ঔপনিবেশিক আমলে সমাজ সংস্কারের বহুমাত্রিক প্রবণতা 

মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় আধুনিকতা

Share:

আসলে মির্জা দেলোয়ার হোসাইন তার লেখাপত্রে মুসলমান সমাজের সংস্কার নিয়ে যা যা বলেছেন, আমি তার কিছু প্রধান প্রবণতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ও বাংলায় হিন্দু সমাজ ও মুসলমান সমাজে আধুনিকতার গ্রহণ ও বর্জনের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিসর নিয়ে কথা বলা দরকার। 
প্রথম যে বিষয়টি বলা দরকার, আমরা যে আধুনিকতার কথা বলছি, এটা এক ধরনের ডাকনাম বলতে পারেন সর্বোচ্চ, এর পূর্ণ নাম সম্ভবত কলোনিয়াল মর্ডানিটি। এখানে যে আধুনিকতার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আমাদের সমাজের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসা কিছু না। সাধারণভাবে যেমন ধরে নেওয়া হয়, দুইটা সভ্যতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আদান–প্রদান করে, এখানে সেইভাবে হয়নি। এখানে মূলত আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সময়কার ভারতের অধিবাসীরা রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই অসহায় ছিলেন এবং তাদের এই আধুনিকতা গ্রহণ না করে আসলে বিশেষ কোনো উপায় ছিল না। এখন আমরা আলোচনায় সেটা প্রশংসা করি বা সমালোচনা করি, ওটা আলাদা প্রসঙ্গ। কিন্তু এটা যে একটা কলোনিয়াল ফরমেশন, সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। আর এই আধুনিকতা আমরা নিয়েছি অনেক মাত্রায়, এর একটি রাজনৈতিক দিক আছে, একটি সাংস্কৃতিক দিক আছে, আবার একটি প্রশাসনিক দিকও আছে।
দেলোয়ার হোসেন মির্জা লেখাপড়া শেষ করে ইম্পেরিয়াল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন, যা ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ব্রিটিশ সরকারের আমলা হয়েছিলেন। কর্মজীবন শেষ করেন বেশ সুনামের সঙ্গে, তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিও দেওয়া হয়। ‘খান বাহাদুর’ উপাধি শুনতে খুব ভালো লাগতে পারে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই উপাধি এমন কাউকে দিত না, যিনি কখনো ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। যাদের আমরা আধুনিকতাবাদী বলি, তাদের চিন্তাভাবনা, রাজনৈতিক ধারণা, ধর্মীয় ধারণা,সবকিছুতে একটা বিষয় পরিষ্কার: তারা ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাননি। 
সাধারণভাবে আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজে, আধুনিকতা গ্রহণ বা বর্জনের যে প্রক্রিয়া, সেটা বুঝা যাবে না যদি বাঙালি হিন্দুর আধুনিকতা গ্রহণের প্রক্রিয়াটা না বোঝা হয়। এটা একটা প্রচলিত সত্য যে, প্রাথমিক পর্যায়ে বাঙালি মুসলমানরা বাঙালি হিন্দুদের মতো দ্রুত সাড়া দেয়নি। তারা দীর্ঘ সময় ধরে দূরে থেকেছে। ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে আমরা যদি দেখি, বাঙালি মুসলমান সমাজের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে যাদের পাই—তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ ইত্যাদি। তাঁরা প্রায় সবাই ব্রিটিশ সরকারের চোখে শত্রু। তখনকার বাঙালি মুসলমান এই পুরো গোষ্ঠীই ব্রিটিশদের কাছে এক ধরনের ‘চক্ষুশূল’। একই সময়ে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়দের উত্থানের সময় বাঙালি হিন্দুরা ইউরোপীয় আধুনিকতা গ্রহণ করে তাদের সমাজের সংস্কার করছে যেমন বিধবা বিবাহ, সতীদাহ প্রথা রদ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছে।
আমরা যখন দেলোয়ার হোসেন মির্জার দিকে তাকাই, দেখি তিনি যখন বড় হচ্ছেন এবং পরে লেখালেখি করছেন, তখন তার সামনে আদর্শ হিসেবে রয়েছেন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগররা। তাঁর লেখা পড়ে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়ন করলে মনে হয় তিনি মুসলমান সমাজের জন্য এক ধরনের ‘বিদ্যাসাগর’। মানে, তিনি ধরে নিচ্ছেন—আমাকে শাসন করছে যে উন্নত সভ্যতা, সেই সভ্যতার ভালো ভালো দিক আমি আমার সমাজে আনব। সবকিছু বর্জন করব না, বরং ইংরেজ বা ইউরোপীয় সভ্যতার ‘তুলনামূলক ভালো’ জিনিসগুলো গ্রহণ করব। এখন দেখা যায়, বাঙালি সমাজে দেলোয়ার হোসেন মির্জা এর আগ পর্যন্ত এই দিক দিয়ে খুব বেশি লেখালেখি করেননি। কিন্তু সৈয়দ আহমদ খানের ব্যাপারে তিনি বারবার লিখছেন, প্রশংসা করছেন। সৈয়দ আহমদ খানকে অনেক ক্ষেত্রে তার উত্তরসূরীও বলা যায়। উত্তর ভারতে তিনি আলিগড় আন্দোলন চালালেন, যা অনেকটাই ১৮৫৭ এর সিপাহী বিদ্রোহ–পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দাঁড়ানো। সেখানে অভিজাত মুসলমান সমাজের একটি অংশ ব্রিটিশ সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছিল। ব্যর্থ হওয়ার পরে সেই অভিজাত সমাজের একাংশ শিক্ষা নিল যে সরাসরি ব্রিটিশ বিরোধিতায় যাওয়া যাবে না।
আলিগড় আন্দোলনের মূল কথাই ছিল আমাদের এখন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতে না গিয়ে ইংরেজি শিখতে হবে, আধুনিকতার ভালো দিকগুলো গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তখন বাঙালি হিন্দুরা আধুনিকতা গ্রহণে করে মুসলমানদের অনেক আগে। আধুনিকতা গ্রহণের একটা বৈশিষ্ট্য হলো,ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হওয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস গঠিত হলো, যা স্বদেশি চেতনা ও রাজনৈতিক অধিকার–কেন্দ্রিক আলোচনা সামনে নিয়ে এল। এই প্রেক্ষাপটে আমরা যদি সৈয়দ আহমদ খানের “One Country, Two Nations”–ধরনের লেকচার দেখি, সেখানে তিনি কংগ্রেসের উপর বেশ কড়া সমালোচনা করছেন। তার কাছে কংগ্রেস ও বাঙালি হিন্দু সমার্থক। তিনি বলছেন, মুসলমানদের কোনোভাবেই হিন্দুদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা যাবে না, কারণ হিন্দুরা ধন–সম্পদ ও শিক্ষায়—বিশেষ করে আধুনিক, কলোনিয়াল শিক্ষায় অনেক এগিয়ে। এই লেকচারে তিনি সুদের ব্যাপারে কোরআন থেকে উদাহরণ টেনে সুদকে সীমিত আকারে এক ধরনের জাস্টিফিকেশন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কোরআনের আয়াত দিয়ে তিনি বলছেন, খ্রিস্টানরা আহলে কিতাব, তাই মুসলমানদের বন্ধুই, অন্তত হিন্দুদের চেয়ে বেশি ‘বন্ধু’। তার যুক্তি হলো খ্রিস্টান শাসকরা আমাদের শত্রু না, বরং এক সময় আমরা শাসক ছিলাম, এখন তারা শাসন করছে; তাই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা উচিত। হিন্দুরা যদি কখনো আমাদের উসকানি দেয়, তবু আমরা সেই ফাঁদে পড়ব না; যখন মনে হবে আমরা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছি, তখন প্রয়োজনে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব।
এখানে মূল ধারণাটা হচ্ছে সৈয়দ আহমদ খান এবং মির্জা দেলোয়ার হোসেন দু’জনেরই চিন্তার কেন্দ্রে আছে তৎকালীন ভারতবর্ষের নির্বাহী ক্ষমতা: শাসন–প্রশাসন, ম্যাজিস্ট্রেট, কালেক্টর ইত্যাদি। তারা চান, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী না হয়ে নির্বাহী ক্ষমতার অংশীদার হতে। এই টেনডেন্সি এখনো বাঙালি সমাজে আছে,আমরা বিশেষ সুবিধা পেতে চাই প্রশাসনে, কারণ আসল ক্ষমতা যেন ওইখানেই। আপনি যদি কোনো জেলায় বা উপজেলায় গিয়ে শাসন করতে পারেন, সেটা নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধির চেয়েও অনেক বেশি ক্ষমতাধর মনে হয়।
তাই তখনকার সংস্কারপন্থীরা উপলব্ধি করলেন—ভারতবর্ষে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের খুব দাম নেই, এখানে প্রশাসনিক ক্ষমতার কার্যকারিতা বেশি। ফলে তারা চেষ্টা করছেন, রাজনৈতিকভাবে ইংরেজদের বিরোধিতা না করে বরং তাদের প্রশাসনের অংশ হয়ে হিন্দুদের সমতুল্য বা ইংরেজদের সমতুল্য অবস্থানে পৌঁছাতে। আর তার জন্য লাগবে ইংরেজি শিক্ষা। মুসলমান সমাজকে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি কনভিন্স করতে তারা অনেক চেষ্টা করেছেন, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষা নিতে চায়নি। যেমন, মহসিন ফান্ডের কথা ধরা যাক। হুগলী কলেজ চলত মহসিন ফান্ডের টাকায়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলমানদের কল্যাণের জন্যই। কিন্তু ১৮৪০–৫০ এর দশকে ওই কলেজের ছাত্রদের মধ্যে ১০ শতাংশও মুসলমান ছিল না। মুসলমানের টাকায় কলেজ, কিন্তু মুসলমান ছাত্র নেই। এই পরিস্থিতিতে সৈয়দ আহমদ খান বা মির্জা সাহেবদের মতো লোকেরা ভাবলেন, মুসলমানরা কেন ইংরেজি নিচ্ছে না? কারণ তারা ইংরেজিকে নিজেদের ভাষা বা নিজেদের জিনিস মনে করছে না; বরং ধর্মীয়ভাবে একে বিদেশি ও ‘অমুসলিম’ জিনিস হিসেবে দেখছে। তাই ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের জন্য আগে ধর্মীয় মানসিকতায় সংস্কার আনতে হবে। এই সংস্কারের জায়গাগুলোতে তারা হাত দিলেন।
ভারতীয় বাঙালি হিন্দু সমাজেও আমরা দেখি, প্রায় একই ধরনের একটি প্রক্রিয়া। তারা প্রথমে পাশ্চাত্যের বড় বড় কবি–সাহিত্যিকদের রচনা অনুবাদ করল, ইউরোপীয় চিন্তার বড় আইডিয়াগুলো গ্রহণ করল, তারপর বাংলা ভাষায় সাহিত্য, রাজনৈতিক চিন্তা–ভাবনা গড়ে তুলল। এর ফলস্বরূপ বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী তৈরি হলো। মির্জা সাহেব ও তার সমসাময়িক মুসলমান সংস্কারকরা অনেকটাই সেই অনুকরণে এক ধরনের ইসলামী রেনেসাঁ ঘটাতে চাইলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে। রেনেসাঁ ঘটানোর জন্য সাধারণত একটি ‘স্বর্ণযুগ’ কল্পনা লাগে—ঐ যুগে আমরা খুব ভালো ছিলাম, ঐ যুগে আমরা প্রভাবশালী ছিলাম, কোনো এক সময় ছিল যখন জ্ঞানের বিরাট চর্চা হতো ইত্যাদি। বাস্তবে সেটা কতটা সত্য, সেটা গৌণ; মূল কথা হলো, এই ধারণা ছাড়া মানুষকে কনভিন্স করা কঠিন। মির্জা সাহেব ‘মু’তাযিলা’ ছদ্মনামে লিখতেন। ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে মু’তাযিলা ছাড়াও অনেক ধারার চিন্তা রয়েছে। কিন্তু ১৮৬০–৭০–৮০–এর দশকে এসে কেন হঠাৎ মু’তাযিলা দর্শনকে মুসলমানদের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে তুলে ধরতে হচ্ছে? আমার ব্যক্তিগত মনে হয়, যখন কেউ রাজনৈতিকভাবে নিজের চেয়ে বড় কোনো সংস্কৃতির সামনে দাঁড়ান এবং দেখেন, নিজের কালচারাল রিসোর্স দিয়ে তাকে সহজে মোকাবিলা করতে পারছেন না, নিজের ইতিহাসের ভেতর থেকে এমন কিছু খুঁজতে থাকেন, যা দিয়ে অন্তত আত্মসম্মানবোধ দাঁড় করানো যায়। হিন্দুরা যেমন একসময় বৈদিক সভ্যতা, আর্য সভ্যতা ইত্যাদি নিয়ে একটা গর্ব তৈরি করল, মুসলমান রিফর্মিস্টরাও সেরকম কিছু খুঁজতে গিয়ে মু’তাযিলাদের মধ্যে ‘রেশনাল’ ও ‘হিউম্যানিস্ট’ উপাদান দেখে সেটাকে সামনে নিয়ে এলেন। সৈয়দ আহমদ খানের সেই লেকচারেই দেখা যায়, তিনি বলছেন, মোগল আমলে বা অন্য অনেক আমলে মুসলমানরা শাসক ছিল, কিন্তু উনিশ শতকের মুসলমানদের স্রেফ এই কথা বলে কোনো লাভ নেই; তবু তিনি কথা বলছেন কেন? আসলে একটা সুপেরিয়রিটি বোধ জাগ্রত করা, নতুন এক ধরনের পরিচয় তৈরি করা। এই কাজটাই তিনি করছেন। অতীত ইতিহাস এখানে পরিচয় নির্মাণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। মির্জা সাহেব ও সৈয়দ আহমদ খানের চিন্তায় এই দুইটা ব্যাপারই স্পষ্ট। একদিকে মুসলমানদের মানবতাবাদী যুক্তি ও সভ্যতার গৌরবের কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়া, আরেকদিকে বলা যে ব্রিটিশ শাসক ও হিন্দু সহযোগীরা এখন ক্ষমতায় থাকলেও আপনারাও একসময় শাসক ছিলেন, তাই ভেঙে পড়ার কিছু নেই।
এখন প্রশ্ন আসে, এই রেনেসাঁ আসলে কার মধ্যে ঘটে? বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রসঙ্গে আমরা যদি ১৮৭২ সালের আগে তাকাই, তখন হিন্দুদের ধারণা ছিল—বাংলায় মুসলমানরা মাইনরিটি, হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রথম আদমশুমারিতে দেখা গেল, বাংলায় মেজরিটি মুসলমান। এই মুসলমানরা কোথায় ছিল, কীভাবে বাস করত, কী খেত, কী পরত, তাদের ইবাদত কী? হিন্দু ভদ্রসমাজ বা ইংরেজ কেউই খুব বেশি জানত না। এমন এক অবস্থায় যখন এই সমাজের কেউ একজন ধরা যাক মির্জা সাহেব বলছেন, আমার একটা ‘অডিয়েন্স’ লাগবে। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সমস্ত বাংলায় ঘুরেছেন, কিন্তু যা কিছু লিখছেন সব ইংরেজিতে। ইংরেজিতে বাংলার পক্ষ নিয়ে তিনি আবার সওয়ালও করছেন। তিনি বলেন, বাংলায়, ভার্নাকুলার ভাষায় শিক্ষা দিতে হবে, হিন্দুরা এই কারণে এগিয়ে আছে। কিন্তু একই সময়ে আমরা দেখি, মুন্সি মেহেরুল্লাহদের মতো মানুষ, অন্যান্য ধর্মপ্রচারক বা সংস্কারকরা যশোর, খুলনা, বরিশালসহ নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বাহাস করছেন, তর্ক করছেন, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রশ্ন তুলছেন। অর্থাৎ, তিনি নিজে অনেকটা বিচ্ছিন্ন, ‘এলিট’ সোসাইটি থেকে কথা বলছেন, আর রুট–লেভেলে একদম আলাদা আরেকটা স্তরের কাজ চলছে। রেনেসাঁ কোনো সমাজে এক–দুই জনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর উদ্দেশ্য সাধারণত সোশিও–ইকোনমিক অবস্থানকে শক্তিশালী করা, যেখানে কালচারের চেয়ে ওই সামাজিক–অর্থনৈতিক শক্তির দিকে নজর বেশি থাকে। এই কারণেই দেখা যায়, মির্জা দেলোয়ার হোসেন  তার আগে যাদের আমরা মুসলমান সমাজের হিরো বলি তিতুমীর, সৈয়দ আহমদ খান, আহমদ রেজা খান বেরলভী, হাজী শরীয়তুল্লাহ—তাদেরকে একরকম ‘কলঙ্ক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। তাঁদের নাম ইতিহাসে থাকলেই ব্রিটিশরা মুসলমানদের ‘সন্দেহের চোখে’ দেখে।  
সাইয়্যেদ আহমদ ও মির্জা সাহেবদের ধারণাগত সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে। তাদের কাছে রাজনীতি বলতে মূলত শাসকদের রাজনীতি—পার্টি হবে, গণতন্ত্র হবে—এগুলোই। কিন্তু এই ধারণা তখন আমাদের কাছে একেবারেই নতুন, তাই সেই ভাষায় রাজনীতি শেখাতে সময় লাগে। ফলে তারা বলেন আমাদের আগে সামাজিকভাবে যোগ্য হতে হবে, লেখাপড়া করে ইংরেজি শিখে, বায়রনের কবিতা পড়ে, আধুনিক ‘রুচি’ তৈরি করে তারপর রাজনীতিতে নামতে হবে। এর আগে রাজনীতিতে নামা ঠিক না। হিন্দুরা যেহেতু আমাদের আগে অনেক কিছু করে ফেলেছে, আমরা পারিনি, তাই তারা করুক রাজনীতি, আমরা আপাতত না করি—এমন একটা মনোভাব গড়ে ওঠে। এই মনোভাবের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি, ১৯১০ সালে মির্জা সাহেব যখন হিন্দু–মুসলিম ঐক্যের ধারণাকে ‘ফ্রেশ’ করে সমালোচনা করছেন, তখন পূর্ব বাংলায় ব্যারিস্টার আব্দুর রসুল, পশ্চিম বাংলায় আবুল কাসেম কংগ্রেস রাজনীতি করছেন এবং হিন্দু–মুসলিম ঐক্যের কথা বলছেন। মির্জা সাহেব তখন এই ঐক্যকে অসম্ভব বলে সমালোচনা করছেন। তিনি উদাহরণ দিচ্ছেন বামন আর দৈত্যের মধ্যে কি কখনো ঐক্য হয়? এই তুলনা আসলে নিজেকে ছোট করে ফেলার মতো। অর্থাৎ, তিনি ধরে নিচ্ছেন—হিন্দুরা লেখাপড়া করে আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে গেছে, আমি পারিনি, তাই আমাকে যেন হিন্দুর ‘ছোট ভাই’ হয়ে থাকতে হবে। সেই লাইনে না গেলে আমার উন্নতি অসম্ভব। একই সঙ্গে, যদি এই মুহূর্তে এমন কিছু করি, যাতে ব্রিটিশদের চোখে আমাদের যে সামান্য পজিশন আছে, সেটাও নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বিপদ হবে—এই ভয়ও তার চিন্তায় কাজ করছে। তাই সেই সময়কার সংস্কারপন্থী লেখক–বুদ্ধিজীবীদের মূল রাজনৈতিক চিন্তায় এক ধরনের ঝামেলা থেকেই যায়—তাদের মধ্যে কোনো শক্তিশালী ‘রিবেল’ বা প্রতিরোধচেতনা গড়ে ওঠে না।
আরেকটি বিষয় হলো, তারা ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের কথা বলতে গিয়ে ইসলামকে ‘মোরাল ফোর্স’ হিসেবে রাখতে চান—যেমন ইউরোপে পোপ/চার্চ ও রাষ্ট্রের দীর্ঘ সংঘাতের পর সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠা পেল এবং রাষ্ট্র ও চার্চ আলাদা হলো। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হতিহাস একমাত্রিক না। ইউরোপে যা ঘটেছে, সেটা হুবহু ভারতেও ঘটবে, এমন কথা কোনো ধর্মগ্রন্থে লেখা নেই। আমরা অনেক সময় ধরে নিই—সামন্তবাদের পরে পুঁজিবাদ, পুঁজিবাদের পরে আরও কিছু, এগুলো যেন অ্যালজেব্রার ফর্মুলার মতো। কিন্তু ইতিহাস ও কালচার সে ভাবে কাজ করে না।
সমস্যা হচ্ছে, ‘মোরাল ফোর্স’ নিজেই একটা এবস্ট্রাক্ট শব্দ। আপনি কতটুকু আলাদা রাখবেন, এর ভূমিকা কী হবে?এসব স্পষ্ট না। মির্জা সাহেবের পরে যারা রাজনীতি করছেন—আবুল হাশিম, আবুল মনসুর আহমদ ইত্যাদি।তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতি করলেও একই কথা বলেছেন: ইসলাম আমাদের জন্য মোরাল ফোর্স; নৈতিকভাবে আমরা ইসলামের কথাই মানব, কিন্তু রাজনীতি হবে গণতন্ত্রমুখী। এখন এই গণতন্ত্রমুখী রাজনীতি ভালো না খারাপ, সেটা আলাদা আলোচনা; তবে এর উৎস যে ওই ঊনবিংশ শতকের মর্ডানিটি–গ্রহণের প্রক্রিয়া, সেটা স্পষ্ট। কারণ, প্রথমে মর্ডানিটি নিয়েছিলেন আমাদের হিন্দু বন্ধুরা, আমরা পরে অনেকটা তাদের দেখাদেখি নিয়েছি। ওখানের অরিজিন না বুঝলে এই ধারার রাজনীতি ও চিন্তার সীমা বোঝা কঠিন।
অমলেশ ত্রিপাঠী বিদ্যাসাগরকে বলেছেন ‘ট্র্যাডিশনাল মর্ডানাইজার’। আমার মনে হয়, মির্জা সাহেবও অনেকটা সে রকম। মর্ডানাইজেশন দরকার, কিন্তু নিজের ট্র্যাডিশনও রাখতে হবে—এই দুইটার মধ্যে একটা সিন্থেসিস করতে চান তিনি। যখন তিনি মু’তাযিলার কথা আনছেন, সেটা ইউরোপীয় চিন্তা না, বরং ইসলামেরই এক ধারা। তিনি চেষ্টা করছেন মুসলমান সভ্যতা—হোক সেটা বাঙালি মুসলমানের, হোক বৃহত্তর ইসলামী সভ্যতার—এর সঙ্গে ইউরোপীয় সভ্যতার এক ধরনের সিন্থেসিস করার। এভাবে দেখলে তাকে রেডিকাল মর্ডানিস্ট বলা ঠিক না; রেডিকাল মডার্নিজম সম্ভবত আরও বিস্তৃত ও ধারালো কিছু দাবি করে। আরেকটা বিষয়, আমাদের এখানে মর্ডানাইজেশন ও মর্ডানিস্টদের নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পার্থ চ্যাটার্জি কথা মনে পড়ে। তিনি জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের নির্মাণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘ইনার ডোমেইন’ ও ‘আউটার ডোমেইন’–এর ধারণা দিয়েছেন। ভারতবর্ষের হিন্দু সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুরা যখন মর্ডানিটি গ্রহণ করছে, তখন তারা ইনার ডোমেইনে (ধর্ম, পরিবার, দৈনন্দিন জীবন) একভাবে, আর আউটার ডোমেইনে (ইকোনমিক, সোশাল, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ, পলিটিক্যাল) আরেকভাবে মর্ডানিটিকে নিচ্ছে। এই আউটার ডোমেইনে তারা দেখে—এখানে ইংরেজরা শাসক এখানে গায়ের জোরে, সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তিতে তাদের মোকাবিলা করা সম্ভব না। তাই প্রথম দিকে তারা সেইভাবে মোকাবিলা করতেও চায় না। তারা তাকায় ইনার ডোমেইনের দিকে—আমার ধর্ম, আমার পরিবার, আমার গৃহস্থালি। এখান থেকে একটা ‘প্রিপারেশন ফেইজ’ শুরু হয়—আমি নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করব, যেন পরবর্তীতে আউটার ডোমেইনে গিয়ে কোনো ক্রাইসিসে না পড়ি।
১৮২০ থেকে ১৮৭০ কংগ্রেসের জন্মের আগ পর্যন্ত হিন্দু সমাজে যা কিছু ঘটছে, সেখানে আমরা দেখি: বিদ্যাসাগর, রামমোহন রায়রা আধুনিকতাকে শতভাগ নেননি, কিন্তু অনেকবেশি গ্রহণ করেছেন। কিছু জায়গায় প্রশ্ন তুলেছেন, বাকিটা অনুসরণ করেছেন। তারা একটি নতুন আইডেন্টিটি নতুন হিন্দু, নতুন কালচারাল ও রিলিজিয়াস আইডেন্টিটি তৈরি করতে চেয়েছেন, যেখানে সতীদাহ থাকবে না, কিন্তু দুর্গাপূজা থাকবে; বিধবা বিবাহ নিয়ে সংস্কার হবে, কিন্তু অন্য অনেক আচার বজায় থাকবে। আমরা যাকে আজকাল সহজ করে বলি, “যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা”—এটাও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। ইনার ডোমেইনে নিজেদেরকে বদলাতে গিয়ে তারা আসলে আউটার ডোমেইনের জন্য মানসিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। পার্থ চ্যাটার্জি বলছেন, কলোনাইজড সোসাইটির সদস্যরা ইনার ডোমেইনে অনেক বেশি ক্রিয়েটিভিটি ও অটোনমি দেখিয়েছেন, কারণ ঘরের ভেতরে আপনি কী করছেন, সেটা ব্রিটিশরা পুরোপুরি বোঝে না, নিয়ন্ত্রণও করতে পারে না।
এখন, এই ফ্রেমওয়ার্কে আমরা যদি মির্জা দেলোয়ার হোসেনের ‘নতুন কালচারাল আইডেন্টিটি’–র কথা ভাবি তিনি মূলত এমন একটা মুসলমান সমাজ কল্পনা করছেন, যেখানে নামাজ–কালাম, রোজা–রেয়াজ সব আছে; কিন্তু, ধরুন, বহু বিবাহ থাকবে না; সুদকে তারা আগের মতো দেখবে না, বরং সীমিত মাত্রায় গ্রহণ করবে; কিছু সামাজিক প্র্যাকটিস বদলে যাবে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ২০–৩০ বছর পরে একটি নতুন মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি হবে শিক্ষিত, ইংরেজি–জানা, কালচারাল ক্যাপিটাল সমৃদ্ধ। কিন্তু এই নতুন কালচারাল আইডেন্টিটির সঙ্গে হাজী শরীয়তুল্লাহদের ধারা মেলে না। ১৯ শতকে আলেমদের মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ডিবেট ছিল—ভারতবর্ষ মুসলমানদের জন্য কী? এটা কি বন্ধু না শত্রু? দারুল ইসলাম, না দারুল হারব? দীর্ঘ সময় ধরে অনেকেই ভারতকে দারুল হার্ব মনে করেছেন, ইংরেজদের সঙ্গে প্রচুর যুদ্ধ–সংঘাত করেছেন, বিশেষ করে ১৮০১ থেকে ১৮৪০ পর্যন্ত। পরে, ১৮৫০–এর পর থেকে মুসলমান সমাজ ধীরে ধীরে ইংরেজি শিক্ষা নিল, শাসন–প্রশাসনে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। তখন কেরামত আলী জাউনপুরীর মতো আলেমরা বলতে শুরু করলেন ভারতবর্ষ দারুল ইসলাম–এর কাছাকাছি, অন্তত পুরোপুরি শত্রু রাজ্য না। ফরায়েজি আন্দোলনের শুরুর দিকে শরীয়তুল্লাহরা ঈদের জামাত, জুমার নামাজকে শত্রু রাজ্যের ক্ষেত্রে হারাম ধরে নিয়েছিলেন, প্রকাশ্যে পড়তেন না; কিন্তু পরে ব্যাখ্যা বদলাতে থাকল।
এই নতুন কালচারাল আইডেন্টিটি—যারা ইংরেজ–অনুগত, অরাজনৈতিক, ইংরেজি শিক্ষিত, বায়রন পড়া মধ্যবিত্ত তাদের কাছে ভারত আর দারুল হার্ব না, বরং এমন একটা জায়গা, যেখানে শাসকরা শত্রু না, বরং তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। পরের রাজনীতিতেও মুসলিম লীগ গঠন–পরবর্তী সময়েও আমরা দেখি প্রশাসনের সঙ্গে মুসলমান অভিজাতদের এক ধরনের লাভ–হেট রিলেশনশিপ চলেছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো খুব শক্তিশালী রিবেল চেতনা গড়ে তুলতে পারেনি। শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী যত বড় হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রশ্ন জোরালো হয়েছে—শিক্ষিত হিন্দুদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী হবে? ঐক্য না দূরত্ব? আজ আমরা যে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলি, তখন কিন্তু রাষ্ট্রকে ইসলামি বা হিন্দু করার প্রশ্নে তেমন ডিবেট হয়নি, কারণ রাজা তো ব্রিটিশ। তখনকার তর্ক ছিল—গরু কোরবানি করা ঠিক কি না, গরু হত্যা করা কি গ্রহণযোগ্য?
শুনলে অবাক লাগতে পারে—শিক্ষিত মুসলমানদের একাংশ ভাবত, হিন্দুরা আমাদের ভাই, আমরা শত শত বছর একসঙ্গে আছি, ভবিষ্যতেও থাকব; তাহলে ওদের দিকে তাকিয়ে আমাদের কিছু ছাড় দেওয়া উচিত। গরু খাওয়া ইসলাম পালন করার একমাত্র শর্ত না, তাই গরুর কোরবানি না করলেও মুসলমান থাকা যায় এমন যুক্তিও এসেছে। মীর মুশাররফ হোসেনের গজীবন প্রবন্ধে আমরা দেখি, তিনি বলছেন—বাঙালি তো কৃষক সমাজ, এখানে গরু হালচাষে ব্যবহৃত হয়, গরু একটা দরকারি জীব; ধর্মীয় প্রশ্নের বাইরে দাঁড়িয়েও গরু নিধন খুব ভালো কাজ না।
মূল আলোচনাটা এখানে—হিন্দুর সঙ্গে একসঙ্গে বাস করতে গেলে মুসলমান সমাজকে কী ধরনের স্যাক্রিফাইস করতে হবে। মীর মুশাররফ হোসেন ও শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্তের একাংশ রাজি হলেন—প্রয়োজনে আমরা গরুর কোরবানি বাদ দিতে পারি। প্রশ্ন হলো এই স্যাক্রিফাইস কি অপর পাশ থেকেও এসেছে? ইতিহাস দেখায়, শিক্ষিত হিন্দু সমাজ মুসলমানদের স্বার্থে তেমন স্যাক্রিফাইস করতে খুব একটা রাজি ছিল না। যদি থাকত, তাহলে পরবর্তী অনেক সংঘাত হয়তো এভাবে তৈরি হত না। আব্দুর রাজ্জাক তার “Political Parties of India”–জাতীয় লেখায় বলছেন, ভারতবর্ষে রাজনীতি অনেকটা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মতামতের একটা সাজ। আজ, ২০০ বছর পরে, যখন আমরা এক ধরনের ‘মডার্ন’ ক্লিনিক বা সমাজ গড়ার চেষ্টা করছি, তখন আমার মনে হয় লোকাল এলিমেন্টগুলোর দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার—ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেই যা কিছু স্থানীয়, সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ফরেন এলিমেন্টগুলো—যেমন ইউরোপীয় গণতন্ত্র, সংসদীয় ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র—আমরা প্রায় রেডিমেড প্যাকেজ হিসেবে নিয়ে নিয়েছি। চাইলেও এখন পুরোপুরি ফিরে যাওয়া সম্ভব না, কিন্তু যা নিয়েছি, তা খুব ফাংশনালও হয়ে ওঠেনি। গণতন্ত্রের কথাই ধরুন—আমাদের সমাজের স্ট্রাকচারের সঙ্গে সেটা মোটেও স্বচ্ছন্দে বসেনি। সমাজকে দোষ দেওয়ার আগে আমাদের ভাবতে হবে—হয়তো সমস্যাটা সমাজের না, সমস্যাটা সিস্টেম বেছে নেওয়ার জায়গায়।
দেলোয়ার হোসেন মির্জা, সৈয়দ আহমদ খান—এই সব রিফর্মিস্ট, মর্ডানিস্ট, মডারনাইজারদের নিয়ে আমরা গত একশ বছর ধরে অনেক বন্দনা করেছি। এখন একটু বেশি ক্রিটিক্যাল হওয়ার সময় এসেছে। তাদের অবদান অবশ্যই আছে, কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতাও আছে। পরে আমরা যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন দেখি ১৯২৭ সালে, সেও একই ধরনের ধারা—’কান্ট’’ যেমন বলেছিলেন, ‘Self–imposed immaturity’ দূর করাই এনলাইটেনমেন্ট, আমাদের এখানে বারবার সেই কথাই ঘুরে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ, আমার বুদ্ধি আছে, কিন্তু আমি ব্যবহার করছি না; আমি কোরআনের কথা শুনছি, নবীর কথা শুনছি, নিজের বুদ্ধি প্রয়োগ করছি না—এই সমালোচনা মির্জা দেলোয়ার হোসেন ১৯ শতকে করেছেন, ৩০–এর দশকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের লেখকেরাও করেছেন, আমাদের সময়ে হুমায়ুন আহমেদ–সাফাদের লেখাতেও ঘুরে ফিরে এসেছে। কিন্তু জিনিসটা খুব নতুন কিছু না, এবং ইউরোপেও এই ধারার অতিরিক্ত র‍্যাশনালিস্ট সমালোচনা খুব বেশি এপ্রিশিয়েটেড হয়নি এখনকার সময়ে।
সুতরাং, আমরা যখন এই ধরনের লেখক বা ধারাকে নিয়ে কথা বলি, তখন তাদের অবদানকে স্বীকার করেই, একটু বেশি ক্রিটিক্যাল হওয়া দরকার তাদের সীমাবদ্ধতা, কনটেক্সটের সীমা, কলোনিয়াল জগতে দাঁড়িয়ে তাদের ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট’—এসব দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। 

Share: