ইকবাল চিন্তায় ‘খুদি’ তালাশ

রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর। পাঠক পরিচয় নিয়েই স্বচ্ছন্দ। আগ্রহ ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও পুরাণ নিয়ে। প্রকাশিত বই সাইরাস (২০২১), মাহদিয়াত (২০২৩) এবং জীবন কিংবা জিজ্ঞাসার জার্নাল (২০২৪)

Share:

ইকবাল যখন কলম ধরেছেন, দক্ষিণ এশিয়া তখন পরাধীন। দুনিয়ার বাকি দেশগুলোতেও মুসলমানদের অবস্থাও তথৈবচ। উসমানি খেলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত না হলেও তাকে ঠিক ‘থাকা’ বলা যায় না। অবশ্য ইকবাল জীবিত থাকতেই সে জ্যোতিহীন লণ্ঠনটিকেও লুটিয়ে পড়তে দেখেছেন ভূমিতে। ভারতে তখন মোগলদের মসনদ হারানোর অর্ধশতকের পেরিয়ে গেছে। বহু আন্দোলন করেও সেগুলো পর্যবসিত হয়েছে ব্যর্থতায়। বিপরীতে পাশ্চাত্য আধিপত্যের সূর্য মধ্যগগনে। এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে বিস্তৃত তাদের উপনিবেশ। পাশ্চাত্যের জৌলুস ও প্রাচ্যের গরিবি খুব ভালোভাবেই দেখেছেন ইকবাল।

বিশ শতকের গরিবি প্রাচ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিকদের একজন ইকবাল। উপমহাদেশের অস্থির সময়ে তিনি যে আদর্শিক বয়ান চালু করলেন, তা ইন্দোনেশিয়া থেকে আলজেরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে পরবর্তীতে। স্বীয় ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার নির্যাসে তার আত্মপরিচয়ের প্রস্তাবনা আলোচিত হয় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৈঠকে। এশিয়া, ভারত কিংবা মুসলিম- চিন্তার এ তিন সিলসিলা থেকেই ইকবাল প্রাসঙ্গিক। আর যেহেতু ইকবাল চিন্তার প্রাণ হলো খুদি। ঘুরে ফিরে আসে খুদি প্রসঙ্গও।

ইকবালের খুদি নিয়ে চর্চার ধরণ নানাবিধ। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দার্শনিককে পাশে রেখে ব্যবচ্ছেদ চলে খুদির। সেই দার্শনিক বয়ান-প্রতিবয়ানের ঝলকানিতে প্রায়ই হারিয়ে যায় ইকবালের সৃষ্টিকর্মে ‘খুদি’ তালাশের চেতনা। ফলে এ প্রবন্ধে আমাদের নজর থাকবে ইকবালের সুবিশাল কর্মকাণ্ডকে হাজির রেখে খুদির উৎস ও ব্যপ্তি তালাশ। যেহেতু খুদি নয়া প্যারাডাইমের সামনে দাঁড় করায় পাঠককে; ফলে শেকড় থেকে শিখর পর্যন্তই চোখ ঘুরবে সময় ও সুযোগে ।

ইকবালের সৃষ্টিকর্ম 

পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে ১৮৭৭ সালের ৯ই নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ইকবাল। বাবা নুর মুহম্মদ ও মা ইমাম বিবি। বাল্যকাল অতিবাহিত হয় বিখ্যাত পণ্ডিত মীর হাসানের সাহচার্যে।[1] উর্দু, আরবি ও ফারসিতে দক্ষতা আসে তখন থেকেই। শিয়ালকোট থেকে এফ.এ পাশ করে ১৮৯৫ সালে লাহোর যান। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে বি.এ. এবং এম.এ ডিগ্রি লাভ নন। লাহোর অরিয়েন্টাল কলেজ এবং পরে সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন ৬ বছর। তারপর ১৯০৫ সালে পাড়ি জমান ইউরোপে। ম্যাকটাগার্ড এবং জেমস্ ওয়ার্ডের মতো দার্শনিকদের কাছে থেকে নেন দর্শনের পাঠ। ইউরোপের দার্শনিক ঐতিহ্য নিয়ে অধ্যয়ন করেন গভীরভাবে। ক্যামব্রিজ থেকে করেন বিএ এবং লন্ডন থেকে ব্যারেস্টারি। এরই মধ্যে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে হোমেলের অধীনে শেষ হয় পিএইচডিও। দেশে ফিরে লাহোর সরকারি কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপক নিযুক্ত হন ইকবাল। অবশ্য দ্রুত চাকরি ইস্তফা দিয়ে পুরো দমে শুরু করেন আইন ব্যবসা।

“সরূর-এ-রাফতা”, সদাকৈনের আঁকা আল্লা ইকবালের প্রতিকৃতি, thesufi.org

মুসলিম দার্শনিকগণ মূলত ছিলেন এনসাইক্লোপেডিক। তারা একই সঙ্গে দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ও বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছেন। আল রাজি (৮৬৫ – ৯২৫ খ্রিস্টাব্দ), ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রিঃ) ও ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রিস্টাব্দ) তেমন বহুমাত্রিকতার উদাহরণ। ইকবালের ক্ষেত্রেও সেই বহুমাত্রিকতার ঐতিহ্য পরিদৃষ্ট হয়। তিনি তিনটি ভাষাতে অনন্য সৃষ্টিকর্ম উপহার দিয়েছেন। ইংরেজিতে লেখা তার ‘রিকনস্ট্রাকশন অব রিলিনিয়াস থট ইন ইসলাম’ দর্শনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যেখানে তার পরিণত দার্শনিক মননের পরিচয় পাওয়া যায়। ফারসিতে লেখা ‘জাভেদনামা’কে স্থান দেয়া হয় রুমির মসনভি ও ফেরদৌসির শাহনামার কাতারে। উর্দু সাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র হিসেবে স্মরণ করা হয় বাল-ই জিবরিলের নাম। তিনটি রচনাতেই প্রাধান্য পেয়েছে খুদি প্রসঙ্গ। এর বাইরে ফারসিতে আসরারে খুদি, রুমুজে বেখুদি ও পায়ামে মাশরিক; উর্দুতে বাংগে দারা, জরবে কলিম ও আরমুগানে হেজাজে খুদির পরিচয়, সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা এসেছে। বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার জীবনের মতো তার রচনাও বহুমাত্রিক। এ বহুমাত্রিক রচনা দিয়েই তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র বিশ্ববীক্ষার সেতু।

খুদির সংজ্ঞায়ন

খুদির উৎস নিয়ে আলাপে সবার আগে আসে সৈয়দ নাজির নিয়াজির প্রসঙ্গ। তাকে বলা হয় ইকবালের বসওয়েল। জেমস বসওয়েল যেভাবে স্যামুয়েল জনসনের সান্নিধ্য ও স্মৃতিচারণকে তুলে এনেছেন; সৈয়দ নাজির সে ভূমিকা পালন করেছেন ইকবালের জন্য। সৈয়দ নাজির একবার আল্লামাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেউ দাবি করে আপনার ‘খুদি’ নীৎশের দ্বারা প্রভাবিত; কারো দাবি অন্য কিছু। এখন আপনিই বাতলে দিন, আপনার খুদি চিন্তার উৎস কী। জিজ্ঞাসা শুনে ইকবাল তার দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দিলেন রহস্য উন্মোচনের। পরের বার সৈয়দ নাজির যখন দেখা করতে আসেন, ইকবাল তার সামনে খুলে দেন কোরান। সেখানে খোদা বলেছেন- ‘তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন। তারাই হল ফাসিক।’[2]

ইকবালের ‘খুদি’ সংক্রান্ত আলোচনায় এ অনুগল্প খুবই প্রাসঙ্গিক।[3] সূরা হাশরের আয়াতের ইশারা হলো- যখন কেউ আল্লাহকে ভুলে যায়, তার পরিণতি হিসেবেই সে আত্মবিস্তৃত হয় বা নিজেকে ভুলে যায়। নিজেকে ভুলে যাওয়ার মানে অবশ্যই খাওয়া, ঘুম কিংবা পরিবারসঙ্গ ভুলে যাওয়া না। মানুষের ভেতরের যে আরো এক ‘আমি’ আছে; যার শেকড় অপার্থিব, তাকে ভুলে যাওয়া। সে আত্মবিস্তৃত মানুষের জীবন কাটে ইন্দ্রিয় নির্ভরতায়। সে ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার আটকে থাকে ভোগ আর উপভোগে। অথচ মানুষ গড়পরতা সৃষ্টির মতো না। যেখানে তামাম জগত তৈরি হয়েছে কুন ফায়াকুনের মাধ্যমে, সেখানে মানুষকে খোদা তৈরি করেছেন নিজ হাতে।[4] খোদা মাটির আদমকে রুহ ফুঁকে দিয়েছেন। তাকে জমিনে খলিফা হিসেবে পাঠিয়েছেন। এই রুহের মধ্য দিয়ে মানুষ তার দুনিয়াবি বাকি বিশেষণকে ছাপিয়ে নতুন পরিচয় অর্জন করে। এ পরিচয় মানুষের জন্য মৌলিক। যে স্বয়ং আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করে, সৃষ্টিজগতে তার অবাধ্য হওয়ার মতো কেউ নাই। আর এ কারণেই এ পরিচয়ে মানুষ যে ক্ষমতা পায়; তা বিস্ময়কর। আসমানি কিতাবগুলোতে তার ভুরি ভুরি উদাহরণও রয়েছে। এমন মানুষের স্পর্শেই নমরুদের আগুন বাগান হয়, ভাগ হয়ে যায় লোহিত সাগর, আরোগ্য লাভ করে কুষ্ঠরোগী কিংবা দ্বিখণ্ডিত হয় চাঁদ। নতুন এ পরিচয়ই ইকবালের খুদি। খুদিকে তাই সেল্ফ, ইগো, অহম কিংবা নিজ বলা যায় না। বরং খুদি হলো মানুষের সত্যিকার সত্যিকার সত্ত্বা বা হাকিকাতে ইনসানিয়াত। এজন্যই ইকবাল বলেন, ‘খুদি যখন প্রকাশ্য অবস্থায় থাকে, তখন তা মোস্তফাময়। খুদি যখন নির্জনতায় থাকে, তখন তা খোদাময়। জমিন, আসমান, আরশ ও কুরসি- কোনো কিছুই খুদির ক্ষমতার বাইরে না।’[5]

খুদি হলো মনুষত্বের সার। খুদির মধ্য দিয়েই মানুষ খোদার খলিফা হয়। ইতিহাসে যারা শহীদ, গাজি ও নফসে মুতমায়িন্না আকারে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছন; তারা মূলত খুদির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তা আখি সিরাজ উদ্দিন উসমান হোন, জামাল উদ্দিন আফগানি হোন কিংবা হোন শাহজালাল আল-ইয়ামানি। যে অপার্থিব শক্তি দিয়ে তারা উম্মাহর ভাগ্য বদলে দিয়েছেন, তার সম্মিলিত পরিচয় খুদি। ইকবাল দাবি করেছন, যদি খুদির যত্ন যথাযথভাবে নেয়া হয়, তাহলে তার মধ্যে অতুলনীয় শক্তি অর্জিত হবে। তখন মাটির মানুষ সহজেই ঝলসে দিতে পারবে মিথ্যা ও ভুলের ঝঞ্জাল।[6] এই যে পৃথিবী বদলে দেয়ার গান, এর পেছনে প্রধান অনুঘটক খুদি। খুদির বৃদ্ধির মাধ্যমেই মানুষ কলবে শহিদ ও কলবে সলিম হয়ে ওঠে। যে নিজের খুদির বিকাশ করে ফেলেছে, ইকবালের চোখে তিনিই মর্দে মুমিন। খুদির সুন্দরতম প্রকাশ ছিল রাসুল (সা.)-এর মধ্যে; এজন্য তিনি আল্লাহর পক্ষে শ্রেষ্ঠ স্বাক্ষ্যদাতা। এইখানেই সূরা আনফালের সেই প্রসঙ্গ আনা যায়। বদর যুদ্ধের দিন রাসুল (সা.) এক মুঠো ধূলা নিয়ে মুশরিকদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেন। সেই ধূলি তাদের চোখে, মুখে ও নাকে যায়। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে শত্রুরা। ওই কথাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সূরা আনফালে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি যখন ধূলা নিক্ষেপ করলেন, তখন মূলত আপনি ধূলা ছুড়েননি। ধূলা ছুড়েছেন স্বয়ং আল্লাহ।’[7] এই আয়াতেই প্রমাণিত হয় বিকশিত খুদির ক্ষমতা। এদিকে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শুনে। তার চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখে। তার হাত হয়ে যাই, যার দ্বারা সে ধরে….।’[8] এখানেও দেখা যায় মানুষের আরেক পরিচয়, যা তাকে মহান করে। খুদি যদি নেহায়েত অহম ও ইগো হয়ে থাকে, তাহলে আরশ, কুরসি কোনোভাবেই খুদির অধীন হয় না। এজন্যই ইকবালের চোখে খুদিকে চিনতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। ইকবাল বলছেন-

‘ভোরের বাতাস এসে আমারে জানিয়ে গেছে ধীরে,

যে জন খুদিকে জানে, তার স্থান বাদশাহী স্তরে

এটাই প্রাণের সার, এখানে বাঁচার সম্মান-

খুদিতে রাজত্ব তোর, খুদিহীনে ঠাঁই আস্তাকুড়ে।

যেভাবে মরুর মাঝে ঝর্ণা খুঁজে ফেরে বেদুইন

সেভাবে এ জনপদে খুঁজতেছি মর্দে মমিন।’[9]

খুদ তকদির সম্পর্ক

প্রতিটি মানুষের মধ্যে খুদি অস্তিত্বশীল; কিন্তু তাকে বিকশিত করতে হয়। প্রস্তুত করতে হয় খোদায়ী আলোয়। তাহলেই তকদির বদল করা সম্ভব। ইকবালের একটা উক্তি খুব প্রচলিত। খুদিকে এমন উচ্চতায় আসীন করো, যেন খোদা তকদির লেখার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, বলো তুমি কি চাও।[10] ঠিক পরের লাইনেই ইকবাল একে চূড়ান্ত আলকেমি হিসেবে রায় দেন। আলকেমি হলো এমন শাস্ত্র, যেখানে সহজপ্রাপ্য ধাতুকে (যেমন সীসা কিংবা লোহা) মূলবান ধাতুতে (যেমন সোনা কিংবা রূপা) পরিণত করা নিয়ে আলোচনা হয়। এক সময় বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, তুচ্ছ ধাতুকে মূল্যবান ধাতুতে পরিণত করা সম্ভব। যাহোক, ইকবালের চোখে খুদির ইতিবাচক পরিবর্তনের চেয়ে বড় কোনো আলকেমি নেই। ইকবাল খোলাখুলি আহবানই করেছেন ‘তু রাজ-এ কুন ফাকাঁ হ্যায় আপনি আঁখো পার আয়াঁ হু যা, খুদি কা রাজ দাঁ হো যা, খোদা কা তরজমাঁ হো যা’। অর্থাৎ তুমি ‘কুন ফায়াকুন’-এর রহস্য; নিজের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখো। নিজের রহস্য জানো; হয়ে যাও খোদার তরজমা।[11] এইখানে খোদার তরজমা বুঝতে ফের প্রসঙ্গ আসে সেই হাদিসের, আমি তার কান হয়ে যাই,.. চোখ হয়ে যাই…., হাত হয়ে যাই…। একই কবিতায় আরেকটু এগিয়ে ইকবাল বলছেন, ‘খুদির মধ্যে ডুবে যাও, এটাই জীবনের রহস্য। সকাল আর সন্ধ্যার বৃত্ত থেকে বের হও, অমর হয়ে যাও’। একই সুর শোনা যায় যরবে কলিমে। তিনি জানাচ্ছেন, জীবন ঝিনুকের মতো, সেখানে খুদি হলো বৃষ্টি বিন্দু। ঝিনুকের দাম কি রইলো, যদি বিন্দুটিকে মুক্তায় পরিণত করতে না পারে। যদি তোর খুদি হয় স্ব-সুরক্ষিত, সৃজনশীল ও টেকসই; তাহলে এটাও সম্ভব যে, মৃত্যুও তোকে মারতে পারবে না।’[12]

যেহেতু খুদির শেকড় খোদার মধ্যে, ফলে পরিণত খুদির চোখে অসম্ভব বলে কিছু নেই। বিশ্বাসীর জন্য এটাই চূড়ান্ত সত্য। কারণ খোদা তকদিরের স্রষ্টা, ফলে খুদিতে খোদার হাজিরা মানে তকদিরে খোদার হাজিরা। খোদা ‘কুন’ বললে যদি সবকিছুই সম্ভব হয়, তাহলে যে খুদির সঙ্গে খোদার সম্পর্ক, তার ‘কুন’ বলার মধ্য দিয়েও সব সম্ভব। অর্থাৎ পরিণত খুদির সামনে কোনো প্রতিবন্ধকতাই দিনশেষে প্রতিবন্ধকতা না। এটাই চূড়ান্ত তকদির। উদাহরণ হিসেবে, কাঁচের দেয়ালে কাদা দিয়ে ঢিল ছুড়লে কাঁচ অক্ষত থাকবে, কিন্তু পাথর দিয়ে ছুড়লে কাঁচ গুড়িয়ে যাবে। এটাই কাঁচের তকদির। ফলে কেউ যদি কাঁচ ভাঙতে চায়, তাকে অবশ্যই পাথর হাতে নিতে হবে। এখানে ইকবালের দাবি, কাঁচ ভাঙতে চাইলে নিজেকে কাদার মতো না বানিয়ে পাথর বানাও। একইভাবে কেউ যদি কোনো ব্যক্তি কিংবা জাতির ভাগ্য বদলাতে চায়, তাদের নিজেদের বদলাতে হবে। এজন্যই খুদির ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। ইকবাল মনে করেন, কোনো জাতির তকদির প্রতিনিয়ত তার কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে থাকে।[13] তিনি স্পষ্ট আহবান জানান,

‘দোয়ায় তোর নিয়তি বদলাইবার পারবো না,

না পারুক নিজেরে তো তুই বদলাই ফেলতে পারবি-

খুদির মধ্যে যদি বিপ্লবের পয়দা হয়

সব সীমাবদ্ধতা উপড়াই ফেলতে পারবি;

শরাব একই থাক, আগের মতোই থাক সরাইখানার হইচই

পান করার তরিকা ও পেয়ালা বদলাই যাক,

তোর দোয়া হয় ইচ্ছা পূরণের জন্য

অথচ আমি দোয়া করি তোর ইচ্ছাটাই বদলাই যাক।[14]

ঐতিহ্য নাকি নীৎশে: একটি ভুলের ব্যবচ্ছেদ

ইকবালকে নিয়ে আলোচনার ময়দানে সবার আগে দাবি উঠে নীৎশের প্রভাব। সম্ভবত এই ধারণা তৈরি হয় ইকবালের ইউরোপ সফরের কারণে সৃষ্টি হওয়া সন্দেহ থেকে। পরবর্তীতে পশ্চিমা হেজেমনি নিয়ন্ত্রিত প্রেস ও পণ্ডিতদের দাবি তাকে শক্ত পাটাতন দিয়েছে। কিন্তু খুদি যদি আত্মপরিচয়বাচক ধারণা; তাহলে সেখানে বাইরের মুখাপেক্ষিতাই কি তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? ইকবাল বলেন, ‘যদি তুই নিজের খুদিটাকে না হারিয়ে ফেলতি, তাহলে বার্গসৌঁর জাদু তোর ওপর কাজ করতো না।’[15] বার্গসৌঁ এখানে কেবল বার্গসৌঁ না, পশ্চিমা দার্শনিক মহলেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। পরের পঙক্তিতেই একইভাবে হেগেলের সমালোচনা করেন ইকবাল।

সৈয়দ নাজির নিয়াজিও ইকবালকে নীৎশের ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলেন। তার প্রধান কারণ নীৎশের উবারম্যানশ বা সুপারম্যান ধারণার সঙ্গে ইকবালের মর্দে মুমিন, ইনসানে কামিল ও মর্দে ফকির ধারণাগুলোকে গুলিয়ে ফেলা। এমন ভুল ধারণাকে চমৎকারভাবে খণ্ডন করেছেন ইকবাল গবেষক ড. মুহম্মদ মারুফ তার লেখা ‘ইকবালস ক্রিটিসিজম অব নীৎশে’ প্রবন্ধে। ১৯২১ সালের জানুয়ারিতে নিকলসনকে লেখা চিঠিতে ইকবাল বলছেন, ‘আমি নীৎশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিশ বছরের বেশি আগে থেকে সুফি মতবাদের ইনসানে কামিল নিয়ে লিখি।’[16] এরপর ইকবাল চতুর্দশ শতকের সুফি আবদুল করিম আল জিলির ওপর লেখা একটা আর্টিকেলের দিকে ইশারা করেন, যা ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকুয়ারি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ সালে। লেখাটা পরবর্তীতে তার ডেভেলপমেন্ট অব মেটাফিজিকস ইন পারসিয়া গ্রন্থে অন্তর্ভূক্ত হয়। ইকবালের লেখা থেকেই প্রমাণিত হয় তিনি সুফি আবদুল করিম আল জিলি ও মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবির ‘ইনসানে কামিল’ ধারণা থেকেই প্রভাবিত হয়েছেন। ইবনুল আরাবির ইনসানে কামিল ধারণা বেশ সুপরিচিত, আল জিলি এ নামে একটি বই-ও লিখে গেছেন।

মুসলিম ঐতিহ্যে ইনসানে কামিলের ধারণা শত শত বছর ধরেই চলে আসছে। তাদের থেকে ইকবালের অনুপ্রেরণাপ্রাপ্তি নীৎশের সঙ্গে তার পরিচয়ের বহু আগেই। বরং নীৎশেকেই এক্ষেত্রে ইকবাল প্রাচ্যের দর্শন থেকে প্রভাবিত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘এটা অসম্ভব না যে, নীৎশেই মুসলিম ও প্রাচ্যীয় ধারণা থেকে অবনমিত রূপ হিসেবে তার বস্তুবাদী ধারণাকে ধার করেছেন।’[17] নীৎশের ওপর যে প্রাচ্যের প্রভাব ছিল, তা তার লেখা থেকেই স্পষ্ট। জার্মান চিন্তার ওপর প্রাচ্যের প্রভাব কেমন, গ্যাটের দিওয়ানের মতো নীৎশের দাজ স্পেক জরাথুস্ত্রও তার একটা উদাহরণ মাত্র।

আল্লামা ইকবালসহ আধুনিক কালের চিন্তকগণ, দ্যা ট্রেজারস অব টাইম, সাদেক্বীন, ১৯৬১ উৎসঃ google arts & culture

নীৎশের প্রভাব না; বরং নীৎশেকে নিয়ে আলাদা বোঝাপড়া আছে ইকবালের। ইকবালের চোখে নীৎশে অনুসন্ধানী, কিন্তু বস্তুবাদী ঐতিহ্য তাকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে দিতে পারেনি। সেই বাইরের চোখ দিয়ে দেখতে চেয়েছে সত্যকে। অথচ পরমের অভিজ্ঞতা পার্থিব দার্শনিকতা দিয়ে নাগাল পাওয়া সম্ভব না।[18] দিনশেষে নীৎশে ব্যর্থ, কারণ শোপেনহাওয়ার ও ডারউইনের মতো চিন্তকদের প্রভাব তাকে আড়াল করে রেখেছিল।[19] নীৎশে আধ্যাত্মিকতার দিকে না হেটে বস্তুজগতের দিয়ে সমাধান চেয়েছেন। এক্ষেত্রে বরং নীৎশের সাথে কার্ল মার্কসের তুলনায় করা যায়। ইকবালের কাছে তারা দুজনেই প্রোফেটিক; কিন্তু আধ্যাত্মিক দিশা না পাওয়ায় দিনশেষে ব্যর্থ। নীৎশের উবারম্যানশ বস্তুবাদী বিবর্তনের ফসল। যদি তিনি পরিণত মানুষ তৈরিতে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির ভূমিকা বুঝতেন, তাহলে পথ হারাতেন না। এজন্যই ইকবাল মনে করেন, ‘নীৎশের হৃদয় বিশ্বাসীর, কিন্তু তার মস্তিষ্ক কাফেরের।’[20] ইকবালের কাছে নীৎশে রুমির মতোই এক অনুসন্ধানী ছিলেন। কিন্তু রুমি শামস তাবরিজকে পেয়েছেন, নীৎশে তা পাননি। বস্তুবাদের মধ্যে ডুবেই নীৎশে মূলত খুদিকে অস্বীকার করেছেন। এর প্রতিধ্বনি দেখা যায় জাভেদনামায়। সেখানে ইকবাল নীৎশেকে চিত্রিত করেছেন দুই দুনিয়ার মাঝখানে। কারণ নীৎশে ‘লা ইলাহা’কে ধরেছে, কিন্তু ‘ইল্লাল্লাহ’ বুঝতে পারেনি।

ফলে ইকবালের খুদির ওপর নীৎশের নয়, বরং মুসলিম ঐতিহ্য থেকে আসা ইনসানে কামিলের ধারণাই প্রভাব বিস্তার করেছে। সেই পরিচয় নিয়েই তিনি ‘আত্মপরিচয়’-এর জয়গান গাইছেন। ইকবাল সজোরে ঘোষণা করছেন, খুদির রহস্য লুকায়িত আছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর মধ্যে। খুদি তরবারির মতো; আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ হলো সেই তরবারির ধার।[21] এটা দাবি যেন কোরানের প্রতিধ্বনি। ‘যারা বলে আল্লাহ আমার রব, তারপর তাতে অবিচল থাকে; ফেরেশতারা তাদের কাছে নাজিল হয়।’[22] অর্থাৎ খোদার সাহায্য এসে পৌঁছায়।

খুদি, প্রাচ্য তাসাউফ

ইকবালের দাবি, খুদি না থাকার কারণেই পশ্চিমা দুনিয়া আলোহীন। খুদির মৃত্যুতেই প্রাচ্য রোগাক্রান্ত। খুদির মৃত্যুতেই আরব হারিয়েছে জৌলুস। ইরান ও ইরাকে পড়ে আছে নিছক হাড়গোড়। খুদির মৃত্যুর কারণে হিন্দুস্তানের মানুষ কয়েদি। এইখান থেকে বের হওয়ার জন্য তাদের কোনো তৎপরতা নেই। খুদির মৃত্যুর কারণেই আলেমরা বেঁচে খাচ্ছে হারামের পর্দা।[23] ইকবালের এই দাবি বেশ কঠিন। কারণ পাশ্চাত্যের খুদিহীন হওয়া আর প্রাচ্যের খুদিহীন হওয়ার প্রকাশ এক নয়। পাশ্চাত্য খুদিহীন হয়েছে সবকিছুকেই পরিবর্তনশীল বানিয়ে নিয়ে। অন্যদিকে প্রাচ্য খুদিহীন হয়েছে সবকিছুকেই অপরিবর্তনশীল ধরে নিয়ে। পাশ্চাত্যে নৈতিক নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে; আর প্রাচ্যে চিন্তার স্থবিরতা। প্রাচ্যের এই গরিবীকে সনাক্ত করে ইকবাল নিজের পরিচয়টুকুও দিয়ে দিয়েছেন। যরবে কলিমে একটা অনুগল্প উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, বেহেশতে প্রখ্যাত সুফি হাকিম সানাই এসে মাওলানা রুমিকে জানাচ্ছেন, প্রাচ্য এখনো ভিক্ষাবৃত্তি করে। তাদের কোনো অগ্রগতি নেই। সে সময় আরেক সুফি মানসুর হাল্লাজ এসে বলছেন, শেষ পর্যন্ত ভারতে একজন মর্দে কলন্দর খুদির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছে। মানসুর হাল্লাজের মুখে এই মর্দে কলন্দরকে দিয়ে ইকবাল নিজেকেই বুঝাতে চেয়েছেন। কারণ ইকবালই খুদির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন।[24]

কোন জাতির নৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শ নিজেকে অস্বীকারের মধ্যে নাই, বরং রয়েছে নিজেকে সত্যায়নের মধ্যে। ইকবাল মনে করেন সংস্কৃতি ও সভ্যতা ভয়ানক সংকটে পড়বে, যদি খুদিকে অস্বীকার করা হয়। কিন্তু প্রাচ্যের জন্য আত্ম-অস্বীকৃতি অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ ইন্দো-ইয়োরোপীয় ধর্মবিশ্বাসে দুনিয়াবিমুখ মরমীবাদ বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে। ইকবালের দাবি, আত্ম-অস্বীকৃতি পরাজিত জাতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে কিংবা এ বৈশিষ্ট্যের কারণে কোনো জাতি পরাজিত হতে পারে। ফলে আত্ম-অস্বীকৃতি স্বয়ং বৈপরীত্যপূর্ণ।

ইকবালের চোখে খুদি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। যে সব শক্তি খুদির বিকাশের পথে অন্তরায়, ইকবাল তেমন সবকিছুকেই সমালোচনার চোখে দেখেন। এ পর্যায়ে তাসাউফের সমালোচনাও বাদ যায়নি। ইকবাল নিজেকে রুমির আধ্যাত্মিক শিষ্য মনে করেন, সেটা তিনি পীর ও মুরিদ কবিতা ও জাভেদনামার মতো সৃষ্টিতে বার বার প্রমাণ দিয়েছেন। তার চোখে প্রাথমিক দিকের সুফিবাদ ছিল বিপ্লবের মতো। এজন্যই ইমাম গাজালির দেয়া ফিলোসোফির সমালোচনাকে ইকবাল ইমানুয়েল কান্টের দর্শনের পাশে রেখে পাঠ করেন।[25] কিন্তু পরবর্তী সময়ে সুফিবাদ পর্যবসিত হয়েছে নেহায়েত দুনিয়াবিমুখতা ও অনুকরণপ্রবণতায়। এজন্য নবির শিক্ষাই নিরাপদ ও সম্পূর্ণ। আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গুহীর ছিলেন পঞ্চদশ শতকের সুফি। তিনি বলেছিলেন, ‘‌রাসুল আসমানে গেছেন এবং ফিরে এসেছেন। কিন্তু আমি হলে আর কখনো ফিরতাম না’। ইকবাল মনে করেন, কেবল এই একটা বাক্যই সুফি ও নবীর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য যথেষ্ট। অধিকাংশ সুফি হাকিকতের অভিজ্ঞতাকেই গন্তব্য মনে করেন গাঙ্গুহির মতো। অথচ নবিদের জন্য এটা যাত্রার শুরু মাত্র। নবিরা সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে দুনিয়া আসেন এবং মানব সমাজে কাজ করেন। তারা দুনিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান।

ইকবাল অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাকে জ্ঞানের উৎস মনে করেন। কিন্তু যদি তা সক্রিয় সত্তার জন্য বিপদজনক রূপ নেয়, তখন তা সমালোচনাযোগ্য। ইকবলের কাছে সুফি হলেন দুনিয়ায় খোদার ইচ্ছার সৃজনশীল ও সক্রিয় প্রতিনিধি। যারা সুফিবাদের নাম নিয়ে সমাজে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, তারা বৈরাগ্যের পথ অবলম্বন করে। ইকবাল ফকিরি আর বৈরাগ্যের মধ্যে পার্থক্য করেন। ফকিরি মানে বৈরাগ্য নয়। জাভেদনামাতে তার প্রসঙ্গে বলছেন,

‘মর্দে ফকির আগুনের গোলার মতো

সুলতানি ও বাদশাহী তার সমানে খড়ের মতো

বাদশাহের শান শওকত খতম করার জন্য তার মুখের একটা পবিত্র হরফই যথেষ্ট;

মর্দে ফকিরের তাকৎ ও বাদশাহের জবর পীড়নের মধ্যে পার্থক্য ঢের

একটা হলো জজবায়ে কলিম আর অন্যটা সামেরির জাদু

মর্দে ফকির তার নিগাহ দিয়ে বিজয় অর্জন করে নেয়।[26]

স্পষ্টত ইকবালের মর্দে ফকির ও সুফি খুদির দ্বারা পূর্ণ। বর্তমানে প্রচলিত বেখুদিময় তাসাউফে ইকবালের ঘোর বিরাগ। ঠিক এই জায়গা থেকেই ইকবাল ফানার বিরোধিতা করেন। কারণ ফানার অর্থ খুদির বিলোপ। ইকবালের চোখে এটা অসম্ভব। ইকবালের ভাষ্য, খুদি খোদার মধ্যে ফানা হবে না। বরং খোদাকে নিজের মধ্যে ধারণ করবে। ধারণ করবে তার গুণাবলি। খোদার রঙে রঙিন হবে। সত্যিকার অস্তিত্বশীল হওয়ার মানে সত্যিকার অর্থেই ‘I am’ বলতে পারা। অস্তিত্বের মাত্রা নির্ধারণের মাপকাঠি এই ‘I am’। বাইবেলে মুসার সামনে এসে খোদা ঠিক যেভাবে বলেছিলেন ‘I am that I am’। বেখুদি ব্যক্তি সেদিক থেকে ‘অস্তিত্বশীল’ নয়। অস্তিত্বের মাত্রায় তারা কেবল বয়ে যাওয়া মুহূর্ত। ইকবালের দাবি, ফানা ধারণা ইন্দো-ইরোপীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের ভেতর থেকে ইসলামে পরবর্তী সময়ে প্রক্ষিপ্ত হয়েছে বলে ইকবাল। অস্তিত্বের ন্যূনতম একক খুদি। এ খুদির বিভিন্ন স্তর আছে। সৃষ্টির মধ্যে মানুষের কাছে এসে খুদি পূর্ণতা পেয়েছে। ফলে চারপাশের তুলনায় সে আরো বেশি বাস্তব। সে নিজেও প্রকৃতির সৃজনশীল পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে খুদির বিলুপ্তি তার সৃষ্টির উদ্দেশ্যের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। বিপরীত দিকে কোরানের সূরা ইখলাসে বর্ণিত চারটি গুণ একটা স্বতন্ত্র খুদির ধারণা দেয়। যদিও ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামে খোদাকে ইন্ডিভিজুয়াল আকারে না পাঠ করার প্রবণতা আছে। রূপক হিসেবে দাঁড় করানো হয়। এক্ষেত্রে দলিল হিসেবে আনা হয় কোরানের সূরা নূরের ৩৫ নম্বর আয়াতকে। কিন্তু ইকবালের কাছে আয়াতটিকে পরবর্তী অংশ সমেত পাঠ করলেও খুদিরই নির্দেশনা পাওয়া যায়। সেদিক থেকে ইকবালের চোখে খোদা হচ্ছেন আল্টিমেট ইগো বা পরম খুদি বা সুপ্রিম ‘I am’।

পরম খুদির সঙ্গে মানুষের সংযোগ পদ্ধতির নাম ইবাদত। ইকবালের কাছে ইবাদত হলো নিজের ভেতরের শক্তিকে বাড়ানোর মতো। একটা কনক্রিট জীবনের অভিজ্ঞতা দেয় ইবাদত। সত্যের পথে কেউ এগিয়ে যায় পদচিহ্ন ধরে, কেউ এগিয়ে যায় কস্তুরির ঘ্রাণে। এভাবে সব ধরনের জ্ঞানার্জনই এক ধরনের ইবাদত। যে পদার্থ ও জীববিজ্ঞানী, সেও এক ধরনের সুফি। এভাবে ইকবালের তাসাউফ এক সক্রিয় আধ্যাত্মিকতার ধারণা সামনে আনে, যা খুদির সফলতার মধ্যেই নিহিত।

মিল্লাত মসিহা

ইকবাল বলছেন, ‘যদি খুদির সঙ্গে জ্ঞান একত্র হয়, তাহলে জিবরাইলের গায়রত আসে। যদি খুদির সঙ্গে প্রেম মিলে, তাহলে পয়দা হয় ইসরাফিলের ক্ষমতা।[27]এভাবে প্রথমে ব্যক্তি খুদি সম্পর্কে অবগত হবে, তারপর তৈরি করবে একটা খুদিময় জাতি। ইকবাল দাবি করছেন, যে জাতির তরুণদের খুদি ইস্পাতের মতো কঠিন। সে জাতির জন্য ধারালো তরবারির দরকার হয় না।[28] একই পুস্তকের আফগানিদের উদ্দেশ্য করে ইকবাল বলতেছেন, রোম বদলে গেছে, সিরিয়া বদলে গেছে। ভারত বদলে গেছে। হে পর্বতের সন্তান আফগান। তুই নিজের খুদি চিনে নে। মৌসুম সুন্দর, পানিও যথেষ্ট আছে, মাটিও উর্বর। এমন মাটিতে যে কাজ শুরু না করবে, সে সত্যিকার কৃষক না।[29]

ইকবাল যখন চিন্তা করছেন, তখন ভারতে জাতীয়তাবাদের ভরা জোয়ার। ইউরোপ সফরকালে সেখানকার জাতীয়তাবাদ দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এই ধরণের জাতীয়তাবাদে ইকবালের ভরসা ছিল না। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ভুক্তভোগী ছিল মুসলিম দেশগুলোও। ফলে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে ইকবাল দেখেছেন মূর্তিপুজার আদলেই।[30] এর বিপরীতে ইকবাল সামনে আনেন মিল্লাতের ধারণা। ইকবালের মিল্লাত হলো পরিণত খুদির অধিকারী ব্যক্তিদের সমাবেশ। মানুষ জগতের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আবিষ্কার ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খুদির অগ্রগতি সাধন করে। যখন সেই খুদি পরিণত অবস্থায় যায়, তা মিল্লাতে নিহিত হয়। এটা খুদির বিলোপ না। কারণ এমন ব্যক্তিরাই মিল্লাতের শক্তি। এভাবে মিল্লাত আর ব্যক্তি পরস্পর পরস্পরকে প্রতিফলিত করে। ব্যক্তি প্রকাশিত হয় মিল্লাতের মধ্য দিয়ে, আর মিল্লাত সুগঠিত হয় ব্যক্তির মধ্য দিয়ে।

সৃষ্টির প্রতিটা স্তরেই জীবন দৃশ্যমান। জীবনের স্তর নানাবিধ। মানুষের মধ্যে এসে পূর্ণতা পেয়েছে জীবন। ব্যক্তি নিজে পরিণত হয়েছে সৃষ্টিজগতের অনিবার্য কেন্দ্রে। এভাবে জীবনের মাত্রা অনুযায়ী সৃষ্টিজগতে খুদির প্রকাশ ঘটে। সেই অনুযায়ী নির্ধারিত হয় প্রকৃতির ওপর অধিকার। ইকবালের চোখে, বিশ্বজগত হলো অজস্র খুদির সমাবেশ। কিন্তু এ সমাবেশ সমাপ্তি বাচক না। অর্থাৎ প্রতি মুহূর্তে এখানে নতুন খুদি যুক্ত হচ্ছে এবং পুরনো খুদি জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। এভাবে মহাবিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে তার পরিণতির দিকে। অর্থাৎ ‘আদিম বিশৃঙ্খলা’  থেকে ‘পরিণত কসমস’-এ রূপ নিচ্ছে। তার মানে পৃথিবীর কাজ কখনোই সমাপ্ত হয়নি; এখনো নয়। বরং সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়ত চলমান। এ সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার মধ্যে মানুষেরও অংশগ্রহণ রয়েছে। এভাবে ইকবাল মনে করেন, বিশ্বজগতে মানুষ সৃষ্টি সত্তা নয়। বরং সক্রিয় কর্তা সত্তা। প্রসঙ্গ ক্রমে আরেকটা কথা সামনে আনা যায়। কোরানে সূরা ইসরার ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘তারা জিজ্ঞাসা করে, রুহ কি। আপনি বলে দিন রুহ হলো আল্লাহর আদেশে।’ অন্যদিকে ২৩ নম্বর সূরায় আল্লাহ কাদায় তৈরি দেহে রূহ ফুঁকে দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন (১২-১৪)। অর্থাৎ মানুষ বিভিন্ন ধাপে তৈরি হয়েছে। আগে শরীর পরে রুহ। সৃষ্টির প্রথম দিকে চিন্তা চালিত হতো শরীর দিয়ে। কিন্তু যখন থেকে রুহ আসন গ্রহণ করলো। শরীরের চালনাশক্তি পেল বুদ্ধি। ফলে সেমেটিক সিলসিলায় ‘The Fall of Adam’ নামে পরিচিত, তা ইকবালের চোখে ‘The Rise of Adam’। কারণ এর মধ্য দিয়ে মানুষ এপেটাইটের বাইরে বৌদ্ধিক নতুন অবস্থায় উন্নীত হয়।

ইকবালের মতে, কোরান সর্বশেষ আসমানি কিতাব ও রাসুল (সা.) সর্বশেষ নবী। এই ঘোষণাই সব রকমের মসিহাবাদ থেকে ইসলামকে আলাদা করেছে। ইসলাম পরিণত ধর্ম হিসেবে মসিহাবাদী ধারণা থেকে মুক্ত। মসিহাবাদ খুদির প্রকৃত প্রকাশের পরিপন্থী হিসেবে যায়, তৈরি করে নিষ্ক্রিয়তা। ইকবাল মনে করেন, ইসলামের মূল প্রবণতার ওপর ইন্দো-ইউরোপীয় মসিহাবাদের প্রভাবেই মসিহাবাদ প্রক্ষিপ্ত হয়েছে।

আত্মা শরীরের দ্বন্দ্ব!

ইকবালের চোখে ‘আমি’ অস্তিত্বশীল, এই ব্যাপারে কোন তর্ক নেই। তর্ক হতে পারে ‘আমি’-এর গতিপ্রকৃতি নিয়ে। একই ভাবে খুদির অস্তিত্ব বিতর্কের উর্ধ্বে, তর্ক হতে পারে খুদির প্রকৃতি নিয়ে। ইমাম গাজালি বলেছেন, ইন্দ্রিয় দিয়ে যে তথ্যগুলো আমরা পাই, তা সন্দেহমুক্ত নয়।  দেকার্ত তার ডিসকোর্স অন মেথডে দাবি করেছেন, এই সন্দেহই ‘আমি’-এর অস্তিত্ব প্রমাণ করে। ইকবাল এদিক থেকে কিছুটা দেকার্তিয়ান। তার ভাষায়, দুনিয়ায় যা কিছু আছে, তার সবকিছুকেই সন্দেহ করা যায়। কিন্তু যদি বলা হয়, ‘আমি’ একটা গোলকধাঁধাঁ। তাহলে এই ফায়সালাটা কে দিল? সেটা তো ‘আমি’। দুনিয়ার সবকিছুর অস্তিত্ব দলিলসাপেক্ষ। ইন্দ্রিয়ের তথ্যে ভরসা রাখা যায় না, আকল ঠিক মতো ধরতে পারে না। কিন্তু ‘আমি’ বোঝার জন্য কোনো দলিলের প্রয়োজন নেই। নিজের দিকে তাকালেই বুঝা যায়। যদিও দেকার্ত ও ইকবাল দুই জনের জন্যই খুদি ইনটুইশনের পাটাতন। তবে দেকার্তের খুদি যৌক্তিক ও বৌদ্ধিক। কিন্তু ইকবালের খুদি দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসায়। একথা সত্য খুদি সব সময় পূর্ণ নয়; তার প্রতিবন্ধকতা আছে। কিন্তু তার মানে খুদিকে অস্বীকার করার কিছু নেই। দশম শতকের দার্শনিক ইবনে মিশকাওয়াহ প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, নশ্বর সৃষ্টিতে আত্মা অপার্থিব। এ অপার্থিবতাই তাকে অবিনশ্বরতা দিয়েছে। আত্মার আলাপে ইবনে সিনাও তাকে শরীরের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন। গাজালির চোখে আত্মা হলো অবিভক্ত একক। এই আলাপকেই এগিয়ে নিয়ে ইকবাল বলতেছেন, খুদি নিজেকে একটা একক আকারে প্রকাশ করে, তাকে আমরা মানসিক অবস্থা বলি। পৃথকভাবে মানসিক অবস্থা বলে কোনো কিছু অস্তিত্বশীল না। খুদির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো স্বকীয়তা। আমাদের হাসি, কান্না, দুঃখ বেদনা আমাদের নিজস্বতা তৈরি করে। সেটা প্রভাব ফেলে আমার খুদির ওপর।

ইকবালের মতে, খুদির দুই ধরণের অভিমুখ রয়েছে। প্রথমটা সমঝদারি ও দ্বিতীয়টি ক্রিয়াশীলতা। সমঝদারি জীবন ও জগতের রহস্য ও গোপন সূত্র অনুধাবন করে। অন্যদিকে ক্রিয়াশীলতা কাজ করে বাইরের দুনিয়া নিয়ে। মনোবিজ্ঞান পড়ার মধ্য দিয়ে মূলত খুদির ক্রিয়াশীলতা নিয়ে পড়াশোনা করা হয়। কিন্তু খুদির সমজদারির জন্য দরকার মেডিটেশন ও কনটেমপ্লেশন। খুদির এই দিকটাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়, এজন্যই জীবন হয়ে পড়ে স্থবির। ইকবালের কাছে জীবন প্রবাহিত নদীর মতো। এটা অনন্ত থেকে শুরু ও অনন্তে গিয়ে শেষ হয়েছে। ফলে খুদিও সব সময় গতিশীল। এই গতিশীল থাকাই খুদির নিয়তি। খুদিকে কিন্তু ইকবাল দেহের বিপরীতে দাঁড় করাননি। দর্শনের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত তর্কগুলোর একটি মাইন্ড-বডি ডাইকোটমি। ইকবাল এই টানাপড়েনকে বাতিল করে কোরানে ঠাঁই নিয়েছেন। তার মতে, কোরান শরীর ও আত্মাকে বিপরীতে দাঁড় করায় না। কোরান যখন পুনরুত্থানের কথা বলে, তখন তা কেবল মানসিক না; শারিরীকও। দেহের খাঁচায় আত্মা বন্দি, এটা কোরানিক স্পিরিটের সঙ্গে যায় না। কারণ শরীর ও আত্মা মিলিয়েই একটা একক। শরীর ছাড়া আত্মা বা আত্মা ছাড়া শরীর তার পরিচয় হারায়। হাশরের মাঠে বিচার শরীরের বা আত্মার না, দুইয়ের মিলিত যে একক, তার। কোরানে তাই আত্মার অমরত্বের চাইতে মানুষের অমরত্ব গুরুত্বপূর্ণ। মাইন্ড ও বডি সেখানে কেবল একই মুদ্রার দুই পিঠের মতো।

খুদির মানুষ

খুদির পথে বড় বাধা হলো বস্তু। সত্যিকার খুদি এই বস্তুর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। খুদি জীবন পায় অগ্রবর্তী বাধাকে অতিক্রম  করার মধ্যে। সে অতিক্রমের পথে থেমে যাওয়ার আরেক নাম মৃত্যু। এজন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সময় হলো  সবচেয়ে সুবর্ণ মুহূর্ত। খুদির সামনে অসম্ভব বলে কিছু নাই; তবে তার জন্য যোগ্য হয়ে উঠা জরুরি। আর সেটা হলে কোনো অতীত বর্তমান ভবিষ্যত থাকে না। ইকবাল মনে করেন, প্রেমের পথে সময় অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতে আবদ্ধ নয়। আরোও অনেক রকম সময় আছে, যাদের নাম নেই। ইকবালের দাবি, খুদি ছাড়া মানুষ অসম্পূর্ণ। কারণ সে সময় কেবল তার মুহূর্তের আনন্দ দরকার। পরে সেই সাময়িক আনন্দের জন্য অনুশোচনা করে। কিন্তু তারপরও আবার করে ভুল। এভাবে চলতে থাকে চক্রের মতো। অথচ মানুষ নিজে তার নিয়তির নির্মাতা। সে নিজে তৈরি করতে পারে দোজখ বা বেহেশত। দিনশেষে তাকে বাছাই করে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ফলে এই দুনিয়া হলো সত্যিকার খুদি হয়ে উঠার জায়গা। এভাবেই মানুষ ইনসানে কামেল বা মর্দে মমিন হয়ে উঠে। ধর্ম মানুষকে সেই ব্যাকরণের মধ্যে রাখে; যেন তার অন্তর পরিশুদ্ধ হয়। যেন সে হাকিকতকে ঠাহর করতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই বিশ্বাস জরুরি। ইকবাল বলেন, ‍তুমি তো খোদার হাত ও জবান, বিশ্বাস তৈরি করো নিজের মধ্যে, সন্দেহের শিকারে পরিণত হয়ো না।

ইকবালের দাবি, খুদির অস্তিত্ব স্বতঃপ্রমাণিত। কিন্তু মানুষ যতোক্ষণ আল্লাহ থেকে দূরে, ততোক্ষণ সে পূর্ণ নয়। এক্ষেত্রে আসরারে খুদিতে ইকবাল খুদির পূর্ণতার পথে তিনটি স্তরের কথা বলেছেন। প্রথমটি, আইন মান্য করা, দ্বিতীয়টি আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং তৃতীয়টি খোদায়ী খেলাফত। আত্মার অগ্রগতিতে তৃতীয় স্তর হলো খোদায়ী প্রতিনিধিত্ব। তার রাজত্বই দুনিয়ায় খোদায়ী রাজত্ব। মানুষের পরিশীলিত খুদি সম্মিলিত হয়ে সবার কল্যাণার্থে যে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে, সেটাই সত্যিকার গণতন্ত্র। কারণ এর মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সক্ষম খুদিদের অংশগ্রহণ থাকে। তবে এটাও মনে রাখা আবশ্যক, খুদির যাত্রায় শেষ বলে কিছু নাই। তাই বিশ্রাম বলেও কিছু নেই। শেষ একটাই, তা হলো মৃত্যু। কাজ নিজেই সবচেয়ে বড় ধ্যান।

ইকবাল মনে করেন খুদিকে তৈরি করে প্রেম। তবে খুদি, জীবন আর প্রেম তিনটা আলদা না। একটা পর্যায়ে গিয়ে তারা একীভূত হয়ে যায়। তখনই তৈরি হয় ইনসানে কামেল। এই ইনসানে কামেল বা মর্দে মমিনই জমিনে খোদার প্রতিনিধি। ইনসানে কামেলের জ্ঞান আসে ভালোবাসার তত্ত্বাবধানে। ভালোবাসা তৈরি করে বুদ্ধিকে। ভালোবাসার অভাবে মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। প্রেম ছাড়া জ্ঞান মানুষকে বিপথে নেয়। কিন্তু যখন প্রেম জ্ঞানের সঙ্গে মিলিত হয়, মানুষ যেন হয়ে উঠে ফেরেশতা। এভাবে প্রেমের মধ্য দিয়ে খুদি যে শক্তি পায়, তা দিয়ে পাহাড় টলানো সম্ভব। তার মানে কিন্তু ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান উপেক্ষণীয় না। বরং সত্যি-মিথ্যার সিদ্ধান্ত নেয়ায় এর প্রাসঙ্গিকতা জরুরি। ভালোবাসা বুদ্ধিকে সত্যিকার পথ দেখায়। আমাদেরকে অবশ্যই বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করতে হবে। প্রতি মুহূর্তে ভালো ও মন্দ নাজিল হচ্ছে। সেখানে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ রাখতে পারে, সে সফল। খুদি যখন দুনিয়ার চালক হয়ে দাঁড়ায়, ব্যক্তি তখন কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। সেই কর্তার দায়িত্বই খোদা তাকে দিয়েছেন। মানুষ তখনই খোদার সহ-কর্মী।

ইকবালের কাছে মানব অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। মহাবিশ্বে মানুষ হলো অনুর মতো। সমাজ ও সভ্যতার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যক্তির বৃদ্ধি ঘটে। ব্যক্তির এ অগ্রগতির মধ্য দিয়ে পরিণত হয়ে সমাজের সক্রিয় অঙ্গে। সেক্ষেত্রে তার ভূমিকা সৃজনশীল। এরকম অনেক গুলো খুদি মিলিত হয়ে তৈরি করে নৈতিক মূল্যবোধ। তৈরি করে জাতি। এমন সমাজ ও জাতির ইচ্ছার সঙ্গে ব্যক্তির ইচ্ছা সংঘাতপূর্ণ না। এভাবে ব্যক্তির সচেতন প্রচেষ্টার দ্বারা খুদির যাত্রা শুরু। যার শেষ আত্মিক বিশুদ্ধতায়। আর বিশুদ্ধ আত্মাই পারে খোদার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে। ইকবালের এই খুদি ধারণা একদিক থেকে হেগেলিয়ান। তারা দুজনেই নিজের সময়কে পাঠ করেছেন। দুজনেই অতিন্দ্রীয় ও ধর্মীয় ইশারায় হেঁটেছেন। দুজনেই সক্রিয় ছিলেন স্বীয় সমাজে। তবে ইকবাল নিজেকে তার সময় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে পেরেছিলেন। যাহোক, ইকবালের কাছে সম্মিলিত খুদি তৈরি হওয়া জরুরি। কারণ সেটাই মানব সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব করে। আর সম্মিলিত খুদি গড়ে ওঠে একক খুদির মাধ্যমে। একক খুদির প্রেমই তাকে তার লক্ষ্যকে চিনিয়ে দেয়, যেখানে সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো খোদার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। সেটা হলে তার আত্মজ্ঞানই হবে খোদার জ্ঞান। ইকবাল এজন্যই কোরানের এ আয়াতে ইশারা করেন, খোদা মানুষের ঘাড়ের শিরার চেয়েও কাছে থাকেন।

বৈপরীত্য কবিদের সৌন্দর্য। কিন্তু ইকবালের খুদি ধারণায় কোনো বৈপরীত্য নেই। তার কারণ তিনি কবি নন; তিনি এক কলন্দর, যে খুদির রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। যিনি প্রচণ্ড দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘যদি তোর খুদি হয় স্ব-সুরক্ষিত, সৃজনশীল ও টেকসই; তাহলে এটাও সম্ভব যে, মৃত্যুও তোকে মারতে পারবে না।’[31]

তথ্যসূত্র:

১. আসরারে খুদি, মুহম্মদ ইকবাল, লাহোর, ১৯১৫,

২. রুমুজে বেখুদি, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯১৮

৩. বাল-এ জিবরিল, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯৩৫

৪. যরবে কলিম, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯৩৬

৫. আরমুগানে হেজাজ, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯৩৮

৬. জাভেদনামা, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯৩২

৭. বাংগে দারা, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯২৪

৮. পায়ামে মাশরিক, মুহম্মদ ইকবাল, ১৯২৩

৯. The Reconstruction of Religious Thought in Islam, Sir Muhammad Iqbal, Oxford University Press, 1934

১০. Iqbal: poet-philosopher of the East, Sharif al Mujahid, Quid-i Azam Academy, Karachi,1986

১১. A Critical Exposition of Iqbal’s Philosophy, Ehsan Ashraf, Associated Book Agency, Patna, 1978

১২. Introduction to Iqbal, S. A. Vahid, Pakistan Publications, Karachi,

১৩. Romuz-i- Iqbal, Edited by Dr. Zafar Uganwi, 1984
১৪. Iqbal: Mind and Art, Jagan Nath Azad, Modern Publications, Lahore, 1999

১৫.  Iqbal: The life of a Poet, Philosopher and Politician, Zafar Anjum, Vintage Books, 2014

১৬. ইকবাল রিভিউ জার্নাল, ইকবাল একাডেমি, পাকিস্তান

[1] Iqbal: The life of a Poet, Philosopher and Politician, Zafar Anjum, Vintage Books, 2014

[2] আল কোরান ৫৯: ১৯

[3] ইকবাল কা মুতাআলা, সৈয়দ নাজির নিয়াজি, লাহোর, ১৯৪১

[4] আল কোরান ৩৮: ৭৫

[5] বাল-ই জিবরিল, ৯৪ নম্বর কবিতা

[6] যরবে কলিম ৮১ নম্বর কবিতা

[7] আল কোরান ৮: ১৭

[8] সহিহ বুখারি, ৬৫০২

[9] বাল-ই জিবরিল, ৪২ নম্বর কবিতা

[10] বাল-ই জিবরিল, ৫৩ নম্বর কবিতা

[11] বাংগে দারা, ১৬৩ নম্বর কবিতা

[12] যরবে কলিম, ২৫ নম্বর কবিতা

[13] যরবে কলিম, ১৬ নম্বর কবিতা

[14] যরবে কলিম, ১৮৮ নম্বর কবিতা

[15] যরবে কলিম,৮ নম্বর কবিতা

[16] S.A. Vahid. Ed., Thoughts and Reflections of Iqbal, Lahore, 1964, p 93

[17] Note on Nietzsche” in Vahid, Ed„ op. cit., p. 241. In his footnote Vahid states that this note was dictated by Iqbal to late Sayyid Nazir Niazi in the summer of 1937

[18] A.J. Arberry, Javid Name (London : Allen & Unwain, 1966), p. 112.

[19] The Reconstruction of Religeous Thought in Islam, p. 115

[20] পায়ামে মাশরিক, নীৎশে, ২৬৯

[21] যরবে কলিম, ৫ নম্বর কবিতা

[22] আল কোরান ৪১: ৩০

[23] যরবে কলিম, ৮৮ নম্বর কবিতা

[24] যরবে কলিম, ১২৭ নম্বর কবিতা

[25] ‍Sir Mohammad Iqbal, The reconstruction of Religious Thought in Islam, P. 184

[26] জাভেদনামা, জিন্দারুদকে রুমি

[27] বাল-ই জিবরিল, ৬২ কবিতা

[28] যরবে কলিম, ৭৭ কবিতা

[29] যরবে কলিম, ১৯২ নম্বর কবিতা

[30] বাল-ই জিবরিল, ১৪২ কবিতা

[31] কবিতার ক্রম উল্লেখের ক্ষেত্রে ইকবাল উর্দু (Iqbalurdu) ব্লগে উদ্ধৃত ক্রম অনুসরণ করা হয়েছে।

Share:

আরো পড়ুন