা বুঝাতে ব্যবহৃত হত; এই অর্থে Wissenschaft শব্দটি Science শব্দের চেয়ে বৃহৎ পরিসরের ইঙ্গিতবাহী (ম্যাক্স ওয়েভার : ২০০৪)।
যাই হোক, পরবর্তীতে এটি দ্বারা যেকোন ধরণের পদ্ধতিগতভাবে সুসংগঠিত জ্ঞানের পরিসরকে বুঝানো হতে থাকে। পদ্ধতিগতভাবে সুসংগঠিত এই জ্ঞানের পরিসর আবার সামাজিক কারণ তা শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের আওতায় অন্যান্যদের মধ্যে হস্তান্তর করে দেয়া যায়। এই বিশেষ টেকনিক্যাল অর্থেই Wissenschaft এর অর্থকে ইংরেজি Science এর সমতুল ধরা হয়েছে (প্রাগুক্ত )।
কান্টের একজন প্রগাঢ় শরাহ লিখিয়ে হিসেবে হাইডেগার এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালই ওয়াকিবহাল ছিলেন। তবু তিনি কেন কান্টকে এভাবে চিহ্নিত করতে চাইলেন? কান্টের সামগ্রিক লেখাজোঁকায় বা তাঁর বিশ্বব্যবস্থার যে তাত্ত্বিক-স্থাপত্য (architectonic), তাতে এমন কিছু কি আছে যা থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যায়?
গ.১ কান্ট ও তাঁর প্রাক–পর্যালোচনামূলক পর্বের লেখাজোঁকা
কান্ট তাঁর দর্শনের কিতাবাদী প্রকাশের ক্ষেত্রে ১৭৭০ ঈসায়ীর পূর্বেকার লেখাজোঁকাগুলো বিবেচনা না করার জন্য প্রকাশকদের অনুরোধ করেছিলেন (ফ্রাঙ্ক থিলি : ১৯৪৯)। আমাদের মতে, এই সময় বিভাজনের মধ্যেই এ সুআলের সম্ভাব্য অনুসন্ধান ক্লু নিহিত আছে। অর্থাৎ কান্টের চিন্তার ‘পর্যালোচনামূলক পর্ব’ ও ‘প্রাক-পর্যালোচনামূলক পর্ব’ এর মধ্যে সুপষ্ট ও প্রয়োজনীয় পৃথকীকরণের এতদিনকার প্রচলনকে মাড়িয়ে গিয়েই এ পয়েন্টে আমাদের ভাবতে হবে।
এক্ষেত্রে তাঁর দর্শনের চুড়ান্ত জায়গাটার সূত্রায়নে পর্যালোচনামূলক ও প্রাক-পর্যালোচনামূলক পর্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা রয়েছে; আমাদের প্রথম অভিমত হল: মশহুর ‘বুদ্ধির জগৎ’ ও ‘ইন্দ্রীয়ের জগৎ’ দ্বিবিভাজন প্রাক-পর্যালোচনামূলক পর্বের।
বিশেষভাবে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কান্টের প্রাক-পর্যালোচনামূলক পর্বের Träume eines Geistersehers erläutert durch Träume der Metaphysik (Dreams of a Spirit-Seer, Illustrated by Dreams of Metaphysics) [১৭৬৬ ঈসায়ীতে প্রকাশিত] নামক কিতাবের কথা বলেন। এটিতে কান্ট বলেন,”মানুষের রুহকে অবশ্যই বর্তমান জীবনের নিরিখে দুই জগতের সাথে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, মানে যতক্ষণ এই দেহে রুহ থাকবে ততক্ষণ। যদিও এই দেহ শুধু তার সামনে দৃশ্যমান অবয়বী জগতই স্পষ্টভাবে তার অভিজ্ঞতায় হাসেল করতে পারে। কিন্তু একই সাথে রুহানি জগতের সদস্য ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে সে দেহজভাবেই তার রুহানি ফিতরতকেও অভিজ্ঞতায় হাসেল করতে পারে এবং অবস্তুগত বৈশিষ্ট্যের বিশুদ্ধ উপস্থিতিও সে এক্সপেরিয়েন্স করতে পারে সে সাথে একে শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের আওতায়ও নিয়ে আসতে পারে;..” [ “…The human soul must therefore be seen as connected even during this present life with two worlds, of which, as long as it is bound in personal union with a body, it experiences clearly only the physical one; However, as a member of the spiritual world, it experiences and imparts the pure influx of non-material nature;…”] (কান্ট : ২০০২)
এ কথা কান্ট বলেছেন বটে; কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক উপসংহার ভিন্ন রকম: “…মানুষের যুক্তি-বুদ্ধির পাখা এতটা শক্তিশালী করা হয়নি যে, সে আসমানের সর্বোচ্চ স্তরে জমা মেঘ ওখানে গিয়ে ছুঁয়ে আসবে; চর্মচক্ষুতে আখেরাতের রহস্য দেখবে! এ বিষয়ে অতি-আগ্রহী তলবকারীদের আমরা একটা খুব স্বাভাবিক কথাই বলব: ঐ জগতে গিয়ে দেখে না আসা পর্যন্ত তাঁদের জন্য উত্তম হল সবরের সাথে অপেক্ষা করা।…” [ “…Human reason was not given strong enoughwings to part clouds so high aoove us, clouds which withhold from our eyes the secrets of the other world. Tliecurious who inquire about it so anxiously may receive the simple but very natural reply, that it would be best for them to please have patience until they get there…”] (প্রাগুক্ত )
এ প্রসঙ্গে Encyclopedia Britannica এর ভাষ্য মতে, Traume কিতাবেই প্রথম লাইবনিৎস-উল্ফিয়্যান মেটাফিজিক্সের বাইরে কান্টের নতুন দর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, যা পরবর্তীতে The Inaugural Dissertation of 1770-এ অনেক পরিণতভাবে হাজির হয়েছে এবং মশহুর প্রথম ক্রিটিকে এই শেষোক্ত সন্দর্ভের গুরুত্বপূর্ণ আইডিয়াগুলো’ই কেন্দ্রীয় থেকে গেছে (কান্ট : ১৮৯৪)। যদিও Traume – এ নেতিবাচক উচ্চারণ আছে, কিন্তু তিনি এতে এমন কিছু জোর দিয়ে বলেননি যাতে থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে, রুহানি জগতের বিষয়াদি মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রম বৈ আর কিছুই নয়। বরং এতে এই ইঙ্গিত আছে যে, নৈতিক অভিজ্ঞতাই মানুষকে একটি বিশুদ্ধ বুদ্ধি জগতের ‘নমুনা’ বিষয়ক সুআলের মুখোমুখি করে দিতে পারে এবং এক্ষেত্রে এটিই যথেষ্ট। কাজেই কাজেই শুধুমাত্র একটি ‘স্বয়ম্ভু নৈতিক বিশ্বাস’ এর উপর আস্থাবান হওয়াই রুহের জগতের সাবুত, যদিও অধিবিদ্যার পরিপ্রেক্ষিত থেকে এ জগতের জ্ঞান হাসেল অসম্ভব।
এসব কথার তাৎপর্য কি?
কান্টের তাত্ত্বিক-স্থাপত্য পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, সমস্ত বাছনি সক্ষমতা সম্পন্ন (freedom of choice বা اِخْتِيَار) বুদ্ধিমান সত্ত্বা (rational being বাكائن عاقل) নিজেদের একটা বিশেষ হালে আবিষ্কার করেন এবং এমন হাল যা, তাঁদেরকে নৈতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার অবস্থায় পতিত করে। এই অবস্থা ব্যক্তিকে একই সাথে তাঁর স্বার্থ চিন্তার সমতুল হিসেবে আরেকজন আকলি সত্ত্বার সমধর্মী স্বার্থকেও অবশ্যম্ভাবীভাবে বিবেচনায় আনার অবস্থায়ও নিয়ে আসে। অর্থাৎ সকল লিপ্ত আকলি সত্ত্বার এ বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছানো উচিত যে, সত্যিকারের জীবনযাপনযোগ্য একটি জীবনে অবশ্যই সবার জন্য সমতাসূচক ও ভেদাভেদহীন সুখের নিশ্চয়তা থাকবে।
কিন্তু নৈতিক আইন মান্য করা অনেক সময় সেই কাংখিত সুখ বিসর্জন দেয়া দাবী করে। অথচ আমরা জীবনের তাৎপর্যকে এই সুখের সাথেই সংশ্লিষ্ট করি। কান্ট মনে করেন, এই সমস্যা আমাদেরকে একটি ‘ব্যবহারিক পরিসর সংশ্লিষ্ট অসংগতি বা অর্থহীনতায়’ উপনীত করে। যদি আমরা একটি মৌলিক স্বীকার্য এক্ষেত্রে অনুমান করে নিই, তাহলেই আমাদের নৈতিক কর্মযজ্ঞের যৌক্তিকতা সংরক্ষিত হতে পারে।
অর্থাৎ তিনি দাবি করতেছেন, আমাদের অবশ্যই ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির বাইরের একটি জগৎ কিংবা মৃত্যু পরবর্তী আখেরাতের জীবন সে সাথে একজন মহান ও নৈতিক ‘খোদা’কে স্বীকার করতে হবে। এই স্বীকার করা বিশ্বাস থেকে হতে পারে কিংবা মানুষের ‘যুক্তি-বুদ্ধি’ যে চৌহদ্দিতে সীমায়িত সে বিবেচনার দিক থেকেও হতে পারে। এই মৌলিক স্বীকার্য থেকেই আমাদের বর্তমান জীবনের জন্য ‘সর্বোচ্চ ভাল’ কিংবা ‘পরম সুখ’ নিশ্চিতির ন্যায্যতা আসতে পারে। কিন্তু রুহানি জগতের জ্ঞান বা রুহানি অস্তিত্ব নিয়ে কেন ইতিবাচক অর্থে চিন্তা করা সম্ভব না? এর সম্ভাব্য জওয়াব ইন্দ্রীয় ও বুদ্ধির চৌহদ্দিতে আমাদের বুঝব্যবস্থা যেভাবে সীমায়িত হয়েছে তার মধ্যে নিহিত।
কান্ট বলতেছেন, যেকোন বিষয়ে আমাদের ধারণা তৈরি হওয়া সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার দাবীই হল কোন বস্তু বা বিষয় কর্তৃক বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলোতে প্রতিক্রিয়া তৈরী করা (আয়ন মহারাজ : ২০১৭) । কাজে কাজেই রুহানি জগতের বিষয়াদি বা রুহানি অস্তিত্ব এই অর্থে বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গুলোতে প্রতিক্রিয়া তৈরী করতে পারে না। অর্থাৎ আমাদের বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে রুহানি অস্তিত্ব বা রুহানি প্রকৃতি নিয়ে ইতিবাচক অর্থে কোন তথ্য পাওয়া যায় না।
এ অর্থে কান্ট mundus spiritualis-এ কান্ডজ্ঞানীয় পরিসরের দিক থেকে যেকোন ধরণের অভিগমনকে নাকচ করে দেন (আয়ন মহারাজ : ২০২০)। কিন্তু Traume থেকে এই সেকশনের প্রথমে উদ্ধৃত প্রথম উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট যে, তিনি ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির সংকট-সীমান্তের জগত (regnun finium) এস্তেমাল করেছেন।
উপরে আমরা দেখেছি, কান্টের ভাবধারা অনুযায়ী খোদা, ফেরেশতা বা অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা বা এসবের জগৎ সম্পর্কে ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি হিসেবে প্রত্যক্ষ কোন তথ্য নেই; কারণ ইন্দ্রিয়ানুভূতির গাঠনিক ভিত্তি হল স্থান ও কাল এবং স্থান-কালের এই বিশেষ অবস্থার মধ্যে কোন বিষয় আমাদের ইন্দ্রীয়ানুভূতিতে ধরা পড়ে। এই হিসেবে ইন্দ্রিয় আনিত জ্ঞান ‘বিশুদ্ধ বুদ্ধিতে ধরা পড়া’-র আওতায় আসবেনা। সুতরাং অতিন্দ্রিয় বিষয়াদি যা, তা হিসেবে আমাদের ইন্দ্রিয়ানুভূতিতে ধরা পড়া সম্ভব না এবং ধরা পড়ার ব্যাপার যদি থেকেও থাকে, তবে তা থেকে এসবের স্বরূপ সম্পর্কে প্রকৃত অর্থেই কোন উপসংহারে যাওয়া সম্ভব না। পক্ষান্তরে ঐশী অনুভূতি কোন কারণে বা কোন কিছুর ফলশ্রুতিতে ঘটে না । এই অনুভূতি প্রকৃত অর্থেই আজাদ, ফলত এটি ‘আদি প্রকরণ’ (archetype)।
মোদ্দাকথা হল, উল্লেখিত বিষয়গুলো ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় ধরা পড়া কোন বিষয় না (intuitive empirical )। তাই মানুষের পক্ষে কখনো প্রত্যক্ষ সচেতনতায় খোদা, ফেরেশতা কিংবা এ সংশ্লিষ্ট জগতের ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া কিংবা এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হওয়া সম্ভব না।
এক্ষেত্রে কান্টের শরাহ লিখিয়েরা ফেরেশতার জগৎ সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার টাইপগুলো তিনটা প্রকরণে চিহ্নিত করেছেন:
১. ফেরেশতা বা অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা বা জগতের প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা, যা বাহ্যিক গঠন রূপে অভিজ্ঞতায় ধরা পড়েছে। [ DME ns ]
২. ফেরেশতা বা অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা বা অবস্থিতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যা আবার ধরা পড়েছে ইন্দ্রিয় বহির্ভূত অভিজ্ঞতার আকারে। [ DME s ]
৩. ফেরেশতা বা অতিন্দ্রিয় সত্ত্বা বা জগতের একটি অপ্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যা ধরা পড়েছে ইন্দ্রিয়ভাবে বোধগম্য হয় এমন মাধ্যমের থ্রোতে যেমন কোন ইমেজ বা অনুভূতি ইত্যাদি। এটি আবার সংগঠিত হয়েছে সেই অতিন্দ্রিয় জগতের হস্তক্ষেপে। [ IME ]
উপরের তিনটি অভিজ্ঞতার প্রথম দুটি কাণ্টের ক্রিটিকে টেকে না এবং শেষেরটির সম্ভাবনাকে ঐশী অনুভূতি বা প্রেরণা (divine intuition or intellectual intuition)-র সম্ভাবনার দিক থেকে সম্ভব বলে মনে করেছেন কান্ট বিশেষজ্ঞরা (আয়ন মহারাজ : ২০১৭)।
প্রথম অভিমত সংশ্লিষ্ট উপরের সামগ্রিক ডিসকোর্স থেকে কান্টের ফেরেশতা জগৎ সম্পর্কে আমাদের দ্বিতীয় অভিমত হল: কান্টের সামগ্রিক লেখাজোঁকা জুড়ে ফেরেশতার জগৎ উঁকি ঝুঁকি দেয়া গেছে বিভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন অর্থে। এখন আমরা দাবোস বাহাসে হাইডেগার কর্তৃক কান্টের সামগ্রিক প্রজেক্ট চিহ্নিতকরণের পরে হাজির করা আরো একটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট ধরে আগাব। তিনি বলেন:
“এখন আমাদের অন্য সমস্যা হল, ‘কল্পনা (imagination)-র ভেদ করে যেতে পারার সক্ষমতা’ সম্পর্কীয় সমস্যা। ক্যাসিরের দেখাতে চেয়েছেন যে, মানবীয় সসীমতা কান্টের নীতিবিদ্যা সংশ্লিষ্ট লেখাজোঁকায় ট্রান্সেনডেন্ট হিসেবে রূপায়িত হয়েছে। কিন্তু আমরা ‘ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পারেটিভ’-এ এমন কিছুর মুখোমুখি হই, যা সসীম সৃষ্টির ধারণাকে অতিক্রম করে যায়। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ইম্পারেটিভ এর ধারণা কাজে কাজেই সসীম সৃষ্টিকেই নির্দেশ করে। কিন্তু ইম্পারেটিভের উচ্চ কোন কিছুর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার বৈশিষ্ট্য বা প্রবণতা একই সাথে সসীম সৃষ্টিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও। এই ছাড়িয়ে যাওয়াও আবার সৃষ্টসুলভতা (Geschopflickeit) ও সসীমতার মধ্যেই।…” [ “But now to the other problem, that of the power of imagination. Cassirer wants to show that finitude becomes transcendent in the ethical eritings.–In the Categorical Imperative we have something that goes beyond the finite creature. But precisely the concept of Imperative as such shows the inner reference to a finite creature. Also, this going-beyond to something higher is always just a going-beyond to the finite creature, to one which is created (angel). This transcendence too still remains within creatureliness and finitude….” ] (কান্ট : ১৯৯৭)
উপরে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদের প্রথম বাক্য বিবেচনায় নিয়ে আমরা কান্টের লেখাজোঁকায় হাল আমলে সবচেয়ে আলোচিত Anthropology from a Pragmatic Point of View (১৭৭২- ১৭৯৮ ঈসায়ীর মধ্যে Anthropology বিষয়ে দেয়া লেকচারসমূহের কান্ট কর্তৃক দেয়া কিতাবের রূপ) এর ১নং কিতাবের ‘On the power of imagination’ অনুচ্ছেদের বয়ানটি মুখতসরে হাজির করব।
কল্পনার ভেদ করে যাওয়ার সক্ষমতা মানুষের বুঝ-ব্যবস্থা সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিশেষ ধরণের মননশক্তি। এটি হয় ‘প্রডাকটিভ’ অর্থাৎ কোন বিষয়ের মূলানুগ-উপস্থাপন-কর্ম-সম্পাদনের সাথে জড়িত। অথবা এটি ‘রি-প্রডাকটিভ’ অর্থাৎ কোন বিষয়ের সংকর-উপস্থাপন-কার্য-সম্পাদনের সাথে জড়িত (কান্ট : ২০০৬)।
স্থান ও কালের বিশুদ্ধ অনুভূতি (pure intuition) প্রডাকটিভ মননশক্তির সাথে জড়িত ঘটনা এবং অন্য সবধরনের অনুভূতি অভিজ্ঞতাসূচক অনুভূতি (empirical intuition)। এক্ষেত্রে, শেষোক্তটি যখন কোন বিষয় সম্পর্কীয় ধারণার সাথে সংযুক্ত হয় তখন অভিজ্ঞতাসূচক বুঝ-ব্যবস্থা সূচিত করে এবং একে আমরা বলি ‘এক্সপেরিয়েন্স’।
অন্যদিকে, প্রথমোক্তটি বাধ্যবাধকতায় বিশেষ বিশেষ ধরণের ইমেজ উৎপন্ন করে এবং এগুলোকে আমরা বলি ‘ফ্যান্টাসি’। আবার, এসব ইমেজের সাথে জাহের কিংবা বাতেন যেকোন অর্থে অভিজ্ঞতার দিক থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আমরা ‘ভিশনারী’ বলতে পারি। কারও ঘুমের হালতে এসব ইমেজের বাধ্যবাধকতা সূচক চরিত্রে হাজিরা নেয়াকে আমরা ‘খোয়াব’ বলে থাকি।
উপরের গ.১ বয়ান থেকে কান্টের একটা বহুমুখীন ভাবধারা পাওয়া গেল; যাতে কখনও দুই জগতের কথা এসেছে, এসেছে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কথা সাথে একজন মহান ও নৈতিক খোদার ধারণা। এ শেষোক্তটা খানিকটা ইবনে সীনার ‘ওয়াজিবুল ওয়াজুদ’ সমগোত্রীয়।
ঘটনা যাই হোক, বার্নার্ড ফ্রেইডবার্গ কইতাছেন, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির বাইরের এই তৃতীয় ও অনন্য উপাদানটি’ই কান্টের তিনটি ক্রিটিককে একডোরে বেঁধেছে (বার্নার্ড ফ্রেইডবার্গ : ২০০৫)।
আমরা এই তৃতীয় উপাদনটির প্রস্থানপটে হাজির হওয়ার জন্য যে বাহাসের সূত্র ধরে এগিয়েছিলাম, সেটির এই বিশেষ দিক নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পিটার এলি গর্ডন বলেন, বাহাসে এই পর্যায়ে হঠাৎ করেই আসা ‘এঞ্জেল’ বা ফেরেশতা ধারণা খুবই দ্ব্যর্থকতা যুক্ত; কারণ তাঁর মতে, কান্টের দ্বিতীয় ক্রিটিকের ‘নৈতিক আইন’ এর আলোচনা প্রসঙ্গে শোপেনহাওয়ারের মশহুর উক্তিটি সম্পর্কে হাইডেগার ও ক্যাসিরের বেশ ভালভাবেই অবগত ছিলেন (“Kant here gave a thought to the dear little angels”) (পিটার এলি গর্ডন : ২০১০)।
তিনি আরো বলছেন, ফেরেশতা বলতে হাইডেগার এখানে ঠিক কি বুঝিয়েছেন, তা পরিষ্কার না। কারণ ফেরেশতা একই সাথে সৃষ্ট ও রুহানি। যদিও হাইডেগারের “being-there-between” of all created life’ শব্দ-পুঞ্জের থ্রোতে ফেরেশতা বলতে বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় উভয় ডোমেইনের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এমন একটা মধ্যবর্তী (intermediary) পরিসরকে বুঝিয়েছেন, তা ভালভাবেই বুঝা যায়।
তবে, কান্ট সম্পর্কে হাইডেগারের এসব প্রস্তাবনা ও এসব প্রস্তাবনার উপর এলি গর্ডনের মন্তব্য থেকে নিচের বিষয়গুলো উঠে আসে:
এক. কান্টের তত্ত্বের পরিসর শুধুমাত্র’ই ‘প্রকৃতি’ সংশ্লিষ্ট তত্ত্বায়ন ছিল না। নিউ-কান্টীয় দার্শনিকরা এর পরিসরকে এমন একটি পরিসরে পর্যবসিত করেছিলেন, যাতে মনে হয় এটি শুধুই গাণিতিক-বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্যই উপযুক্ত। আদতে, কান্ট ওয়াজুদ সম্পর্কীয় একটি প্রাইওর ও গ্লোবাল তত্ত্বের কৌশিশে ছিলেন, যে মেহনতে প্রকৃতি শুধুমাত্রই মওজুদ বিষয়াদির একপ্রস্তীয় পরিসর ছিল না এবং এটি এমন ক্ষেত্র নয়, যা শুধুই “present-at-hand” বিবেচনা করেছে।
দুই. কান্টের জন্য ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধির বাইরে “কল্পনা” অন্যতম সমস্যায়নের ক্ষেত্র ছিল। যদিও কান্ট নিজে কিভাবে এই পরিসরকে ‘ফেরেশতার জগৎ’ রূপে ভেবেছেন, তা বাহাসে নিয়ে আসা হাইডেগারের পয়েন্ট থেকে স্পষ্ট হয় না। তবে আমাদের অভিমত হল, কান্ট ও হাইডেগারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ‘ঈসায়ী থিওলজি’-র হওয়াতে হাইডেগারের পক্ষে কান্ট সম্পর্কে এই দূরবর্তী অনুমানটা করা সম্ভব হয়েছে।
এখন খোদ হাইডেগারে এ বিষয়টি কিভাবে এসেছে, ইস্যুটি কতটুকু পরিচ্ছন্নতায় হাজির আছে এবং কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া থেকে (oblivion of Being) কি কি পুনরুদ্ধার হয়েছে, সে সম্পর্কে ফ্রেন্স ভাষাভাষী দুনিয়ায় হাইডেগারের দর্শনকে প্রথমদিকে পরিচয় করানো হেনরী করবিনের দ্বারস্থ হওয়া যাক।