মক্কার অবস্থা
মক্কা নগরী আরবের রাজধানী। শহরটি কায়রো থেকে ৭৭৫ মাইল দূরে অবস্থিত। মদিনা থেকে দূরত্ব ২৭০ মাইল এবং এডেন থেকে দূরত্ব ৭৫০ মাইল। এর সমুদ্র বন্দর হলো জেদ্দা, যার কথা আগে আলোচনা করা হয়েছে। নগরীটি তিন দিক থেকে পাহাড়বেষ্টিত। চতুর্থ দিক মদিনার অভিমুখে খোলা। সেই দিকে রাস্তা ও অপেক্ষাকৃত কম পাহাড়ি অঞ্চল। আল কিবলা পত্রিকায় প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদন অনুসারে, শহরের জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার। এখানে মুসলিম দুনিয়ার প্রত্যেক জাতি ও সম্প্রদায়ের দেখা মিলে। তবে অমুসলিমরা সরাসরি প্রবেশ করে না। নগরের বসবাসযোগ্য অঞ্চলের দৈর্ঘ্য দুই মাইল আর প্রস্থে এক মাইল।
শহরটি মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্র ও পবিত্রতম স্থান। গ্রিকরা এই জায়গাকে মাকুরিয়া বলে। বর্তমানে জনপদ আগের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। পাহাড়ের পাদদেশ জুড়ে। এখানকার ভূমি পাহাড়ি এবং পানি লবনাক্ত। এমনকি জমজম কূপের পানিও এই বিশেষত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। শহরের মাঝখানে দশটি মহল্লা রয়েছে।
জারদাল মহল্লা: এ মহল্লায় হজরত মাহমুদ ইবনে ইবরাহিম আদহামের মাজার অবস্থিত। এখানে একটি কূপ বিদ্যমান। মক্কা বিজয়ের সময় রাসুল (সা.) এখানে গোসল করেন। এ মহল্লার অধিকাংশ মানুষই ভারতীয়।
হাসারাতুল বাব মহল্লা: এ মহল্লায় বসবাস করে তুর্কি, আরব ও ইয়ামেনিরা। বর্তমানে তুর্কি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নেই বললেই চলে।
জাবাল হিন্দি মহল্লা: এ মহল্লার অধিকাংশ মানুষই হিন্দুস্তানের। এখানে চারটি মুসাফিরখানা রয়েছে।
শায়বি: (মূল প্রবন্ধে বিস্তারিত নেই)
জাবালে উমর মহল্লা: এ মহল্লাতেও বেশ কিছু মুসাফিরখানা রয়েছে।
সামলা মহল্লা: হজরত আবু বকর ও আমির হামজা এই মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। এখানেও বেশ কিছু মুসাফিরখানা রয়েছে।
জাবালে আবু কুবায়েস মহল্লা: আল্লাহ প্রথম এই পাহাড়কে সৃষ্টি করেছেন।
জিয়াদ মহল্লা: এ মহল্লায় অধিকাংশই বাঙালি শিক্ষক বসবাস করে।
মুসফালা মহল্লা: এ মহল্লারও অধিকাংশ মানুষ বাঙালি।
ওয়াসাসা মহল্লা: এ মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেছেন মুহম্মদ (সা.)। এইখানেই অবস্থিত হযরত আলি (রা.) এর ঘর। এ মহল্লায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন হযরত উমর (রা.)।
উপর্যুক্ত মহল্লাগুলো ছাড়াও আরো কিছু ছোট মহল্লা রয়েছে। তার বর্ণনা লিখতে গেলে বিস্তর জায়গা দরকার। মহল্লাগুলো ঘুরে বুঝা গেল হজ কর্তৃপক্ষ এখানে মাদরাসাও পরিচালনা করে। সবচেয়ে বড় মাদরাসাটি অবস্থিত হারাম শরিফের পাশেই। সেটি পরিচালিত হয় সরকারের দ্বারা।

মুসফালায় অবস্থিত একটা ছোট মাদরাসা, দেখতে অনেকটা বাংলার স্থাপনার মতো। মাদরাসার নাম মাদরাসায়ে সুলাতিয়া হিন্দি। প্রতিটি দিক থেকেই মাদরাসাটি চলছে অনেকটা বিস্ময়কর ভাবে। আমরা যখন সেখানে হাজির হলাম, তখন মাদরাসাটি বন্ধ ছিল। তারপরও বাইরের দৃশ্য ও ব্যবস্থাপনা দেখে উচ্ছ্বসিত হলাম। মাদরাসার অভিভাবক ও মুহতামিম ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মৌলবি মুহম্মদ সায়িদ মুহাজির। তিনি তার চারিত্রিক সৌন্দর্য, সাবলীল ভাষা, তাকওয়া ও যোগ্যতার কারণে মক্কার শায়খদের মধ্যে অনন্য উচ্চতা লাভ করেছেন।
তুর্কি সরকার আগে মাদরাসাটির জন্য বিপুল অঙ্কের ভাতা বরাদ্দ রাখতো। দুঃখজনকভাবে তুর্কি শাসন শেষ হওয়ার কারণে সেখানকার ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে। মক্কার শরিফ হোসায়েন এখানে কোনোপ্রকার সহযোগিতা প্রদান করেন না। ফলে মক্কায় বসবাস করা হিন্দুস্তানি মুসলমানদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
মক্কার দালানকোঠা
পবিত্র শহরটির বাড়িগুলো বহুতল। প্রতিটি তলার চারপাশে বাতাস চলাচলের জন্য রয়েছে নকশা করা কাঠের দরজা। বাড়িতে কোনো উঠান নেই। অধিকাংশ বাড়িই তৈরি হয়েছে কাঠে। অধিকাংশ বাড়িতেই দেখা যায় মানুষ খাটে নরম ও চমৎকার গদিতে ঘুমায়। শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে নহরে জুবায়দা নামে খাল। খালের পানি মিষ্টি। সাধারণত এ পানি মানুষ পান করে। নাহরে জুবায়দা মাউদি, হুনায়ন, তাইফ, মিনা ও মক্কার অন্যান্য অঞ্চলের চাষাবাদের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
ব্যবস্থাপনা
শহরের বাজারে খুবই পরিচ্ছন্ন ও গোছানো। প্রতিটি পণ্যই বিপুল। সরকার প্রতিটি পণ্যের মূল্য ঠিক করে দিয়েছে। তারপরও হজের দিনগুলোয় নির্ধারিত দামে কিছু মেলে না। প্রতিদিন তায়েফ থেকে হরেক কিসিমের ফল আসে ও বিক্রি হয়। শহরের ব্যবস্থাপনা প্রশংসনীয়। রাতে শহর ও বাজারের রাস্তাগুলো আলোকোজ্জ্বল থাকে। নিরাপত্তার জন্য সর্বত্র থাকে পুলিশ। সেখানকার ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাগুলো ইসলামি শরিয়া মোতাবেক ফায়সালা হয়। কোনো প্রকার ফি দিতে হয় না। বড় বড় মোকাদ্দমাগুলোর মীমাংসা হয় পরামর্শ পরিষদ তথা মজলিসে মাশওয়ারাতে। ছোট ছোট মোকাদ্দমা ছেড়ে দেয়া হয় পুলিশ (ইসলামিক পুলিশ বিভাগের সহকারী পরিচালক) অথবা মুহতাসিব (বাজার পর্যবেক্ষক) -এর হাতে।
মক্কার মানুষের অন্তর মদিনার মানুষের তুলনায় শক্ত। ছোটখাটো বিষয়ে একজন আরেকজনকে গালি দিয়ে দেয়া খুবই সাধারণ বিষয়। তারা মারামারি করতে এমনকি মরতে ও মারতেও প্রস্তুত। কেউ যদি দর কষাকষির সময় বাজারে কিছু বলে; তাহলে তারা ধাক্কা মেরে হিন্দিতে বলবে-‘ধুর, ফালতু বকে কাজ নেই’।
মসজিদে হারামের উত্তরে অবস্থিত নগর হাসপাতাল, একটি পোস্ট অফিস, নাহরে জুবাইদার তত্ত্বাবধান অফিস এবং বর্তমান কর্তৃপক্ষের বসবাস জায়গা। মাজলিসে মুশাওয়ারাত, যা আমাদের ওইদিকে কাউন্সিল নামে পরিচিত; সেটি অবস্থিত হারাম শরিফের পাশে। মক্কা থেকে একটা টেলিগ্রাফের লাইন চলে গেছে জেদ্দার দিকে। তারপর জেদ্দা থেকে সমুদ্র হয়ে সোজা মদিনার দিকে। মাসজিদুল হারামের দক্ষিণে অবস্থিত সেনাছাউনি ও তুর্কি দূর্গ; সেটি এখন একরকম ধ্বংসস্তুপ। তার পাশেই রয়েছে বিদ্যুতকেন্দ্র। হামিদিয়া কাছারির পেছনে অবস্থিত সরকারি পত্রিকা কিবলার অফিস।
মক্কার নিম্নোক্ত স্থানের কথা পৃথকভাবে উল্লেখ করা দরকার-
জাবালে আবু কুবায়স: হারাম শরিফের পূর্ব পাশে অবস্থিত। এটা সেই জায়গা, যেখানে বেলাল (রা.) প্রথম আজান দিয়েছেন। এ পাহাড়েই চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। হজরত বেলাল যেখানে আজান দিয়েছেন, সেখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছে পরবর্তীতে। মানুষ সেই মসজিদ জিয়ারত করে।
জান্নাতুল মুয়াল্লা: শহরের উত্তরপূর্ব দিকের গোরস্তান এটি। দুই পাহাড়ের মধ্যে মধ্যে অবস্থিত। এখান দিয়েই প্রধান রাস্তা মদিনা মুনাওয়ারার দিকে চলে গেছে। এখানে শায়িত রয়েছেন হযরত খাদিজা (রা.), কাসিম বিন রাসুল (সা.), আবদুর রহমান বিন আবু বকর, আবদুল্লাহ বিন উমর, আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের, আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)। ফকিহদের মধ্যে রয়েছেন ফকিহুল উম্মত মোল্লা আলি ক্বারী, শাইখুল মাশায়েখ হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরি মক্কী এবং মওলানা আবদুল হক মুহাজির (রহ.)। তাদের সঙ্গে রয়েছেন আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। কিছু কিছু সূত্র মতে, হযরত খাদিজার মাজারের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত হজরত আমিনা (রা.) এর মাজার।
মাসজিদুল ইজাবাহ: এই মসজিদ অবস্থিত জান্নাতুল মুয়াল্লার কাছেই। হারাম শরিফ থেকে এর সম্ভাব্য দূরত্ব এক মাইল।
মাসজিদুর রাইয়া: এটি একটি উঁচু স্থানে জান্নাতুল মুয়াল্লার পথে অবস্থিত। মক্কা বিজয়ের পর এ স্থানে মহানবী (সা.) নামাজ আদায় করে তার বাহিনীর পতাকা স্থাপন করেছিলেন।
মসজিদুল জিন: এটি পাহাড়ের পাদদেশে দালানের মতো করে তৈরি। এর কাছেই মাসজিদুশ শাজারা অবস্থিত। যেখানে মসজিদুল জিন অবস্থিত, সেখানে আগে জনবসতি ছিল না, তবে এখন আছে।
জাবালে নুর: এটি মক্কা শহরের জনবসতি থেকে পূর্ব দিকে তিন ক্রোশ (প্রায় ৯ কিলোমিটার) দূরে মিনার পথে অবস্থিত। এই পাহাড়ে বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এই পাহাড়েই হেরা গুহা অবস্থিত, যেখানে মহানবী (সা.) ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
মুরসালাত গুহা: এটি মিনা নামক স্থানে মসজিদে খায়েফের কাছে অবস্থিত। এই গুহাতেই সূরা আল-মুরসালাত অবতীর্ণ হয়েছিল। এই গুহার কোণে একটি পাথর আছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র মস্তকের চিহ্ন রয়েছে।
দারে খাদিজেতুল কুবরা: এটি শহরের ভেতরে অবস্থিত। মহানবী (সা.) হিজরত পর্যন্ত এই স্থানেই বসবাস করতেন। এই স্থানেই হযরত ফাতেমাতুজ জাহরা (রা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
মাকাম মাওলিদুন নবী (সা.): এটি হারামের সাথে সংলগ্ন, কুবায়স পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। একটি সবুজ গম্বুজ বিশিষ্ট। সুন্দর, পবিত্র ও বরকতময় স্থান, যার কাঠামো দুই মঞ্জিল বিশিষ্ট।
দারে আবু বকর সিদ্দিক (রা.): এর কাছেই দুটি পাথর রয়েছে। একটি হাজারে মুত্তাকা এবং অন্যটি হাজারে মুত্তাকাল্লেম। হজ করতে আসা লোকজন এই দুটি পাথরও জিয়ারত করেন।
মাওলিদ আলী (আ.): এটি শা’বে-বনি হাশিম মহল্লায় হারামের সাথে সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত।
মসজিদ হযরত আয়েশা (রা.): এটি শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত। (এই মসজিদকে মসজিদে উমরাহ নামেও ডাকা হয়)।
মসজিদে নহরুন নবী: এটি মিনায় অবস্থিত। এখানে সূরা আল-কাউসার অবতীর্ণ হয়েছিল। বর্তমানে সেখানে আর যাওয়া হয় না, কারণ ডাকাতদের ভয় খুব বেশি।
হিজরত গুহা: এটি সেই গুহা যেখানে মহানবী (সা.) তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে নিয়ে হিজরতের দিন অবস্থান করেছিলেন। এটি হারাম শরীফ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত। আলহামদুলিল্লাহ! হজের আগে আগে এই সমস্ত জিয়ারত সম্পন্ন করা গিয়েছিল।