আমরা যারা সাধারণত মাদ্রাসার পরিমন্ডলে বড় হয়েছি তারা শাহ ওয়ালিউল্লাহকে সাধারণত শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলি না, আমরা বলি শাহ সাহেব। শাহ সাহেব দুইজন আছেন। একজন হচ্ছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি আরেকজন আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহমাতুল্লাহ আলাইহি। প্রথমজনকে বলি বড় শাহ সাহেব আর দ্বিতীয়জনকে ছোট শাহ সাহেব। এটা একটা আদরের পরিভাষা; মাদ্রাসা পরিমন্ডলে আমরা বানিয়ে নিয়েছি।
গ্রিক ফিলোসফি যখন মুসলিমদের কাছে আসলো তখন মুসলিমদের ভিতরে কোন প্রকারের সেকুলারিজম কিংবা নাস্তিকতার দর্শন মুসলিম সমাজে দীর্ঘ আটশত-নয়শত বছরে কখনো আবির্ভাব ঘটেনি। কিন্তু এই গ্রিক ফিলোসফি যখন ইউরোপের কাছে গেল, যাওয়া মাত্রই সেখানে নাস্তিকতার আবির্ভাব ঘটল। সেখানে স্রষ্টা বিরোধিতার সয়লাব ঘটল। চার্চের যে দিকটা ছিল সেই দিকটা যদি আমি ভুলেও যাই তারপরেও ইউরোপের ফিলোসফিগত কিছু সমস্যা ছিল। এই সমস্যাগুলোর কারনে মুসলিম সমাজে যা ঘটেনি তা ইউরোপে ঘটেছে। মুসলিম সমাজে যে নাস্তিকতার আবির্ভাব ঘটেনি এবং স্রষ্টাহীনতার সয়লাভ ঘটেনি; এর পিছনে যে সমস্ত মহান মনীষীদের অবদান রয়েছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি রহমাতুল্লাহ তাদের অন্যতম।
কোরআন এবং হাদিস আসলে ফ্লেক্সিবল কোন জিনিস না। যারা নতুন নতুন ইসলাম শিখেন, নতুন নতুন কোরআন নিয়ে গবেষণা করেন তারা নিজেদের মত করে কোরআনের টেক্সটকে বুঝার চেষ্টা করেন। হাদিসের টেক্সটকে বোঝার চেষ্টা করেন। অবশ্যই এটা তারা বুঝতে পারেন। প্রত্যেকটা শাস্ত্রে যেহেতু নিজস্ব একটি ভাষা আছে; ফলে কোরআনকে ব্যাখ্যা করতে গেলেও সেই শাস্ত্রের নীতি দিয়েই ব্যাখ্যা করতে হবে। বাইবেল একটি ফ্লেক্সিবল গ্রন্থ সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। কিভাবে প্রমাণ হলো? সমাজের ভিতরে যে সমস্ত মোরাল ভ্যালুস এবং নর্মসগুলো ছিল সেগুলো খুব দ্রুতই ভেঙ্গে পড়তে শুরু করল। বাইবেল এবং বাইবেলে যারা স্কলার ছিল তারা সমাজের ভেঙ্গে পড়াকে রক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু গ্রীক ফিলোসফি যখন মুসলিমদের কাছে আসলো তখন তারা সম্পূর্ণ গ্রীক ফিলোসফিকে কোরআন এবং হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন সভ্যতার আলাপ করছেন তখন সেখানে তিনি ‘ইরতেফাকাত’এর আগে ‘ইরতিকাবাত’এর আলোচনা করেছেন। ইরতিকাবাত, ইরতিকাবুন, কুরবুন। মূল মাদ্দাহ হলো ق-ر-ب। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্যের আলোচনাটা তিনি আগে করছেন তারপরে তিনি আলোচনা করছেন ইরতেফাকাতের আলোচনা।
মুসলিম ফিলোসফারদের নিয়ে এই সমস্ত আলোচনাগুলো জরুরি। এর মাধ্যমে আমরা চিহ্নিত করতে পারব কোন ঘটনাটা ঘটার কারণে মুসলিম সমাজ এখনো আদিম অবস্থা তথাকথিত আদিম অবস্থায় বিরাজমান অন্যদিকে ইউরোপীয় সমাজ কেন তথাকথিত ‘উন্নত’ ও ‘উন্নয়নশীল’ এবং সেকুলার রাষ্ট্র ও সেকুলার সমাজে পরিণত হলো।
কেউ মনে করেন, ইউরোপের এনলাইনটেনমেন্টের সমান্তরালে মক্কায়ও একটা এনলাইটেনমেন্ট ঘটেছে। আমি যতটুকু জানি এবং আমার যতটুকু ধারণা আছে, মক্কায় কোন প্রকার এনলাইটেনমেন্ট ঘটেনি। মক্কায় ঐ সময়ে যখন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি ছিলেন তখন কোন এললাইটেনমেন্ট সেখানে ঘটেনি। কেন ঘটেনি? আমি বলছি যে, আপনি যদি ঐ সময়ের টেক্সটগুলো পড়েন তাহলে দেখবেন যে, শাহ ওয়ালিউল্লাহর ফিলোসফিক্যাল জ্ঞান এবং মানতিকী জ্ঞান সব হিন্দুস্তানের জ্ঞান অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশে যে সমস্ত জ্ঞানগুলোর চর্চা হতো সেগুলোর আলোকেই তিনি ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’কে ডিফাইন করছেন নতুনভাবে। মুজাদ্দিদে আলফেসানী ‘আকলে খালেস’ এর ধারণা দিচ্ছেন কোথা থেকে? আকলে খালেসের ১০০ বছর পরে পিউর রিজনের ধারণা দিলেন পশ্চিমের ফিলোসফার ইমানুয়েল কান্ট। আকলে খালেস আর পিউর রিজন একই জিনিস। তো মুজাদ্দিদে আলফেসানি আকলে খালেসের যে সমস্ত ক্রিটিক করছেন সেগুলো বলার জন্য অনেক বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন। সে সময় আমাদের কাছে নেই। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির চিন্তায় আমরা ওয়াহেদাতুল উজুদ এবং যেসব দার্শনিক দিকগুলো দেখি সেগুলো সব হিন্দুস্তানের। তিনি মক্কায় থাকাকালীন উলুমে হাদিস এবং উলুমে ফেকাহর কিছু ধারনা পেয়েছেন। এখানে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে যে, মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব ১৭০০ সালের দিকে জন্ম গ্রহণ করেছেন। আর শাহ ওয়ালিউল্লাহরও জন্ম ১৭০০ সালের দিকে। পরস্পরের সাথে তাদের দেখা হয়েছে, এরকম কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। কিন্তু তারা একই ওস্তাদের ছাত্র। তো শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি যে ওস্তাদের কাছে পড়ছেন মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাবও একই ওস্তাদের কাছে পড়েছেন। কিন্তু চিন্তাগত প্যাটার্নের জায়গায় তাদের মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য। এর কারণ কিন্তু এটাই যে, মক্কায় কোন প্রকারের এনলাইটেনমেন্ট ঘটেনি। সেই সাথে আমি এটাও বলছি না যে, হিন্দুস্তানে এনলাইটেমেন্ট ঘটেছে। ইউরোপের কাছে যেটা এনলাইটেনমেন্ট সেটা আমাদের কাছে এনলাইটেনমেন্ট না। যাই হোক সেটা অনেক বিস্তারিত আলোচনা।
আরেকটি পয়েন্ট আমি উল্লেখ করতে চাই। শাহ ওয়ালিউল্লাহর ব্যবহৃত একটা শব্দ হচ্ছে ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’। তো ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’ মানে কী? ইচ্ছাকৃতভাবে কোন প্রকার পূর্ণতা দেওয়া। ‘আর-রায় উল কুল্লি’, ‘আল-জরাফাহ’ এবং ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’— এই তিনটা প্রকারই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। আর-রায় উল কুল্লি বলতে অনেকে public good তরজমা করেন। কিন্তু এই তরজমাটা আমার কাছে সহি মনে হয় না। আর ‘আর-রায় উল কুল্লি’ মানে হচ্ছে সামগ্রিক চিন্তা। public will এর একটা পশ্চিমা এসেন্স তৈরি হয়েছে আমাদের মনে। যেটা আসলে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধারণাকে ধারণ করতে পারে না। তারপরে ‘আল-জরাফাহ’ নিয়ে হলো নান্দনিকতাবোধ। ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’ নিয়ে একটু ব্যাখ্যার বিষয় আছে। ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’ মানে হচ্ছে মানুষ তার নিজের স্বেচ্ছায় যে পূর্ণতা হাসিল করে এবং স্বেচ্ছায় সে যে পশু থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে।
একটি মৌমাছি সারাজীবন একই চক্রে ঘুরপাক খায় যত বড় মৌমাছি-ই হোক না কেন। বাবুই পাখি ১০০ বছর কিংবা ১০০০ বছর পরে ভিন্ন রকমের বাসা বানাবে এটা খুবই সুদুর পরাহত ভাবনা। কিন্তু, মানুষ প্রতিনিয়ত তার চিন্তার মাধ্যমে, তার ইচ্ছার মাধ্যমে সে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কার্ল মার্ক্স তার ‘দাস ক্যাপিটাল’ বইয়ের প্রথম খন্ড এবং ‘ইকোনমিক এন্ড ফিলোসফিক্যাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, শ্রম কিভাবে শ্রমিক থেকে আলাদা হয়ে যায়। শ্রমিকের যখন ইচ্ছার কোন দাম থাকে না, ইচ্ছার কোন দখল থাকে না তার কাজের মধ্যে, তখনই শ্রম শ্রমিক থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং পুঁজিবাদের শ্রম হয়ে যায়।
তো এভাবেই শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেখিয়েছেন যে, ইরতিফাকাতের মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো হয় মানুষ সেটা তার ইচ্ছার গুণেই করে। যদি এই ইচ্ছার এলিয়েনেশন হয়ে যায় তখন মানুষ রোবটে পরিণত হবে। আর যদি ইচ্ছা মানুষের ভিতরে থাকে এবং সেটা যদি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে করে তাহলে মানুষ রোবটে পরিণত হবে না। সমাজও সভ্যতা সভ্যতা দিন দিন আরো উন্নতি হবে।