শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ

[প্রবন্ধের সার-সংক্ষেপ: দক্ষিণ এশিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি। জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো সমাজ ও সভ্যতা নিয়েও তার বোঝাপড়া মৌলিক। মানব সমাজের গঠন ও বিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি যে ‘ইরতিফাকাত’ তত্ত্ব সামনে এনেছেন, তা আদিম সমাজ থেকে বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। তবে তিনি কেবল সমাজের পরিবর্তন ব্যাখ্যার মধ্যেই সীমিত রাখেননি আলোচনা; সামনে এনেছেন মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি ও ধর্মের সম্পর্ককেও। সমাজ ব্যাখ্যায় তিনি যে পথে হেঁটেছেন, তা সমকালীন ইউরোপীয় সমাজতাত্ত্বিক হবস, লক ও রুশোর সমাজ ও রাষ্ট্রদর্শনের বিপরীতে বিকল্প এক প্রস্তাব সামনে আনে। এছাড়া সমাজ পরিবর্তনে তার ব্যাখ্যা পরবর্তীতে এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজ সংস্কারকদের প্রভাবিত করেছে ব্যাপকভাবে। দুঃখজনকভাবে শাহ ওয়ালিউল্লাহর সমাজচিন্তার তাত্ত্বিক ও দার্শনিক দিক বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে সে অর্থে আলোচিত নয়। বর্তমান প্রবন্ধের প্রধান লক্ষ্য শাহ ওয়ালিউল্লাহর সমাজ ও সভ্যতা কেন্দ্রিক ‘ইরতিফাকাত তত্ত্ব’ কে গভীরভাবে পাঠ ও পর্যালোচনা করা। পাশাপাশি ধ্রুপদি মুসলিম চিন্তার সঙ্গে তুলনামূলক পাঠের প্রচেষ্টা। আধুনিক মুসলিম মনন ও সমাজ ব্যাখ্যায় যা ব্যাপকভাবে প্রাসঙ্গিক।]

গত ২৯ জুন ২০২৫, রোজ বৃহস্পতিবার, সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের (সিআইবি) আয়োজনে “শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ” শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বাংলামোটরে অবস্থিত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত এ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন দেশের বরেণ্য লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও অ্যাকটিভিস্টগণ। তারা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেন উপমহাদেশের সমাজ ও দর্শন চিন্তার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত তত্ত্ব নিয়ে। উঠে আসে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার চিন্তার অবস্থান, পরবর্তী হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তার চিন্তার প্রভাব ও সমকালীন বাংলায় তার প্রাসঙ্গিকতার নানা দিক।

আহমেদ দীন রুমি

সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল

সেমিনার শুরু হয় “শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ” নামক লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর ইসলামিকেইট বেঙ্গলের সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট আহমেদ দীন রুমি। প্রবন্ধকার বলেন, শাহ ওয়ালিউল্লাহর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তন। ওয়ালিউল্লাহর দর্শন আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, তার চোখে সভ্যতার গতিশীলতার প্রধান কারণ মানুষের বিশেষ কিছু গুণাবলি। এই গুনাবলিই তাকে প্রাণী জগতের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। খাদ্য, পানীয়, জৈবিক চাহিদা ও বাসস্থানের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টিজগতের সবার। সেই প্রয়োজন সবাইকে পুরণ করতে হয়। তবে প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রত্যেক প্রজাতির রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি। সেই দিক থেকে মানুষের জন্য রয়েছে বিশেষ তিনটা গুণ। প্রথমত, রায় আল কুল্লি বা সার্বিক বিবেচনাশক্তি। দ্বিতীয়ত, জারাফাহ তথা নান্দনিকতা বোধ এবং তৃতীয়ত তাকাম্মুল বা পরিপূর্ণতার প্রতি নিরবিচ্ছিন্ন আকর্ষণ; সেটা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে হোক কিংবা অনুকরণের মধ্য দিয়ে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতে, এই তিনটা বিষয় নিশ্বাসের মতো মানুষের মধ্যে থাকে। তবে সব সমাজে সমানভাবে থাকে না। মানুষের স্বভাব, বুদ্ধি ও অনুভুতির পার্থক্যের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভালোমন্দ বিচার ও অনুসরণনের ক্ষেত্রে তারতম্য ঘটে। চিন্তাভাবনার সুযোগ সুবিধার তারতম্যের কারণেও মানুষের অবস্থার তারতম্য ঘটে। আর সেই তারতম্যই সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তন ও কাঠামোকে সংজ্ঞায়িত করে।

উনিশ শতকে ভারতে যে ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম দেখা দেয়, তার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহ। – আহমেদ দীন রুমি

ওয়ালিউল্লাহ পরবর্তী হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক চিত্রও তুলে ধরেন আহমেদ দীন রুমি। তিনি বলেন, উনিশ শতকে ভারতে যে ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম দেখা দেয়, তার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহ। ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমে মুসলিমরা রাজনৈতিক ভাবেই কেবল পরাজিত হয়নি। মুসলিম আইন, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন, সবকিছুই বদলে গেল। ব্রিটিশ মিশনারিদের হাতে তখন ব্যাপকহারে মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে। ১৮০৬-৭ সালের দিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শাহ আবদুল আজিজ ভারতকে দারুল হারব ঘোষণা দেন। অর্থাৎ মুসলমানদের কর্তব্য হয় যুদ্ধ করা না হলে হিজরত করা। ঔপনিবেশিক ইতিহাসে এই ফতোয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরবর্তী মুসলমানদের প্রতিরোধ সংগ্রাম অনেকাংশেই এই ফতোয়া থেকে প্রভাবিত।
প্রবন্ধ উপস্থানের পর দেশের বরেণ্য আলোচকরা তাদের মূল্যবান মতামত রাখেন। আলোচনায় উঠে আসে ধ্রুপদি মুসলিম জ্ঞানচর্চা, ইউরোপীয় সমাজদর্শন ও বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকেন্দ্রিক নানা প্রসঙ্গ। বিশেষ করে মুসলমানদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বেড়ে উঠার পেছনে শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাধারার ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতা উঠে আসে।

কামরুল হাসান নকীব

লেখক ও অনুবাদক

লেখক ও অনুবাদক কামরুল হাসান নকীব শাহ ওয়ালিউল্লাহর ব্যবহৃত কয়েকটি পরিভাষা পুনর্ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, শাহ ওয়ালিউল্লাহর ব্যবহৃত ‘আর-রায় উল কুল্লি’, ‘আল-জরাফাহ’ এবং ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’- এই তিনটা প্রকারই মানুষকে পশু থেকে আলাদা করে। আর-রায় উল কুল্লি বলতে অনেকে public good তরজমা করেন। কিন্তু এই তরজমাটা আমার কাছে সহি মনে হয় না। আর ‘আর-রায় উল কুল্লি’ মানে হচ্ছে সামগ্রিক চিন্তা। public will এর একটা পশ্চিমা এসেন্স তৈরি হয়েছে আমাদের মনে। যেটা আসলে শাহ ওয়ালিউল্লাহর ধারণাকে ধারণ করতে পারে না। তারপরে ‘আল-জরাফাহ’ হচ্ছে নান্দনিকতাবোধ। ‘আত-তাকমিল বিল-ইরাদাহ’ মানে হচ্ছে মানুষ তার নিজের স্বেচ্ছায় যে পূর্ণতা হাসিল করে এবং স্বেচ্ছায় সে যে পশু থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে।

“ইরতিফাকাতের মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো হয় মানুষ সেটা তার ইচ্ছার গুণেই করে। যদি এই ইচ্ছার এলিয়েনেশন হয়ে যায় তখন মানুষ রোবটে পরিণত হবে।”- কামরুল হাসান নকীব

তার মতে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেখিয়েছেন যে, ইরতিফাকাতের মাধ্যমে সমাজ ও সভ্যতার মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো হয় মানুষ সেটা তার ইচ্ছার গুণেই করে। যদি এই ইচ্ছার এলিয়েনেশন হয়ে যায় তখন মানুষ রোবটে পরিণত হবে। আর যদি ইচ্ছা মানুষের ভিতরে থাকে এবং সেটা যদি নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে করে তাহলে মানুষ রোবটে পরিণত হবে না। সমাজও সভ্যতা সভ্যতা দিন দিন আরো উন্নতি হবে।

মেহেদী হাসান

শিক্ষক ও গবেষক

আলোচক মওলবি আশরাফ বলেন, সামাজিক বিবর্তনের ইহজাগতিকতা ও পরজাগতিকতা সমন্বয় ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেটা মূলত খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিল না বলেই তাদের মধ্যে এক ধরনের ধর্মবিহীন বিজ্ঞান চর্চা তৈরি হয়েছে এবং সেটার ফলাফলও তারা পাচ্ছেন। সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ তৈরি হয়েছে। একটা সমাজ যে সমন্বিতভাবে থাকবে এবং জগতের প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যে একে অপরের প্রতি যে সহযোগিতামূলক ব্যাপার আছে, পাশ্চাত্যের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ সেই জায়গাটাকে অস্বীকার করেছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত তত্ত্বকে যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি তাহলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে আমাদের দ্বন্ধের জায়গাটাকে আরো স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।

“ইরতিফাকাত তত্ত্বকে যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি তাহলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে আমাদের দ্বন্ধের জায়গাটাকে আরো স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।”- মওলবি আশরাফ

মওলবি আশরাফ

আলেম, লেখকও সম্পাদক

আলোচক মওলবি আশরাফ বলেন, সামাজিক বিবর্তনের ইহজাগতিকতা ও পরজাগতিকতা সমন্বয় ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেটা মূলত খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিল না বলেই তাদের মধ্যে এক ধরনের ধর্মবিহীন বিজ্ঞান চর্চা তৈরি হয়েছে এবং সেটার ফলাফলও তারা পাচ্ছেন। সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ তৈরি হয়েছে। একটা সমাজ যে সমন্বিতভাবে থাকবে এবং জগতের প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যে একে অপরের প্রতি যে সহযোগিতামূলক ব্যাপার আছে, পাশ্চাত্যের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ সেই জায়গাটাকে অস্বীকার করেছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত তত্ত্বকে যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি তাহলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে আমাদের দ্বন্ধের জায়গাটাকে আরো স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।

“ইরতিফাকাত তত্ত্বকে যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি তাহলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে আমাদের দ্বন্ধের জায়গাটাকে আরো স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো।”- মওলবি আশরাফ

আরিফ বিল্লাহ

চিন্তক ও একটিভিস্ট

তরুণ চিন্তক ও অ্যাকটিভিস্ট আরিফ বিল্লাহ বলেন, আধুনিকতা যখন আসছে তার একটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট হাজির ছিল। এটা বলার কিছু কারণ আছে। ইউরোপীয় সভ্যতা বিস্তার ঘটার পূর্বে পুরো বিশ্বে তিনটা গানপাউডার সভ্যতা ছিল। ঐদিকে ওসমানীয় খেলাফত, এদিকে হিন্দুস্তান এবং চায়না। এ সভ্যতাগুলোর পরস্পরের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের প্রত্যেকের স্ব স্ব আওতাধীন ভূখণ্ডে স্বাধীন বাণিজ্য ছিল। আবার, আরবরাও পুরো পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। সুমদ্র এবং বাণিজ্যিক বন্দরগুলো তারা আবিষ্কার করছে। ফলে মুসলমানরা এই বাণিজ্যিক ভ্রমণের ভিতর দিয়ে পুরো বিশ্বব্যাপী একটা সহযোগিতা ও সামাজিক বোধ গড়ে তুলেছিল। মুসলমানদের সমুদ্র ও ভূখন্ড আবিষ্কারের এই অগ্রগতির সাথে সাম্রাজ্য গড়ার চেতনা আলাদা না; বরং ভালোভাবে সম্পৃক্ত।। আজকে যখন শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত নিয়ে আমরা আলাপ করছি, সেখানে ইরতিফাকাতের চতুর্থ পর্যায় চিন্তাটা কিন্তু একটা সাম্রাজ্যের কল্পনা থেকেই গড়ে উঠছে। উনার এই চতুর্থ ইরতিফাকাতটি পলিটিক্যাল ইউটোপিয়া না।

“শাহ ওয়ালিউল্লাহ মনে করতেন না যে, প্রকৃতি বলতে মানুষের বাইরে আলাদা কোন সত্তা আছে। কিন্তু আধুনিকতার মূল অনুমানই হচ্ছে মানুষ থেকে প্রকৃতির ভেদ।”- আরিফ বিল্লাহ

শাহ ওয়ালিউল্লাহ অথবা মোটা দাগে ইসলামের যখন আমরা একটা দার্শনিক পাঠ হাজির করব তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে এটা আধুনিকতার শর্তাবলীর মধ্যে পড়বে না। আধুনিকতা বলতে আমি গ্রিকো-খ্রিস্টান সভ্যতার কথা বুঝাচ্ছি। কারন শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন ইরতিফাকাত নিয়ে আলাপ করছেন তখন তিনি আল্লাহ, সমাজ ও প্রকৃতিকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করে দেখেছেন। পরস্পরের বিকাশ বা ইচ্ছার বাহিরে মনে করেন নাই। তিনি মনে করতেন না, প্রকৃতি বলতে মানুষের বাইরে আলাদা কোন সত্তা আছে। কিন্তু আধুনিকতার মূল অনুমানই হচ্ছে মানুষ থেকে প্রকৃতির ভেদ। শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন মনে করেন যে প্রকৃতি এবং মানুষ অবিভাজ্যভাবেই উপস্থিত। টেকনোক্রেটিক সাইন্স জগতকে ব্যাখ্যা করতে পারে না বরং জগতের সাথে মানুষের নিত্যকার সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটা নৈতিক ভিত্তি এবং দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মধ্যে আমরা যে মানুষকে পাই সেটা প্রচণ্ড সামাজিক।

মুহাম্মদ তানিম নওশাদ

শিক্ষক ও গবেষক

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লেখক, গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক মুহাম্মদ তানিম নওশাদ। তিনি বলেন, ইসলামী ইতিহাস এবং তার গতিপ্রবাহ নিয়ে বলতে গেলে আমরা খুব বেশি করে ইবনে খালদুনের কথা বলি। আধুনিক কালে ইবনে খালদুনকে জনপ্রিয় করেন আর্নেস্ট গেলনার। তিনি ইবনে খালদুনকে পৃথিবীর এ যাবতকালের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সমস্যা হচ্ছে যে, কোন কোন ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহর অবদান ইবনে খালদুনের চেয়ে বেশি। কিন্তু তাকে নিয়ে সেরকম কোন আলোচনা পশ্চিমা জগতে দেখি না।
তিনি আরো বলেন যে, ইসলামী ঘরানায় তাকে অনেকে আহলুল হাদিস, আহলুল রায় এবং মাতুরিদি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আশআরী ঘরানার দর্শনের প্রভাব উনার উপর আছে। মূলত, তিনি এই সব ঘরানা থেকে তার নিজের মত করে নিয়েছেন। তবে একটা জায়গা থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। তিনি মূলত যুক্তিবুদ্ধি সম্পূর্ণ চিন্তক অর্থাৎ হিকমা বা রিজন এবং লজিকের প্রভাব উনার দর্শনগত জায়গায় খুব বেশি।

“শাহ ওয়ালিউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তাটা হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো সীমিত না করেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা ত্বরান্বিত করতে হবে।” মুহাম্মদ তানিম নওশাদ

তার দাবি, শাহ ওয়ালিউল্লাহর দর্শনগত জায়গাটা হচ্ছে মূলত ভারতবর্ষকেন্দ্রিক এবং সেটা হচ্ছে এমন একটা সময় সেটা মোগল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের সময়টা ছিল ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭। তারপরে আর মোগল সাম্রাজ্য সেভাবে দাঁড়াতে পারে নাই। শাহ ওয়ালিউল্লাহ যখন ইসলামী পন্ডিত হিসেবে সারা দুনিয়াতে খ্যাত তখন মোগল সম্রাট আলমগীরের রাজত্ব। সেই সময় মোগল সাম্রাজ্য সংকুচিত হওয়ার কারনে ভালোমত রাজস্ব উঠানো যাচ্ছিল না। যাদেরকে রাজস্ব উঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হতো তারাও অনেকে ঠিকমত সেই দায়িত্বগুলো পালন করতো না। রাজত্ব নির্ভর করে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় সামন্তদের উপরে এবং তার চেয়েও বেশি নির্ভর করে সৈন্যদের উপর তাদেরকে ঠিকমত বেতন না দেয়ার কারনে কিন্তু মোগল সাম্রাজ্য অনেকটাই পতিত হয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তার বিশেষ একটি দিক হচ্ছে, তিনি সেই সময়কার একেবারে সমাজে অবিকশিত জনগোষ্ঠীর কথাও বলেছেন। যাদের সেইভাবে মূল্যায়ন করা হতো না সেই অংশটাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাঁর সমাজ প্রকল্পে যে, তাদেরকে এক ধরনের সমর্থনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকে রাখতে হবে। মোঘল সাম্রাজ্যের খালিসা রাজস্ব ব্যবস্থার আয় কমে গিয়েছিল। এ কারনে শাহ ওয়ালিউল্লাহর অর্থনৈতিক চিন্তাটা হচ্ছে, মানুষের প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো সীমিত না করেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিটা ত্বরান্বিত করতে হবে। এইটাই ইরতিফাকাত তত্ত্বের মূলভিত্তি। ইরতিফাকাতের একটা সংজ্ঞা এমন হতে পারে, অধিকার ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার সুবিধাজনক উপায়। আমার মতে, এটা হচ্ছে তার দর্শনের মূল কথা। এক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু চিন্তা-ভাবনা সামনে নিয়ে এসেছেন এবং সেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনার শেষভাগে গিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় উপস্থিত থাকা দর্শকরা শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাধারা ও তার পরবর্তী হিন্দুস্তানের মুসলমানদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ নিয়ে নিজেদের মন্তব্য তুলে ধরেন। উঠে আসে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতার প্রসঙ্গও। সকলের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। আয়োজিত এ সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক, আইনজীবী, অ্যাকটিভিস্ট ও চিন্তকরা। তারা মনে করেন, বাংলায় মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক যে ইতিহাস, তা পুনপাঠের ক্ষেত্রে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে থাকবে।