ঔপনিবেশিক আদমশুমারি ও পরিচয়বাদী রাজনীতির সূচনা

রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর। পাঠক পরিচয় নিয়েই স্বচ্ছন্দ। আগ্রহ ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও পুরাণ নিয়ে। প্রকাশিত বই সাইরাস (২০২১), মাহদিয়াত (২০২৩) এবং জীবন কিংবা জিজ্ঞাসার জার্নাল (২০২৪)

Share:

ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী জেএইচ হাটন। ১৯২৯ সালে তাকে ভারতে আদমশুমারি পরিচালনার দায়িত্ব দেয় সরকার। দুই বছর পর তার তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয় আদমশুমারি। এ অঞ্চলে আদমশুমারি পরিচালনার ব্যাপারে তিনি বলেন,‘পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ভারতের মানুষ বেশি ধার্মিক। বিপরীতে আমেরিকার সংস্কৃতি ধর্মের ব্যাপারে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন। ফলে আদমশুমারিতে ভারতীয়দের ধর্ম পরিচয়কে অগ্রাধিকার দিয়েই উল্লেখ করা জরুরি।’

জেএইচ হাটন কেবল নন; গোটা ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ সরকারের নীতি ছিল ভারতের আদমশুমারিতে ধর্ম পরিচয়কে নিজেদের বোঝাপড়া অনুসারে সামনে রাখা। ১৮৭১-৭২ সালে প্রথম বড় পরিসরে যে আদমশুমারি হয়, তাতে সরকারের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিই যেন উঠে এসেছে। সাধারণত আদমশুমারির উদ্দেশ্য থাকে কোনো অঞ্চলের জনসংখ্যা ও তাদের সার্বিক পরিস্থিতি নিরূপণ। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে আদমশুমারি ভিন্ন মাত্রা পায়। আদমশুমারির ওপর ভর করেই চলতে থাকে রাজনৈতিক মেরুকরণ।

ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল ও সেখানকার অধিবাসী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে। প্রথম যখন বড় পরিসরে আদমশুমারি হলো ১৮৭১-৭২ সালে; একই সময়ে গেজেটিয়ারের কাজও চলে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের নেতৃত্বে। সেটা ১৮৮১ সালে ইমপেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া শিরোনামে প্রকাশিত হয়। আদমশুমারি ও গেজেটিয়ার উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের বিভিন্ন অংশের ভূগোল, অধিবাসী ও অর্থনীতি নিয়ে একটা ধারণা দেয়া হয়। আর যেহেতু বহিঃশক্তির হাতে হয়েছে কাজ, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিবেচিত হয়েছে সবকিছু। স্থানীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা সম্পূর্ণ আলাদা। ইউরোপীয় ভূখণ্ডে আদমশুমারি ছিল অনেকটাই সেকুলার প্রক্রিয়া। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আদমশুমারি হলে সেটা হতো ধর্মীয় উদ্দেশ্য সামনে রেখেই। কিন্তু তারাই যখন ভারতের আদমশুমারিতে হাত দিল, বিষয়টা ঘটেছে ভিন্নভাবে। আর এজন্যই ১৮৭২ সালে ভারত প্রথম বড় পরিসরে হওয়া আদমশুমারির পরই এ অঞ্চলে ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠতে শুরু করে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে ধর্ম পরিচয় একটা মৌলিক বিভাগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কেবল সাংখ্যিক নয়; সময়কেও তারা এভাবে পরিচয় করে দিতে থাকে। ভারতীয় ইতিহাসকে হিন্দু ও মুসলিম যুগ হিসেবে ভাগ করতে শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। যদিও ইউরোপে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে বিভক্ত ইতিহাস। ভারতে এসে ধর্ম ও সম্প্রদায়গত পরিচয়কে মুখ্য করে তুলল। ভারতে এ ধর্ম পরিচয়ের বিভেদটুকু মুখ্য করে তোলার কারণে তাদের শাসনকাজ সুবিধাজনক হয়ে উঠেছিল সত্য, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হিসেবে বেড়ে যেতে থাকে রাজনৈতিক অস্থিরতা।

হিন্দু সমাজের বিভিন্ন বর্ণগোষ্ঠীর প্রতিকৃতি—বাঁ থেকে ডানে: কোকণাস্থ ব্রাহ্মণ, দেশস্থ ব্রাহ্মণ নারী, রাজপুত, কোলি জেলে, আওধের পাসি দলিত পুরুষ, এলাহাবাদের বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ এবং তেলেঙ্গানার কোমাটী নারী, ১৮৭৪, Wikimedia Commons

জাতীয়তাবাদ-পরবর্তী সময়ে কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য একটা সাধারণ পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় বিভিন্ন অঞ্চলের ঔপনিবেশিক প্রভুরাই নিজেদের সুবিধামতো সমাজের পরিধি ও স্তর নির্ধারণ করে দিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ কিংবা গোত্রীয় পরিচয়ের মতো। কিন্তু ভারতে সেই জায়গা নিয়েছে ধর্ম। এখানে আদমশুমারির মধ্য দিয়েই পরিচয় টানা হয় হিন্দুরা সংখ্যাগুরু; ফলে তাদের মধ্যে সেই চেতনা তৈরি হয়। সর্বভারতীয় হিন্দুরাষ্ট্র প্রকল্প মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। অন্যদিকে বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণে এখানকার দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক বোধ গড়ে উঠতে থাকে সেভাবেই। আদমশুমারির আগে শাক্ত, শৈব কিংবা বৈষ্ণব আলাদা পরিচয় হিসেবে ছিল। এটাকে দায়সারা এক পরিচয়ের মধ্যে বেঁধে ফেলা জরুরি ছিল না; কিন্তু এটাই ঘটেছে আদমশুমারিতে। আর কতগুলো ভিন্ন পরিচয়কে একটা পরিচয়ে আটকে আনার চেষ্টাই গভীর করেছে উচ্চ শ্রেণী ও নিম্ন শ্রেণীর ধারণাকে।

ঔপনিবেশিক শক্তি ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি ১৮৫৭ সালেই প্রয়োগ করেছিল। বিশেষ করে সিপাহি বিদ্রোহে বড় পরিসরে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ‘অপরায়ণ’ করার মাধ্যমে। তার এক যুগ পার হতে না হতেই আদমশুমারির মাধ্যমে তৈরি হয় সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু ধারণা, এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা তীব্র ছিল, তা ভারতের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিমুখ দেখলেই বোঝা যায়। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু ধারণা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে তৈরি হয় ধর্মীয় পরিচয় ও সাংখ্যিক আধিপত্যের রাজনীতি। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত হিন্দু জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির হার ছিল কম। এমনকি ব্রিটিশ আদমশুমারিতে মুসলিম জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ও হিন্দুর সংখ্যা কমতেও দেখা গিয়েছিল। এমন পরিসংখ্যান হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে যায়। পরিস্থিতিকে আরো ঘোলা করে ব্রিটিশ সরকারের দেয়া বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য। ১৯০১ সালের আদমশুমারির দিকে ইঙ্গিত করে কমিশনার হার্বার্ট হোপ রিজলি প্রশ্ন ছুড়েছেন, এ আদমশুমারি কোনোভাবে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের উল্লম্ফন এবং হিন্দু ধর্মের অবক্ষয় কিনা। সমকালীন হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯০৯ সালে উপেন্দ্র নাথ মুখার্জির লেখা বই ‘হিন্দু: আ ডাইং রেস’। মুখার্জি হিন্দুর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আদমশুমারির তথ্যকে সামনে আনেন। তার লেখার প্রতিপাদ্যই ছিল হিন্দু সম্প্রদায় বিপদে রয়েছে। এমনকি তিনি স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে অনুরোধ করেন, যেন খ্রিস্টান ও মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করা হয়। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ছিলেন অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার নেতা। হিন্দু জাতি বিপদে আছে—এ ধরনের ধারণা বৃদ্ধি পরবর্তী সময়ে ভারতে হিন্দুত্ববাদের শেকড়কে শক্তিশালী করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। উপেন্দ্র নাথ মুখার্জি ১৯২৬ সালেই লেখেন ‘হিন্দু সংস্থান: স্যাভিয়র অব ডাইং রেস’। অর্থাৎ আদমশুমারিতে জনসাংখ্যাগত হিসাব হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার একটা প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

ভারতের প্রথম সর্বব্যাপী আদমশুমারির পর পরই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তীব্র হয়। ১৮৭৯ সালে রাজনারায়ণ বসু লেখেন ‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’। সত্তরের দশকের শেষ দিকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখেন ‘বন্দে মাতরম’। ১৮৮২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাংলার ইতিহাস সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। তার চোখে বাঙালির জাগরণ মানে বাঙালি হিন্দুর জাগরণ। সেই প্রবণতা নতুন মাত্রা যোগ করে ১৮৯২ সালে প্রকাশিত আরেক বাঙালি চন্দ্রনাথ বসুর বই ‘হিন্দুত্ব’। ১৮৯৪ সালে কলকাতা রিভিউ পত্রিকার জুলাই সংখ্যায় আড়াই পাতাজুড়ে লেখা হয় বইটির রিভিউ। বইটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে। মুসলমানদের পক্ষ থেকেও চলতে থাকে নানা তৎপরতা। অন্যদিকে ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় হিন্দু ও মুসলিম পরিচয়কে সবার আগে সামনে আনা হয়। সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোট ব্যবস্থা এবং সংসদে আসন পর্যন্ত নির্ধারণ হয়েছে। এভাবে ভৌগোলিক অধিকার ও জনসংখ্যাগত শক্তি প্রদর্শন একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে মর্লি-মিন্টো সংস্কারের মধ্য দিয়ে স্থানীয়করণ হয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতির। লাহোরের সরকারি মেডিকেল কলেজের সিট বরাদ্দ হয় হিন্দু, মুসলিম ও শিখের অনুপাত যথাক্রমে ৪০, ৪০ ও ২০ জন। ফলে ভারতে সাম্প্রদায়িক পরিচয় যেন আরো পোক্ত হয়েছে। আদমশুমারি যে পরিচয়বাদী আধিপত্যের শেকড় থেকে ক্রমে মহীরুহ হতে থাকে। যেন আলাদা করে শিবির গোছাতে শুরু করে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো। পরস্পরবিরোধী পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে।

ভারতের ৭২টি বর্ণগোষ্ঠীর নমুনা প্রতিকৃতি, All people, nations and languages shall serve Him. …, Source: Yale Library

আদমশুমারির মধ্য দিয়ে সবার আগে যে বিভাজন ঘটে, তা হলো হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে। তবে পরবর্তী সময়ে তা হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে আটকে থাকেনি। আন্তঃহিন্দু বর্ণগুলো ও ভাষাগত সীমারেখার মধ্য দিয়ে বিভাজন তৈরি হয়েছে; তার অধিকাংশই পরে আর কখনো মীমাংসা হয়নি। ভারতে সামাজিক ব্যবধান ও সংঘাতের অন্য একটা কারণ ছিল এ ধর্মীয় স্তরায়ণ। যেহেতু বর্ণবাদ ঔপনিবেশিক আমলেই প্রতিটি প্রদেশের মধ্যেই গেঁথে গিয়েছিল। তারা ভারতে ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে স্তরায়ণ ঘটেছে। ব্রিটিশ সরকার প্রতি প্রদেশের আদমশুমারিতে অদ্ভুত একটা সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপীয়, আরমেনীয়, মোগল, পারসিক কিংবা অন্য কোনো বিদেশী ভৌগোলিক পরিচয়ের বাইরে সবাইকে ফেলা হয় হিন্দু নামের ছায়ার নিচে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দুর সংজ্ঞাটা হয়েছে মুসলমানের বিপরীত তথা যিনি মুসলমান নন, তিনি হিন্দু—এমন। আগ্রা ও অযোধ্যায় আদমশুমারির দায়িত্বে থাকা জর্জ গ্রিয়ারসন সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘হিন্দু হলো একজন ভারতীয় অমুসলিম।’

গবেষক আর বি ভগৎ একটা বিষয় স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন Census and the construction of communalism in India গবেষণাপত্রে। তিনি দেখিয়েছেন, ব্রিটিশ আদমশুমারি মধ্যপ্রদেশে যারা ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ও বেদকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকেও হিন্দু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যারা কোনো হিন্দু দেবতার উপাসনা করে না কিংবা কোনো পুরোহিতের সঙ্গে পরিচিত নয়, মন্দিরে যায়নি কখনো, গরুর গোশত খায়, মৃতকে কবর দেয়, এমন বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্প্রদায় হিন্দু হিসেবে শ্রেণীভুক্ত হয়েছে আদমশুমারিতে। সেখানে বড় একটা জনগোষ্ঠীকে ঠিক হিন্দু না বলে ‘কথিত হিন্দু’ বলাই যৌক্তিক। কারণ এ নামকরণের আগে হিন্দু হিসেবে এমন একমাত্রিক কোনো পরিচয় প্রস্তুত ছিল না। এজন্য মাদ্রাজের সুপারিনটেনডেন্ট ১৮৮১ সালের আদমশুমারির সময় ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভাগ করতে আপত্তি জানান। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের জন্য তিনি হিন্দু পরিচয় ব্যবহার করতে নারাজ ছিলেন।

ভারতের জন্য হিন্দু ও মুসলমানের সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে বিভাজন করা যায় না। হিন্দু ধর্ম অনেক সম্প্রদায়ের সামনে ইসলাম ধর্মের স্বাদ যুক্ত হয়েছে। অনেকের আচরণ আবার হিন্দু ও মুসলিম দুটোকেই গ্রহণ করেছে। অনেক হিন্দু পাঁচপীরি ঐতিহ্য অনুসরণ করত। পাঁচ পীরকে সম্মান ও তাদের নামে পশু কোরবানি করে। গুজরাটে কুনবিসি নামে সম্প্রদায় বসবাস করে; তারা তাদের ঘরোয়া উৎসবে ব্রাহ্মণের খোঁজ করে ঠিকই, একই সঙ্গে তারা নিজেদের পিরানা দরবেশ ইমাম শাহ ও তার বংশধরদের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা তাদের মৃতদের কবর দেয় অনেকটা মুসলমানদের মতো। শেখ আদাসিরা হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মে বিয়ে করে। অন্যদিকে মোমনাসিরা করে খতনা। একদিকে তারা গুজরাটি কোরআন পড়ে, অন্যদিকে হিন্দু রীতিনীতিতেও সমান শ্রদ্ধাশীল। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যকার যে সীমারেখা, সেটা হয়তো তাও কোনোভাবে চিহ্নিত করা যায় এভাবে। শিখ ও জৈন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পার্থক্যটা ছিল আরো বেশি সূক্ষ্ম।

ধর্মীয় এই ওতপ্রোত যোগাযোগকে ঔপনিবেশিক শাসকরা নিজেদের মতো করেই সমাধান করতে চেয়েছেন। তারা মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছে, তারা হিন্দু নাকি মুসলমান নাকি খ্রিস্টান, তারপর সেই ধর্মে ভুক্ত করেছে। যারা কোনো পরিচয় বলেনি, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বর্ণ ধরে। এখন তারা যদি কোনো স্বীকৃত হিন্দু বর্ণের অভ্যন্তরে পড়ে, তাহলে আবার হিন্দু হিসেবে গণ্য হতে থাকে। তাই ভারতের বর্ণ পরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গেও আদমশুমারি ব্যাপকভাবে জড়িত। গবেষক পদ্মনাভ সমরেন্দ্র তার Census in colonial India and the birth of Caste গবেষণাপত্রে দাবি করেছেন, বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত বর্ণপ্রথা মূলত ঔপনিবেশিক শাসকদের চাপিয়ে দেয়া; এটা আগে থেকে আধিপত্য বিস্তার করেনি। কারণ ভারতীয় বর্ণপ্রথা বলতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বোঝানো হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বর্ণ বলে যেটার শ্রেণীকরণ করেছে, তা স্থানীয় জাতি পরিচয়। ফলে একদিকে স্থানীয় জাতিধারণাকে বর্ণের রূপ দেয়া হয়েছে এবং তাদের সামাজিক অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, অন্যদিকে সংকুচিত হয়েছে ন্যায়বিচারের পরিসীমা।

আদমশুমারি থেকে সৃষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক চেতনা বাড়তি যে দ্যোতনা তৈরি করে, তাই ভারতের রাজনীতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে পরবর্তী দশকগুলোয়। স্থানীয় চেতনায় সেই বিভাজনের সিলসিলাই এগিয়ে নেয়া হয়েছে। কেউ হিন্দু, শিখ কিংবা বৌদ্ধ না হলে তাকে তফসিলি হিন্দু হিসেবে গণ্য করা শুরু হলো। আর বর্ণ পরিচয়ের অন্য অর্থ সামাজিক স্তর; ফলে সেটাই ঘটল। তারা সামাজিকভাবেও উপেক্ষিত ও অস্পৃশ্য হয়ে রইল। স্বাধীনতার পর ভারতের আদমশুমারিতে ছয়টি ধর্মকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ, জৈন ও বৌদ্ধ। পরবর্তী সময়ে আরো দুটি বিভাগ তৈরি হয়—অন্যান্য এবং প্রযোজ্য নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভারতে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ধর্মবিশ্বাস বিদ্যমান। ফলে এতগুলো ধর্মকে মাত্র ছয়টি বা আটটি বিভাগে আটকে ফেলার চেষ্টা আদমশুমারির প্রকৃত উদ্দেশ্যকেই নাকচ করে দেয়।

ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয়দের পরিচয় করিয়ে দেয়ার সাম্প্রদায়িক যে নীতি ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে; তার প্রভাব আদমশুমারির ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তামাম ভারতে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। শুরু হয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও সাংখ্যিক আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস। এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তার প্রভাব দৃশ্যমান।

Share:

আরো পড়ুন