রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল

বাংলায় ইউরোপীয় রেনেসাঁর বরপুত্র মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ

মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় আধুনিকতা

রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল

Share:

নোয়াহ গর্ডনের একটা উপন্যাস আছে; নাম The Physician। কাহিনীতে দেখা যায়, রব কোল নামে এক তরুণের খুব ইচ্ছা ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু সেই সময়ের ইউরোপে ডাক্তার হওয়ার কোনো উপায় নেই। আগ্রহের জায়গা থেকেই রব কোল একজন ইহুদি হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে কিছুদিন কাজ করে। একদিন সেই ইহুদি ডাক্তারের কাছেই তিনি শুনতে পান সত্যিকার ডাক্তারি বিদ্যা শিখতে হলে বাগদাদ কিংবা ইস্পাহানে যেতে হবে। বিশেষ করে ইস্পাহানে ইবনে সিনা নামে একজন আছেন, যিনি চিকিৎসাশাস্ত্র শেখান। কথা শোনার পর রব কোল ইহুদির ছদ্মবেশে ডাক্তারি শেখার জন্য ইস্পাহানের দিকে রওনা হয়। ইস্পাহানে পৌঁছে সে ইবনে সিনার অধীনে চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে পান্ডিত্য অর্জন করে। অবশ্য তখন ইস্পাহানের রাজনৈতিক অবস্থা তখন ভালো না। ধীরে ধীরে শহরটির পতন শুরু হয়। তখন Rob Cole ইস্পাহান থেকে লন্ডনে ফিরে আসে। ফিরে এসে সেখানে একটা হাসপাতাল স্থাপন করে। জোগাড় করে শিষ্য। এভাবে তার হাত ধরে ইউরোপে বিস্তৃত হয় আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র।
এই গল্পটির সঙ্গে বর্তমানে বিদ্যমান বয়ানের এক সাদৃশ্য রয়েছে। সেই বয়ান হলো ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূচনা মূলত আরবদের রাখা জ্ঞান থেকেই। আধুনিকতার আলোচনায় আসলেও দেখা যায়, পৃথিবীজুড়ে সব আধুনিকতাবাদী চিন্তকরা এই বয়ানকে গ্রহণ করেছেন। জামালউদ্দিন আফগানি থেকে শুরু করে স্যার সৈয়দ আহমদ খান হয়ে মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ পর্যন্ত প্রায় সবাই এই দলে। তাদের দাবি, যেহেতু ইউরোপ তার রেনেসাঁ এনেছে প্রাচ্যের জ্ঞানকে গ্রহণ করে এবং সেটাকে রিফাইন করে। ফলে আমরা যে রেনেসাঁ কল্পনা করছি, সেই রেনেসাঁ আমাদেরও নিয়ে আসতে হবে ইউরোপীয় অগ্রগতিকে গ্রহণ ও পরিশীলন করে। মির্জা দেলোয়ারের যুক্তিগুলো বুঝতে গেলে এই যুক্তি ও বয়ানটাকে মনে রাখা দরকার। তাহলে মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদকে দক্ষিণ এশিয়া এবং বৈশ্বিক মুসলিম পরিসরে হাজির করা সহজ হবে।
পলাশীর যুদ্ধের পরে বাংলায় মুসলমান অভিজাতদের একটা বড় অংশের পতন ঘটে। পরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে মূলত এই কফিনে শেষ পেরেকটা পড়ে। এর পরে মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর বড় একটি অংশ কার্যত আর থাকে না। নতুন যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, নতুন যে অভিজাত শ্রেণী গড়ে উঠছে, তাদের বড় অংশই হিন্দু। এই নতুন হিন্দু অভিজাত শ্রেণীর সামনে আছেন দ্বারকানাথ ঠাকুরদের মতো ব্যক্তিত্বরা। এই নতুন অভিজাত শ্রেনির মধ্য দিয়ে বাংলায় ইউরোপায়ন ঘটতে থাকে। এই ইউরোপায়ন শুধু অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৮০০ সালের পর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বদৌলতে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ইউরোপায়নের কাজটাও পোক্ত হয়। দেখা যায়, ফোর্ট উইলিয়ামের প্রথম দিককার বাংলাভাষায় প্রকাশিত বইগুলোর অধিকাংশই খ্রিস্টধর্মের প্রচার–প্রসার এবং হিন্দু পুরাণ নিয়ে।
এদিকে খ্রিস্টান মিশনারিরা তাদের প্রচারণায় স্বভাবতই ইসলাম ও হিন্দুধর্মকে আক্রমণাত্মক ভাষায় উপস্থাপন করে খ্রিস্টধর্মের প্রচারের একটা পথ তৈরি করছেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলায় এবং গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমান ও হিন্দুদের ভেতরে এক ধরনের পুনর্জাগরণবাদী চেতনা গড়ে ওঠে। যেহেতু হিন্দু সমাজ অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই তাদের মধ্য থেকেই শিক্ষিত শ্রেণী আগে গড়ে ওঠে। তারা প্রথম দিকে এই সংস্কারগুলো গ্রহণ করতে থাকে। ফলে হিন্দুদের এক ধরনের অগ্রগামী প্রজন্ম দেখা যায়। মুসলমান প্রজন্মটা তুলনামূলকভাবে পরে আসে। নতুন প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে মুসলমান শ্রেণী দাঁড়ালো, তাদেরকে ঐতিহাসিক এ. এফ. সালাউদ্দিন আহমদ তিনটা ভাগ আলাদা করেছেন। এই প্রতিক্রিয়াটা সাধারণভাবে ইউরোপীয় উপনিবেশের পরে নতুন যে শ্রেণী তৈরি হয়েছে, যারা ইংরেজি শিক্ষা ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছিল, প্রধানত তাদের মধ্যকার প্রতিক্রিয়া। এই তিনটা শ্রেণীর একটা হচ্ছে রক্ষণশীল, একটা সংস্কারবাদী এবং আরেকটা বৈপ্লবিক। এ. এফ. সালাউদ্দিন দাবি করেছেন, রক্ষণশীল শ্রেণী হল নওয়াব আব্দুল লতিফদের ধারা। তারা ইংরেজি শেখার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেও ইউরোপীয় ভাবধারা ও দর্শনকে গ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন। দ্বিতীয় ধারাটা হলো সৈয়দ আমির আলীর ধারা। তিনি মুসলমানদের সমাজের ভেতরে সংস্কার দরকার তুলে ধরেন। তৃতীয় যে ধারাটি বৈপ্লবিক। এই ধারা ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে পুরোপুরি প্রভাবিত। ইউরোপীয় দর্শন, মানবতাবাদ, সেকুলারিজম – এই সব ধারণা তারা ভালোভাবে আত্মস্থ করেছেন। সেই আলো দিয়ে নতুন বাংলার সমাজকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে ভেবেছেন। বাঙালি মুসলমানের প্রতিনিধিত্বকারী মির্জা দেলোয়ার আহমদ ঠিক এই জায়গাতেই প্রাসঙ্গিক।
মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের জন্মসাল ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ, আর তার ঠিক এক বছর আগে জামালউদ্দিন আফগানির জন্ম। মনে রাখা দরকার, এই সময়ে বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসিত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এক ধরনের সংস্কারপ্রবণতা দেখা দিয়েছে। মিশরে মোহাম্মদ আবদুহু, তুরস্কে নামিক কামাল, আফগানিস্তান থেকে প্যান-ইসলামিস্ট জামালউদ্দিন আফগানি, ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের মতো একসারি নাম। এই ধারায় বাংলার নিজস্ব প্রতিনিধি মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ, যদিও তিনি খুব বেশি আলোচিত হননি।
মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের জীবনকে কয়েকটা ছোট পর্বে ভাগ করে দেখা যায়। তার বাবা ছিলেন ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল লা মার্টিনিয়ারের শিক্ষক। বলা যায়, মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের আধুনিকতার পাঠের প্রথম অনুপ্রেরণা এসেছে তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা একটা কথা বলেছিলেন, আমার যদি ১০০টা সন্তান থাকত, আমি ১০০ জনকেই ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত করতাম, মানে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম। কারণ, কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া আমাদের জন্য শেষ কথা নয়; আমাদের পার্থিবভাবে সফল হতে হবে। মুসলমান জাতি পার্থিবভাবে পিছিয়ে আছে। সম্ভবত, এই অনুপ্রেরণাটা বাস্তবায়িত হয়েছেন মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের মধ্য দিয়ে। তার প্রমাণ মির্জা দেলোয়ার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট। এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যে, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার মাত্র তিন বছর পর মির্জা দেলোয়ার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেন। আধুনিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি তিনি কর্মজীবনেও সফল ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে।
মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ ইউরোপীয় দর্শনের ওপর ব্যাপক পরিমাণে পড়াশোনা করেছেন। তার বিভিন্ন লেখায় দেখা যায় স্পেন্সার, মিল, ডারউইন, হেনরি বাকল এবং লকের লেখা ও চিন্তাভাবনার রেফারেন্স তিনি ব্যবহার করছেন। আলোচনায় টেনেছেন সমকালীন ইউরোপীয় চিন্তকদেরকেও। তবে তখনকার ‘ইয়ং বেঙ্গল’ থেকে তার একটা বড় পার্থক্য আছে। ইয়ং বেঙ্গলের বড় অংশ মূলত ট্র্যাডিশনকে রিজেক্ট করে এসেছে। কিন্তু মির্জা দেলোয়ার পুরোপুরি বাতিল করেননি। তিনি এক ধরনের রিফরমেশনের কথা বলেছেন। তিনি মনে করতেন, তিনি মূলত মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার হিসেবে মু‘তাজিলা সম্প্রদায়ের ধারাকে ধারণ করেন। ক্লাসিক্যাল যুগে মুতাজিলারা যুক্তি–বুদ্ধি–কেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চা করেছেন। মির্জা দেলোয়ার অনেক সময় ‘মু‘তাজিলা’ ছদ্মনামেই লেখালেখি করছেন। এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে তিনি মুসলিম সমাজের সমস্যাগুলোর কথা বলেন। সুপারিশ করেন, মুসলমানদের স্থবিরতা কাটাতে কী কী করা দরকার।
মুসলিম সমাজের প্রথম যে সীমাবদ্ধতার কথা মির্জা দেলোয়ার মনে করেন, তা হলো– মুসলিম সমাজে ধর্ম ও রাষ্ট্র একীভূত হয়ে আছে। এটাকে তিনি বড় সমস্যা মনে করেন। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রচিন্তার দিক থেকে এটি তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে দেয়নি। তিনি বলছেন, একটা পর্যায় পর্যন্ত ধর্ম ও রাষ্ট্রের একীকরণ জরুরি হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মুসলমানরা যখন তাদের রাষ্ট্রকে এক্সপ্যান্ড করতে গেছে, তখন ধর্ম ও রাষ্ট্র এত বেশি একীভূত থাকাটা আর কার্যকর ছিল না, সেখানে এক ধরনের বিভাজন দরকার ছিল। তার পর্যবেক্ষণ হলো, ইউরোপ এই কাজটা করতে পেরেছে। প্রথম দিকে সবকিছু পোপের দখলে থাকলেও, পোপ সব কিছু করতে পারলেও, সেখানে ধীরে ধীরে পোপ এবং রাজাদের মধ্যে এক ধরনের টেনশন তৈরি হয়। দেখা গেছে, পোপ যদি ধর্মীয় ব্যাপারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে চান, রাজারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। আবার রাজারা যদি জনগণের উপর অত্যাচারী হয়ে উঠতে চান, পোপ হস্তক্ষেপ করতে পেরেছেন। মির্জা দেলোয়ার দাবি করেছেন, এই দুইটা আলাদা এবং সমান্তরাল শক্তি একে অপরকে পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এই কারণে ইউরোপের রাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনা অনেক বেশি উন্নতি করতে পেরেছে। কিন্তু মুসলমানদের রাষ্ট্রচিন্তা একটি নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে থেমে গেছে। তিনি বলছেন, যদি আমরা এই সমস্যাটা সমাধান করতে চাই, তাহলে রাষ্ট্র এবং ধর্মকে আলাদা করা দরকার। তিনি মনে করেন, ভারত যেহেতু ইতিহাসে কখনোই পুরোপুরি ধর্মরাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়নি, তাই ভারতের জন্য এই বিভাজন সহজ।
মির্জা দেলোয়ার দাবি করেছেন, মাক্কি সূরা এবং মাদানি সূরা– এই দুই ধরনের সূরার ভেতরে আমরা দেখতে পাই, মক্কি সূরাগুলো ইসলামের soul বা আত্মা, এগুলো মূলত মুসলমানদের ভেতর নৈতিকতা ও ইথিক্স তৈরি করে। তিনি বলেন, এগুলোকে যদি আমরা ইসলামের আত্মা ধরে নিয়ে পাঠ করি এবং মাদানি সূরাগুলোকে পাঠ করার সময় মনে রাখি যে, মাদানি সূরার বড় অংশ বিভিন্ন প্রেক্ষাপট–নির্ভর বিধান, তাহলে এই প্রেক্ষাপটভিত্তিক অংশগুলোতে ইজতেহাদের সুযোগ তৈরি হয়। মাদানি সূরার কিছু কিছু বিষয়ে যদি আমরা ইজতেহাদ রিভাইভ করি, তাহলে মুসলমান সমাজের ভেতর থেকে আলেম ও সমকালীন অভিজ্ঞ মানুষরা নতুন করে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন। যদি আমরা ইসলামের মোরালিটিকে অপরিবর্তনীয় অংশ হিসেবে দাঁড় করে নিই, তাহলে একটা সুস্থ সমাজ তৈরি করতে পারব। এইভাবে মির্জা দেলোয়ার ধর্মকেও দুই ভাগে ভাগ করছেন। একটা নৈতিক অংশ, আরেকটা আইনি অংশ। তিনি বলছেন, নৈতিক অংশ তো ধর্মেরই জায়গা, এখানে ইজতেহাদের সুযোগ নেই। কিন্তু আইনি অংশে সমকালীন আলেম ও অভিজ্ঞ মানুষরা ইজতেহাদের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে পারেন, আমাদের সমকালীন প্রেক্ষাপটে সমস্যার সমাধান সেখানে খুঁজে পেতে পারেন।
পরবর্তী স্তরে গিয়ে মির্জা দেলোয়ার বলছেন আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে জ্ঞানের সমস্যা। জ্ঞানের সমস্যাটা হচ্ছে, যেমন আমাদের রাষ্ট্র নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে পারেনি, তেমনি আমাদের জ্ঞানও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে পারেনি। ফলে দেখা গেছে, ইউরোপ বাগদাদ, কর্ডোভা এবং ইসফাহান থেকে জ্ঞান নিয়ে গেছে এবং আলাদা আলাদাভাবে ডেভেলপ করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা যখন মুসলিম সভ্যতার কথা বলি, তখন মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানের ভান্ডারকে প্রায়ই একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ দেখতে পাই। মির্জা দেলোয়ার বলছেন, ইউরোপে যখন জ্ঞানের উন্নতি ঘটেছে, তখন সেই জ্ঞানের উন্নতির মাধ্যমে তারা ধর্মের ভেতরে ঢুকে পড়া অনেক কুসংস্কার অপসারণ করতে পেরেছে। কিন্তু আমাদের মুসলিম সভ্যতার ভেতরে জ্ঞান কখনোই শুদ্ধিকারক হিসেবে কাজ করতে পারেনি। এর একটি কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, মুসলিম সমাজে শাসক প্রায় সবসময় একজন ব্যক্তি বা একক ক্ষমতার প্রতীক হয়ে যান এবং তারা জ্ঞানকে আলাদা কোনো স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে রাখেন না। এর একটি সুন্দর উদাহরণ তিনি দিয়েছেন। আমরা যখন ইমামতের কথা বলি বা শাসকের কথা বলি, তখন দেখি, তিনি একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধান এবং ধর্মীয় প্রধান। তিনি বলছেন, যদি কেউ একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধান এবং ধর্মীয় প্রধান হয়ে যায়, তাহলে ধর্মকে সে খুব সহজে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করতে পারে; বিশেষ করে তার শাসনকার্যের পেছনে সম্মতি উৎপাদনের ক্ষেত্রে। এইভাবে ধর্মের ক্ষেত্রটি একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে পারে না, তাকে সবসময় ক্ষমতার সেবায় নিয়োজিত রাখা সম্ভব হয়।
মির্জা দেলোয়ার মুসলিম সমাজের ভেতরে অর্থনৈতিক সমস্যার আলোচনায় জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা যদি ইউরোপের দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যায় সংসদে মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঢুকতে পারেনি, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা গরিব ছিল। মানে হচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলরা নীতিনির্ধারক হতে পারে না। মুসলমানদের সমস্যা হচ্ছে, মুসলমানদের ভেতরে অভিজাত শ্রেণী খুবই দুর্বল এবং সংখ্যায় অল্প। বিশেষ করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে মুসলমানদের মধ্য থেকে অভিজাত শ্রেণীর বড় একটা অংশের পতন ঘটেছে। মোগলদের আনুষ্ঠানিক পতনের পর, বিশেষ করে ১৮৫৮-এর পর থেকে, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা মুসলমানদের পতনের কারণ খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। এটা নিয়ে আলতাফ হোসাইন হালীর একটি সুন্দর বই আছে মুসাদ্দাসে হালী। তিনি সেখানে মুসলমানদের অর্থনৈতিক সমস্যা এবং পতনের কারণ নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিন্তু তার এই বিশ্লেষণ অনেকটা কবির বিলাপের মতো। বিপরীতে, মির্জা দেলোয়ার যে সমস্যাগুলোর কথা বলছেন, সেখানে তিনি কেবল সমস্যা বলেই থেমে নেই, বরং কিছু সমাধানের প্রস্তাবও দাঁড় করাচ্ছেন। তিনি বলছেন, মুসলমানদের অল্প কয়েকজন অভিজাত যাঁরা আছেন, তারা খুব অপচয়ী এবং ভোগবিলাসী। একটা নির্দিষ্ট সীমার বাইরে গিয়ে তারা অপচয় করতে পছন্দ করেন। একটা উদাহরণও তিনি দিয়েছেন। তার মতে, ইউরোপেও দাসপ্রথা ছিল। কিন্তু ইউরোপের যে দাসপ্রথা, সেখানে তারা দাসদের উতপাদন কাজে ব্যবহার করেছে। তারা আফ্রিকা থেকে দাস নিয়ে গেছে, বাংলা থেকেও দাস নিয়ে গেছে, আর আমেরিকায় তাদের কৃষি কাজে ব্যবহার করেছে। কিন্তু মুসলিম আমলে যে দাস ব্যবহৃত হয়েছে, তার বড় একটা অংশ ব্যবহৃত হয়েছে তাদের ইন্দ্রিয়জ ভোগ–তৃপ্তির জন্য। জীবনের আরাম–আয়েশের জন্য, হারেমের জীবন সহজ করার জন্য, গৃহস্থালীর জীবন সহজ করার জন্য। ফলে দাসপ্রথাকে তারা আলাদা কোনো অর্থনীতি হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। এই যে দাসশ্রমকে আলাদা অর্থনৈতিক উৎস হিসেবে তৈরি করতে না পারাকে তিনি মুসলিম অর্থনীতির পতনের একটি বড় কারণ হিসেবে দেখেছেন। আরেকটা বড় কারণ তিনি বলছেন, মুসলমানদের অর্থনীতি ছিল অনেকটাই গ্র্যান্ট–নির্ভর। মুসলমানরা যখন রাজনৈতিকভাবে কোনো অঞ্চল জয় করেছে, রাজনৈতিকভাবে বিজয়ী হওয়ার পরে তারা তারা বিভিন্ন লোককে জমি ওয়াকফ করে দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যুদ্ধক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, তাকে একটা জমি দেয়া হলো। একজন সুফিকে একটি বিশেষ অঞ্চল দিয়ে দেয়া হলো। এই যে গ্র্যান্ট–নির্ভরতা, এর বাইরে গিয়ে আলাদা করে ব্যবসা ও পুঁজির প্রবাহ মুসলমানদের মধ্যে শক্তভাবে তৈরি হয়নি। এই কারণে দেখা গেল, ভূমির অধিকার থেকে যখন মুসলমানরা সরে গেল, মানে রাজক্ষমতা থেকে যখন মুসলমানরা সরে গেল, তখন মূলত তাদের অর্থনীতিও সরে গেল, কারণ তাদের বিকল্প কোনো অর্থনীতির ভিত্তি ছিল না। অন্যদিকে, ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পরে হিন্দু অভিজাতদের ভেতরে ব্যবসা–নির্ভর একটি ইকোনমি তৈরি হতে থাকে। মুসলমানদের মধ্যে এই ধরনের অর্থনীতি বাড়তে পারেনি, আর সেই কারণে মুসলমানদের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
মির্জা দেলোয়ার সুদ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, মুসলমানদের মধ্যে সুদ নিষিদ্ধ – এই নিষেধাজ্ঞার কথা সবাই জানে, কিন্তু এর মানে এই না যে, সব মুসলমান সুদের প্রলোভন থেকে দূরে থাকে। বাস্তবে অনেক মুসলমান সুদে টাকা ধার দেয় না ঠিকই, কিন্তু নিজেরা সুদের ঋণ নেয় এবং এই প্রক্রিয়া গরিবদের আরও গরিব করে ফেলে। আবার বর্তমান অর্থনীতি অনেকটাই পুঁজিনির্ভর, আর পুঁজি সরবরাহ করে মূলত ব্যাংক। তিনি বলছেন, যারা গরিব, তারা পুঁজির এই সরবরাহ কীভাবে পাবে? তাহলে তো গরিবরা গরিবই থাকবে। তিনি আরও বলছেন, মুসলিম সমাজে যদি ব্যবসা না থাকে, ব্যাংকিং না থাকে, তাহলে গরিবের গরিবই থেকে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই, ধনী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় না। মুসলমানদের অর্থনৈতিকভাবে গরিব হয়ে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করছেন বহুবিবাহ এবং উত্তরাধিকার আইনের প্রয়োগ। তিনি বলছেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে যে অল্প কয়েকজন মুসলিম অভিজাত বেঁচে ছিলেন, তাদের অনেকেই দুই–এক প্রজন্মের মধ্যেই গরিব হয়ে গেছেন শুধু এই কারণে যে, তারা বহু বিবাহ করেছেন এবং উত্তরাধিকার আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়নি। কয়েক প্রজন্মের মধ্যে দেখা গেছে, এক জমিদারের বিশাল সম্পদ ছোট ছোট খন্ডে ভাগ হয়ে গেছে, ছিন্ন–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, শেষ পর্যন্ত আর বাস্তব সম্পদ হিসেবে টেকেনি। বহুবিবাহের সমালোচনাও তিনি এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে করেছেন। এখন প্রশ্ন, এই সমস্যার সমাধান তিনি কীভাবে দিচ্ছেন? তিনি বলছেন, আমাদের উত্তরাধিকার–সংক্রান্ত সমস্যা এবং বহুবিবাহ–সংক্রান্ত সমস্যাগুলো উইল ব্যবস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। তিনি প্রস্তাব করছেন, উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে যখন দেখা যায় দাদা বেঁচে থাকা অবস্থায় বাবা মারা গেছেন, তখন যে নাতি থেকে যায় সে প্রথাগত ব্যাখ্যায় সম্পত্তির হকদার হয় না। মির্জা দেলোয়ার বলছেন, এখানে তাকে উইলের মাধ্যমে হকদার করা যেতে পারে। আবার, যেখানে কন্যা সন্তানের কোনো ভাই নেই, অর্থাৎ কোনো পুত্রসন্তান নেই, সেখানে কন্যা প্রায়ই বঞ্চিত হয়। এই ক্ষেত্রেও উইলের মাধ্যমে কন্যাকে যথাযথ হকদার করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমরা দেখি, সব সন্তানের মধ্যে কিছু সন্তান খুবই যোগ্য; তারা সম্পদ না পেলেও নিজের যোগ্যতা দিয়ে সম্পদ অর্জন করতে পারে। আবার কিছু সন্তান অনভিজ্ঞ বা অক্ষম; তারা সম্পদ ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। মির্জা দেলোয়ার প্রস্তাব করছেন, এখানে ইজতেহাদের মাধ্যমে একটা সংশোধন আনা যেতে পারে – যারা অনভিজ্ঞ ও দুর্বল, তারা কিছুটা বেশি সম্পত্তির হকদার হতে পারে। তিনি বলতে চাইছেন, ইসলামের মূল স্পিরিট যেহেতু সামাজিক ন্যায়বিচার, তাই এভাবে পুনর্বিন্যাস করলে বাস্তবে কোনো বৈষম্য তৈরি হবে না।
নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা জানি, ইউরোপীয় মানবতাবাদ দিয়ে তিনি প্রভাবিত ছিলেন। সেখানে নারীর অধিকার, বিশেষ করে বহুবিবাহ ও তালাক প্রসঙ্গে, তার প্রবল আপত্তি ছিল। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম, পাবনা, রংপুর, ঢাকা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যে সমস্যাগুলোর কথা বলছেন, সেগুলো মূলত পূর্ববঙ্গের, অর্থাৎ আমাদের আজকের বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের সমস্যা। তিনি বলছেন, আমি পূর্ববঙ্গের ওইসব জায়গায় গিয়ে দেখেছি, মুসলমানদের বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বহুবিবাহ এবং ইচ্ছামতো তালাক দেওয়া। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বহুবিবাহের মধ্য দিয়ে পারিবারিক অশান্তি তৈরি হয় এবং এটা নারীদের জন্য এক ধরনের অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। একাধিক বিয়ের মাধ্যমে প্রথমত উত্তরাধিকারের অনিশ্চয়তা তৈরি হয় – একজনের বিশাল জমিদারি থাকলেও বহু বিবাহের ফলে তার সম্পদ বার বার ভাগ হয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সংসারজীবনের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের কারণে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয় এবং এর ভেতর দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্যকর শিক্ষা ও মূল্যবোধ সঞ্চার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, এই বহুবিবাহের বাস্তবতাই অনেক ক্ষেত্রে যাচ্ছেতাই তালাকের এক ধরনের সংস্কৃতি তৈরি করে। এর ফলে নারীর ভবিষ্যৎ একেবারে অনিশ্চিত হয়ে যায়। তাই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি বলছেন, বিয়ে অবশ্যই রাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে, আদালতের মাধ্যমে নিবন্ধিত হতে হবে। তালাকের ক্ষেত্রেও একইভাবে আদালতের অনুমোদন থাকতে হবে।
সুলতানি আমল বা মুঘল আমলে বিয়ে ও তালাকের দায়িত্ব ছিল কাজীদের ওপর। আর কাজীরা তখন ছিলেন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি। কিন্তু যখন রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের পতন ঘটে, কাজীরা আর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি থাকেন না, কেবল ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে থেকে যান। ফলে বিয়ে ও তালাক আর রাষ্ট্রের নিবন্ধিত কাঠামোর মধ্যে থাকে না। মির্জা দেলোয়ার বলছেন, বিয়ে ও তালাক – উভয়কেই বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত করতে হবে। নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনযাপনকে কিছু নির্দিষ্ট শর্তের অধীনে আনা সম্ভব হবে, বিশেষ করে অধিকারের ক্ষেত্রে। যেমন, কেউ ইচ্ছামতো যখন তখন তালাক দিতে পারবে না, তার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। এই শর্তগুলোর মধ্যে তিনি বলছেন, যদি দেখা যায় একজন পুরুষ শুধু নিজের ইচ্ছায়, ব্যক্তিগত অনাগ্রহের কারণে স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়, তখন দেখতে হবে, ইসলামের মৌলিক ন্যায়বোধের সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা। একই সঙ্গে নারীদেরও তালাকের অধিকার দিতে হবে; ছেলেপক্ষ চাইলেই একতরফা তালাক দিতে পারবে না, তাকে আদালতের কাছে প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। মির্জা দেলোয়ার এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমের প্রস্তাব করছেন, যার মাধ্যমে সংস্কার আনা সম্ভব।
শিক্ষার ক্ষেত্রে মির্জা দেলোয়ারের অবস্থান প্রথম থেকেই স্পষ্ট। তিনি ইউরোপীয় নলেজ দিয়ে অত্যন্ত অভিভূত। কিন্তু সেই জ্ঞানকে নিজের সমাজের উপযোগী করে নিতে চান। তিনি বলছেন, ইউরোপ মূলত মুসলমানদের যে জ্ঞানচর্চার ইতিহাস, সেটাকেই বর্ধিত করেছে। এখন আমাদের উচিত হবে, এই বর্ধিত জ্ঞানটাকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে এনে নিজের সমাজের বাস্তবতার আলোকে সাজানো। তার দাবি, এই বর্ধিত জ্ঞান আমাদেরই সম্পদ, কারণ এর উৎসের বড় অংশ আমাদের বাগদাদ, কর্ডোভা, ইসফাহান। তাই আমাদের করণীয় হলো, এই জ্ঞানকে আবার গ্রহণ করা, নিজেদের মতো করে পুনর্গঠন করা এবং এর আলোকে আমাদের নিজস্ব রেনেসাঁ তৈরি করা। এই প্রেক্ষিতে তিনি শুধু ইউরোপীয় মানে ইংরেজি শিক্ষা নয়, বরং ইউরোপীয় দর্শন, ইউরোপীয় জীববিজ্ঞান, ইউরোপীয় ভূগোল এবং জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় তাদের যে অগ্রগতি, সেই সবকিছুকে গ্রহণ করার কথা বলেন। এই জ্ঞান গ্রহণের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করতে পারব, এবং ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানও উৎপাদন করতে পারব।
এটা করতে পারলে আমরা কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারব – যেমন, ইউরোপীয় দর্শনের আলোকে তারা রাষ্ট্রের সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করেছে, সেটা বুঝতে পারব; তারা ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের বিরোধকে কীভাবে মীমাংসা করেছে, সেটা শিখতে পারব; এবং তাদের দার্শনিক অগ্রগতির সঙ্গে সমঝোতার একটা ক্ষেত্র তৈরি করতে পারব। এই কাজের জন্য আমাদের এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যারা এই জায়গাগুলোতে নেতৃত্ব দিতে পারবে। মির্জা দেলোয়ার বলছেন, ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় পূর্ববঙ্গের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তিনি লক্ষ্য করেছেন। সেটা হলো – পূর্ববঙ্গের অভিজাত শ্রেণী মূলত উর্দুভাষী, আর আতরাফ শ্রেণী বাংলাভাষী। এখানেই আমরা দেখি, যতটা তিনি ইংরেজি শিক্ষাকে প্রমোট করছেন, ততটাই তিনি বাংলার পৃষ্ঠপোষকতাও করছেন। কারণ, বাংলার যে মুসলমান আতরাফ শ্রেণী, তাদেরকে আপনি বাস্তবে উর্দু শেখাতে পারবেন না, তাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সেটার অনুমতি দেয় না। অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে বাংলার আতরাফ শ্রেণীর আদতে কোনো স্বাভাবিক যোগাযোগ নেই। এই যোগাযোগহীনতার কারণে অভিজাত শ্রেণীর আর্ট, কালচার এবং সভ্যতা–বিষয়ক বোঝাপড়া আতরাফ শ্রেণীর মধ্যে পৌঁছাতে পারে না। এই বিচ্ছিন্নতার কারণেই দুদু শাহ, মজনু শাহ, হাজী শরীয়তুল্লাহদের মতো ব্যক্তিত্বরা সাধারণ মানুষের মধ্যে জায়গা করে নেন। মির্জা দেলোয়ার সমালোচনামূলক ভঙ্গিতে দুদু শাহ, মজনু শাহ, হাজী শরীয়তুল্লাহদের সমালোচনা করছেন এই কারণে যে, যদি শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী সাধারণ মুসলমান শ্রেণীকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারত, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংস্কারের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারত, তাহলে এই ধরনের অরাজকধর্মী আন্দোলনের প্রয়োজন হতো না। বরং আরও সুশৃঙ্খল উপায়ে রেনেসাঁ আনা সম্ভব হতো। তার মতে, অভিজাত শ্রেণী বাংলা শিখছে না, বাংলার সঙ্গে সংযোগ করছে না। ফলে, বাংলার ভাষাভান্ডার ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে এবং এই ভান্ডারের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়। তিনি বলছেন, অভিজাত মুসলিম শ্রেণীকে এখানে বাংলার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। মির্জা দেলোয়ার মনে করেন, বিভিন্ন সময়ে শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ধর্মীয় পণ্ডিতরা একটা কাজ করেছেন – তারা নেটিভ ভাষায় কোরআন অনুবাদ করতে দেননি। এটা ফার্সির ক্ষেত্রেও হয়েছে, উর্দুর ক্ষেত্রেও হয়েছে, বাংলার ক্ষেত্রেও হচ্ছে। তিনি বলছেন, যদি কোরআন এবং ইসলামের মূল টেক্সটগুলো বাংলায় নিয়ে আসা যায়, তাহলে ইসলামের মূল স্পিরিটের সঙ্গে বাংলার সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষকে যদি এভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে বাংলায় পুঁথি সাহিত্যের মতো ফ্যান্টাসি–নির্ভর সাহিত্য চর্চা তার অযাচিত প্রভাব হারাবে। তখন ইসলামের যৌক্তিক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা – এই জায়গাগুলো বেশি করে জায়গা করে নেবে।
সমকালীন সংস্কারক সৈয়দ আমির আলী এবং নওয়াব আব্দুল লতিফদের মতো যারা ছিলেন, তারা চেয়েছিলেন, ব্রিটিশ সরকার যেন মুসলমানদের কিছু পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। মির্জা দেলোয়ার এখানে দ্বিমত পোষণ করছেন। তিনি বলছেন, বাহ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন নেই; দরকার হলো মুসলমানদের স্বাবলম্বী হওয়া। মুসলমানদের নিজেদের মধ্যেই যে পরিমাণ অর্থ আছে, সেটাই যথেষ্ট। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলছেন, তখনকার ঢাকার নবাব ছিলেন, অযোধ্যার নবাব ছিলেন, বিহারের নবাব ছিলেন। এই নবাবরা যদি তাদের সম্পদের সুষম বণ্টন করেন, তাহলে শুধু মহসিন ফান্ডের সম্পদ মুসলমানদের পেছনে খরচ করলেই অনেকদূর এগোনো সম্ভব। তিনি বলছেন, আমরা যদি অপেক্ষা করি ব্রিটিশরা কখন আমাদের সাহায্য করবে, কখন ভর্তুকি দেবে – তাহলে সেটা কোনো পিছিয়ে পড়া জাতিকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে না, সাময়িকভাবে কিছু স্বস্তি দিতে পারে মাত্র। আমাদের আসলে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এই কারণেই তিনি বারবার বলছেন, আমাদের অভিজাত শ্রেণী গরিবদের সহযোগিতা করবে এবং সামগ্রিকভাবে একটি বিপ্লবী সামাজিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে অগ্রগতি আসবে। এই জায়গায় তিনি সামাজিক সংস্কারের গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং দায়বদ্ধতার কথা বলছেন।
মির্জা দেলোয়ারকে যখন আমরা প্রশংসা বা সমালোচনা করব, তার আগে সমকালীন কনটেক্সটটা মাথায় রাখা জরুরি। সে সময়টা মূলত ইসলামিক মডার্নিজমের সময়। ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত, তিউনিসিয়া, মিশর, তুরস্ক এবং ভারতের মতো অঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যে এক ধরনের সংস্কারপ্রবণতা ছিল। তারা অধঃপতন থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। সমাধানের আলাপগুলোতে আমরা দেখি, প্রায় সবাই বলছেন, আমাদের ইজতেহাদ করতে হবে। এটা জামালউদ্দিন আফগানি, মোহাম্মদ আবদুহু, নামিক কামাল সবাই বলছেন, ইজতেহাদের মাধ্যমে ধর্মকে নতুন প্রেক্ষাপটে ভাবতে হবে। বাংলা থেকে মির্জা দেলোয়ারও কথা বলছেন একই সুরে। তার মানে তিনি তাদের সমকালীন এবং অনেক ক্ষেত্রে বয়সে তাদের চেয়েও অগ্রবর্তী। অনেকের থেকে বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও তার চিন্তার এই মিল প্রমাণ করে, ঔপনিবেশিক প্রতিক্রিয়ার যে ঢেউ, তার থেকে বাংলা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ছিল না। বরং বাংলায় এই প্রতিক্রিয়ার একজন স্বতন্ত্র প্রতিনিধি ছিলেন মির্জা দেলোয়ার; তাকে আমরা জামালউদ্দিন আফগানি বা মোহাম্মদ আব্দুহদের সমান্তরালে পাঠ করতে পারি।
জামালউদ্দিন আফগানি এবং মির্জা দেলোয়ার – দুজনেই মুসলিম জাতির উত্থান চান, কিন্তু মির্জা দেলোয়ার অনেক বেশি স্পেসিফিকভাবে বাঙালি মুসলমানের উত্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, আরেকটু বড় করে বললে ভারতীয় মুসলমানদের উত্থানকে। আফগানি একজন প্যান–ইসলামিস্ট; তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহর একীকরণের কথা ভাবছেন, অন্যদিকে মির্জা দেলোয়ার ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনেক বেশি অনুগত; ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে তার সরাসরি কোনো সমালোচনা নেই। আফগানি বলছেন, আমরা মুসলমানদের শক্তিশালী করব এই কারণে যে, ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে তাদের মুক্ত করতে পারি। এই জায়গায় আফগানির চিন্তাধারা অনেক বেশি রাজনৈতিক। যদি আমরা মোহাম্মদ আব্দুহর সঙ্গে তুলনা করি, দেখি যে আব্দুহ অনেক বেশি ধর্ম ও সমাজ–সংস্কারের ভেতরে কাজ করছেন – ধর্মীয় সংস্কার, ইজতেহাদ, কোরআনের নতুন ব্যাখ্যা, আল–আজহারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ও সমঝোতা – এসব নিয়ে তিনি বেশি মনোযোগী। আব্দুহ ইসলামী শরিয়ার পুনর্গঠনের দিকে বেশি মন দেন। মির্জা দেলোয়ার বাংলা এবং মুসলিম সভ্যতাকে একত্রে রেখে পড়তে চান। এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে আসে স্যার সৈয়দ আহমদ খান। মির্জা দেলোয়ার তার অনেক প্রবন্ধে সৈয়দ আহমদ খানের প্রশংসা করেছেন এবং অনেকটা তার ভক্তও বটে। এটার একটা কারণ আছে – আমরা যাদের ইসলামিক মডার্নিস্ট দেখি, তাদের মধ্যে মোটামুটি সবার পূর্বসূরী অবস্থানে আছেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান। তাই যখন সৈয়দ আহমদ তার পরিণত বয়সে পৌঁছেছেন, তখন মির্জা দেলোয়ার তার কাছ থেকে শেখার অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু স্যার সৈয়দও মডার্নিজম গ্রহণ করেছেন ধর্মের ভেতরে থেকেই। এখানে মোহাম্মদ আব্দুহর সঙ্গে তার একটা মিল আছে। তিনি কোরআনের ব্যাখ্যায় গেছেন, ধর্মের ব্যাখ্যা পুনর্গঠনে গেছেন।
এর একটা সুন্দর উদাহরণ দেওয়া যায় – সুদের ব্যবস্থা নিয়ে স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, তখন তিনিও আসলে সুদের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত সুদ জুলুমের পর্যায়ে না পৌঁছায় এবং পুঁজির প্রবাহ সচল থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংকিং সিস্টেমকে সমর্থন করা যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি সূরা আলে–ইমরানের একটি আয়াতের বিশেষ ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু মির্জা দেলোয়ার যখন সুদ নিয়ে আলোচনা করেন, তখন তিনি সরাসরি কোরআনের ইন্টারপ্রিটেশনে যান না। তিনি বলেন, ইসলামের মূল স্পিরিট হচ্ছে জুলুমের বিরোধিতা। তাই যেখানে সুদ জুলুম সৃষ্টি করবে, সেখানে তা গ্রহণযোগ্য নয় – এইটাই যৌক্তিক অবস্থান। যুক্তির কথা বলতে বলতেই তিনি আবার ইউরোপের ব্যাংকিং সিস্টেমের উদাহরণ নিয়ে আসছেন। এখানেও তার রেফারেন্স পয়েন্ট হচ্ছে যুক্তি এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁ। সুদ নিয়ে স্যার সৈয়দ এবং মির্জা দেলোয়ারের মধ্যে যে পার্থক্য, সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আরও একটা জায়গায় তিনি বলেন, একজন ট্র্যাডিশনাল মানুষ তার পক্ষে যতটা মডার্ন হওয়া সম্ভব, স্যার সৈয়দ ততটা; কারণ তার শিক্ষাজীবন মূলত ট্র্যাডিশনের ভেতর থেকেই উঠে এসেছে। কিন্তু মির্জা দেলোয়ার অনেকটাই মডার্ন প্রোডাক্ট – মানে মডার্ন শিক্ষাব্যবস্থারই এক ধরনের সরাসরি ফল।
বাঙালি মুসলমান পরিসরে আলোচনা করতে গেলে দেখি, মির্জা দেলোয়ার দুইটা কথা বিশেষভাবে বলছেন। একটা হলো, তিনি হিন্দু–মুসলিম ঐক্যের জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দূরত্ব রাখার পক্ষে। তিনি বলছেন, একটি বামন আর একটি দানবের মধ্যে কখনোই সমান ঐক্য সম্ভব না। মুসলমানরা এখন বামনের অবস্থায় আছে; আগে তাদের প্রতিবেশী অগ্রসর সম্প্রদায়ের সমান্তরালে যেতে হবে, তারপর ঐক্যের কথা বলা যাবে। মুসলমানদের এই স্বতন্ত্র চিন্তা–ধারা পরবর্তীতে মুসলিম সংস্কারকদের মধ্যেও দেখা যায়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলায় মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান, স্বতন্ত্র ভোটাধিকার, স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান – এসব ইস্যু নিয়ে যে রাজনৈতিক কাজ হয়েছে, সেখানে এই ধারার প্রভাব রয়েছে। আবার বাংলা ভাষা নিয়ে মির্জা দেলোয়ারের যে আলোচনা – বাঙালির স্বাতন্ত্র্য – পরবর্তীতে বাঙালি জাতিসত্তার রাজনীতিতে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এর দীর্ঘ প্রতিফলন আছে। এখানেই আসে বাঙালিত্ব এবং মুসলিম পরিচয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রশ্ন। দুই ধরনের পরিচয়কে নিয়ে যে বৈপরীত্য আজ আমরা দেখি, মির্জা দেলোয়ার অনেক আগে থেকেই সে বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলছেন, পূর্ববঙ্গে যখন বাঙালি ও হিন্দুর আলাপ ওঠে, সেখানে মুসলমান বনাম হিন্দু এইভাবে বলা হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যখন আলাপ ওঠে, তখন বলা হয়, বাঙালি বনাম মুসলমান। অর্থাৎ বাঙালিত্ব আর মুসলিম পরিচয়কে পরস্পরবিরোধী করে দেখার একটা প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গে বেশি, পূর্ববঙ্গে তা ছিল না। পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি এবং পরিচয়–সংক্রান্ত আলোচনায়ও এই বাঙালিত্ব আর মুসলিম পরিচয়ের দ্বিধা আমাদের রাজনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করেছে।

Share: