শিক্ষক ও গবেষক

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য পাঠের পদ্ধতিগত প্রশ্ন: কসমোপলিটানিজম, রস ও ভাব

কসমোপলিটান বেঙ্গল: পুনর্পাঠ ও পুনর্মূল্যায়ন

শিক্ষক ও গবেষক

Share:

সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল কর্তৃক আয়োজিত ‘কসমোপলিটান বেঙ্গল: পুনর্পাঠ ও পুনর্মূল্যায়ন’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামের প্রথম সেশনে আমাদের বিষয়  হল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে কসমোপলিটান ধারা।

এক্ষেত্রে আমরা বিশেষভাবে দুইটি বিষয়ে কথা বলব:

এক, দ্যা আইডিয়া অব কসমোপলিটান বা কসমোপলিটানের ধারণা।

দুই, মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার মুসলিম সাহিত্যকে আমরা কিভাবে পড়ব বা এপ্রোচ করব?

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের রেফারেন্সে-ই বলছি, এসব সাহিত্যে তিনটি বিষয় মুখ্য—প্রেম, রস এবং ভাব। এখানে আমরা শুধু রস এবং ভাব নিয়ে আলাপ করব— রসকে আমরা কিভাবে আস্বাদন করব? ভাবকে কীভাবে বিশ্লেষণ করব?

তো প্রথমেই রস এবং ভাবের কনটেক্সট বা পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলাপ শুরু করছি। রস এবং ভাবের কনটেক্সট বলতে আমরা The Idea of Cosmopolitan-কে বোঝাচ্ছি। তারপর রস এবং ভাবকে কীভাবে এপ্রোচ করা যায় তার পদ্ধতিগত দিক নিয়ে আলাপ করব।

The Idea of cosmopolitan বলতে আমরা বহুজাতিকতা বা আন্তর্জাতিকতাবাদ ধরনের কিছু বুঝাচ্ছি না। প্রাক-আধুনিক দুনিয়ায় ইউরোপে যেসব দার্শনিক রচনাবলী লেখা হয়েছে এবং সুলতানি বাংলায় যেসব সাহিত্য তৈরি হয়েছে—তার মধ্য দিয়েই এ দুই ভূগোলে কিভাবে কসমোপলিটান আইডিয়া ভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে, সেটাকে সামনে রেখেই আমাাদের আলাপ। ইউরোপীয় বলতে বিশেষভাবে কান্টের লেখাজোঁখায় কসমোপলিটানের আইডিয়া যেভাবে হাজির হয়েছে তাকে বুঝানো হয়েছে।

হাল আমলের গবেষকরা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের বিকাশের তিনটি কেন্দ্র চিহ্নিত করছেন। প্রথমটা হল ভুলুয়া বা বৃহত্তর ফেনী-নোয়াখালী অঞ্চল; দ্বিতীয়টা হল দেয়াং বা পটিয়া-আনোয়ারা; এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম এবং তৃতীয়টা হল আরাকান, যেটাকে হাল আমলের গবেষকরা বলছেন ‘ম্রোকো’, এই তৃতীয় কেন্দ্রটি পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারের রামুতে এসে স্থিত হয়েছে।

এই তিনটি কেন্দ্রের প্রসঙ্গে গবেষকরা বলেছেন যে, এগুলো খুব ঘনিষ্ঠভাবে বঙ্গোপসাগরীয় আদান প্রদানের সাথে সম্পর্কিত বা যুক্ত ছিল। আমরা যখন বঙ্গোপসাগরীয় আদান প্রদানের বিষয়টা সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভাববো তখন সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ‘আইডিয়া অব হসপিটালিটি’ এর ধারণা চলে আসবে।

হসপিটালিটি বুঝাতে আমরা দার্শনিক জনার্দন গানেরির রেফারেন্সে যাবো। উনি বলেছেন, এখানকার হসপিটালিটি তিনটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত ছিল। প্রথমত, মাইগ্রেশন অব পিপল অর্থাৎ, হসপিটালিটি টুওয়ার্ডস মাইগ্রেটেড পিপল; দ্বিতীয়ত, মাইগ্রেশান অব টেক্সট অর্থাৎ হসপিটালিটি টুওয়ার্ডস মাইগ্রেটেড টেক্সট এবং তৃতীয়ত, মাইগ্রেশান অব আইডিয়াস অর্থাৎ, হসপিটালিটি টুওয়ার্ডস মাইগ্রেটেড আইডিয়াস। ফলে ঐ সময়কার বাংলায় তিন ধরনের হসপিটালিটির পরিসর পাওয়া যাচ্ছে— পিপল, টেক্সট এবং আইডিয়া।

এক্ষেত্রে মাইগ্রেশন অফ দ্যা পিপল বা হসপিটালিটি টুওয়ার্ডস মাইগ্রেটেড পিপল বিষয়টি বঙ্গোপসাগরীয় বা বৃহৎ অর্থে ভারত মহাসাগরীয় আদানপ্রদানের সাথে যুক্ত ছিল।এদিক থেকে আমরা গুজরাটের মুজাফফর শাহী সালতানাত, ডেকানের বাহমানি ও বিজয়নগর সালতানাত, বাংলায় ইলিয়াস হোসেন শাহী সালতানাত এবং আরাকানের ম্রোকো সালতানাতের অধীন ভূ-খণ্ডগুলোর কথা বলব।

আবার, যখন আমরা মাইগ্রেটেড আইডিয়াস বা হসপিটালিটি টুয়ার্ডস মাইগ্রেটেড আইডিয়াস বিষয়টি দেখব, তখন বিশেষভাবে সৈয়দ সুলতানের উদাহরণে যাব। আয়েশা ইরানি তার তার সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সৈয়দ সুলতান ‘নবী বংশ’- এ নবীদের ইতিবৃত্ত বা বংশকে মহাভারতের মহাকাব্যিক কাঠামোয় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। এছাড়াও তিনি কৃষ্ণদাস কবিরাজ ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ গ্রন্থে  কৃষ্ণের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটিকে ইসলামের নবীদের আখ্যানগুচ্ছের নিরিখে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। ফলত, মাইগ্রেটেড আইডিয়াসের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কিছু মানুষজন ছিলেন যারা আইডিয়াকে নিজেদের মতো এডাপ্ট করেছেন।

মাইগ্রেটিং টেক্সটের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, মালিক মোহাম্মদ জায়সীর ‘পদুমাবৎ’-কে আলাওল বাংলায় এডাপ্ট করেছেন।

তাহলে এখানে যে বিভিন্ন রকম হসপিটালিটি গড়ে উঠেছিল, দার্শনিকভাবে সেগুলোর নীতিগত জায়গাগুলো কী ছিল?

সেজন্য আমরা একে ঐ সময়ের ইউরোপীয় তথা কান্টের কসমোপলিটানিজম ধারণার দিক থেকে বুঝার চেষ্টা করব। কান্টের কসমোপলিটানিজমের অন্যতম প্রধান পাটাতন হল হসপিটালিটি।

কান্টের হসপিটালিটি আইডিয়াকে একবাক্যে এভাবে বলা যায় যে, “…the right of a stranger to make use of that shared possession of the human race, the surface of the earth, to visit other places, the right not to be treated with hostility because he or she arrived on the land of another as long as no violence is committed upon the host.”।

এ প্রসঙ্গে কান্টের এই সময়কার মশহুর ব্যাখ্যাকার অনরা ও’নেইল মন্ত্যব্য করছেন, কান্ট কথা শুরু করেছেন ‘দ্যা-রাইট’ শব্দ দিয়ে। তিনি বলছেন , কান্টের অধিকার ধারণাটি—নিজের উপর না; বরং অন্যের উপর প্রয়োগ করা যায়—এমন সব কাজকর্মের উপর বেশি জোর দেয়। ফলত এ ভাবধারা থেকে অন্যের কর্তাসত্তাকে (agency) ক্ষতির মুখে না ফেলে কাজকর্ম করে যাওয়ার খুব সীমাবদ্ধ পরিসরের ধারণাই পাওয়া যায়। ফলত কান্ট যেটাকে কসমোপলিটানিজম বলেছেন সেটা আসলে নিজের উপর না বরং অন্যের উপর প্রয়োগের বিষয় এবং তাঁর অধিকারের ধারণা যার উপর প্রয়োগ করা হয় সেটা শেষপর্যন্ত প্রয়োগ হওয়া ব্যক্তির  কর্তাসত্তাকে ব্যাহত করে।

ও’নেইল এই কথা বলে এখানে একটা নোট দিচ্ছেন যে, পুরা দুনিয়াতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের কলোনিয়ালিজমকে বৈধতা দিয়েছে এই কসমোপলিটানিজমের আইডিয়া দিয়ে। পাশাপাশি, কান্টের এ আইডিয়ার মধ্যে—আমাদের রিয়েলিটির যে সাংস্কৃতিক বিভিন্নতা, মানুষে-মানুষে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ভিন্ন ভিন্ন ধরণের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ইত্যাদির কোনটার-ই প্রতিফলন নাই।

কিন্তু আমরা যদি উদাহারণ হিসেবে সৈয়দ সুলতানের কসমোপলিটানিজমের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই , তিনি কৃষ্ণের কাহিনীকে ব্যাখ্যা করেছেন মুসলিম বর্ণনা অনুযায়ী এবং সেটাকে আবার উপস্থাপন করেছেন মহাভারতের মহাকাব্যিক কাঠামোয়। এক্ষেত্রে তিনি হসপিটালিটিকে কিভাবে এস্তেমাল করেছেন? দেখা যাচ্ছে যে, তিনি যেসব বিষয়কে নিজের জন্য এস্তেমাল করেছেন, সেগুলো আসলে শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার-ই প্রচেষ্টা ছিল এবং এর সাথে মহাভারত বা শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের সম্পর্ক পরস্পরকে ভেদ করে যাওয়ার দিক থেকে খুবই বহিস্থ, অন্তস্থ না। ফলত, চৈতন্য চরিতামৃত বা মহাভারতের নিজস্ব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এই কাজের দ্বারা ব্যাহত হয় না; মানে এখানে যে কসমোপলিটানিজমের ধারণা পাওয়া যায়, সেটা অপরের এজেন্সীকে ব্যাহত না করে কিভাবে এডপ্ট করা যায় তার উদাহরণ।

কিন্তু সমান্তরালভাবে ঐ সময় ইউরোপে কসমোপলিটানিজমের যে আইডিয়া বিকশিত হয়েছিল, সেটার উদ্দ্যেশ্য ছিল নিজের স্বার্থে পরের এজেন্সিকে কিভাবে ব্যাহত করা যায় তার জন্য একটা বয়ান নির্মাণ করা—যেটা কান্টের মধ্যে আমরা স্পষ্টত দেখতে পাই। কান্টের এই সময়কার সবচেয়ে মশহুর শরাহকার অনোরা ও’নেইল  বলেছেন এই কথা এবং তাঁর Constructing Authorities: Reason, Politics and Interpretation in Kant’s Philosophy বইয়ের ‘Cosmopolitanism : then and now’ অধ্যায়ে। সৈয়দ সুলতানের চিন্তাভাবনায় যে হসপিটালিটি, তা ইউরোপে ঐ সময়ে বিকশিত চিন্তাভাবনাগুলোর সাথে একটা পরিষ্কার পার্থক্য হাজির করে।

আবার, মাইগ্রেটিং পিপলের ক্ষেত্রে যেমনটা আমরা দেখতে পাই—বিশেষভাবে আলাওল তার পদ্মাবতীর ভণিতায় বলেছেন যে, ম্রোকোর রাজধানী শহরে ১৬ ধরনের ভাষাভাষী মানুষজন ছিল।

এতো ধরনের ভাষাভাষী মানুষজনেট একসাথে থাকা কীভাবে সম্ভবপর হয়েছিল?

আসলে সেখানে মানুষদেরকে যে হসপিটালিটি প্রদান করা হয়েছিল, সেটা ছিল এক ধরনের সহজাত ও সহানুভূতি নির্ভর মেলবন্ধনের জায়গা থেকে, যা কোন ধরনের ‘Universal Right’ এর ধারনা থেকে আসে নাই।

এর মূর্তরূপ আমরা কোন জায়গায় সনাক্ত করব?

ইতিহাসবিদরা বলছেন, ঐ সময়কার পাড়া, গ্রাম ও মহল্লা কেন্দ্রিক স্ব-স্ব কমিউনিটি ব্যবস্থাপনার মধ্যে এ বিষয়টা স্পষ্টত ফুটে ওঠে। সে সময় কমিউনিটি গুলো আলাদা-আলাদা থাকলেও পারস্পরিকভাবে সন্নিহিত ছিল। সুতরাং এই হসপিটালটি বিমূর্ত কোন অধিকারের ধারণা থেকে আসে নাই বরং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে ঘটেছে এবং এই সম্পর্ক বিশেষ কিছু গুণাবলীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, পারস্পরিক সহিষ্ণুতা, মানবিকতা, করুণা এবং বৃহদার্থে মানুষের আধ্যাত্মিক আবহ। ফলত, এই হসপিটালিটি কোন বিমূর্ত দার্শনিক পরিভাষার মধ্যে ধরা পড়ে নাই; বরং ধরা পড়েছে পদাবলী, সঙ্গীত, মহাকাব্য এবং সুফিদের আখ্যানের মধ্যে। পরিপ্রেক্ষিতের দিক থেকে বললে, আমাদের যে কসমোপলিটানইজম সেটা স্পষ্টতই ইউরোপের আধুনিকতার সূচনালগ্নে যে কসমোপলিটানিজম বিকশিত হয়েছে তার অনুরূপ নয়।

এখন আমরা ভাব এবং রসের কথায় আসব। থিবো দুবের তার In the Shade of the Golden Palace বইয়ের ভূমিকাতে লিখছেন, মধ্যযুগের সাহিত্য গুলাকে স্রেফ অনুবাদ সাহিত্য কিংবা সমন্বয়বাদী  অথবা সেকুলার  সাহিত্য হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এছাড়া আয়েশা ইরানি সৈয়দ সুলতান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এগুলাকে ‘ফ্রন্টিয়ার লিটারেচার’ হিসাবে শ্রেণীকৃত করেছেন; কিন্তু ঊনার এ ধরণের শ্রেণীকরণ নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে।

তাহলে, আমরা আসলে রসকে কীভাবে আস্বাদন করব? রসকে আমরা আসলে বুঝতে পারি না। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ব্যাপারে বিশেষভাবে আমাদের বাংলা সাহিত্যের ছাত্ররা কোন আগ্রহ পায় না। তাদের কাছে এটা বিরক্তিকর লাগে যেন  এর মধ্যে কোন মজার ব্যাপার নাই। আমাদের পুরোধাা গবেষকরা এটাকে এভাবে-ই উপস্থাপন করছেন। তাঁরা যে ইচ্ছাকৃতভাবে করেছেন ব্যাপারটা এমন না; কিন্তু তাঁদের মধ্যে এপ্রোচটা এমন ছিল!

কিন্তু রস আহরণ করার একটা দারুণ উদাহরন In the Shade of the Golden Palace বইয়ে থিবো দুবের দেখিয়েছেন। তিনি আলাওলের কাব্যরস উদঘাটনের ভিতর দিয়ে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের কাব্যরসকে আবিষ্কার করেছেন। আমরা সে দিকটাতে যাচ্ছি না, ভাবের দিকটাতে যাব।

ভাবের দিকটি আবিষ্কার করার জন্য দুই ধরনের পূর্বশর্ত পূরন করতে হয়।

প্রথমত, টেক্সটের ভাবগুলা বিশ্লেষণের জন্য এর যে অন্ত:স্থ লজিক্যাল শর্তগুলো পূরণ করা লাগে তার সাথে সাথে যায় এমন কৌশল আমাদেরকে রপ্ত বা এস্তেমাল করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন সব কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে যেগুলো এসব ভাবের লজিক্যাল শর্ত পূরণের দিক থেকে বহি:স্থ। ফলত, এসব কৌশল এস্তেমাল করে কৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ব্যর্থ হিসেবেই পর্যবসিত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এই টেক্সটগুলো বিশ্লেষণ করার জন্য এমন একটা পরিসর এস্তেমাল করতে হবে যা তার লিংগুইস্টিক বা ভাষাবিদ্যাগত শর্তসমূহ অন্তর্ভুক্ত করে।

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে বলে রাখা দরকার! আমরা এখানে বিশেষভাবে লজিক্যাল এবং লিঙ্গুইস্টিক শর্তসমূহ প্রসঙ্গে পুরো মধ্যযুগের সাহিত্যকে ফোকাস করছি না বরং ডক্টর আহমদ শরীফ যেটাকে ‘বাংলার সুফি সাহিত্য’ বলেছেন সেটাকে বুঝা এবং তার পদ্ধতি প্রসঙ্গে বলছি।

যাই হোক, আমরা বলছি কবিতার কথা। এখানে লজিক্যাল শর্তসমূহ কোথা হতে আসবে?

সাধারণত আমরা ভাবি যে, কবিতায় লজিকের ব্যাপার নাই। কিন্তু এখানে লজিক বলতে আমি মোটাদাগে কবিতার অন্তর্নিহিত বিন্যাসের কথা বুঝাচ্ছি। সেটাকে আমাদের ধরতে হবে। এক্ষেত্রে, যেসব মডার্ন স্কলার এই টেক্সটগুলো পড়েছেন তাদের সমস্যার জায়গাগুলো দেখানোর জন্য উদাহরণ হিসাবে আমি আর্থার এফ. বোলারের কিছু কথা বলব। তিনি বলেছেন যে, আধুনিক গবেষকরা সুফি সাহিত্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাষাবিদ্যা, ঐতিহাসিক সামাজিক-অর্থনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ এবং সুফিদের উপর অন্যান্য ঐতিহ্যের প্রভাবের মতো বিষয়গুলো হাজির করে থাকেন—আসলে এর বাইরে তাদের অন্য কিছুই করার থাকে না। তিনি আরো বলছেন, এসব সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে সবকিছুই আছে কিন্তু সুফিরা যা, আসলে সেগুলোর কিছুই নাই। আমরা যেভাবে ভাবি বা যে ভাষায় কোন কিছু প্রকাশ করি সেগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক পূর্বানুমানের উপর ভিত্তির উপর তৈরি হওয়া। একজন গবেষকের বৈজ্ঞানিক পূর্বানুমানের যে পাদপীঠ থাকে তা একটি বিশেষ ধরনের ওয়ার্ল্ডভিউ বা বিশ্বদর্শনকে নির্দেশ করে। সুফিরা যে ধরনের জগতকে এক্সপেরিয়েন্স বা অভিজ্ঞতায় হাসেল করেন, সেটাকে তারা আকারহীন বা অবস্তুগত জগৎ বলে থাকেন। কিন্তু একজন আধুনিক গবেষকের পক্ষে ঐ জগৎকে রিকগনাইজ বা স্বীকার করা আসলেই সম্ভব না। কারণ আমাদের acculturation এবং কালচারাল ম্যাট্রিক্স দাঁড়িয়ে আছে কিছু তথাকথিত বৈজ্ঞানিক এবং বস্তুগত অনুমানের উপর।

সুফিরা যে জগতটাকে যাপন করেন সেই জগতের কেন্দ্রবিন্দু কোন ধরনের বস্তুগত এবং বৈজ্ঞানিক অনুমান না; বরং তার কেন্দ্র হল নিরঞ্জন। এমন নিরঞ্জন যিনি হলেন নৈরূপ আকার এবং এই আবহের মধ্যে-ই সুফিরা শ্বাস-প্রশ্বাস নেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং সেগুলোকে কাব্য বা তত্ত্বে হাজির করেন। অর্থাৎ তাঁদের যে বয়ান সেটা বিশেষ ধরনের বিশ্বদর্শনেই বোধগম্য এবং এর অন্ত:স্থ শৃঙ্খলাজাত। এদিক থেকে আমরা একে লজিকাল শর্ত বলছি।

সাম্প্রতিককালে এন্থ্রপলজিতে Anthropology of Extraordinary Experience নামে একটা বিষয় বিশেষভাবে হাজির হয়েছে। এ বিষয়েরই একজন গবেষক সি. রড্রিক উইলসন বলেছেন, আধুনিক শিক্ষা এবং সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা খুবই ধার্মিক মানুষজনও এসব নিয়ে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সেকুলার পূর্বানুমান বা বোঝাপড়া অতিক্রম করে যেতে পারেন না। অর্থাৎ এগুলো বোঝার ক্ষেত্রে যিনি ধর্মীয় মানুষ তিনিও আমাদের যে acculturation এবং অনুমান সেগুলোকে অতিক্রম করে যেতে পারেন না। ফলে আসলে আমরা এইসব টেক্সটের অন্তর্নিহিত শৃঙ্খলাকে স্পর্শ করতে পারি না এবং এগুলোকে একটা বহির্ভূত পদ্ধতিতে বুঝাই হয়ে উঠে। কিন্তু আমরা একাডেমিক্যালি ও পদ্ধতিগতভাবে এগুলোকে বুঝতে চাই, তাহলে আমাদের এমন কৌশল এস্তেমাল করতে হবে যেগুলো এসব ভাব, আখ্যান বা কাব্যের অন্ত:স্থ লজিক্যাল শর্তগুলো পূরণ করে।

আবার, যেহেতু সুফিরা যে জগতকে অভিজ্ঞতায় হাসেল করার কথা বলেন, সে জগতের মধ্যে-ই তাঁরা বেড়ে ওঠেন, শ্বাস-প্রশ্বাস নেন এবং তাদের শিক্ষার কাজকারবারও চালিয়ে যান। এটাকে আধুনিক বাচনে বলা যায়,it is particular form of life। আরও বিস্তৃত অর্থে যদি বলি, it is a particular way of being-in-the-world। ফলত,এটার পরিসর মোটেও ভাষাগতভাবে বা চিহ্নবিদ্যার দিক থেকে, সিনট্যাক্স বা সিমানটিক্সের পরিসর না। বাংলাদেশে হাল-আমলে যারা মধ্যযুগের উল্লেখিত টেক্সটগুলোকে ব্যাখ্যা করছেন তারা মূলত সিমানটিক্সের পরিসরেই দাঁড়ান। কিন্তু আমরা যখন এগুলোকে  being-in- -the-world বা  form of life এর দিক থেকে দেখি তাহলে দেখা যাবে, এগুলোতে একই সাথে শ্রোতা ও বক্তার উপস্থিতি আছে। ফলত, এই টেক্সটগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরিসর হবে প্রাগম্যাটিক্স; নিছকই  সিমানটিক্স বা সিনটেক্স না ।

 

তথ্য সূত্র :

. আইডিয়া অব কসমোপলিটান

১. অনরা নেইল

-Constructing Authorities : Reason, Politics and Interpretation in Kant’s Philosophy, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা ২০১৫-এ ছাপছে।

২. আয়েশা . ইরানি

-The Muhammad Avatara : Salvation History, Translation and the Making of Bengali Islam, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা ২০২১-এ ছাপছে।

৩. ইমানুয়েল কান্ট

-‘Idea for a Universal History with a Cosmopolitan Aim’ in Anthropology, History and Education, এল্যান ডাব্লু. উড আংরেজিতে তর্জমা করছেন এবং ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা ২০০৭-এ ছাপছে।

-‘Toward Perpetual Peace’ in Practical Philosophy, মেরি জে. গ্রেগর আংরেজিতে তর্জমা করেছেন এবং ১৯৯৬-এ ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা এটি ছাপছে।

৪. জনার্দন গানেরি

-‘Migrating Texts and Traditions : Dara Shukoh and the transmission of the Upanishads to Islam’ in Migrating Texts and Traditions, সম্পাদনা করেছেন উইলিয়াম সুইট এবং উট্টাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা এটি ২০০৯-এ ছাপছে।

৫. থিবো দ্যুবের

-In the Shade of the Golden : Alaol and Middle Bengali Poetics in Arakan, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা ২০১৮-এ ছাপছে।

৬.মুঈনুদ্দীন আহমদ খান

-Social History of the Muslims of Bangladesh under the British Rule : Diplomacy, Politics and Modernism, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ ১৯৯২-এ এটি ছাপছে।

. মধ্যযুগের বাঙলার সুফী সাহিত্য বিশ্লেষণের লজিক্যাল ভাষাবিদ্যাগত শর্তসমূহ পূরণ প্রসঙ্গে

১.আহমদ শরীফ

-বাঙলার সুফী সাহিত্য, সময় প্রকাশন ২০১১-এ ছাপছে।

২. আবদুর রহমান ত্বহা

-Dialogues for the Future, আবদুল্লাহ এল বৌবেক্রি মূল আরবি থেকে আংরেজিতে তর্জমা করছেন এবং ই জে ব্রিল ২০২৩-এ ছাপছে।

৩.আর্থার এফ. বোলার

-Revealed Grace : The Juristic Sufism of Ahmad Sirhindi (1564-1624), ফনস ভাইটা ২০১১-এ এটি ছাপছে।

৪. সি৷ রড্রিক উইলসন

-‘Seeing They See Not’ in Being Changed : The Anthropology of Extraordinary Experience, ডেভিড ই. ইয়ং ও জ্যা-গাই গুলেট যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন এবং ব্রডভিউ প্রেস ১৯৯৮-এ ছাপছে।

Share: