কুতুবউদ্দিন আহমেদ ইবনে আবদুর রহিম শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহমাতুল্লাহকে জানতাম আমি জানতাম একজন ফকিহ, ইসলামী দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং একজন সুফি সাধক হিসাবে। কিন্তু তার সম্পর্কে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম উনি একজন ওয়েলফেয়ার ইকোনমিস্ট। একজন সাইকো এনালিস্ট। রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে জন্ম দেওয়ার জন্য একজন যুগপুরুষ। ইসলামী ইতিহাস এবং তার গতিপ্রবাহ নিয়ে বলতে গেলে আমরা খুব বেশি করে ইবনে খালদুনের কথা বলি। আধুনিক কালে ইবনে খালদুনকে জনপ্রিয় করেন আর্নেস্ট গেলনার। তিনি ইবনে খালদুনকে পৃথিবীর এ যাবতকালের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সমস্যা হচ্ছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহর অবদান ইবনে খালদুনের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাকে নিয়ে সেরকম কোন আলোচনা পশ্চিমা জগতে দেখি না। এমনকি আর্নেস্ট গেলনারের লেখালেখিতেও শাহ ওয়ালিউল্লাহ নাই; ইবনে খালদুন তো প্রভুত পরিমাণেই আছে। একজন সমাজবিজ্ঞানী যখন সমাজকে বিশ্লেষণ করেন তখন তিনি একাধারে ইতিহাসবিদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। এ প্রকল্পে বিষয়গুলিকে আলাদা করা যায় না। সেটা যদি করা হয় তাহলে ঠিকমত রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রকল্পকে হাজির করা যায় না। বিষয়গুলো আসলে একটা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত।
ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা যে ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে আছি সেটা একটা সময় ছিল উপনিবেশিক যুগ। উপনিবেশিক শাসনকে মোকাবেলা করবার জন্য এখানে নতুনভাবে ইসলামকে হাজির করতে হয়েছে। সে কারনে ইরতিফাকাত বোঝার জন্য আসলে দরকার হচ্ছে শাহ ওয়ালিউল্লাহকে মনস্তাত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা। ইসলামী ঘরানায় তাকে অনেকে আহলুল হাদিস, আহলুল রায় এবং মাতুরিদি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আশআরী ঘরানার দর্শনের প্রভাব উনার উপর আছে। মূলত, তিনি এই সব ঘরানা থেকে তার নিজের মত করে নিয়েছেন। তবে একটা জায়গা থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। উনি মূলত যুক্তিবুদ্ধি সম্পূর্ণ চিন্তক অর্থাৎ হিকমা বা রিজন এবং লজিকের প্রভাব উনার দর্শনগত জায়গায় খুব বেশি। যে কারনে উনাকে যত কিছুই বলা যাক না কেন দর্শনগতভাবে উনি একেবারেই anthropomorphic না। anthropomorphic হচ্ছে, আল্লাহকে মানুষের জায়গা থেকে বুঝে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা। যেমন, আপনি যখন দেবী দুর্গাকে একটা একটা নারী হিসেবে চিত্রিত করেন, তখন তার তলোয়ার এবং ত্রিশুলের মতো অস্ত্রশস্ত্র দেখে বোঝা যায় যে, তার জন্মগ্রহণ মধ্যযুগের ভারতে। কিংবা যীশু খ্রিস্টকে যখন আপনি দেখেন সেমেটিক পোশাক পরিহিত, তখন বোঝা যায় যে, আরব অঞ্চলের কোন এক জায়গাতে তার জন্ম অর্থাৎ তিনি স্থান-কালকে অতিক্রম করতে পারেন না। কিন্তু সূরা ইখলাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামন পরিষ্কার বলেছেন, ওয়ালাম ইয়াকুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ অর্থাৎ তাঁর সাথে তুলনীয় আর কেউ নেই।
যুক্তিপদ্ধতির অনিবার্য ফলাফলস্বরূপ নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদীরা যখন আল্লাহকে বোঝার চেষ্টা করেন তারা তার মধ্যে একটা ফলকে হাজির করেন। সমস্যাটা দাঁড়ায়, যখন আপনি বলেন যে, তিনি মানুষের বোধশক্তি ও চিন্তার সীমার বাইরে, তখন আসলে তাকে কোন সীমার মধ্যেই আনা যায় না। আপনি যখন বলে যে, আল্লাহকে আপনি কোনভাবেই ধারন করতে পারেন না, তখন আপনি যদি সেখানে আবার লজিক প্রয়োজন মনে করে প্রয়োগ করেন তখন লজিক নিজেই নিজেকেই রিফিউট করে। এই জিনিসটা বোঝা দরকার শাহ ওয়ালিউল্লাহকে বুঝবার জন্য।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর পুরা দর্শন বা তত্ত্বকে দুই ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি ইনসাফ এবং ইনসানিয়াত প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। এজন্য ইসলামকে তিনি যে মানবিক পরিগঠনের জায়গা থেকে চিন্তা করেছেন তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে একটা অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সেটা খুবই পদ্ধতিগত। ইসলামের ইতিহাসে অন্তত তার আগ পর্যন্ত এত পদ্ধতিগতভাবে ইসলামের অর্থনীতি নিয়ে সামগ্রিকভাবে কেউ চিন্তা করেন নাই। অর্থনৈতিক দর্শনকে আমরা কিভাবে চিন্তা করব? একটা ব্যাষ্টিক অর্থনীতি আরেকটা সামষ্টিক অর্থনীতি। মার্ক্সের সমাজদর্শনটা ছিল সামষ্টিক অর্থনীতি। কিন্তু, তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ব্যাষ্টিক অর্থনীতির জায়গাগুলিকে উনি কম আলোচনা করেছেন যেটা নিয়ে কিন্তু সাবঅল্টার্ন স্কুলের তর্ক আছে। কিন্তু শাহ ওয়ালিউল্লাহ অনেকটা ব্যাষ্টিক জায়গায়ও গিয়েছেন। সে কারনে তিনি এখানে এনালজিক্যাল ডিডাকশনের ব্যবহার করেছেন।
যখন পশ্চিমা বিশ্ব কার্ল মার্ক্সকে নাকচ করার চেষ্টা করেছে সাধারণত তারা ওয়াল্ট হুইটম্যান রোস্টোকে ব্যবহার করেছে। রোস্টো মনে করতেন যে, মানবজাতির বিকাশ হয় সরলরৈখিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ, সমাজের উন্নতি আসলে এমন এক সুষম গঠনমূলক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিটি দিক আরেকটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এগিয়ে চলে। কিন্তু আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ওইভাবে হয় না। তিনি মনে করতেন যে ট্রেডিশনাল সমাজ মাত্রই অনুন্নত। সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি হয় না। ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের পর থেকে মানুষের মধ্যে তাবৎ জ্ঞান এসে হাজির হয়েছে। এর আগে কোন জ্ঞানতাত্ত্বিক কোন কিছু জগতে ছিল না। এরপরে তিনি চিন্তা করেছেন precondition for take-off অর্থাৎ নতুন নতুন চিন্তার বহর দরজা খুলে গেল। সেখানে জগতের উন্নয়নকে যান্ত্রিকভাবে চিন্তা করা হল। নতুন নতুন সমাজবিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদ নানানভাবে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করল। তার পরের স্তর take-off এবং তারপরের স্তরে জগতের যে অতি উন্নয়ন সেটাকে উনি বলছেন Drive to Maturity। তারপরের স্তর আরো ভয়ানক যেটা পাশ্চাত্য ক্যাপিটালিজম প্রচার-প্রসার করে সেটা হচ্ছে Age of High Mass Consumption।
রোস্টোর সাথে শাহ ওয়ালিউল্লাহর তত্ত্বগত পুরাপুরি বিরোধ। তাঁর চিন্তাকে অর্মত্য সেনসহ অনেক পশ্চিমা অর্থীনিতিবিদও অনুমোদন করবেন না। তাছাড়া, তাসাউফপন্থী বা দর্শনের আধ্যাত্মিকতার মার্গে তো এ ধরনের চিন্তাকে অনুমোদন করা যায় না। বরঞ্চ এই high mass consumption এর কারনে দুনিয়াতে সব রকমের যুদ্ধবিদ্রহ ঘটে, লুটতরাজ হয় এবং দুনিয়াতে যে উপনিবেশিক যুগের সূচনা হয়েছে সেটাও কিন্তু এই high mass consumption এর কারনে। ফলে, এক ধরনের লুটতরাজ প্রচার করবার যে প্রকল্প তৈরি হয়েছে এবং ষাটের দশকে কমিউনিজমকে ঠেকানোর জন্য যখন ন্যাটোর পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র theory of containment অনুমোদন করে তখন কিন্তু এই রোস্টোকে দাঁড়া করানো হয়েছিল—এটা আসলে বোঝা দরকার।
অর্থনীতির চাকা আসলে একরৈখিক। কিছুটা কার্ল মার্ক্সও বলতেন এমন। মার্ক্স কিন্তু বলছেন যে, ইতিহাসের পরিবর্তনটা কখনো ট্র্যাজেডি হয় কখনো ফার্স হয় অর্থাৎ একই রকম কিন্তু হুবুহু না। আমার বাইবেলের প্রিয় একটা লাইন আছে, লাইনটা আছে Old testament এর book of ecclesiastes এর, “What has been will be again, what has been done will be done again; there is nothing new under the sun”- যা হয়েছে আবারো হবে যা করা হয়েছে সেটাও আবার করা হবে। এই পৃথিবীতে নতুন কিছু না। কিন্তু তারপরেও আমার প্রশ্নটা হচ্ছে দুইটা জিনিস রিপিটেশনের পরেও কি হুবুহু থাকে? তা কিন্তু হয় না। রিপিটেশন হয়, কিন্তু সেখানে অনেক নতুন মাত্রা থাকে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর দর্শনগত জায়গাটা হচ্ছে মূলত ভারতবর্ষকেন্দ্রিক এবং সেটা হচ্ছে এমন একটা সময় সেটা হচ্ছে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের সময়টা ছিল ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭। তারপরে আর মোগল সাম্রাজ্য সেভাবে দাঁড়াতে পারে নাই। শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন ইসলামী পন্ডিত হিসেবে সারা দুনিয়াতে খ্যাত তখন মোগল সম্রাট আলমগীরের রাজত্ব। সেই সময় মোগল সাম্রাজ্য সংকুচিত হওয়ার কারনে ভালোমত রাজস্ব উঠানো যাচ্ছিল না। যাদেরকে রাজস্ব উঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হতো তারাও অনেকে ঠিকমত সেই দায়িত্বগুলো পালন করতো না। রাজত্ব নির্ভর করে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় সামন্তদের উপরে এবং তার চেয়েও বেশি নির্ভর করে সৈন্যদের উপর তাদেরকে ঠিকমত বেতন না দেওয়ার কারনে কিন্তু মোগল সাম্রাজ্য অনেকটাই পতিত হয়। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, এই সমস্যাটা কিন্তু ইউরোপেও ছিল। ইউরোপের রোমান সাম্রাজ্যের পতনের একটা মূল কারন এটা। বিশেষ করে আফ্রিকা অঞ্চলে সৈন্যদের ঠিকমত বেতন দেওয়া হতো না।
আরেকটা জিনিস বলে রাখি যে, মার্ক্সের ফিলোসফিকাল একটা কনস্ট্রাকশন হচ্ছে প্রলেতারিয়েতকে প্রমোট করা। কিন্তু, কথা হচ্ছে, প্রলেতারিয়েত কে? এই জিনিসটা কিন্তু স্থানভেদে ভিন্ন হয়। যেমন আমি একটু বলতে চাই যে, রাশিয়াতে যারা বর্ধিষ্ণু কৃষক এদেরকে বলা হয় ‘কুলাক’। কিন্তু মার্ক্স ও এংগেলসের তত্ত্ব অনুযায়ী, কৃষক মাত্রই ছিল প্রলেতারিয়াত শ্রেণী, কিন্তু রাশিয়াতে কুলাকের ক্ষেত্রে কিন্তু তা না; আবার লেলিন যখন রেড আর্মিকে প্রলেতারিয়েতের অন্তর্ভুক্ত করে বলশেভিক বিপ্লব করেন তখন তিনি সৈন্যদেরকে চিন্তা করতেন প্রলেতারিয়াত হিসেবে। কিন্তু এটা আসলে প্রুশিয়ান জার্মানির ধারনার একেবারেই বিপরীত। জার্মানিতে কিন্তু পুরাটাই ছিল আর্মির ব্যবস্থা অর্থাৎ আর্মি নিয়ন্ত্রণ করত। তার মানে দেখা যাচ্ছে যে, রাষ্ট্র এবং সমাজের সাথে সাথে প্রলেতারিয়াতের ধারণা ভিন্ন হয়। ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দটাকে যদি আমরা নাও ব্যবহার করি তাহলে ধরেন ‘দরিদ্র-নির্যাতিত শ্রেণী’র ধারণাটাও কিন্তু স্থানভেদে ভিন্ন হয়। এখন কাকে নিয়ে আপনি সমাজ আন্দোলন করবেন সেটা একটা বিষয়! এইখানে লেলিনের সাথে শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তার একটা সমান্তরাল দিক হচ্ছে, তারা দুইজনই সেই সময়কার একেবারে সমাজে অবিকশিত সৈন্যদের যারা জীবন দিত অথচ সেইভাবে মূল্যায়ন করা হতো না সেই অংশটাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাদের সমাজ প্রকল্পে যে, তাদেরকে এক ধরনের সমর্থনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকে রাখতে হবে। কারন মনে রাখতে হবে যে, সমাজে যত বড় বড় কথাই থাক, জ্ঞানের আলোচনা থাক, কিন্তু যুদ্ধ হচ্ছে অবশ্যম্ভাবী জিনিস। সেই সময় কিন্তু আপনি আগাবেন না! যেমন সম্প্রতি কিন্তু ইসরাইল ইরানের যুদ্ধ হল সেখানে কিন্তু আলি শারিয়াতি যুদ্ধ করতে যায় নাই! সৈন্যরাই এগিয়ে গেছে। তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে। ইসলামের অনেক যুদ্ধে অনেক বড় বড় ফিকাহ শাস্ত্রবিদের চেয়ে যার তলওয়ারের জোরের ক্ষমতা ছিল। সেটাও কিন্তু কার্যকর হয়েছে। কারন, কে কোন জায়গা থেকে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের সাহায্য করবে এটা তো কেউ জানে না। একটা রাষ্ট্র তার প্রত্যেকের অবদানের মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে। এ প্রত্যেকটা জিনিস-দিকগুলিকে মনে রাখা হতে হবে।
মোঘল সাম্রাজ্যের খালিসা রাজস্ব ব্যবস্থার আয় কমে গিয়েছিল। এ কারনে শাহ ওয়ালিউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তাটা হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো সীমিত না করেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা ত্বরান্বিত হবে। এইটাই ইরতিফাকাত তত্ত্বের মূলভিত্তি। ইরতিফাকাতের একটা সংজ্ঞা এমন হতে পারে, অধিকার ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার সুবিধাজনক উপায়। আমার মতে, এটা হচ্ছে তার দর্শনের মূল কথা। এক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু চিন্তা-ভাবনা সামনে নিয়ে এসেছেন এবং সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ালিউল্লাহর সময় মোঘল সাম্রাজ্যের তখন আয় কমে গিয়েছিল। কিন্তু, কোষাগারের বড় একটা অংশ রাজন্যবর্গ অর্থাৎ, সাম্রাজ্যের যারা বড় বড় উচু পদে আছেন তাদের পিছনে ব্যয় হতো। শাহ ওয়ালিউল্লাহ একটা এক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, এভাবে সাম্রাজ্য চললে হবে না, বরং সাম্রাজ্যের সবাইকে সুযোগ-সুবিধার অংশীদার করতে হবে। সেজন্য বিলাসিতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অবশ্য বিলাস না করার তত্ত্বটা আমাদের রসূলুল্লাহর তত্ত্ব।
আরেকটা হচ্ছে, জায়গিরদেরকে বিভিন্ন জায়গায় থেকে থেকে কর আদায় করতে হতো। কর আদায় করতে গিয়ে তারা অনেক সময় দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত হতো। শাহ ওয়ালিউল্লাহ একটা ক্লাসকে সমর্থন করতেন সেটা হচ্ছে নোবেল বা সম্ভ্রান্ত শ্রেণী যেটাকে জার্মান ভাষায় ‘Reichskämmerer’ বলা হয়। ‘জর্মান দেশের কৃষকযুদ্ধ’ নামে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের ‘Der deutsche Bauernkrieg’ বইটিকে আমি সরাসরি জার্মান থেকে বাংলায় অনুবাদ করছিলাম। জার্মানের নোবেল ক্লাসটা সেখানে কী করত? কৃষক শ্রেণীকে সহযোগিতা করত। কারণ, নোবেল হয়েও তারা ভূমিপুত্র। শাহ ওয়ালিউল্লাহ কিন্তু এই মনস্তত্ত্বটা বুঝতেন। সম্ভ্রান্ত গোষ্ঠী যারা জমিদারের বাইরের অংশ, শ্রেণীটা কিন্তু বাংলাদেশে নাই, যে কারনে আমরা মর্মটা বুঝিনা। এখানকার ভূমির অন্তর্গত সম্ভ্রান্ত জনগোষ্ঠী অনেক সময় ধনী হয়েও প্রয়োজনে এখানকার নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়াতো। জার্মানির পঞ্চদশ শতাব্দীর কৃষক বিদ্রোহতে দেখা যায় যে, তারা অত্যন্ত নির্যাতিত হওয়ার পরেও এবং তাদের ধনসম্পদ ঝুঁকির মধ্যে পড়ার পরেও তারা কিন্তু সমাজব্যাপী ভাবে অংশগ্রহণ করছে। জার্মান দেশে “Genossenschaft” নামে কৃষকদের নিয়ে একটা নবগঠিত শাসন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এই সমস্ত কিছু নিয়েই আসলে জার্মান আন্দোলনটা দাঁড়াইছে। এই প্রকল্পটার কথা শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাহেব না জেনেও তার চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে কিন্তু তিনি সেই জায়গাতে পৌঁছেছেন। বিভিন্ন জায়গার মানুষ আসলে বিভিন্ন ভাবে ধারনটাকে নিয়ে রাষ্ট্র প্রকল্প ধারা করাতে চায়।
বাংলাদেশে শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলতে আসলে লোকজন বোঝে কেবল হজ্জাতুল্লাহিল বালিগা। কিন্তু এর বাইরেও তার যে আরো অনেক লেখা আছে সেটা তেমন পড়া হয় না। যেমন দেখা যাচ্ছে যে, ট্যাক্স সম্পর্কেও তার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য আছে। সেটা হচ্ছে যে ট্যাক্স কাকে দেয়া হবে? যেই লোকটা দরিদ্র যার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নাই, আপনি কি তার কাছ থেকে সেই পরিমাণ ট্যাক্স নিবেন যেটা অন্যের কাছ থেকে নেন? এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে কিন্তু সেই দায়বদ্ধতা থাকা উচিতও না। উনি বিষয়গুলো আলোচনা করছেন। তারপরে উনার রাষ্ট্র প্রকল্পের ধারণাটা নির্ধারিত হয় ব্যক্তির জায়গা থেকে। কারন ব্যক্তি হচ্ছে একটা সোশ্যাল ইউনিট। পরিবার হচ্ছে আরেকটা কম্পোজিট সোশ্যাল ইউনিট সেটা থেকে ক্রমাগত বড় হতে হতে একটা রাষ্ট্র হয়। ব্যক্তি কিভাবে সমাজ প্রতিপালন করবে? তার আগে সে নিজে নিজেকে কিভাবে বিকশিত করবে? তার নিজের সাথে তার কী বোঝাপড়া? রাষ্ট্রের সাথে তার বোঝাপড়ার আগে তার পরিবারের সাথে কী বোঝাপড়া? অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রে তার গৃহের অর্থনীতি কিভাবে নির্ধারিত হবে? এ সমস্ত কিছু নিয়ে উনি যেভাবে চিন্তা করেছেন। অনেক নোবেল লরিয়েটও এভাবে চিন্তা করে নাই।
তো সত্যি কথা বলতে হচ্ছে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি স্বাভাবিকভাবে একজন বিশ্বয়কর ব্যক্তিত্ব। তার মধ্য দিয়ে আসলে প্রতিফলিত হয়েছে একটা এক গভীর সমাজবিজ্ঞানীর এবং এক দার্শনিকের যিনি মানুষের মনস্তত্ব এবং তার অর্থনৈতিক সমীকরণ এবং সেই সাথে তার নৃতাত্ত্বিক ও জৈবিক বাস্তবতা নিয়ে একটা যুথবদ্ধ সমাজ কাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রকল্প নির্ধারণ করেছেন। যেটা আমার মনে হয় যে কেবল ইসলামের ইতিহাসে নয় সমগ্র পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত বিরল।