সাম্প্রদায়িক আবেগের ইতিহাসে নতুন বাতায়নের চোখ

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা

Share:

রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর দুইজন-ই ইসলামিকেটের আওতায় পড়েন। এই অর্থে যে, হয়তো আমরা অনেকেই জানি না যে, পৃথিবীর প্রথম যে ফারসি পত্রিকা সেইটা ছাপায় রামমোহন রায়। তার নাম হচ্ছে ‘মিরাত-উল-আখবার’। আমাদের কাছে বিদ্যাসাগর হচ্ছেন একজন। কিন্তু বিদ্যাসাগরের সময় বিদ্যাসাগর ছিলেন দুইজন। মানে এক বিদ্যাসাগর নিজের নামে লিখত, আরেক বিদ্যাসাগর ছিল গুপ্ত যে বেনামে লিখত। “অতি অল্প হইল” এবং “আবার অতি অল্প হইল”—তাঁর এই দুইটা বই ছিল বেনামে লেখা। তবে মজার জিনিস হচ্ছে, যে বই তিনি নিজের নামে লিখছেন সেইখানে উনি সংস্কৃত দিয়ে সবকিছু ভরায় ফেলছেন, কিন্তু যেই বইগুলা তিনি বেনামী লিখেছেন সেইখানে আরবি-ফার্সি শব্দের ব্যবহার অনেক বেশি। এটা যে আরবি-ফার্সি রাখার জন্য এমনটা করছেন— ব্যাপারটা তাও না। ব্যাপারটা হচ্ছে যে, আসলে প্রমিত বাংলা বা বাংলা বলে এখন আমরা যেটা চিনি, সেইটা কলকাতা বা তার আশপাশে ওইখান থেকে হয়েছে—এই কথাটাই অনেকাংশেই ভুয়া। 

ভুয়া মানে এই অর্থে যে, বিদ্যাসাগর যে ওইভাবে লিখছে তার কারণ হচ্ছে— তার আশপাশে কলকাতার যে সাধারণ সমাজ আছে তাদের কমন ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে বাই-ডিফল্ট আরবি ফার্সি শব্দ ছিল। সেই কারনে তার ল্যাঙ্গুয়েজ অটোমেটিকেলি এমনটা হয়ে গেছে। কারন “অতি অল্প হইল” এবং “আবার অতি অল্প হইল” লেখা দুটি হচ্ছে রসালো ধরনের টিটকারি মূলক লেখা। ফলে এই রস তৈরির জন্য আমরা যেমন কতগুলা ল্যাঙ্গুয়েজ, স্ল্যাং বা এরকম কিছু জিনিস ব্যবহার করি তেমন বিদ্যাসাগরের ভিতরে ঐগুলা ছিল এবং বেনামি লিখছেন বলে তিনি সেখানে খোঁটাও দিতে পারছেন। সে তো লিখতেছে বেনামে ফলে সে বলতেছে—অমুক লোকটা যে এখন বিদ্যাসাগরের নিন্দামন্দ করতেছে, উনি যখন না খেয়ে ছিল তখন তো বিদ্যাসাগরের কাছে যেয়ে বলেছিল যে, আমাকে একটা কিছু দেন, তখন বিদ্যাসাগর তাকে চাকরি জোগাড় করে দিছে। এখন বিদ্যাসাগরেরটা খেয়ে বিদ্যাসাগরের নিন্দামন্দ করছে কত বড় নিমক হারাম!— এগুলো তো আর স্বনামে বলা যায় না।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হচ্ছে যে, খুব সম্ভব রামমোহন এবং বিদ্যাসাগরকে কোলকাতার ভদ্রলোক যাকে বলে সেখানে ফিট করানো যায় না। মানে এরা ঠিক ভদ্রলোক না বলে আমার ধারণা। মানে ভদ্রলোকের ভেতরে আরও এমন কতগুলো ফিচার আছে যেগুলো এদের ভিতরে নাই। তারা হচ্ছেন নিয়ন্ত্রিত এবং একই সাথে রিলিজিয়াস। আরেকটা জিনিস বলি সেটা হচ্ছে সত্যজিতের একটা মুভি দেখছিলাম, ডায়লগটা বিভূতিভূষণ থেকে আসছে। তো সেখানে অপু তার বউকে জিজ্ঞেস করে যে, “এই যে আমাকে তুমি বিয়ে করলে, তোমার অনুশোচনা হয় না? আমি যে গরিব তোমার অনুশোচনা হয় না?” তখন তার বউ বলে যে, এত কঠিন কথা বুঝি না। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, অপু এবং তার স্ত্রী দুজনেই কিন্তু ব্রাহ্মণ। অপু বললো যে, তোমার অনুশোচনা হয় না? ও বলল যে, অত কঠিন কথা বুঝি না। তারপরে অপু তাকে ভাঙ্গায়া বলছে যে, তোমার আফসোস হয় না, আফসোস? তখন সে বুঝতে পারে। তারপরে বলে যে, না, আফসোস হয় না। মজার জিনিস হচ্ছে যে, এরপর থেকে তার বউ আফসোস শব্দটা ব্যবহার না করে অনুশোচনা শব্দটা ব্যবহার করা শুরু করে।

বৃটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমল দুই জায়গাতেই এবং বিশেষভাবে কোলকাতায় জাতি, মানুষ সংজ্ঞায়নের বেলায় রেসিজম কী রোল প্লে করছে—এটা আসলে খুবই মিসিং বলে আমার মনে হয়। মানে বাংলাদেশের যে ইতিহাস লেখালেখি হয় এইখানেই আসলে জিনিসটা মিসিং। এটা নিয়ে অনেক কিছু বলা যায়। দুইটা পলিটিকাল পার্টি গঠিত হল—কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হল ১৮৮৫ সালে এবং মুসলিম লীগ হল ১৯০৬ সালে। দুইটাই নির্দিষ্ট একটা ঘটনার পরের ঘটনা। বঙ্গভঙ্গের মতো বেশ বড় ধরনের ঘটনাগুলো সম্পর্কে আমরা যতটা জানি তার আগের ঘটনাটা আমরা ওইভাবে খেয়াল করি না। সেটা হচ্ছে যে, ১৮৮৩ সালের দিকে একটা ঘটনা ঘটেছিল, লর্ড রিপন গভর্নর থাকাকালীন সময়ে—ইন্ডিয়ান জাজ ইংরেজদের বিচার করতে পারবে কিনা? ইংরেজ যদি ফৌজদারি অপরাধ করে সেটার বিচার করতে পারবে কি না? বিচার করতে পারবে—এইমূলক আইন পাশ হল। এর ফলে ইংরেজদের ভিতরে মারাত্মক রিঅ্যাকশন হয়। তারপরে ওই আইন বাতিল হয় এবং দেখলাম যে (আমি নিশ্চিত না), ১৮৮৪ সালেই লর্ড রিপনকে চলে যেতে হয়। আমি আন্দাজ করি যে, সে আসলে ইংরেজদের ভেটোতে এই জায়গায় থাকতে পারেনি। যদিও সে আইনটা সংশোধন করেছিল মানে পুরোপুরি বাতিল করে নাই। প্রতিবাদের পরে সে যেটা করছে সেটা হচ্ছে যে, নেটিভরা বিচার করতে পারবে কিন্তু একটা জুরি বোর্ড থাকতে হবে যেখানে মিনিমাম ফিফটি পার্সেন্ট জুরি মেম্বার ইংরেজ থাকবে তারপরে নেটিভরা বিচার করতে পারবে। এইটা নিয়ে নেটিভদের ভিতরে একটা রিয়াকশন হয়। 

বঙ্কিমচন্দ্রের তো এখন অনেক নিন্দামন্দ করা হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের যে ঋণ তা আসলে আমাদের মনে করার দরকার হয় না। যেমন ধরেন বাংলায় লেখা ফার্স্ট ফেমিনিস্ট রাইটিং বঙ্কিমচন্দ্রের। তার আগে কেউ লেখেন নাই। বাংলায় ফেমিনিজমের জনক বঙ্কিমচন্দ্র—এটা বেশ উইয়ার্ড লাগবে অনেকের কাছেই। আমরা এখন যেটা অনেক ইউজ করি, ‘বাঙালি মুসলমান’—এই টার্মটা বঙ্কিমচন্দ্র থেকে নেওয়া, তার আগে কোথাও দেখি নাই। প্রফেসর রাজ্জাক বঙ্কিমচন্দ্র থেকে গল্প নিয়ে নিজের গল্প হিসেবে চালিয়েছে—সেইটা নিয়ে আবার সেলিম খান লিখছে। বঙ্কিমচন্দ্রের এমনই একটা নিন্দিত ক্যারেক্টার যার ব্যাপারে মোটামুটি সকল পক্ষ— কোলকাতার লিবারাল, বাংলাদেশের লিবারাল, হিন্দু এবং মুসলমান—একমত যে, বঙ্কিমচন্দ্র হচ্ছে একমাত্র গালি দেওয়ার লোক যাকে নির্দ্বিধায় গালি দেওয়া যায়। কিন্তু বিদ্যাসাগর সেই গালি খাওয়ার লোকটা হয় নাই যদিও সে এইগুলো করেছে। যেমন, সিরাজউদ্দৌলার নিয়া সে যখন বই লিখেছে সেখানে দুরন্ত দুরাচার সিরাজউদ্দৌলার উচ্ছেদ থেকে মহামতি লর্ড হেস্টিংসের সময়কাল পর্যন্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত যে করল তাকে মহামতি সম্বোধন করেছে এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে সে সেলিব্রেটও করেছে। তারপরেও তার রেস্পেক্টটেড হইতে প্রবলেম হয় নাই। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে যারা একদম শুরুতে সমালোচনা করছে তাদের ভিতরে বঙ্কিমচন্দ্র একজন, দীনবন্ধু মিত্রও ছিলেন। তার একজন ভাই ছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র সেও ছিলেন। তার একটা বইয়ের নাম ‘বেঙ্গল রায়টস’। এই ব্যাপারে খুব ইম্পর্টেন্ট বই এটি। যাইহোক, ইন্ডিয়ানরা যে সাদাদের বিচার করতে পারবে না এটা একটা বড় ঘটনা ছিল। যার পরে নেটিভদের ভিতরে এক ধরনের রিয়াকশন হয়। 

এই রিয়াকশনের ফলে কংগ্রেস তৈরি হচ্ছে ১৮৮৫ সালে। এখন “গুপ্ত” বিষরক আলোচনার মতো আরেকটা আলোচনা চলতেছে “কিংস পার্টি” বিষয়ক। তো রিয়্যাল কিংস পার্টি হচ্ছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। কারন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম নামে এক লোক যে ছিল ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট এবং সাদা চামড়ার। সে এটা প্রতিষ্ঠা করে বেসিক্যালি ইন্ডিয়ার নেটিভদের ভিতরে যে ক্ষোভ গুলো হয়েছে সেগুলো যেন একটা সিস্টেমেটিক ওয়েতে ডেলিভার হতে পারে। একইভাবে মুসলিম লীগের সাথেও এই ‘কিংস’ এর যোগাযোগটা ছিল। মুসলিম লিগ শুরুতে লর্ড মিন্টোর সাথে মিটিং করে। তারপরে তার বুদ্ধিতে আসলে মুসলিম লীগ তৈরি হয় যদিও এই জিনিসটা ইতিহাসে লিখা নেই কিন্তু ডিডাকশানিস্ট মেথডে কিছুটা বোঝা যায়। কীভাবে বোঝা যায়?— মুসলিম লীগ যখন হয়েছে, ততদিনে কংগ্রেস তার আগের পজিশনে আর নাই। কংগ্রেস তখন এক ধরনের স্বরাজের স্বপ্ন দেখে। 

একটা সময় পর্যন্ত ব্রিটিশ ক্রাউনের সাথে ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসির যে কনফ্লিক্ট আছে— এইটা নিয়ে কোন ভাবনাই ছিল না। খেয়াল করলে দেখা যায়, এখনকার অস্ট্রেলিয়া, কানাডা যেই অর্থে ‘ব্রিটিশ ক্রাউনের’ ডমিনিয়ন সেখানে প্রাইম মিনিস্টার (মন্ত্রী শাসিত সরকার) সিস্টেমটা আছে আর যে যে জায়গায় রেভ্যুলেশন হয়েছে সেগুলোতে প্রেসিডেনশিয়াল শাসন। ক্রাউনের সাথে যে ডেমোক্রেসির নেসেশারি বিরোধ আছে— এই ভাবনাটা ছিল না এবং কংগ্রেস এরকম পজিশনে ছিল। পরে মুসলিম লীগ যে হয়েছে সেও এরকম পজিশনে ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের এটা চেঞ্জ হয়েছে ওই ঘটনায় যেখানে সে ঐ রেসিজমটা দেখল। কংগ্রেস ফার্স্ট অধিবেশন করেছে ৭২ জন নিয়ে তাদের মধ্যে দুই জন ছিল মুসলমান এবং প্রায় চল্লিশ জন ছিল উকিল। তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় পলিটিশিয়ানদের ভিতরে সবচাইতে পাওয়ারফুল ছিল উকিল, ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী থেকে শুরু করে শেখ মুজিব পর্যন্ত সবাই কিন্তু উকিল। এইখানে একমাত্র ভাসানীই হচ্ছে একটু ‘ক্ষেত’। আমার একটা অনুমান হচ্ছে যে, চুয়ান্ন সালে যখন সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হয় তখন ভাসানী কেন প্রধানমন্ত্রী হল না? আমার ব্যক্তিগত অনুমান হচ্ছে যে, ভাসানি সোহরাওয়ার্দী থেকে ইংরেজি কম পারতেন বলে হয় নাই (হিস্টোরিক্যাল হিসাবে নেওয়ার দরকার নাই)। যাই হোক, রেসিজমের এই ব্যাপারটার কারনে আসলে ভারত ‘স্বরাজের’ দিকে গিয়েছে।

এখানে আরেকটা বিষয় দেখার হচ্ছে যে, আমরা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার পরে পাকিস্তানের যেমন অনেক নিন্দামন্দ করি, একইভাবে ব্রিটিশদের ব্যাপারেও সার্টেন কতগুলো নিন্দামন্দ করি যেগুলো মোর অর লেস আই থিঙ্ক ফলস। কী রকম?—ইংরেজদের আসলে এই জায়গায় শাসনের একটা লেজিটিমিসি ছিল যেইটা আমরা খুবই মিস করি। তখন মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে গেছে। মোঘলদের অনুমতি নিয়ে কিন্তু তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতেছে। জাহাঙ্গীরের দরবার থেকে বিনা শুল্কে ব্যবসা করার ফরমান নিয়ে তারা আসছে। কিন্তু তারা যখন বাংলায় বাণিজ্য করতেছে ততদিনে তো আসলে মুঘল সাম্রাজ্যই নাই। নবাব বলতেছে, আমি হইলাম এইখানের নবাব ফলে আমাকে শুল্ক দেও। ও বলছে— না, এইটা যেহেতু মোঘলদের অধীনে তাই আমি শুল্ক দিব না। এটা আসলে কনফ্লিক্টের এর গোড়া। নবাবরা একধরনের রেভ্যুলেশন করছে। আর ওরা আগের যেই রাজা মানে মোগলদের ফরমান নিয়ে বাংলায় আসছে। এখনকার চায়না আর তাইওয়ানের কনফ্লিক্টের মতো। চায়না বলে যে, তাইওয়ান আমার। আর তাইওয়ান বলে যে, পুরা চায়নাই আমার। মাওয়ের রেভ্যুলেশনের পরে রাজারা পালিয়ে তাইওয়ান আইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। তাইওয়ান বলছে ওরা হচ্ছে অবৈধ মানে এখন যেটা আমরা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না হিসাবে চিনি সেটা অবৈধ। আমি হইলাম বৈধ। ফলে পুরা চায়নাই আমার। আর চীন বলে যে, আমি মেইন ল্যান্ড, আমিই হচ্ছি যে লেজিট অথরিটি, তাইওয়ান আমার এবং তাইওয়ান- চায়নার দ্বন্দ্বটা হচ্ছে ওই জায়গায়। একই ঘটনা বাংলায় ঘটেছিল। নবাবরা বলতছে যে, এইটা আমার। আর মোঘলরা বলছিল যে, তোমরা আমাকে মান না, দাঁড়াও আমি আরেকজনকে পাঠাইতেছি।

ফলে যেটা হয়েছে, ১৭৬৫ সাল থেকে তারা কিন্তু আরও বেশি লেজিট হয়েছে এবং তখনও কিন্তু নবাবি শেষ হয় নাই। এরপরে খেয়াল করেন যে, মুর্শিদাবাদের নবাব কিন্তু এখনও আছে এবং মুর্শিদাবাদের নবাব হচ্ছে মিরজাফরের বংশধর। পাকিস্তানের ইস্কান্দার মির্জা সেইও মিরজাফরের বংশধর। আর সিরাজউদ্দৌলার নাতির নাতির নাতির এরকম একজন ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর স্ত্রী। সোহরাওয়ার্দীকে আবার উৎখাত করেন ইস্কান্দার মির্জা ফলে হিস্টোরিক্যাল একটা কন্টিনিউটি কিন্তু আছে যেটা যদিও আমরা খেয়াল করি নাই এবং যেই অর্থে উচ্ছেদ বলে এটা কিন্তু ফলস, কারণ সিরাজউদ্দৌলার বাচ্চারা কিন্তু ইংরেজের বৃত্তি নিয়া পড়ছে এবং নবাবরাও বৃত্তি পাইত। ফলে বিষয়টা আসলে হয়েছে যে, মোগলরা ব্রিটিশদেরকে কিছু সার্টেন এখতিয়ার দিছে তারা সেইটার-ই চর্চা করেছে।

কিন্তু ওয়েস্টার্ন অর্থে যে পিপল সেই সেন্স টা এই জায়গায় হয়তো অতটা ছিল না। কিন্তু আমি আন্দাজ করি যে, এই জায়গায় খুব সম্ভবত পিপলের অল্টারনেটিভ হিসেবে সমাজ বলে বড় একটা কনসেপ্ট ছিল যেটা পিপলের নেটিভ ভার্সন হিসাবে ছিল। আরেকটা হচ্ছে, ইসলামের ভিতরে ‘কওম’ বলে একটা আইডিয়া আছে সেটা হয়তো ‘জাতি’ ধারনার কাছাকাছি জিনিস। মানুষরা সেটা মানে নাই ফলে কনফ্লিক্ট হচ্ছে এবং ওরা যেহেতু টর্চার করতছে যেমন, নীলচাষ করার জন্য অত্যাচার। ইংরেজের এই লেজিটেমেসি কিন্তু ১৮৫৭ পর্যন্ত ছিল মানে সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত। সিপাহী বিদ্রোহের পরে গিয়ে মুঘল এম্পায়ার এবোলিশড হল। এবোলিশড হওয়ার পরে কী হবে? এটা তো কোন না কোন ক্রাউন বা স্টেটের অধীনে থাকতে হবে। ফলে এটা যে ব্রিটিশ স্টেটের অংশ হল। এর আগ পর্যন্ত এটা মোঘলদের অধীনে ছিল।

এখানে আরও বেশি খেয়াল করার ব্যাপার হচ্ছে যে, মুঘলদের সময় এটা ছিল হিন্দুস্তান; নট ‘হিন্দুস্থান’। ওই যে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান—ওই যে স্তান। হিন্দুস্থান শব্দের ভেতরে অটোমেটিক্যালি এক ধরনের অ্যসিমিলিশন অব দ্য টু কমিউনিটি আছে এবং ফারসি ও সংস্কৃত দুইটার একধরনের ভাষাগত যোগাযোগ আছে। কিন্তু যেটা সংস্কৃততে স্থান সেটা ফার্সিতে স্তান। ফলে এটা ছিল হিন্দুস্তান এবং এই জায়গার মুসলমানরা হিন্দুস্তানী মুসলমান হিসেবে পরিচিত ছিল। তো ১৮৫৮ সালে যখন মুঘল এম্পায়ার এবোলিশড হল তখন এটা আর হিন্দুস্তান থাকে নাই। তার আগ পর্যন্ত কিন্তু এটা ছিল হিন্দুস্তান।

এরপরে ১৯৪৭ সালে যেটা ঘটলো যে আলোচনাটা হয় না। ১৮৫৮ এর পরে হিন্দুস্তান ইন্ডিয়া হয়। কংগ্রেস ইন্ডিয়াকে ট্রান্সলেট করছে ভারত হিসেবে। কিন্তু এই ভারত বলতে কিছু ছিলই না—কনসেপ্টচুয়ালি ভারত লম্বা সময় ধরে এক্সিস্ট করত না; আগেও এক্সিস্ট করত না। ধরেন, মহাভারতে ভারতের উল্লেখ আছে কিন্তু অশোক কি তার এম্পায়ার কে ভারত বলতো? আমরা যদি মুঘলদের আগের এখানের একটা একক এম্পায়ার চিন্তা করি সেটা তো অশোকিয়ান এম্পায়ার (মৌর্য সাম্রাজ্য), অশোকের স্তম্ভ সেই আফগানিস্তানেও আছে। অশোক কিন্তু তার এম্পায়ারকে ইন্ডিয়া বলত না এবং ভারতও বলত না। ইন্ডিয়া হচ্ছে পার্সিয়ানদের দেয়া নাম। এই কারনে আমি বলি যে, আসলে ভারত ভাগ হয়নি, হিন্দুস্তান ভাগ হয়ে ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান দুইটা হয়েছে, আরও অনেকগুলো রাষ্ট্র হয়েছে, বাকি রাষ্ট্রগুলোকে ইন্ডিয়া দখল করেছে যেমন হায়দ্রাবাদ, সিকিম এরকম। ফলে ভারত ভাগ হয়েছে—এই জিনিসটাই ভুয়া। ফলে আমার কাছে মনে হয় যে, কনসেপ্টচুয়ালি কংগ্রেস যে ভারত/ভারতীয়/সর্ব ভারতীয় হইল—এইটা বলার ভিতর দিয়েই সে আসলে মুসলমানদের বাদ দিয়ে দিছে।

আমি ইসলামিকেটকে দেখি হিমালয়ের দক্ষিণে আর হিন্দুকুশের পূবের এই এলাকার পরিচয় হিসাবে। এই পরিচয়ের যদি একক কোন নাম থাকে সেটা হচ্ছে হিন্দুস্তান। ভারত ও মহাভারতের যে ‘ভরত’ সেটা মহারাষ্ট্রের ছোট্ট একটা জায়গা। এই অঞ্চলের লিঙ্গুইস্টিক্যালি ইসলামিকেট যে ব্যাপার সেটা হিন্দুস্তান শব্দে আছে এমনকি আইডিয়া হিসেবেও। যদিও ইসলামিকেট বলাটা মুসলমান হিসেবে আমাদের বলতে ভাল লাগতে পারে কিন্তু আমরা যদি অন্যান্যদের কথা চিন্তা করি তাইলে আসলে ইসলামিকেট বলা ঠিক না। অন্যদিকে এক ধরনের কমিউনিটি-ট্রিটির জায়গা থেকে হিন্দুস্তান শব্দটা এসেছে। এটা এমনিতেই একটা শান্তিচুক্তি। যেখানে ধরেন ওরা আছে। আবার হিন্দু ধর্ম ও তো আসলে একক ধর্ম হিসেবে আগে কিছু ছিল না। হিন্দু ধর্মও তো আসলে সেদিনের একটা কনসেপ্ট। ‘হিন্দু’ বলতে যে ধর্ম হিসাবে কিছু একটা মিন করে, এটাও আসলে নাইন্টিন সেঞ্চুরিতে শুরু হওয়া এবং অনেকখানি আসলে কোলকাতার ইন্টেলেকচুয়ালদের অবদান বেশি এইসব জায়গায়। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বিবেকানন্দ অনেকের এরকম কাজ আছে। একটু আগে যেটা বলছিলাম যে, ১৮৫৮ সালে মোগল এম্পায়ার এবোলিশড হওয়ার মাধ্যমে এটা ব্রিটেনের পার্ট হয়ে গেল। তার আগে ব্রিটেন মানে ইংরেজরা তাদের ডকুমেন্টে এটাকে হিন্দুস্তানই লিখত। ১৮৫৭ পরে এটাকে ইন্ডিয়া হিসেবে লেখা শুরু করে এবং তর্জমা করা হয় ভারত হিসেবে। 

এজন্য আমি বলি যে, জিন্নাহ বা ওই সময়ের পাকিস্তান আন্দোলনের এটা ভুল ছিল। আমার মনে হয় যে এইটা বেস্ট হইতো যে, যদি তারা বলতেন রাষ্ট্রটার নাম হবে হিন্দুস্তান। আর যারা ‘হিন্দুস্তান’ আইডিয়ার ভেতরে থাকবে এবং কমিউনাল তারা ইন্ডিয়া-ভারত এইগুলা বানাক। ভাগ হয়ে যাওয়ার যে দায় সেটা কংগ্রেসের উপরে পড়ুক, যারা হিন্দুস্তানে থাকবে না তারা হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র বানাক। একটা ফান্ডামেন্টাল জায়গা আছে। অনেকের একটা প্রশ্ন আছে সেটা হচ্ছে ‘কংগ্রেস’ শব্দের ভিতরে হিন্দু নাম নাই, ধর্ম নাই। কিন্তু মুসলিম লীগের নামের মধ্যে ‘মুসলিম’ কেন? সেই একই লোকগুলো বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদের কিন্তু খুবই ফ্যান। এখানে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, হিন্দুস্তানে মুসলমানরা হচ্ছে মাইনরিটি। ফলে জিন্নাহ বেসিকালি মাইনরিটির পলিটিকস করতেছেন। মুসলিম লীগ আসলে মাইনরিটির পলিটিক্স করতেছেন। ফলে মাইনরিটির আসলে তার নিজের মেইন পরিচয়টা নিতে হয়; তা না হলে সে তার নিজেদের লোকদের সাথে কমিউনিকেট করবে কেমনে? প্রায় সকল জায়গায় মাইনরিটিকে তার ধর্ম পরিচয় নিয়ে আসতে হয়, সেকুলার হওয়াটা সে অ্যাফোর্ড করতে পারে না। ধরেন ১৯৫০ সালে পাকিস্তানে যে দাঙ্গা হয়েছে, পরে যে যোগেন মণ্ডল চলে গেল এটা কি জিন্নাহর ড্রিমের ভিতরে ছিল? জিন্নাহর যে স্টেট ড্রিম সেটার ভিতর তো এমনটা ছিল না এবং কোন স্টেট-ই আসলে ফর্মালি বলে নাই যে, এই দেশে হিন্দু থাকতে পারবে না বা ঐ দেশে মুসলমান থাকতে পারবে না। আমার ধারণা এইটা আসলে বেশিরভাগই গুজব। কারন এটার ওপর কোনো রিটেন ডকুমেন্ট নাই।

আরেকটা হচ্ছে যে, ‘আইডিয়া অব ন্যাচারাল কান্ট্রি’ বা ‘আইডিয়া অব ন্যাচারাল হ্যাবিটেট’-এর ভিতরে হিন্দুদের ন্যাচারাল হ্যাবিট্যাট হচ্ছে ইন্ডিয়া—এরকম একটা আইডিয়া হইছে। মুসলমানদের ব্যাপারেও এরকম সেইম একটা জিনিস হইছে এবং বাংলা ভাষার রাজধানী ন্যাচারালি হচ্ছে কলকাতা। কেউ কি কখনো শুনেছেন যে, বিদ্যাসাগর, শীর্ষেন্দু বা নচিকেতা এদের উপরে বিশেষ কোনো হামলার কারণে তারা গেছে। এদের লেখাজোখায় আমি কোনো আলামত পাইনি। কিন্তু এরা কিন্তু ওই জায়গায় গিয়ে খুব কষ্ট করেছে। অথচ এই জায়গায় তারা জমি-জমা, প্রতিষ্ঠান এগুলো রেখে গেছে। জীবনানন্দের তো একটা হ্যান্ডসাম চাকরি ছিল। সেই সময়কার টপ ক্লাস চাকরি। সেগুলো ছেড়ে ওই জায়গায় গিয়ে অনেক কষ্ট করছে। এতই কষ্ট করেছে যে, ঐখানে হুমায়ন কবিরকে তেল দিয়ে তার চাকরি জোগাড় করতে হয়েছে। সে বই উৎসর্গ করছে হুমায়ুন কবিরকে। তারপরে হুমায়ুন কবির একটা পত্রিকা পাবলিশ করেছে। সেটার এডিটর হয়েছে জীবনানন্দ। আমরা জীবনানন্দকে যে নিভৃতচারী মনে করি ব্যাপারটা এরকম মোটেই ছিল না আর কি। সব ভুয়া। 

এর সাথে যেটা বলবার সেটা হচ্ছে যে, মোগল এম্পায়ার যখন এবলিশড হল এবং আমরা ব্রিটেনের অংশ হলাম তারপর দেখা গেল যে, ব্রিটিশ ক্রাউন এর সাথে ডেমোক্রেসির কোন বিরোধ নাই। মানে ক্রাউন ক্রাউনের জায়গায় থাকবে কিন্তু দেশ চালাবে আইন দিয়ে—এখন ব্রিটিশ ডেমোক্রেসি যেভাবে চলে। ব্রিটিশদের তো এখনও রাণী আছে, তাই না? বেসিক্যালি আমাদের যে প্রেসিডেন্ট পদটা আছে, সেখানে থাকার কথা ছিল এই এরকম কোন একটা ক্রাউন। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতির তো আসলে কোন অনার নাই। আমাদের উচিত হচ্ছে যে, নবাব পদটা ফিরিয়ে নিয়ে আসা মানে এই প্রেসিডেন্টের বদলে আমদের বলা উচিৎ নবাব। প্রেসিডেন্টেকে নবাব বানালাম আর তার নীচে উজির থাকবে তারা রাষ্ট্র চালাবে। আমরা যদি প্রি-কলোনিয়াল হতে চাই তাহলে হয়তো এরকম একটা জায়গায় যাওয়াই ভালো। এবং চিত্রনায়ক নাঈম আছে যে ঢাকার নবাবের ওয়ারিশ। আমার মনে হচ্ছে, তারে নবাব বানাইলে চুপ্পুর চেয়ে অনেক ভালো হবে। 

এখন বিষয় হচ্ছে, ক্রাউন এর সাথে ডেমোক্রেসির কোন কনফ্লিক্ট নাই— এটা শুরু হচ্ছে রেসিজমের জায়গা থেকে। পাকিস্তানে কিন্তু সেইম ঘটনা ঘটেছে। এখানে হচ্ছে যে, কম্যুনাল ব্যাপারের বাইরেও একটা রেসিস্ট ব্যাপার ছিল। রেসিস্ট এই অর্থে যে, পাকিস্তানের আর্মিতে কত পার্সেন্ট বাঙালি ছিল? পূর্ব পাকিস্তানী কতজন ছিল? আমি আসলে এক্সাক্ট নাম্বার জানি না, কিন্তু আসলে খুবই কম। অথচ, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছিল কিন্তু মেজরিটি। “তোমরা তো শিক্ষিতই ছিল না”—এরকম কিছু আর্গুমেন্ট আছে। কিন্তু সিপাহিদের কী এমন শিক্ষা দরকার! ব্রিটিশ আমলে ওরা হাফপ্যান্ট পরে নাই? ওরা এমন কী জানত?— ওরা বন্দুক চালিয়েছে না? মেজর না বানাক, অন্তত সিপাহীদের মধ্যে তো মেজরিটি থাকতে পারতো। আমি তো বলি নাই— যে পড়তে পারে না তাকে মেজর জেনারেল বানায়া দেওয়া হোক। সিপাহীদের মধ্যে তো রাখতে পারতো সেটাও তো বানায় নি। 

এখানে যেরকম রেসিস্ট একটা জিনিস দেখা গেছে ব্রিটিশ আমলে ওই জিনিসটই হয়েছে এবং ওইখান থেকে মোস্টলি এই আইডিয়া অব কনফ্লিকটা আসছে ব্রিটিশ ক্রাউনের সাথে। সেটা হচ্ছে ব্রিটিশরা আমাদেরকে হিউম্যান ডিগনিটি দেয় না। সেটাকে নিজেদের পক্ষে চ্যানেলিং করতে কিংস পার্টি হিসেবে কংগ্রেস বানাচ্ছে। কংগ্রেস বানানোর পরে বিশ বছরে যেটা হয়েছে— কংগ্রেস ভুলে গেছে যে তারা একটা স্বরাজের স্বপ্ন দেখছে। এই সময় ব্রিটিশরা মুসলমানদের দিয়ে আরেকটা পার্টি—‘মুসলিম লীগ’—বানাইছে। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে যে, মুসলিম লীগসহ মুসলমানদের পার্টিগুলোর শুরুতে আগ্রহ ছিল ইংরেজরাই থাক। এরা কিন্তু এন্টি-ইংরেজ মুভমেন্ট করে নাই। যে কারণে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করার কোন মানে নেই। আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের বিজয় দিবসও পালনের কোন মানে নেই। পাকিস্তান হারছে সত্য কিন্তু আমরা কি জিতছি? আমারতো মনে হয় যে,  ইন্ডিয়া জিতছে। মুসলিম লীগ বা মুসলমানদের দলগুলো চায় নাই ব্রিটিশরা এখান থেকে চলে যাক। তারা পাকিস্তানের কথা বলছে তখন যখন ব্রিটিশরা চলে যাবে-ই মনে হইছে। যদি চলে যাই-ই তাহলে কেবলমাত্র যেন হিন্দুদের হাতে ক্ষমতাটা না যায়। কারন জিন্নাহর আর্গুমেন্ট স্টাইল ছিল যেমনটা আমি দেখি, বাংলাদেশের মুসলমানদের দুটো দিক আছে। একটা হচ্ছে যে, আমরা কাস্ট সিস্টেমের আন্ডারে চলে যাব, আমরা সবাই আব্দুল হয়ে যাব। সকল হিন্দু এলিটদের মোটামুটি একজন ব্যক্তিগত আব্দুল ছিল। এই যে আমরা ব্যক্তিগত আব্দুল হয়ে যাবো—এইটা তো হওয়া যাবে না। আরেকটা হচ্ছে আরামে গরু খাওয়া যাবে না। এই দুইটা কারনে আমরা পাকিস্তান চেয়েছিলাম। মানে আমি কোনোভাবেই বাদ দিচ্ছি না শ্রেণি, ধর্ম এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর।

ফলে আমরা তো আসলে ইংরেজ বিরোধী ছিলাম-ই না, বরং ইংরেজ থাকবে এবং তার ভিতরে-ই ডেমোক্রেটিক সম্ভাবনাগুলো বিচার ও খুঁজে বের করার ইচ্ছা ছিল। আমার আরও যেটা মনে হয় সেটা হচ্ছে যে, মুসলমানরা শুরুতে ইংরেজদের অনেক ডিনাই করছে—এটাও আমার ভুয়া লাগে। ভুয়া লাগে কেন?—কারন আমি যেটা দেখতে পাই যে, আগে ডিভিশনটা ছিল আমির-গরিব। ধরেন, আওরঙ্গজেব সাম্প্রদায়িক কিন্তু আওরঙ্গজেবের দরবারে হিন্দু এলিটদের সংখ্যা বেশি ছিল মুসলমানদের চাইতে। বা সিরাজউদ্দৌলার রাজ দরবারে উমিচাঁদ, রাজবল্লভরা কি হিন্দু না? হিন্দু এলিট আছে, মুসলমান এলিটও আছে। গরিব হিন্দু আছে, মুসলমানও আছে। ধরেন, যারা নেটিভ লোকাল মোসলমান তারা বেশিরভাগ গরিব ছিল—এটা ডিনাই করলেই কি না করলেই কী?। যারা এলিট তারা যেহেতু নবাব এবং দিল্লির সম্রাটের সাথে কানেক্টেড ছিল, ফলে তাদের দিক থেকে এক ধরনের লিয়াজু থাকতে পারে। 

আরেকটা হচ্ছে ১৮৩৫ সালে ফার্সি থেকে ইংরেজি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের মধ্যে অনেক বেশি ফার্সি জানা লোক ছিল। সেইটার কারন বিভিন্ন অর্থে হতে পারে—যে কারণে রামমোহন ‘মিরাত-উল-আখবার’ নামক ফারসি পত্রিকা বের করেছে এবং মধুসূদনও ফারসি শিখছে। খুব সম্ভবত ১৮৫৭ সালের পরে সকলে হোপ ছেড়ে দিয়েছে যে, মুঘল তো আর নাই। ১৮৫৮ সালে যে অ্যাবোলিশন অফ স্টেট হইছে তারপরে তার ব্রিটিশ ক্রাউন কে পুরোপুরি মানা ছাড়া অপশন নাই। তার আগ পর্যন্ত তার সামনে ব্রিটিশ ক্রাউন নাই। তার সঙ্গে আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু সে প্রজা তো ছিল মুঘল এম্পায়ারের— ব্যাপারটা ছিল এইরকম।

ফলে আমি মুসলমানদের ডিনায়েলের জায়গাটা অইরকম দেখি না। কিন্তু একই সাথে হচ্ছে যে, মুসলমানদের ডিনাইয়েলের কথা যদি বলা হয় সে ক্ষেত্রে হয়তো ফকির বিদ্রোহের কথা বলা যায়। তো সেটা তো আবার সন্ন্যাসীর বিদ্রোহও বটে। মানে গরিব যারা এবং ছোটলোক যারা তাদের তো অলওয়েজ বিদ্রোহ করতে হয়েছে। ইংরেজ-মোগল তেমন কিছু যায় আসে না। তাদের তো সবসময় নিষ্পেষণ।

Share: