মুসলিম সমাজের সমস্যাবিচার ও উত্তরণভাবনা: মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় আধুনিকতা

[প্রবন্ধের সার-সংক্ষেপ: রেনেসাঁপরবর্তী ইউরোপ যে আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে পা রেখেছে; তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীময়। শিল্পায়িত ও প্রাগ্রসর পশ্চিমা সমাজ থেকে উৎসারিত মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা নাড়া দিয়েছে মুসলিম মননকে। ফলে উনিশ শতকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় দেখা মেলে এমন কতিপয় তাত্ত্বিকের, যারা ইউরোপীয় আধুনিকতার প্রতিক্রিয়া মুসলিম আদর্শকে সমকালের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করতে চেয়েছেন। বাংলার মুসলমান সমাজ থেকে সেই প্রবাহের প্রতিনিধিত্বকারী অন্যতম সফল চরিত্র মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ। উনিশ শতকের শেষদিকে বসে তিনি আধুনিকতার চোখ দিয়ে মুসলমান সমাজের কাঁধে চেপে থাকা বহুবিধ সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন। বাংলার মুসলমান তখন শিক্ষায় পশ্চাৎপদতা, কর্মবিমুখতা, শরিয়াহ ও নাগরিক আইনে টানাপড়েন, বহুবিবাহ, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতায় জর্জরিত। বিদ্যমান পরিস্থিতি পরিবর্তনে মির্জা দেলোয়ার নিজের অর্জিত বোঝাপড়া, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে নির্দেশ করে গেছেন পথ। সে নির্দেশনা বিবৃত হয়েছে তার Essays on Mohammadan Social Reform এবং তৎকালীন পত্রিকা The Mussalman ও The Moslem Chronicle-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে। দুঃখজনকভাবে মির্জা দেলোয়ার হোসায়েনের চিন্তাধারা বর্তমানে পঠিত হয় না। বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে তার সংস্কারচিন্তাকে বৈশ্বিক ও দক্ষিণ এশীয় আধুনিকায়নের প্রেক্ষাপটে রেখে পুনর্পাঠ করা।]

গত ২৪ জুলাই, ২০২৫ তারিখে সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গলের (সিআইবি) তত্ত্বাবধানে আয়োজিত হয় ‘মুসলিম সমাজের সমস্যাবিচার ও উত্তরণভাবনা: মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় আধুনিকতা’ শীর্ষক সেমিনার। রাজধানী ঢাকার বাংলামোটরস্থ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন দেশের স্বনামধন্য লেখক, বুদ্ধিজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও গবেষকগণ। তারা তাদের বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন ঊনিশ শতকে বাঙালি মুসলমান তাত্ত্বিক মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তার নানা দিক; সেই সঙ্গে তুলে ধরা হয় বর্তমান বাংলার প্রেক্ষাপটে বহুমাত্রিক মূল্যায়ন।

আহমেদ দীন রুমি

সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল

সেমিনার শুরু হয় মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তাধারা নিয়ে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গলের সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট আহমেদ দীন রুমি। তার আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, কলোনিয়াল ব্রিটিশ আমলে যে সমস্ত মুসলিম চিন্তক ও সংস্কারকরা এসেছেন তাদের মূলত তিন ভাগে বুঝার সুযোগ রয়েছে। প্রথমধাপে নওয়াব আবদুল লতিফদের মতো রক্ষণশীল, যারা জ্ঞানচর্চা এবং সমাজ উন্নয়ন নিয়ে ভাবলেও মুসলিম মানসে পরিবর্তনের ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেননি। তারা মুসলিম ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই মুসলমান সমাজের অগ্রগতি চেয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে রয়েছেন সৈয়দ আমির আলীর মতো সংস্কারবাদীরা। তারা মুসলিম সমাজের অগ্রগতির জন্য ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরে সংস্কারের প্রস্তাব রাখেন। আর সবিশেষ বিপ্লবী চিন্তকরা মুসলিম কম্যুনিটির ধর্মের বুঝাপড়া এবং সমাজকে পাঠ করতে চেয়েছেন আধুনিকতার বুঝাপড়ার জায়গা থেকে। ফলে তারা ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দাবি করেন। আহমেদ দীন রুমি মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদকে বিপ্লবী কাতারের চিন্তক মনে করেন। তার দাবি, মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ মূলত ইউরোপীয় রেনেসাঁর দ্বারা প্রভাবিত। তার জ্ঞানতাত্ত্বিক তৎপরতাকে পাঠ করা যায় মুসলিম বিশ্বে আধুনিকায়নের প্রতিক্রিয়ায় জেগে উঠা অন্যান্য সমাজসংস্কারকদের পাশে। তার চিন্তাকে দেখা যেতে পারে মিশরের মোহাম্মদ আবদুহু, তুরস্কের নামিক কামাল, বিশ্ব-ইসলামবাদের প্রবর্তক জামাল উদ্দীন আফগানি ও উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদের পাশে রেখে।

“উনিশ শতকে বিশ্ব জুড়ে মুসলিম মননের যে আধুনিকায়ন, তাদের সমান্তরালে রেখে পাঠ করা দরকার মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদকে।”- আহমেদ দীন রুমি

মির্জা দেলোয়ার হোসেন আহমদ বাংলা ও আরো বড় পরিসরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট। তিনি ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। স্বাভাবিকভাবেই তিনি ইউরোপীয় রেঁনেসা ও আলোকয়ানের চিন্তায় প্রভাবিত। আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে তিনি মূলত ইউরোপীয় রেঁনেসা এবং আলোকায়নকে ইসলামী স্বর্ণযুগের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও চিন্তার ব্যাপক বিকাশের যে ধারা তার উত্তারাধিকার এবং বিবর্ধন হিসেবে মনে করেন। তার মতে, মুসলিমদের উন্নতির পথ হল সেই ধারার উত্তরাধিকার গ্রহণ করা এবং পরবর্তী ধাপের বিবর্ধনকে বহন করে নেয়ার মনোভঙ্গি। ফলত ইউরোপীয় রেঁনেসা থেকে শিক্ষা ও সার নিয়ে নিজেদের ধর্ম এবং সামাজিক আয়তনকে ব্যাপকভাবে পরিমার্জন এবং সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া দরকার।
মির্জা দেলোয়ার সাহেবের প্রধান প্রধান সংস্কার ভাবনার মধ্যে প্রবন্ধ উপস্থাপক উল্লেখ করেন যে, সমাজ ও ধর্ম, রাষ্ট্র ও ধর্ম এইসব প্রতিষ্ঠানের পৃথকীকরণ জরুরি। মির্জা দেলোয়ার মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ায় কাজটা সহজ হবে। কারণ সেই অর্থে ভারত কখনোই ধর্মরাষ্ট্র হয়ে উঠেনি। মির্জা দেলোয়ার ইসলামের অনুসঙ্গ এবং প্রাসঙ্গিকতাকে দুইভাগে ভাগ করে। ইসলামের নৈতিক দিক এবং আইনী দিক। এই আলাপে তিনি সামনে আনেন কোরানের মাক্কী এবং মাদানী সুরার বিষয়বস্তু। তিনি অভিমত দেন যে নৈতিক বা শিক্ষা, যা অন্যভাষায় বলা যায় ইসলামের স্পিরিট তাতে ইজতিহাদের কোন সুযোগ নেই, তা অপরবর্তনীয়। কিন্তু আইনী বিষয়গুলো নিয়ে নতুন সমাজের প্রেক্ষাপটে ভাবার এবং ব্যাপক পরিবর্তনের সুযোগ আছে যার মধ্য দিয়ে সমাজ তার সমসাময়িক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠার পথ দেখতে পারে।
মুসলিম সমাজে দারিদ্রতার কারণ ভাবিয়েছে মির্জা দেলোয়ারকে। তিনি অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হিসেবে মুসলিম সমাজের অভিজাত শ্রেণীর ভূমিকাকে দায়ী করেন। অভিজাত শ্রেনির ভোগবিলাসী জীবন এবং প্রাকৃত মুসলমানের সাথে বিচ্ছিন্নতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে ইউরোপে যেখানে দাসদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়, সেখানে মুসলিম অভিজাতরা শুধুই ভোগের জন্য দাসদাসীদের ব্যবহার করেছেন, গৃহপরিচারক-চারিকা করে রেখেছেন। মুসলিম সমাজে পুঁজির প্রবাহর নিরবিচ্ছিন্নতা না থাকার কথাও উল্লেখ করে উত্তরাধিকার আইন, বহুবিবাহ প্রথা এবং সুদের ব্যাপারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক আহমেদ দীন রুমি বলেন যে, তিনি যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে বেশি সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ব্যাপারে মনোযোগী ছিলেন। যদিও তার চিন্তার সমালোচনা করার সুযোগ আছে তবুও তার চিন্তায় মৌলিকতার দিকে মনোযোগ দিয়ে বাংলায় মুসলিম সমাজের আধুনিকায়নকে পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।

মনযূরুল হক

লেখক ও সহ-সম্পাদক, ত্রৈমাসিক পুনর্পাঠ

প্রবন্ধ উপস্থানের পর দেশের বরেণ্য আলোচকরা প্রবন্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের মূল্যবান মতামত রাখেন। আলোচনায় মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তার সমালোচনা ও প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেলোয়ার সাহেব কোথায় কতটুকু প্রাসঙ্গিক হতে পারেন এবং আমাদের চিন্তার গতিমুখ কোনদিকে ঠিক হতে পারে; এসব ব্যাপারে আলোচকরা দিকনির্দেশামূলক বক্তব্য রাখেন।
ত্রৈমাসিক পুনর্পাঠের সম্পাদক ও লেখক মনযুরুল হক। তিনি মির্জা সাহেবকে ক্রিটিক্যালি দেখতে চান। তিনি মির্জা দেলোয়ার সাহেবের চিন্তার প্রান্তিকতা নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। বাংলায় মুসলিমদের অন্যান্য চিন্তাধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, অতীতে দেখা গিয়েছে এ ধরণের সংস্কার ধারণার মধ্য দিয়ে অনেকেই এক পর্যায়ে ইসলামের ‘কোর ভ্যালু’ থেকে দূরে সরে গেছেন। ফলে ধর্মের সাথে বিরোধপূর্ণ অতি সেক্যুলার ঘরানার দলমতে পর্যবিসিত হয়েছেন। সেক্ষেত্রে বিগত সরকারের আমলে ইসলামোফোবিয়োকে সামনে আনেন তিনি। সেক্ষেত্রে এই ধরণের চিন্তার পরিণতি কেমন হতে পারে; সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রতিও জোর দেন তিনি।

“বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে উন্নয়ন, সেক্যুলারিজম এবং ইসলামের কোর ভ্যালু নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব গভীর সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করেছে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের দুর্বল বা নিম্নবর্গীয় অংশ এক প্রকারভাবে প্রান্তিকীকরণ ও সমাজের মূলধারার বাইরে চলে গিয়েছে।”- মনযূরুল হক

অরিত্র আহমদ

গবেষক ও অ্যাকটিভিস্ট

আলোচনার শেষ প্রান্তে আলেম ইফতেখার জামিল তুলনামূলক তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেখতে প্রয়াস পেয়েছেন পুরো ব্যাপারটাকে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটা আলাপ তোলেন যে, বাংলার সংস্কারপন্থী আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে বিশ্বাস ও যুক্তিকে বাইনারি ভাবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আলেমদের জ্ঞানচর্চার ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন বিশ্বাসীরাও তো যুক্তি চর্চা করত, চিন্তায় এক ধরণের স্বাধীনতা এবং গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলেই ইসলামের নানা বিষয়ে স্কলারদের নানা মত ও মাজহাব দেখতে পাওয়া যায়। অপরদিকে, যারা শুধুই যুক্তির কথাই বলেন তারা তো কোন না কোন কিছুতে বিশ্বাস রাখেন। মানুষের যুক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় অর্জিত বোধ-বিশ্বাসের বাইরে নিরেট যুক্তি দিয়েই তো ব্যক্তিক বুঝব্যবস্থা তৈরী হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফলে এই বিশ্বাস আর যুক্তির সত্যিকার অস্তিত্ব আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি এবং এই বাইনারি বুঝতে ও ভাঙ্গতে এই অনুষ্ঠানের মত আলোচনা, সেমিনার ও পারস্পারিক বোঝপড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অপরদিকে প্রস্তাব রাখেন ইসলাম ও মুসলিম কম্যুনিটি নিয়ে চিন্তার জায়াগায় তিনি ইসলামিক থট এবং ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্স এই দুই কনসার্নকে আলাদা রাখার। ইসলামিক থটকে থেকে মুসলিমরা উপকৃত হতে পারে, পেতে পারে পথের দিশা কিন্তু একই সাথে প্রথাগত ঐতিহ্যের বিশেষায়িত পড়াশোনা ছাড়া তাদের হাতে ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সকে ছেড়ে দিতে চান না তিনি। বরং তা বিশেষায়িত আলেমদের মধ্য দিয়ে চালিত এবং বাহিত হওয়াই সমাজের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করেন তিনি। পরিশেষে তিনি এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় আলাপ-আলোচনা চলমান থাকার এবং রাখার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তার আলোচনা শেষ করেন।

“ঔপনিবেশিক আমলে মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের মতো মুসলিম মর্ডানিস্টদের চিন্তার ফলে একাডেমিয়ায় ইসলামিক থট নামে নতুন ডিসপ্লিন তৈরি হয়েছে।”- ইফতেখার জামিল

অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে দর্শকরা তাদের প্রশ্ন-প্রতিক্রিয়ায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্য রাখেন। একজন দর্শক সারি থেকে বাংলার ইসলামকে ‘ইসলামিকেইট’ কি না এই প্রশ্ন রেখে বাংলাকে খুবই ইউনিক কেইস হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন। আরেকজন মন্তব্য করেন, মির্জা দেলোয়ার হোসেন সাহেব মূলত তার সমসাময়িক মুসলিম কম্যুনিটি কেন গরিব এবং তা থেকে উত্তরণের পথ কি তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং সম্ভাব্য কারণ ও সমাধান উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। সেই অর্থে ঠিক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তিনি কনসার্নড ছিলেন না।
অনুষ্ঠানের সমাপনী টানতে গিয়ে সঞ্চালক আসিফুল আবেদীন বলেন, সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের কাজ হলো ইসলামপরবর্তী ও ইসলামপ্রভাবিত বাংলার বহুমাত্রিক চিন্তা ও দর্শনের বিবর্তনকে একাডেমিকভাবে পাঠ করা। মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হয়ে থাকবে। তিনি ধন্যবাদ জানান অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া সাংবাদিক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও চিন্তকদের। বাংলায় মুসলমানের আধুনিকায়নের পথে অগ্রযাত্রার যে ইতিহাস; তা পাঠের ক্ষেত্রে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকবে।

ইফতেখার জামিল

লেখক ও আলেম

আলোচনার শেষ প্রান্তে আলেম ইফতেখার জামিল তুলনামূলক তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেখতে প্রয়াস পেয়েছেন পুরো ব্যাপারটাকে। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একটা আলাপ তোলেন যে, বাংলার সংস্কারপন্থী আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে বিশ্বাস ও যুক্তিকে বাইনারি ভাবে দেখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আলেমদের জ্ঞানচর্চার ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন বিশ্বাসীরাও তো যুক্তি চর্চা করত, চিন্তায় এক ধরণের স্বাধীনতা এবং গ্রহণযোগ্যতা ছিল বলেই ইসলামের নানা বিষয়ে স্কলারদের নানা মত ও মাজহাব দেখতে পাওয়া যায়। অপরদিকে, যারা শুধুই যুক্তির কথাই বলেন তারা তো কোন না কোন কিছুতে বিশ্বাস রাখেন। মানুষের যুক্তির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় অর্জিত বোধ-বিশ্বাসের বাইরে নিরেট যুক্তি দিয়েই তো ব্যক্তিক বুঝব্যবস্থা তৈরী হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফলে এই বিশ্বাস আর যুক্তির সত্যিকার অস্তিত্ব আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি এবং এই বাইনারি বুঝতে ও ভাঙ্গতে এই অনুষ্ঠানের মত আলোচনা, সেমিনার ও পারস্পারিক বোঝপড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অপরদিকে প্রস্তাব রাখেন ইসলাম ও মুসলিম কম্যুনিটি নিয়ে চিন্তার জায়াগায় তিনি ইসলামিক থট এবং ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্স এই দুই কনসার্নকে আলাদা রাখার। ইসলামিক থটকে থেকে মুসলিমরা উপকৃত হতে পারে, পেতে পারে পথের দিশা কিন্তু একই সাথে প্রথাগত ঐতিহ্যের বিশেষায়িত পড়াশোনা ছাড়া তাদের হাতে ইসলামি জুরিসপ্রুডেন্সকে ছেড়ে দিতে চান না তিনি। বরং তা বিশেষায়িত আলেমদের মধ্য দিয়ে চালিত এবং বাহিত হওয়াই সমাজের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করেন তিনি। পরিশেষে তিনি এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় আলাপ-আলোচনা চলমান থাকার এবং রাখার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তার আলোচনা শেষ করেন।

“ঔপনিবেশিক আমলে মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের মতো মুসলিম মর্ডানিস্টদের চিন্তার ফলে একাডেমিয়ায় ইসলামিক থট নামে নতুন ডিসপ্লিন তৈরি হয়েছে।”- ইফতেখার জামিল

অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে দর্শকরা তাদের প্রশ্ন-প্রতিক্রিয়ায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্য রাখেন। একজন দর্শক সারি থেকে বাংলার ইসলামকে ‘ইসলামিকেইট’ কি না এই প্রশ্ন রেখে বাংলাকে খুবই ইউনিক কেইস হিসেবে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন। আরেকজন মন্তব্য করেন, মির্জা দেলোয়ার হোসেন সাহেব মূলত তার সমসাময়িক মুসলিম কম্যুনিটি কেন গরিব এবং তা থেকে উত্তরণের পথ কি তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং সম্ভাব্য কারণ ও সমাধান উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। সেই অর্থে ঠিক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তিনি কনসার্নড ছিলেন না।
অনুষ্ঠানের সমাপনী টানতে গিয়ে সঞ্চালক আসিফুল আবেদীন বলেন, সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের কাজ হলো ইসলামপরবর্তী ও ইসলামপ্রভাবিত বাংলার বহুমাত্রিক চিন্তা ও দর্শনের বিবর্তনকে একাডেমিকভাবে পাঠ করা। মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ সেক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু হয়ে থাকবে। তিনি ধন্যবাদ জানান অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া সাংবাদিক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও চিন্তকদের। বাংলায় মুসলমানের আধুনিকায়নের পথে অগ্রযাত্রার যে ইতিহাস; তা পাঠের ক্ষেত্রে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকবে।