মুসলিম সভ্যতার সংকট ও মালেক বিন নবি

রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর। পাঠক পরিচয় নিয়েই স্বচ্ছন্দ। আগ্রহ ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও পুরাণ নিয়ে। প্রকাশিত বই সাইরাস (২০২১), মাহদিয়াত (২০২৩) এবং জীবন কিংবা জিজ্ঞাসার জার্নাল (২০২৪)

Share:

তোমার সভায় কথা বলার নাইক যাদের যোগ্যতাই-

পাচ্ছে তারাও ধন-দৌল! বেশত! তাতেও দুঃখ নাই।

কিন্তু একী। কাফিররা পায় এই ধরাতেই ‘হুর-কসুর’,

মুসলমানের বেলায় শুধুই ওয়াদা হুরের-স্বর্গপুর!

আফসোস! আর আগের মতন নওক’ তুমি মেহেরবান,

ব্যাপারটা কী। এখন কেন দাও না মোদের তেমন দান?

খোদার প্রতি বান্দার তীব্র অভিযোগ। অনুবাদ কবি গোলাম মোস্তফার। মূল মুহম্মদ ইকবালের ‘শিকওয়া’। শিকওয়া প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে। উসমানি খেলাফত তখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত না হলেও প্রায় শক্তিহীন। ক্ষমতা এক রকম নিয়ে ফেলেছে তরুণ তুর্কিরা। এদিকে সমাপ্ত হয়েছে ভারতের মোগল, বাংলায় সিরাজদ্দৌলা এবং মহীশূরে টিপু সুলতানের দিন। ধ্বংসাবশেষে পরিণত বাগদাদ, কর্ডোবা, কায়রো, ইস্তানবুল ও সমরকন্দের মতো প্রাণকেন্দ্র। দরিদ্রতা, ‍কুসংস্কার ও অজ্ঞতার মধ্যে খাবি খাচ্ছে মুসলমান। অথচ পশ্চিমা উপনিবেশের সূর্য তখন মধ্যগগনে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত গৌরবময় পদচারণা ব্রিটিশ, ফরাসি ও পর্তুগিজ পরাশক্তির। ইকবাল সারাজীবনই এ পরিস্থিতির কারণ খুঁজে গেছেন। ১৯৩৮ সালে মারা যান তিনি, ঠিক সেই বছরই মালেক বিন নবি লিখেছেন একটা উপন্যাস। শ্রেষ্ঠ রচনা বলতে যা ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, তার কোনোটিই তখনো লেখা হয়নি। তবে আধুনিক বিশ্বে দাঁড়িয়ে মুসলিম সভ্যতার অবক্ষয়, পতন ও সামাজিক পরিবর্তনকে পর্যালোচনা করার পরবর্তী দায়িত্বটা তিনিই নিয়েছেন কাঁধে। ধারণ করেছিলেন একদিকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর সমাজতাত্ত্বিক ইবনে খালদুন ও আধুনিক সময়ের কবি ও দার্শনিক ইকবালের উত্তরাধিকার।

মালেক বিন নবিকে মনে করা হয় আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিকদের একজন। তার জন্ম ১৯০৫ সালে, আলজেরিয়ায়। উত্তর আফ্রিকায় তখন ফরাসি উপনিবেশ। তার অধিকাংশ লেখালেখিই ফরাসিতে। আলজেরিয়ার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তি সংগ্রামে ইসলাম যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল, তার বড় দলিল তিনি। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে দার্শনিক ভিত প্রস্তুত করেন। ইকবালকে যেমন উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পাঠ করতে হয়, মালেক বিন নবিকে তেমন পাঠ করতে হয় আলজেরিয়ার স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে।

জেনারেল নিকোলাস শাঙ্গার্নিয়ে (১৭৯৩–১৮৭৭)-এর নেতৃত্বে কনস্টান্টিন অভিযান, নভেম্বর ১৮৩৬, উৎসঃ আলামি

মালিক বিন নবির জন্ম পূর্ব আলজেরিয়ার কনস্টানটাইন শহরে। পরিবার সম্ভ্রান্ত্র ছিল না। নিজের চোখে দেখেছিলেন ফরাসী সৈন্যদের দখলদারত্ব ও নিজ জনতার রক্তাক্ত ইতিহাস। বিন নবি স্থানীয় আল জালিস স্কুলে ভর্তি হন। তুর্কি খেলাফতের দুর্বলতা তাকে আগ্রহী করে তোলে সে সময় থেকেই। জালিস স্কুল থেকে বের হয়ে তিনি মাদরাসায় ঢোকেন। তার চিন্তার দিগন্ত বিস্তৃত হতে থাকে। ঝুকে পড়েন অধ্যয়নের দিকে। তখন থেকেই সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন। পত্রিকায় চোখ রাখতেন নিয়মিত। আমীর খালেদ ও মোস্তফা কামালের বীরত্বের কাহিনী কিংবা জগলুল পাশার ইংরেজবিরোধী লড়াইয়ের খবর তাকে আকর্ষণ করত।  সে আকর্ষণ তাকে নিয়ে যায় মোহাম্মদ আবদুহু আর রশিদ রিদার লেখালেখির কাছে। তিনি মুসলিম সংস্কৃতির অতীত গৌরব আর বর্তমান জরাজীর্ণ চেহারা থেকে ব্যথিত হন। মাদরাসায় অধ্যয়নকালীন তিনি দুজন নওমুসলিম ইসাবেল এবারহার্টের খবর পান। তার লেখা In the warm Shadow of Islam পড়ে তিনি দারুণ মুগ্ধ হন। তবে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় আবদুল রহমান কাওকাবীর উম্মুল কুরা বইটি। এমনকি মাদরাসার ফরাসি শিক্ষক তাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পড়তে দেন। মাদরাসার কাছেই ছিল ক্যাফে বেন ইয়ামিনা। সেখানে নিয়মিত হাজির হতেন সেকালের আলজেরিয়ার প্রতিথযশা বুদ্ধিজীবী শাইখ আবদুল হামিদ বিন বাদিস। বিন বাদিসকে ঘিরে ক্যাফে ইয়ামিনাতে মাদরাসা ছাত্রদের এক চক্র গড়ে ওঠে। তারা আলজেরিয়ার মুসলিম সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো সেখানে বিন নবি ছিলেন তার সদস্য।

লেখাপড়া শেষ হলে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা করে চাকরির কথা ভাবেন বিন নবি। ভাগ্য ফেরানোর জন্য তিনি ফ্রান্সে পাড়ি জমান। অনেক চেষ্টা করে একটি যন্ত্র প্রকৌশল স্কুলে ভর্তি হন এবং প্রকৌশলী হিসেবে বের হন। এ সময় বিন নবীর আলজেরীয় মাদরাসার পুরনো বন্ধু হামুদা বিন সাই ও খালিদী প্যারিসে আসেন। হামুদা কুরআন শরীফের সমাজ বিশ্লেষণ করে বর্তমান মুসলমানদের দুর্দশাকে ব্যাখ্যা করতো। তার সাহচর্যই বিন নবীকে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের প্রতি আকর্ষিত করে এবং পরবর্তীতে মুসলিম দুনিয়ার সমস্যাকে দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক পটভূমিতে বিশ্লেষণ করতে উজ্জীবিত করে। খালিদীর গড়া সংগঠনে বিন নবী একবার Why We are Muslim শীর্ষক বক্তৃতা দেন। প্রকৌশল স্কুল থেকে বের হওয়ার পর ফ্রান্সে তার চাকরি পাওয়ার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রবাসী আলজেরীয় শ্রমিকদের একটা স্কুলে পাঠদান শুরু করেন। বিন নবী এ সময়ে বিশ্বরাজনীতির উত্থান পতন, সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর আয়োজন ও ইউরোপীয় সভ্যতার শক্তি এবং দুর্বলতার দিকগুলো ভাল করে বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি বুঝতে পারেন সাম্রাজ্যবাদকে রুখতে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিরোধই যথেষ্ট নয়, আদর্শগত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও সাম্রাজ্যবাদকে পরাজিত করা দরকার। এটাও বুঝতে চেষ্টা করেছেন, কেন মুসলিম দেশগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক জড়তার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে।

মালিক বিন নবীর সভ্যতা বিশ্লেষণের নমুনা পাওয়া যায় তার দুটি বিখ্যাত বইতে। প্রথমটির নাম The Conditions of Renaissance; এই বইয়ে তিনি আলজেরিয়ার সমস্যাকে সামাজিক দর্শনের পটভূমিতে স্থাপন করেন। তার এ চিন্তার পরিণতি ঘটে Islam in History and society বইয়ে। মূলত বই দুটি একে অপরের পরিপূরক এবং একই চিন্তার গভীর থেকে গভীরতর বিশ্লেষণ। এ বইতে বিন নবী ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরের অগ্রগতি ও বিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। ইবনে খালদুনের বিখ্যাত আসাবিয়া তত্ত্বকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে বিন নবি তার সভ্যতার বিবর্তনের তত্ত্ব হাজির করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন প্রত্যেকটি সভ্যতাই নানা রকম রূপান্তরের ভিতর দিয়ে অনিশ্চিত অভিযাত্রায় নিজেকে সংহত করে। এ সম্মুখযাত্রাকে সামনে রেখে মালিক বিন নবি মুসলিম ইতিহাস ও সভ্যতাকে তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখিয়েছেন। প্রথমটি হচ্ছে- কুরআনের আদর্শে উজ্জীবিত এক সমাজ, যা রসুল (স.)-এর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এ জীবন্ত সমাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায় সিফফিনের যুদ্ধের ভিতর দিয়ে। সিফফিনের যুদ্ধ হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এবং মুসলিম সমাজের সংহতি তখন থেকেই দুর্বল হতে শুরু করে।  দ্বিতীয় স্তরে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। সর্বশেষ স্তরকে তিনি বলেছেন উত্তর আল মুয়াহিদ যুগ, যে যুগ আমাদের এ কাল পর্যন্ত। বিস্তৃত হয়েছে এবং জড়তা, অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক পচন যার বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুসলিম সভ্যতা আজ কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অনুকরণপ্রবণতা। অন্যদিকে ইউরোপ তার সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় এগিয়ে এসেছে। পাশ্চাত্য আজ মুসলিম দুনিয়ার উপর জাঁকিয়ে বসেছে।

মালেক বিন নবির ভাষ্য, সময় একই সঙ্গে চক্রাকার ও সম্মুখগামী। সময়ের চক্রাকার রূপকে ইবনে খালদুন তুলে ধরছেন তার বহুল পরিচিত গ্রন্থ মুকাদ্দিমায়। তিনি দেখিয়েছেন, কিভাবে উত্থান (মিলাদ) ও স্বর্ণযুগ (আওজ) পার করে কোন একটা সাম্রাজ্য ধসে পড়ে (উফুল)। সেই ধসে পড়া ছাইয়ের উপর স্থাপিত হয় নতুন সাম্রাজ্যের ভিত। শুরু হয় নতুন চক্র। তাকে নিয়ন্ত্রণ করে রূপ দেয় আসাবিয়া বা গোত্রীয় বন্ধন। ইবনে খালদুনের সেই আলোচনাকে এখানেই সীমাবদ্ধ রাখতে নারাজ মালিক বিন নবি। তিনি চক্রাকার ধারণাকে বিস্তৃত পরিসরে প্রয়োগ করেন সভ্যতা বুঝতে গিয়ে। সেক্ষেত্রে ইবনে খালদুনের তিনটি স্তরকে তিনি অন্য তিনটি স্তর দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেন। প্রতিটি সভ্যতার জন্য তার চোখে রয়েছে আধ্যাত্মিক স্তর, বৌদ্ধিক স্তর ও খায়েশের স্তর। আধ্যাত্মিক স্তরে সমাজ ও সভ্যতার চালিকশক্তি থাকে খোদায়ী ফিতরাত। নবি থেকে রাশেদুন খেলাফত পর্যন্ত এটা বিস্তৃত। বৌদ্ধিক স্তরে জ্ঞানচর্চা ও শিল্পসাহিতের বিকাশ ঘটে। কিন্তু বুদ্ধি দিয়ে তো খায়েশ বা আকঙ্ক্ষাকে অতোটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না, যতোটা সম্ভব খোদায়ী ফিতরাত দিয়ে। তাই কিছুটা বিকৃতি থাকে। সভ্যতার তৃতীয় স্তরে খায়েশ অবমুক্ত হয়। খোদায়ী ফিতরাত দূরে থাক এবং বুদ্ধি দিয়েও খায়েশকে আটকে রাখা যায় না। ফলে এই সময়টা নৈরাজ্যের।

মালেক বিন নবির কাছে সভ্যতা হলো চিন্তার সমাবেশ। যে সভ্যতা যতো বেশি চিন্তাকে জায়গা দেবে, সে ততো সমৃদ্ধ। মানুষের আসলে দুইটা পরিচয়। খোদ মানুষ হিসেবেই সে আল্লাহর কাছে সম্মানিত। তার জন্য আলাদা আর কোন শর্তের প্রয়োজন নেই, এটা নির্ধারিত। দ্বিতীয় পরিচয় হলো আল্লাহর খলিফা। এটা নির্ধারিত না, ইতিহাসের বিভিন্ন সময় বদলে যেতে পারে যোগ্যতা অনুসারে। এজন্য মানুষকে ফারদ থেকে শাখসে পরিণত হতে হয়। ফারদ ও শাখস্ দুটোর অর্থই ব্যক্তি। তবে শাখস্ একজন সম্পূর্ণ সক্রিয় ব্যক্তি সত্তা, যিনি সভ্যতা গঠনের ইউনিট হিসেবে কাজ করেন। যে কোন সমাজের শাখস্ আর চিন্তা মিলিত হলেই সফলতা দৃশ্যমান হয়। এখানেই প্রগতিশীল রূপটার জায়গা। এই যে মিসর, গ্রিস, ভারত, আরব করে ইউরোপ পর্যন্ত চক্রাকারে উত্থান পতন ঘটলো, এর মধ্য দিয়ে সার্বিকভাবে বড় ধরণের পরিবর্তন এসেছে মানুষের মধ্যেই। মানে ইতিহাস সামনে এগিয়েছে। এক সভ্যতার সূর্য যখন ডুবে যাচ্ছে, অন্য সভ্যতায় তখন সকাল। যারা যোগ্যতা ধরে রেখেছে, থেকেছে। যোগ্যতা হারিয়েছে, ডুবেছে।

সময়ের গোপন পরিচালকের নাম ধর্ম। কারণ ধর্ম পেছনে থেকে কিছু কাজ খুব ভালো মতো সামাল দেয়। ব্যক্তি মানুষকে সামাজিক বানায়। হাতে ধরিয়ে দেয় একটা সাধারণ উদ্দেশ্য, যার উপরে মানুষ একমত হয়। পাশাপাশি বিপুল মেধা ও সৃষ্টিশীলতারে কেন্দ্রিভূত করে। একটা নৈতিক পাটাতন তৈরি করে সামনে যাওয়ার জন্য। এজন্যই প্রতিটা সভ্যতার মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য প্রথম ধাক্কাটা ধর্মই দেয়। মালেক বিন নবির কাছে, ধর্ম তাই সভ্যতার রুহ। প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন রূপে হিন্দুধর্ম, আরব-পারসিকদের উত্থানে ইসলাম ও পশ্চিমাদের জয়যাত্রায় খ্রিষ্টধর্ম সে রুহ হিসেবেই রয়েছে। যে কোন সভ্যতার জাহিরি উন্নতির পেছনে এমন একটা বাতেনি সফর জড়িত। ইউরোপীয়ান এম্পায়ার সোজা হওয়ার অনেক আগেই ছড়িয়ে পড়ছিল খ্রিস্টধর্মের বাতাস। আরো গুছিয়ে বললে, যে যে অঞ্চলে খ্রিস্টিয় বিশ্বাসের বাতাস গেছে, সে অঞ্চলকে বগলে নিয়েই মাথা উঁচু করছে ইউরোপীয়ান সাম্রাজ্য। এই অংশে মালেক বিন নবি অনেকটা জার্মান দার্শনিক হেগেলের সুরেই কথা বলেছেন। তবে মালেক বিন নবির ভাষায়, সিফফিন যুদ্ধের পর মুসলিম সভ্যতার আত্মাও নৈতিকভাবে দূষিত ও বিষাক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

A moment of prayer, Frederick Arthur Bridgman, 1877

মুসলমানদের বিদ্যমান দুরবস্থার জন্য কয়েকটি বিষয় আছে। প্রথমত তারা সভ্যতার আধ্যাত্মিক ও নৈতিক জায়গাটুকু হারিয়ে ফেলা। দ্বিতীয়ত ‘ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ বলতে তারা ইসলামকে না, বুঝতে চায় মুসলিম হওয়া মানেই পূর্ণাঙ্গ হওয়া। এটা তাদের চিন্তার দিক থেকে আড়ষ্টতা তৈরি করে। আর আড়ষ্টতা ও ভেতর থেকে আধমরা হয়ে থাকা মুসলিমরা হঠাৎ ঔপনিবেশিক শাসনে ডুবে গেছে ইনফেরিয়োরিটি কমপ্লেক্সে। তারা নিজেদের যতোটা না চিনেছে, তারচেয়ে বেশি চিনেছে কলোনিয়াল অধিপতিরা। ফলে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের চিন্তাধারা মৃত। কারণ প্রতিটি চিন্তারই কনটেক্সট থাকে। নতুন বিশ্বব্যাবস্থায় তাদের চিন্তা যেন কনটেক্সট খুঁজে পায় না, যেন মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তাদের ঝুলি সমৃ্দ্ধ না। অথচ স্বর্ণযুগে মুসলমান সমাজে শিয়া, সুন্নি, মুতাজিলা, আশয়ারি, সুফি, কালামবিদদের মতো নানা রকম বৈচিত্র্য ছিল। দিনশেষে তাদের উপকারিতাও ছিল। প্রতিটা মতবাদই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিদ্যমান সমস্যাকে ব্যাখ্যা করার ভিন্ন পথ বাতলে দেয়। সামনে আনে একটা বিকল্প বুঝব্যবস্থা। তাতে করে চিন্তা দ্রুত মরতে পারে না। আত্ম জিজ্ঞাসার পরিস্থিতি তৈরি হয়। মুতাজিলারা বুদ্ধিকে বড় পরিসরে প্রায়োগিক করে তুলছে, তাতে প্রতিক্রিয়া কিন্তু ছিল সুদূরপ্রসারী। মুতাজিলাদের বিরোধী হতে গিয়েি একটা বৌদ্ধিক ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে আশারিয়াদের মধ্যে। বর্তমান সময়ে যদিও সেই সময়কার মুতাজিলা ও আশারিয় চিন্তা বা যুক্তির বড় অংশ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু এটা প্রাসঙ্গিক যে, তাদের চিন্তায় বৈচিত্র্য ছিল। আল্লাহ কোথাও থাকেন নাকি স্থাননিরপেক্ষ- এটা আজ আর কোনো প্রশ্ন না। প্রশ্ন হলো- আল্লাহ থাকার পরেও মুসলমানরা হীনবল কেন?

ইসলাম আসার পর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন আরব উপদ্বীপ একত্রিত হলো। বিশ্ব জয় করার সমস্ত ক্ষমতা তাদের মধ্যে ছিল। শুধু ছিল না ক্ষমতাকে কেন্দ্রিভূত করার ব্যবস্থা। সেটাই পেয়েছে নবির মাধ্যমে। নবির ইচ্ছা মানে খোদার ইচ্ছা, আর মুসলমান মাত্রই খোদার ইচ্ছার কাছে বাঁধা। এই সেই ঐক্য। মুসলমানরা এখনো যথেষ্ট সৃষ্টিশীল ও কর্মতৎপর। কিন্তু তাতে ভারসম্য নেই। অন্তত গত দুইশ বছর ধরে সেটাই প্রমাণিত হচ্ছে। জামাল উদ্দিন আফগানি পরবর্তী প্রতিটি ঘটনাতেই মুসলমানদের ছটফট দেখা গেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়নি। সেই পুরোনো পানিতেই খাবি খাচ্ছে। মুসলমান সমাজে তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে অনুকরণের অসুখ। এদিক থেকে মালেক বিন নবির চিন্তা ইবনে খালদুনের চিন্তার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। খালদুন তার আল মুকাদ্দিমায় লিখেছেন, বিজিত জাতি বিজেতাকে অনুসরণ করে, কারণ বিজিত জাতির প্রতিরোধ শক্তি ফুরিয়ে যায়। প্রতিরোধের অস্ত্র চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এতখানি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। সেটা দিয়ে বিজেতাকে মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না। বিজেতা এসে বিজিতের ঘাড়ে চেপে বসে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি চপিয়ে দেয়। আর মুসলিম সমাজের এই অনুকরণের প্রধান কারণ নিজেদের মধ্যে কোনো রেনেসাঁ ঘটেনি। জামালউদ্দীন আফগানী বলেছিলেন ইসলামের মধ্যে রিফরমেশন দরকার। মালেক বিন নবি এই জাগরণ আনতে চান নৈতিক শক্তির উত্থানের ভিতর দিয়ে। কারণ তিনি মনে করেন মুসলিম উম্মাহর শক্তি হচ্ছে কুরআনী নৈতিকতা। এই নৈতিক শক্তি দিয়েই সে বরাবর জাহেলী শক্তিকে পর্যুদস্ত করে এসেছে। মুক্তি দিয়েছে জড়তা থেকে।

বিন নবি মনে করেন সভ্যতা কোন কুড়িয়ে পাওয়া বা অনুকরনের বিষয় নয়। এমনকি এটা কোন সংগ্রহশালাও নয়। এটি একটি নির্মাণের বিষয়। সুতরাং ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ইসলামী সভ্যতার পুনঃনির্মাণ চান তিনি। বিন নবী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। ইসলামী শক্তির ভরকেন্দ্র আরব দুনিয়া থেকে একদিন এশিয়ায় চলে যাবে। সেখানেই নতুন সভ্যতার পত্তন ঘটবে। সেই সভ্যতার প্রতিত্ব হিসেবে তিনি ইকবালকে চিহ্নিত করেছেন। এ সময় বিন নবী আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। একটি হচ্ছে The Quranic Phenomenon, অপরটির নাম In the Whirlwind of the Battle। প্রথমটিতে বিন নবী বলতে চেয়েছেন কুরআন অধ্যয়ন ও ব্যাখ্যার চিরাচরিত ও ঐতিহ্যবাহী ধারাটি সংস্কার করা দরকার। কারণ আজকের মুসলিম তরুণরা পশ্চিমী শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে এক ধরনের বিশ্বাসের সংকটে ভুগতে শুরু করেছে এবং ইসলামকে বোঝার জন্য পশ্চিমী প্রাচ্যতত্ত্ববিদদের উপর ভর করছে। এই আত্মঘাতী ধারা থেকে তরুণদের ফিরিয়ে রাখতে হলে কুরআন ব্যাখ্যার নতুন পদ্ধতি চালু করতে হবে। তিনি মনে করেন, যদি Astrophysics ও Archaeology -এর মতো আধুনিক প্রেক্ষাপট যুক্ত করা যায় তাহলে কুরআন ব্যাখ্যার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। In the Whirlwind of the Battle বইটি লেখা হয়েছিল আলজেরীয় বিপ্লব ও স্বাধীনতার প্রাক্কালে। এতকাল বিন নবী মুসলিম সভ্যতার অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিশেধক হিসেবে যে চিন্তার জাগরণের কথা বলে আসছিলেন তার বাস্তব ও প্রয়োগিক দিকটি তিনি এখানে পর্যালোচনা করেছেন এবং সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক, আদর্শিক প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাবনাকে বিচার করে দেখার চেষ্টা করেছেন।

মালিক বিন নবী এ সময় মুসলিম সংস্কৃতির উত্থান-পতন, মুসলিম জগতের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনরুত্থান, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও আধিপত্যের মুখে মুসলমানদের আদর্শিক সংকট ও সম্ভাবনাকে পুনর্মূল্যায়ন করে আরো লেখালেখি করেন ও বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দেন। তিনি বলতে চেয়েছেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আগে দরকার আদর্শের ভিত প্রস্তুত করা। সদ্য স্বাধীন মুসলিম দেশগুলোতে এই আদর্শিক সংগ্রাম সফল সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। তিনি বরাবরই কোরআনে বর্ণিত সামাজিক সুবিচার ও ইনসাফের নীতিকে প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন এটা ছাড়া মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা কাটার সম্ভাবনা কম। তিনি বলতে চেয়েছিলেন পরাশক্তিসমূহের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ক্ষমতার নয়, এর সাথে আদর্শ ও সংস্কৃতির প্রতিদ্বন্দ্বিতাও রয়েছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণাম হচ্ছে যুগযুগান্তের মূল্যবোধকে অপসারিত করে নতুন মূল্যবোধ দ্রুত যায়গা করে নিচ্ছে এবং এর ফলশ্রুতিতে আসছে ভয়াবহ শূন্যতা। এ শূন্যতার পটভূমিতে মানুষ তার মনুষ্যত্ববোধকে বিসর্জন দিচ্ছে। সভ্যতা হারাচ্ছে তার ধর্ম। এভাবে মালিক বিন নবী আমৃত্যু সবরকমের চেতনাগত ও বস্তুগত দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন আমৃত্যু। ১৯৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর ইন্তেকাল করেন।

মুসলিম জাগরণ বলতে যেটাই বুঝানো হোক, তা যথেষ্ট জটিল। উত্থান প্রত্যাশা করে কিংবা স্বর্ণযুগের স্মৃতিচারণ করে জাগরণ সম্ভব না। হাজার বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধ্যাবস্থা অন্তত এতটা সহজ অবস্থায় কখনো ছিল না বা এখনো নেই। এক অন্তহীন চক্রে আটকে রেখেছে মুসলিম সভ্যতাকে, আটকে রেখেছে নিগৃহীত জীবনে। ইউরোপে যখন রেনেসাঁর শুরু, মুসলিম সভ্যতায় তখন সূর্য ডুবতে যাচ্ছে। দেকার্তকে ধরে ইউরোপীয় চিন্তার যে যাত্রা, তার ধারাবাহিকতা হাল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। যেন প্রতিটি পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা শুরু হচ্ছে পূর্ববর্তী প্রজন্মের রেখে যাওয়া চিন্তা থেকে। শুধু দর্শনে না, জ্ঞানের প্রায় ক্ষেত্রেই একথা খাটে। অথচ ইবনে খালদুনের পর মুসলমানরা তাদের সিলসিলা অবিচ্ছিন্ন রাখতে পারেনি। বিচ্ছিন্নতা যদিও ইবনে খালদুনের পরই দৃশ্যমান হয়েছে। মূল বিচ্ছিন্নতার শুরুয়াত আসলে সিফফিনের যুদ্ধ ও পরবর্তী কয়েকটি ঘটনায়। কোরান বেদুইন আরব জাতির মধ্যে যে শক্তি ফুঁকে দিয়েছিল, তাকে সিফফিনের যুদ্ধেই বিধ্বংসী রূপ দিয়েছে মুসলমানদের বড় একটা অংশ। পরবর্তী সব ধরণের চিন্তা ওই ফিতনায় গিয়ে আটকে যায়। দুটি দল তৈরি হওয়া আসলে ব্যাপার না। সমস্যা পূর্বপুরুষের সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করতে গিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের দ্বিধায় থাকা। সিফফিন যুদ্ধের পর এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানরা বারবার পড়েছে। তখনই শিশুর মতো ভীত হয়ে থেমে পড়েছে চিন্তায়। আর এগিয়ে যাওয়া হয়নি সামনে। এমনকি বর্তমান মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যেও ইসলামের ইতিহাস নিয়েও অ্যাপোলিজিটিক চিন্তাধারা বিদ্যমান। যে জাতি নিজের পতনের কারণ সনাক্ত করতে পারে না, সে আবার দাঁড়াবে কীভাবে?

আধুনিক ইউরোপ ঔপনিবেশিক ক্ষমতা হিসেবে ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। বিন নবি মনে করেন, মুসলমানের মধ্যে তখন দীর্ঘদিনের অনুসরণ করার অভ্যাস ছাড়া কিছু নেই। আর অনুসরণকারী হওয়া মানেই ভোক্তা হওয়া। ভোক্তার কোন অপশন তৈরির স্বাধীনতা থাকে না। থাকে কেবল বাছাই করার। ফলে ঔপনিবেশিক ক্ষমতায় তারা কেবল কিছু মতবাদ আমদানি করার সুযোগ পেয়েছে। স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক শক্তি তৈরি হয়নি। ফলে তারা ভোক্তাই রয়ে গেছে। বিষয়টা আরেকটু ঢেলে বুঝা যাক। ঔপনিবেশিক শক্তির মোকাবেলায় মুসলিম সভ্যতা কয়েক ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। একটা শ্রেণি স্বপ্ন দেখেছে পুনরুত্থানের। অর্থাৎ ইসলামের স্বর্ণযুগে প্রত্যাবর্তনের। এর ফলে উত্থান ঘটেছে সালাফি মতবাদ। প্যান-ইসলামিক মুভমেন্টও এরই অন্তর্গত। এমন প্রতিক্রিয়াতে আসলে ইসলামের অদৃশ্য স্বর্ণযুগে ফেরার চেষ্টা করা হয়েছে; যা অসম্ভব। কারণ গত হাজার বছরের ইতিহাসে সভ্যতার গতিপথ আগের মতো নেই। তাছাড়া স্বর্ণযুগ ঠিক কোন সময়টুকু কিংবা স্বর্ণযুগের ঠিক কে কে অনুসরণীয়, সেটা নিয়েও দ্বিধা থাকে। এর বিপরীতে দ্বিতীয় দল চেয়েছে তাবৎ মুসলিম সমাজের আধুনিকায়ন। যেন উন্নত পশ্চিমা জাতিগোষ্ঠীর অনুকরণেই সার্বিক উন্নতি নিহিত। স্যার সৈয়দ আহমদ ও তার পরবর্তী আলিগড় আন্দোলনে এ প্রবণতা দেখা যায়। এটাও অসম্ভব। কারণ দিনশেষে মুসলিমদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি আছে, যা পাশ্চাত্যের বেড়ে উঠার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাবে না। এমনকি তাদের অবস্থাও এক না। পুনরুত্থান বা আধুনিকায়ন- উভয় আন্দোলনের অসম্ভব দিকটা যখন বোধগম্য হতে শুরু করেছে, তখন হতাশ জাতি ঝুঁকেছে আরো দুই প্রবণতায়। প্রথমটা নৈরাজ্যপূর্ণ ধর্মীয় উগ্রবাদ কিংবা দ্বিতীয়টি দুনিয়াবিমুখ বৈরাগ্যবাদ। ফলে মোটাদাগে একথা বলা যায়, মুসলিম জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে আধুনিকতার মোকাবেলা কিভাবে করা হবে, তার সঠিক ও স্বাভাবিক ব্যবস্থা সেভাবে প্রস্তুত হয়নি।

সভ্যতায় সৃষ্ট লুপ থেকে বের হবার রাস্তা তৈরিতে কয়েকটা বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। মুসলিম বলতে কোন হোমোজেনাস সমাজ অবশিষ্ট নেই। মুসলিম পরিচয় অজস্র মতবাদ দ্বারা বিভাজিত। ফলে জাগরণের পথ তৈরিতে সিফফিন যুদ্ধের আগের ইসলামকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তখন মুসলিম জাতির হাতে দুইটা বিষয় ছিল প্রথমত কোরান ও দ্বিতীয়ত সত্যনিষ্ঠ আকল বা বুদ্ধি। অদ্ভুত ভাবে, বর্তমান সময়েও এ দুটি বিষয় পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করে কোরান অবিকৃত অবস্থায় হাজির আছে। (সূরা হিজর, আয়াত-৯)। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মানুষ খোদায়ী ফিতরাত নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। (সূরা রুম, আয়াত-৩০)। এজন্যই ইসলামে শিশুকে নিষ্পাপ জ্ঞান করা হয়। পরবর্তীতে যা কলুষিত হয় সমাজ ও সংস্কৃতির কলুষতা দ্বারা। দুটি মৌলিক বিষয়ই যেহেতু এখনো মানুষের মধ্যে জারি রয়েছে; ফলে পুনর্জাগরণ চিন্তা এ দুটি থেকেই শুরু করতে হবে। একদিকে কোরান ব্যবহৃত হবে সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধিকে পরিণত করতে, অপরদিকে সত্যনিষ্ঠ বুদ্ধি ব্যবহৃত হবে কোরানের নতুন মাত্রা আবিষ্কার করতে। এই আলাপ পুনরুত্থানের মতো হাজার বছর আগে ফিরে যাওয়ার কল্পনা না। বরং ইতিহাসের বাঁকে পরবর্তীকালে জন্ম নেয়া নানা কৃত্রিম কল্পনার হাত থেকে মুসলিম সভ্যতার রুহকে আলাদা করা।

প্রতিটি সভ্যতারই জিসমি (শরীরি) ও রুহানি (আত্মিক)- দুইটা রূপ থাকে। সিফফিনের যুদ্ধ বা ফিতনার মাধ্যমেই পরবর্তী মুসলিম সভ্যতার রুহ ক্ষয়িষ্ণু রুপ নিয়েছে। যা আর মীমাংসা করা হয়নি বা করা যায়নি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার যতোটুকু হয়েছে তা সেই ক্ষয়িষ্ণু রুহের জোরেই। হালাকু খান বা কামাল পাশা সভ্যতার স্থবির মূর্তিটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছেন কেবল। তাতে বরং দৃশ্যমান হয়েছে শূন্যতাটুকু। যে শুন্যতা আগে থেকেই তৈরি হয়ে ছিল। একই অবস্থা ঔপনিবেশিক যুগে। তবে এক্ষেত্রে ইতিবাচক একটা দিককে চিহ্নিত করেছেন দার্শনিক বিন নাবি। মুসলমানদের মধ্যে অন্তত এতোটুকু সচেতনতা এসেছে যে, তারা ভালো নেই।

পাকিস্তানি শিল্পী সাদেকীনের ইসলামী স্বর্ণযুগের পণ্ডিতদের নিয়ে ম্যুরাল—রুমি, ইদ্রিসি, খালদুন, বিরুনি, খাওয়ারিজমি প্রমুখ, দ্যা ট্রেজারাস অফ টাইম, ১৯৬১, উৎসঃ google arts and culture

প্রশ্ন হলো, রেনেসাঁর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কি মুসলিম জ্ঞানতাত্ত্বিকে ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা হচ্ছে? জবাব হলো- নাহ। বরং জাত (সত্ত্বা) ও সিফাত (গুণ)-কে আলাদা করা হচ্ছে। মুসলিম সভ্যতার জাত হলো কোরান ও বুদ্ধির সম্পর্ক। খোদার কালাম ও মানুষের বুঝের সম্পর্ক। বাদবাকি সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হলো সিফাত। সিফাতকে প্রতি প্রজন্মেই যাচাই বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সুস্থ সভ্যতার বৈশিষ্ট্যই থিসিস-সিন্থেসিসের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া। ফারাবি নিয়ে কথা তুললেন ইবনে সিনা, ইবনে সিনার দর্শনকে নাকচ করলেন ইমাম গাজালি, গাজালিকে নাকচ করে কলম ধরলেন ইবনে রুশদ। কিংবা ইবনে সিনাকে এগিয়ে নিলেন ইবনে তোফায়েল; আবার সেই ইবনে তোফায়েলকে নাকচ করলেন ইবনে নাফিস। এই ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতা মুসলমান সমাজ হারিয়ে ফেলেছে। পরবর্তী সময়ে তাদের চিন্তাকে না কেউ ক্রিটিক করতে গেছে, না পরিমার্জন পরিবর্ধন করতে চেয়েছে। যে কাজটা হয়েছে ইউরোপে।

ইউরোপ যেমন তাদের রুহানিয়াত ধরে রেখে স্বর্ণযুগের ইসলামি সভ্যতা থেকে উপকৃত হয়েছে, সেভাবে মুসলমান সভ্যতাও উপকৃত হতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাস কেবল মুসলমানের ইতিহাস না। মানবজাতির ইতিহাস। মুসলিমরা এক সময় পারসিক, ভারতীয় ও গ্রিক জ্ঞান জড়ো করেছে। সেটাই তুলে দিয়েছে আধুনিক ইউরোপের হাতে। সভ্যতার পরবর্তী ওয়ারিশ হতে গেলে সেটুকুকে নিয়েই পরবর্তী পথ এগিয়ে  যেতে হবে। অযোগ্যের হাতে আল্লাহ নেতৃত্ব দেন না। তবে বাইরের চিন্তাধারাগুলোকে ক্ষুধার্ত ভোক্তার মতো না গিলে যাচাই-বাছাই করে উত্তমটুকুকেই নেয়া উচিত।

মুসলমানদের সেকট্যারিয়ান হওয়া নিয়ে দার্শনিক মুহম্মদ ইকবাল প্রায়ই আক্ষেপ করতেন। বিন নবির কাছে আদতে সেকট্যারিয়ান হওয়াটা বড় কোন সমস্যা না। প্রতিটা মানুষের বেড়ে উঠার ভিন্নতা তার ভেতরে ধর্ম সম্পর্কে বুঝাপড়ায় ভিন্নতা দেয়। বিশ্বাস বিষয়টাই বহুমাত্রিক। কেউ হয়তো খোদার আলিম নামের স্মরণে আবেগতাড়িত বেশি হন, কেউবা রহমান নামে। ফলে ‘বিশ্বাসী” বলে জেনারেলাইজ করে ফেললেও বিশ্বাসীর কাফেলাকে কখনোই হোমোজেনাস বানানো সম্ভব না । বিশ্বাস যেন এক প্রশস্ত বাগান। ব্যক্তি তার বুঝ অনুসারেই গাছ নির্বাচন করে ও সাজাতে চায়। যদি দ্বন্দ্ব থামিয়ে সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায়, বিশ্বাসের বৈচিত্র্য মূলত সৌন্দর্যই।

সার্বিক ভাবে বলতে গেলে মুসলিম সভ্যতার সমস্যা হলো ‘অরিজিনাল আইডিয়া’ এর শূন্যতায় ভোগা। মুসলিম সমাজ সেটাতে তীব্র ভাবেই ভুগছে। অরিজিনাল আইডিয়ার উৎপাদন না থাকলে যে কোন জাতিই একটা প্রাচীন গর্তে পাক খায়। আটকে থাকে কল্পিত স্বর্ণযুগে। অথচ পরিণত হয় বর্তমানের বন্ধ্যা জমিতে। যার অস্তিত্ব আছে, ইতিহাসও আছে কিন্তু উপযোগ নেই। মুসলিমরা স্বর্ণযুগেও বহুধা বিভক্ত ছিল। জাবারিয়া, কাদারিয়া, মুতাজিলা, আশারিয়া, সুফি, শিয়া ও খারেজি মতবাদ ইসলামের প্রথম তিন শতকের মধ্যেই সৃষ্ট। সামগ্রিক সভ্যতায় তাদের স্বতন্ত্র অবদান এখনো চর্চিত। চিন্তার ক্ষেত্রে তাদের প্রাগ্রসর ছাপ অনস্বীকার্য। এমনকি যাদের নামের পাশে ধর্মত্যাগের অভিযোগ দেয়া হয় (যেমন ইসহাক আল রাওয়ান্দি বা আবু বকর আল রাজি), তাদের সৃষ্টকর্মেও বিস্তৃত হয়েছে সভ্যতার পরিধি।

মুসলিম সভ্যতার বর্তমান দেউলিয়াত্ব প্রমাণিত হয় ঘুরে ফিরে সব আলোচনায় ফারাবি, রুশদ, ইমাম গাজালি বা ইবনে খালদুনের ফ্রেমে আটকে যাওয়ার মাধ্যমে। তারা কেউ পরিত্যক্ত নন। কিন্তু বর্তমানে যে ফারাবি বা রুশদের কথা কেবল গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় হয়ে উঠছে, মালেক বিন নবির কাছে এটাই বিপদজনক। কারণ চিন্তার পরিমার্জন বা পরিবর্ধন না ঘটলে যুগের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতা রাখা অসম্ভব। আত্মা সম্পর্কে ইবনে সিনার অভিমত অনেক দিক দিয়েই অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু পরবর্তীতে কে কে এগিয়ে নিয়েছে সেই চিন্তাকে? এই শূন্যতার শেষ পরিণতি হতাশ প্রজন্ম। যারা অস্তিত্বের বিবেচনায় নির্বিচারে গিলতে থাকে পশ্চিমা প্রগতিবাদ। কিন্তু সেটাও কি আরেক ধরণের অনুকরণ নয়? মানুষ ভুল করে ও করবে। তার জন্য জারি থাকবে ফিরে আসার সুযোগ। তবে মানবজাতির জন্যই সেই ‘অরিজিনাল আইডিয়া’-এর পরিবর্ধন প্রয়োজন। প্রয়োজন নতুন মাত্রা  আবিষ্কার করা।

মালেক বিন নবি সারাজীবন মুসলিম সভ্যতার অবক্ষয়ের কারণ, বর্তমান সমস্যা ও মুক্তির পথ নিয়ে কাজ করেছেন। ইবনে খালদুনের মধ্য দিয়ে প্রাচ্যের বৌদ্ধিক চর্চার যে আলো থমকে গিয়েছিল, তাকে উসকে দিয়েছেন প্রাচ্যীয় জ্ঞানতাত্ত্বিক বয়ানের ভেতরে থেকেই। এজন্য জামাল উদ্দিন আফগানি, স্যার সৈয়দ আহমদ খান ও মুহম্মদ ইকবালের মতো তিনিও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেন। কারণ অগ্রগতির নানা রূপ থাকলেও অবক্ষয়ের রূপ প্রায়ই এক রকম। ফলে আলজেরিয়ার সমস্যা পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশেরও সমস্যা, যা বিন নবিকে একই সঙ্গে স্থানিক ও বৈশ্বিক করে তোলে

Share:

আরো পড়ুন