ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা

[প্রবন্ধের সার-সংক্ষেপ: রাজনৈতিকতা, গণতন্ত্র ও আধুনিকতা- বাঙালি মুসলমানের জীবনে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঔপনিবেশিক আমলে তারা যে সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে, তা ভুমিকা রেখেছে স্বতন্ত্র কিন্তু প্রতিনিধিত্বশীল পরিচয় নির্মাণে। সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থান, শিক্ষায় পশ্চাৎপদতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মতো সংকট তাদেরকে পরিণত করেছে পৃথক কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে। ইউরোপীয় শাসনের অধীনে আইনি সংস্কার, নির্বাচনী রাজনীতি ও বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর তাতে অংশগ্রহণের প্রয়াস থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা ঘটে প্রতিনিধিত্বের নতুন ধারার। ১৮৫৫ সালে আঞ্জুমানে ইসলামি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয়, তা ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক আত্মসচেতনতার রূপ লাভ করে। ঔপনিবেশিক আমল যখন সমাপ্তি ঘটলো, তখন সেই চেতনা মন্ত্রীসভা তথা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করেছে। এভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি পর্যন্ত বাংলার মুসলমানের এ আচরণ ও তৎপরতারকে সমকালীন মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র বিকাশের সমান্তরালে পাঠ করা যায়। বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সমকালীন মুসলিম বিশ্বের আধুনিকায়নের প্রেক্ষিতে ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক তৎপরতার বিকাশকে পুনর্পাঠ করা।]

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রোজ বুধবার, সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের (সিআইবি) আয়োজনে “ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিখ্যাত লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও অ্যাকটিভিস্টগণ। তারা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের মাধ্যমে চর্চিত গণতন্ত্রের অবস্থা। উঠে আসে সিপাহি যুদ্ধের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলা মুসলমানদের দ্বারা জনপরিসর তৈরি, রাজনৈতিক দল গঠন ও মন্ত্রীসভা গঠনের অভিজ্ঞতার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পটভূমি।

আহমেদ দীন রুমি

সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর। পাঠক পরিচয় নিয়েই স্বচ্ছন্দ। আগ্রহ ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও পুরাণ নিয়ে। প্রকাশিত বই সাইরাস (২০২১), মাহদিয়াত (২০২৩) এবং জীবন কিংবা জিজ্ঞাসার জার্নাল (২০২৪)।

সেমিনার শুরু হয় সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গলের সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট আহমেদ দীন রুমির লিখিত প্রবন্ধ ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা” নামক লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। তিনি দেখান যে, কিভাবে ইতিহাসের ক্রম ধারাবাহিকতায় বাঙালি মুসলমানের চেতনায় গণতান্ত্রিক ভাবনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। আলোচনার মূল সময়কাল ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল। ব্রিটিশপূর্ব সময়কালের, বিশেষত প্রাচীন বাংলার রাজা গোপালের প্রসঙ্গ টেনে, বাংলার রাজনৈতিক তৎপরতাকে তিনি এক ধরণের ‘প্রোটো ডেমোক্রেটিক’ তৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এরপর আলাপ উঠে আসে ব্রিটিশ উপনিবেশে বাঙালি মুসলিমের রাজনৈতিকতায়।
শাশ্বত বাংলার গ্রামীন জীবনে ঐতিহাসিক স্থান-কালে ঘটনা পরিক্রমায় কিভাবে রাজনৈতিক জোয়ার আসে, জোয়ারে বিচ্ছিন্ন চিন্তার নানা কর্মকান্ডকে অতিক্রম করে কিভাবে একটা সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ জনপরিসর গড়ে উঠে এবং কাল পরিক্রমায় সেই জনপরিসর থেকে বাংলার মুসলমান তাদের রাজনৈতিনিক পরিচয় নির্মাণের দিকে যায় এবং পরিশেষে কিভাবে নানা সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিকতার দিকে অগ্রসর হয় তার একটা আলেখ্য নির্মাণের প্রয়াস পান রুমি। তিনি তার আলোচনাকে মূলত তিনটি চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। ১৮৫৫ সাল থেকে ১৯০৫ সালকে তিনি মনে করেন জনপরিসর তৈরির যুগ। পরবর্তীতে ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত সময়কে তিনি দাবি করেছেন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের যুগ হিসেবে। পরবর্তীতে ১৯১২ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত সমায় তার চোখে প্রতিযোগিতা ও মেরুকরণের সময়। সবিশেষ ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের সময়।আহমেদ দীন রুমি বলেন যে, ইংরেজরা ক্ষমতা নেয় মূলত মুসলমান শাসকদের থেকে এবং ফলতঃ স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজদের সাথে তাদের একটা বৈরীতামূলক সম্পর্কের সূচনা হয় ইংরেজদের। এর জের ধরে নানা সিস্টেমেটিক শাসতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা ইংরেজদের কাছ থেকে পান বিমাতাসুলভ আচরণ আর হিন্দুরা নানা সুবিধাদি। সময়ের সাথে সাথে মুসলিমদের অর্থনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান দুর্বল হতে থাকে এবং হিন্দুদের এক ধরণের উত্থান ঘটে। ফলে ইংরেজ তথা ইউরোপীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং ভাল সম্পর্কেরে সূত্র ধরে দেশীয় চিন্তার সাথে ইউরোপীয় জ্ঞান-ভাবনার মিশেলে হিন্দু সমাজের নবজাগরণ ঘটলেও মুসলনমানরা পিছিয়ে পড়ে। যার ফলে হিন্দু সমাজের সচেতন জনপরিসর, নাগরিক ভাবনা তুলনামূলক আগে গড়ে উঠে। মুসলমানদের চিন্তার জাগরণ ঘটে উত্তর ভারতের চিন্তাগোষ্ঠীর হাত ধরে এবং বাংলার মূলসলমানরা সামাজিক-শিক্ষাগত উত্তরণ ভাবনায় নানা সামাজিক-সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের মত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে সমাজ নানা দ্বান্দ্বিক সংস্কারের ভেতর দিয়ে চিন্তা জগতে এক সুদূরপ্রাসারী পরিবর্তনের দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

“পর পর ঘটে যাওয়া দুইটি ঘটনা ‘বাঙালি’ এবং ‘মুসলমান’-এর রাজনৈতিক ভাগ্য বদলে দিয়েছে। প্রথমটি খেলাফতের বিলুপ্তি ও দ্বিতীয়টি কংগ্রেস কর্তৃক বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল। মূলত এর পরই বিপুল সংখ্যক মুসলমান কংগ্রেস থেকে মুখ ফিরিয়ে স্বতন্ত্র রাজনীতির চেষ্টা চালায়। এজন্যই মাত্র পাঁচ বছরে অন্তত তিনটি রাজনৈতিক দল গড়ে উঠে।”- আহমেদ দীন রুমি

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের মত রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয় তখন মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক যুগপথ বিকাশ সাধিত হচ্ছে। মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে আরো বেগবান করে তুলে কংগ্রেসের হিন্দু স্বার্থঘেষা চিন্তা ও নীতির মুসলিম অপরায়নের রাজনীতি। এরই সুত্রধরে একবিংশ শতাব্দীর একদম শুরুতেই নিখিল ভারত মুসলিম লীগের জন্ম হয় এবং সর্বভারতীয় মুসলিমদের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। বাংলার মুসলমান সমাজও রি মুসলমান স সোৎসাহে সমর্থন জ্ঞাপন করে। এতে করে হিন্দু-মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতিও আরো প্রকট এবং প্রতিযোগিতাময় হয়ে উঠে। খেলাফত আন্দলন এবং বেঙ্গল প্যাক্টের ব্যর্থতার পর বেঙ্গল মুসলিম পার্টি, নিখিল বঙ্গ প্রজা-সিমিতি, কৃষক-প্রজা পার্টি এইসব রাজনৈতিক দল বাংলার মুসলমানের আত্মপরিচয় এবং আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠে বলে মনে করেন রুমি। রাজনৈতিক সুসংগঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনি কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা আরো স্পষ্ট এবং মূর্ত হয়ে উঠে বলেও বর্ণনা করেন তিনি।

তাহমিদাল জামি

লেখক-গবেষক

বেঙ্গল হিস্টরি কালেক্টিভের সমন্বয়ক, ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রবন্ধ উপস্থানের পর দেশের বরেণ্য আলোচকরা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের মূল্যবান মতামত রাখেন। আলোচনায় উঠে আসে আধুনিকতা, জাতিরাষ্ট্র, বাঙালি মুসলমানের বিকাশকেন্দ্রিক নানা প্রসঙ্গ। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বেড়ে উঠা ও সরকারে নিজেদের আসন নিশ্চিত করার বিষয় উঠে আসে।

‘বাহাস’ কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের ক্ষেত্র নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক জনপরিসরের আদি উপাদান হিসেবেও ধরা যেতে পারে। – তাহমিদাল জামি

লেখক ও গবেষক তাহমিদ আল জামি। তিনি আলাপের পদ্ধতিগত দিকটায় জোর দিয়ে বলেন যে, ঔপনিবেশিক আমলের আলোচনায় সাধারণত একটা সররলীকরণের প্রবণতা দেখা যায় এবং জাতিগত ইতিহাস নির্মাণের এক পাক্ষিক প্রবণতাও দেখা যায়। একটা সুস্থিত, সুবিন্যস্ত পদ্ধতিগত আলাপ অনেকাংশেই এইসব জটিলতাগত ত্রুটি দূর করতে পারে। তিনি আরো বলেন, জনপরিসর মূলত শাসকগোষ্ঠীর মোকাবেলায় নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং গণসম্মতি সমন্বয়ের ঘটনা। যেহেতু সময়-স্থানভেদে এইসব প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সম্মতি সমন্বয়ের রূপ-বৈচিত্র্য স্বীকার ব্যাপক ফলে এই বৈচিত্র্যতাকে স্বীকার করেই আগাতে হবে যেন ঔপনিবেশিক আমলের জনপরিসরের স্বরুপ আরো স্পষ্ট হতে পারে। ডেমোক্রেটিক প্রসেস বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ধারণার আলাপে তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রে সরকারের ক্ষমতা এবং ক্ষমতা চর্চার বিপরীতে গণ-সার্বভৌমত্বের যে আন্দোলন, লড়াই, সংগ্রাম তা জনপরিসরের আওতাকে আরো বিস্তৃত করে যা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রারই অংশ।

রক মনু

লেখক

কবি। চিন্তক। সমালোচক। নিউ মিডিয়া এক্সপ্লোরার। নৃবিজ্ঞানী। ওয়েব ডেভলপার। ছেলে।

লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ আলাপ শুরু করেন পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচনা দিয়ে। তার পর্যবেক্ষণে ধরা দেয় যে, পশ্চিমা ইউরোসেন্ট্রিক চিন্তার একটা প্রধানতম সমস্যা হল স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে দুনিয়ায় বৈচিত্র্যময় জ্ঞানতাত্ত্বিকতাকে স্বীকার করতে না পারা। তিনি অবশ্য থেকে এক ধরণের কলোনিয়াল এপিসস্টেমিক হেজেমনির অংশ হিসেবেই দেখেন। ফলতঃ জ্ঞানের ডিকলোনিয়াল প্রসেসে এইখানকার মানুষের জীবন ও রাজনীতির মত ঐতিহাসিক সামাজিক সংঘটনগুলো নতুনভাবে, নতুন চোখে দেখার দরকার আছে এবং গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে ইউরোপীয়ই হতে হবে এমন কোন বাধ্যকতা নাই, বরং আমরা বাংলার স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিকতা বুঝার একটা প্রয়াস পেতে পারি।

“আদতে ক্লাস আইডেন্টি হিসাবে অন্যান্য আইডেন্টিকে বাহিরে রাখে না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাঙালি মুসলমান যখনই পলিটিক্স করতে গেছে তার ক্লাস এবং ধর্মীয় পরিচয়কে খুব একটা আলাদা করে যেতে হয় নাই।”- সহুল আহমদ

স্পষ্ট এবং তুলনামূলক প্রাতিষ্ঠানিক এবং নাগরিক জনপরিসরের ঐতিহাসিক স্ফুরণের পরিপ্রেক্ষিত বিচারে বাংলার মুসলমানদের গোছালো বুদ্ধিবৃত্তিকতা মূলত ত্রিমুখী সংকট বা চাপের মধ্যে পড়ে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একদিকে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব, আরেকদিকে হিন্দু মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে সদ্য ঘটিত বেঙ্গল রেনেসাঁর হেজেমনি আর নিজ সম্প্রদায়ের শ্রেণী বিভক্তি ও দ্বন্দ্বের সংকট। এইসব অতিক্রমের স্বপ্নেই পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্মের বীজ রোপিত হয় এবং পাকিস্তান আন্দোলনে বাংলার মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশের এই সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন আর একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বা এক উপরের থিসিস-এন্টি-থিসিস আকারে পাঠ করার যে সংকট বর্তমান সময়ে চারদিকে চাউর হইতে দেখা যায় তার কারণ খুজতে গিয়ে তিনি এইখানকার হিস্ট্রিওগ্রাফির সমালোচনা করে বলেন যে, পাকিস্থান কোন ভুল নয় যে একাত্তরে তা সংশোধনের নিমিত্তে আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে, বরং এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনা মূলত একই ক্রমোন্নতির দুইটা ভিন্ন পর্যায়, ফলতঃ একটা আরেকটার পরিপূরক।

সহুল আহমদ

লেখক ও গবেষক

গবেষণার পাশাপাশি সমকালীন বিষয়াবলীর বিশ্লেষক। জন্ম সিলেটে, ১৯৯১ সনে। পড়াশোনা করেছেন শাবিপ্রবিতে, পরিসংখ্যান বিভাগে। একাধিক জার্নাল সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত বই: মুক্তিযুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহার; জহির রায়হান: মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ভাবনা; সময়ের ব্যবচ্ছেদ (সহ-লেখক সারোয়ার তুষার)। অনুবাদ: ইবনে খালদুন: জীবন চিন্তা ও সৃজন

লেখক ও গবেষক সহুল আহমদ আলাপ শুরু করেন পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বের সমালোচনা দিয়ে। তার পর্যবেক্ষণে ধরা দেয় যে, পশ্চিমা ইউরোসেন্ট্রিক চিন্তার একটা প্রধানতম সমস্যা হল স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে দুনিয়ায় বৈচিত্র্যময় জ্ঞানতাত্ত্বিকতাকে স্বীকার করতে না পারা। তিনি অবশ্য থেকে এক ধরণের কলোনিয়াল এপিসস্টেমিক হেজেমনির অংশ হিসেবেই দেখেন। ফলতঃ জ্ঞানের ডিকলোনিয়াল প্রসেসে এইখানকার মানুষের জীবন ও রাজনীতির মত ঐতিহাসিক সামাজিক সংঘটনগুলো নতুনভাবে, নতুন চোখে দেখার দরকার আছে এবং গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে ইউরোপীয়ই হতে হবে এমন কোন বাধ্যকতা নাই, বরং আমরা বাংলার স্বতন্ত্র গণতান্ত্রিকতা বুঝার একটা প্রয়াস পেতে পারি।

“আদতে ক্লাস আইডেন্টি হিসাবে অন্যান্য আইডেন্টিকে বাহিরে রাখে না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাঙালি মুসলমান যখনই পলিটিক্স করতে গেছে তার ক্লাস এবং ধর্মীয় পরিচয়কে খুব একটা আলাদা করে যেতে হয় নাই।”- সহুল আহমদ

স্পষ্ট এবং তুলনামূলক প্রাতিষ্ঠানিক এবং নাগরিক জনপরিসরের ঐতিহাসিক স্ফুরণের পরিপ্রেক্ষিত বিচারে বাংলার মুসলমানদের গোছালো বুদ্ধিবৃত্তিকতা মূলত ত্রিমুখী সংকট বা চাপের মধ্যে পড়ে বলে তিনি মন্তব্য করেন। একদিকে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব, আরেকদিকে হিন্দু মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে সদ্য ঘটিত বেঙ্গল রেনেসাঁর হেজেমনি আর নিজ সম্প্রদায়ের শ্রেণী বিভক্তি ও দ্বন্দ্বের সংকট। এইসব অতিক্রমের স্বপ্নেই পরবর্তীতে পাকিস্তানের জন্মের বীজ রোপিত হয় এবং পাকিস্তান আন্দোলনে বাংলার মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। তবে বাংলাদেশের এই সময়ে পাকিস্তান আন্দোলন আর একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বা এক উপরের থিসিস-এন্টি-থিসিস আকারে পাঠ করার যে সংকট বর্তমান সময়ে চারদিকে চাউর হইতে দেখা যায় তার কারণ খুজতে গিয়ে তিনি এইখানকার হিস্ট্রিওগ্রাফির সমালোচনা করে বলেন যে, পাকিস্থান কোন ভুল নয় যে একাত্তরে তা সংশোধনের নিমিত্তে আন্দোলন, সংগ্রাম হয়েছে, বরং এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনা মূলত একই ক্রমোন্নতির দুইটা ভিন্ন পর্যায়, ফলতঃ একটা আরেকটার পরিপূরক।

ড. সাঈদ ফেরদৌস

উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)

এর আগে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর লেখালেখি ও গবেষণার বিষয় সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশ বিভাগ।

নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাঈদ ফেরদৌস তার আলাপে মানুষের ঐতিহাসিক লড়াই, সংগ্রাম এবং তৎপরতা বুঝতে সামাজিক ইতিহাস এবং নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের নিবিড় চর্চার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি ঐতিহাসিক উদাহরন টেনে স্পষ্ট করেন যে কিভাবে বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত পৌছে এবং তা তাদের ভাবনা জগতকে আলোড়িত করে এবং মনন গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। কেননা সময়ের আবর্তে এই মননই আবার ইতিহাসের পট পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

“মুসলিম লীগ পাকিস্তান আনছে বলে মানুষ বিশ্বাস করেছে। সেই মুসলিম লীগকে কয়েক বছরের মধ্যে হটিয়ে যুক্তফ্রন্ট আসল। কিন্তু সেই যুক্তফ্রন্ট কেন কোনোভাবে টিকলো না? এত ক্ষণস্থায়ী যুক্তফন্টের জীবন! এইটার মধ্যেই বাঙালি মুসলমান বা এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পরম্পরার যে ব্যর্থতা তার নিশানা আছে।”- ড. সাঈদ ফেরদৌস

ঔপনিবেশিক আমলের মুসলিমদের রাজনৈতিকতার বুঝাপড়ায় সেক্যুলার ঐতিহাসিক এবং পন্ডিতদের ধর্ম থেকে জাতীয় পরিচয়কে একাট্টাভাবে আলাদা করার যে আকাঙক্ষা এবং সেই আকাঙ্ক্ষাজাত মনোবৃত্তি তার সমালোচনা করে তিনি বলেন যে মানুষ মূলত তার ধর্ম থেকে ঠিক অতটাও আলাদা না। বরং মানুষের যাপিত জীবন, তার সংস্কৃতি, তার লড়াই-সংগ্রাম থেকে উৎসব-উদযাপনে ধর্ম যেভাবে মিশে আছে, তার জীবনের নানা রঙে ধর্ম যেভাবে বাংময় হয়ে উঠে তা থেকে আলাদা করে মানুষকে বুঝার চেষ্টা অত্যন্ত ক্ষীণদৃষ্টির এবং সংকোচিত দৃষ্টিভঙ্গির বলে মনে করেন তিনি। আবার একই সাথে ধর্মীয় বা নৃতাত্ত্বিক জাতিবাদী ইতিহাস নির্মাণের ব্যাপারেও সতর্কতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, জাতীবাদী না বরং জাতীয় ঐতিহ্যিক আবহের উপাদানকে ধারণ করেই সামনের অগ্রগতির পথ দেখতে হবে।

আলোচনার শেষভাগে গিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় উপস্থিত থাকা দর্শকরা মুসলমানদের রাজনৈতিক বিকাশ নিয়ে তাদের মন্তব্য ও জিজ্ঞাসা তুলে ধরেন। উঠে আসে সিলেটের গণভোট ও বাংলায় লীগবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতার প্রসঙ্গও। সকলের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। সমাপনী টানতে গিয়ে সঞ্চালক আসিফুল আবেদীন বলেন, সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের কাজ হলো ইসলামপরবর্তী ও ইসলামপ্রভাবিত বাংলার বহুমাত্রিক চিন্তা ও দর্শনের বিবর্তনকে একাডেমিকভাবে পাঠ করা। বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক তৎপরতা ও বিশেষ করে ঔপনিবেশিক আমলের গণতান্ত্রিক প্রয়াস এক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করে। তিনি ধন্যবাদ জানান অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া সাংবাদিক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও চিন্তকদের।
বাংলায় মুসলমানের রাজনৈতিক কর্তাসত্তা হিসেবে হাজির হওয়ার যে দীর্ঘ সফর; তা পাঠের ক্ষেত্রে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকবে।