ড. সাঈদ ফেরদৌস

উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)

ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ধর্মের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি: একটি নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা

ড. সাঈদ ফেরদৌস

উপ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)

Share:

ঔপনিবেশিক সময়ে এই ভূখণ্ডে যে রাজনৈতিক তৎপরতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ হয়েছে, সেই বিষয়টিকেই নিয়ে প্রবন্ধকার কাজ করেছেন। বিশেষভাবে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং তার সাথে একটি বিশেষ বর্গ হিসেবে বাঙালি মুসলমানকে, অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক চিন্তা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশকে, তিনি একসাথে দেখার চেষ্টা করেছেন। প্রবন্ধকার ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মেথডোলজি মাথায় রেখে কাজটি করেছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও ইতিহাসের ধারণা— ঔপনিবেশিকতা, গণতন্ত্র, আধুনিকতা ইত্যাদি—এই ফ্রেমগুলোকে অটুট রেখেই তিনি তার আলোচনাটা নির্মাণ করেছেন। কিন্তু আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান, রাজনৈতিক বিজ্ঞান বা রাজনৈতিক ইতিহাসের বাহিরে এসে নৃবিজ্ঞান এবং সামাজিক ইতিহাস জায়গা থেকে আলাপ করার চেষ্টা করব।
বড় বড় সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং ঘটনা ধরে ধরে একটি রাজনৈতিক ইতিহাস যেভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় সে অনুসারে প্রবন্ধকার তাঁর আলোচনাকে সাজিয়েছেন। ঔপনিবেশিক সময়ে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক যাত্রাপথে বড় বড় যে অর্জন সেগুলোকে তিনি তালিকাভুক্ত করেছেন। এখন এ কথাও সত্য যে, সেই তালিকাকরণে কিছু বড় বড় জিনিসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে দেওয়া হয়েছে। কারন প্রবন্ধকার যে ডিসিপ্লিনারি ফ্রেম থেকে দেখেছেন সেখানে এই জিনিসগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। উদাহরণ হিসেবে, গণতন্ত্রকে একধরনের আরাধ্য ব্যবস্থা—“গণতন্ত্রই কাম্য”, “আধুনিকতাই কাম্য”, “জাতীয়তাবাদই কাম্য”, “রাষ্ট্রই কাম্য”—এই ধারণাগুলোকে খুব বেশি প্রবলেমেটাইজ না করেই আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে মনে করা হয়েছে যে, ব্রিটিশরা আসার আগে বাঙালিদের মধ্যে, গোপালের সময়ে গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার আভাস ছিল। আবার মুসলমানদের মধ্যে খলিফা নির্বাচন, নির্বাচকমণ্ডলী ইত্যাদির মধ্যেও গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার আভাস ছিল। ব্রিটিশদের নিয়ে আসা গণতন্ত্র সম্পূর্ণ নতুন বা একেবারে অচেনা কিছু ছিল না; এসব তাদের মাঝে আগে থেকে-ই ছিল। তারপর ব্রিটিশরা আসার পরে সেটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। 
প্রবন্ধকের কাজে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ইতিহাস যেরকমভাবে আছে; কিন্তু সত্তা হিসেবে, পরিচয় হিসেবে এবং সামাজিক বর্গ হিসেবে “বাঙালি মুসলমান” কিভাবে বিকশিত হলো—সেই দিকটা তুলনামূলকভাবে কম এসেছে। আমরা রাজনীতি দেখতে পাচ্ছি—মোটাদাগে, উপরের স্তরে—কিন্তু সামাজিক বর্গ হিসেবে, নিচের স্তরের চেতনার গঠনটা কম দৃশ্যমান।
কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগকে আমরা অনেক সময়  উপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে “বার্গেনিং ক্লাব” হিসেবে দেখতে পাই।কারন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশদের সাথে বসে তাদের নিজ নিজ কমিউনিটির জন্য কী কী অধিকার আদায় করা যাবে সেটা নিশ্চিত করা। কিন্তু এটাও সত্য যে, কালক্রমে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ মাঠ ও প্রতিবাদের রাজনীতিতে বিকশিত হয়েছে এবং  ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ হয়েছে। হ্যাঁ, ব্রিটিশরা যেভাবে কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেসির ভেতরে এই রাজনীতিকে চ্যানেলাইজ করেছে সে কাঠামোর মধ্যে দিয়েই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রবেশ করেছে—কিন্তু সেটা তো ঘটেছে। 
প্রবন্ধকার যেভাবে বলছেন যে, মুসলমানরা যখন থেকে ব্রিটিশদের শেখানো গণতান্ত্রিক তরিকার ভেতর দিয়ে হাটা শুরু করল, তখন থেকে “অগণতান্ত্রিক বিদ্রোহ” এবং “বিশৃঙ্খলাগুলো” চলে গেল। এই বক্তব্যকে যদি আমরা শুধু তার ডিসিপ্লিনারি ফ্রেমে না দেখে অন্য ফ্রেমে দেখি, তাহলে এটাকে অন্যভাবে বলা যায়। গৌতম ভদ্র এগুলোকে অন্য নামে দিয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনের ভাষায় কিংবা “বড়” রাজনৈতিক ইতিহাসের ফ্রেমে যেগুলোকে “অগণতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলা” বলছি ফলে ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ ইত্যাদি সেগুলো এ প্রবন্ধে বিদ্রোহ হিসেবে পদবাচ্য না। এই প্রবন্ধে সেগুলোর উল্লেখ নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কমিউনিটি নিজেকে কিভাবে চিনে উঠছে? একটি কমিউনিটি তার নিজেকে, তার অধিকার, তার শোষণ, তার প্রতিরোধ—এসবকে কিভাবে বুঝতে শুরু করছিল? আমরা এখানে খুব “টপ-ডাউন” ভঙ্গিতে বড় বড় ঘটনা, বড় বড় মানুষের নাম পড়ছি—যাদের নাম আমরা ইতিহাসে পড়েছি, যাদের অর্জন আমরা জানি, যারা “ইতিহাসের বড় মানুষ” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সামাজিক ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নাম না-জানা মানুষের জীবনে এবং অখ্যাত মানুষের জীবনেও রাজনীতি,নিজস্ব বুঝাবুঝি এবং  শোষণের অভিজ্ঞতা ছিল—ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আবার স্থানীয় জমিদার-জোতদারদের বিরুদ্ধেও। সেখানে নাম না-জানা মানুষ রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিল।
যেমন, আবুল মনসুর আহমদের ছোটবেলার একটা ঘটনা ছিল—সেটা আমার উপরও গভীর রেখাপাত করেছে। গল্পটা হচ্ছে,আবুল মনসুর আহমদের দাদাবাড়িতে এসডিও সাহেব মাছ ধরতে আসেন, সাথে আসে জমিদারের নায়েব। মাছ ধরতে এসে নায়েব দেখলেন যে তার নিজের বঁড়শিতে মাছ ধরা পড়ছে না, কিন্তু পাশে বসে থাকা ছোকরা আবুল মনসুর আহমদের —তখন তার বয়স আট-দশ বছর— বঁড়শিতে একের পর এক মাছ উঠছে। নায়েব জিজ্ঞেস করল, “তুই কী চাল ব্যবহার করছিস?” তখন সে নায়েবকে তাচ্ছিল্যের সুরে কথা বলল “আপনি নেন না ! নিজ হাতে নেন !” নায়েব ভাবছিল যে, আবুল মনসুর আহমদ তাকে নিজে গিয়ে দিয়ে আসবে। তখন নায়েব তাকে “বেয়াদব”, “মহাবেয়াদব” ইত্যাদি বলল। এক-কথা, দুই- কথা বলতে বলতে আবুল মনসুর আহমদ “আপনি” থেকে “তুমি”তে নেমে আসলেন।  এরপর বিরাট হট্টগোল হল, মুরুব্বিদের ডেকে আনা হলো। দাদা খবর পেলেন যে, নায়েবের সাথে নাকি নাতি ঝগড়া করেছে। দাদা এসে বললেন, “তুই এভাবে মান্যগণ্য মানুষের সাথে কথা বলিস? তখন সে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি তো উনার চেয়ে বড় মুরুব্বি। উনি তো আপনাকে ‘তুমি’ করে কথা বলেন, আপনার সাথে কোনো সম্মান দেখান না!” আবুল মনসুর আহমদ তার আত্মজীবনীতে লিখছেন—ছোটবেলায় তাদের গ্রামে মানুষের মুখে মুখে ছিল যে,“ আল্লাহ যদি করে একদিন জিহাদে যাইব, সেথায় কাফেরের সঙ্গে যুদ্ধ করিব, যদি মরি তাহলে শহীদ, আর যদি বাঁচি তাহলে গাজী।” বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আট-দশ বছরের একটি বালকের মনের মধ্যে এই চিন্তা কাজ করছিল যখন আসলে খেলাফত পতন এবং তুরস্কের যুদ্ধের সাথে এই ভূখণ্ডের মানুষের যোগাযোগ ও যাতায়াত ছিল।
ফলে ‘বড় ইতিহাস’ সাধারণত এইসব জায়গা দেখতে চায় না বা দেখতে পারে না—সমাজের উপরে যখন রাষ্ট্রনায়ক এবং নীতি নির্ধারকরা বড় বড় নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত নেন তখন সেই সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিদিন অনুদিত হয়, মানুষের আটপৌরে জীবনে তার একটা ছাপ পড়ে এবং মানুষ সেটা দ্বারা শেইপড হয়। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে— সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই চেতনা আছে বলে ছোট্ট ছেলে আবুল মনসুর আহমদের মনের মধ্যে সেই ঘটনা রেখাপাত করেছিল। পরে তিনি যখন বড় হয়ে নামী উকিল হলেন, রাজনীতিবিদ হলেন, লেখক হলেন তখনও তিনি তার ছোটবেলার সেই ঘটনার কাছে ফিরে যান। মানে, ঐ ঘটনাটি তার রাজনৈতিক চেতনা ও সত্তাকে শেইপ দিয়েছিল। বড় ইতিহাস বা বড় ঘটনা এই জিনিসগুলোকে দেখে না।
আমি এনথ্রোপলজির মানুষ। আমার কাছে বেশি আগ্রহের জায়গা হচ্ছে, ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা যখন ঘটে, বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ইন্ট্রোডিউস হয়, তখন সাধারণ মানুষের জীবনে তার ফলাফল কী হয়? গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে একটি বই আছে। সেখানে তিনি তার “স্বপ্নের হিন্দুস্তান” নিয়ে বলছেন। অনেক পরে নীরদ সি. চৌধুরী প্রশ্ন করেছিলেন যে, কংগ্রেসের রাজনীতিতে এমন কী ছিল যার কারণে মুসলমানরা সেখানে আসবে? তো কংগ্রেসের রাজনীতির শুরু থেকেই এই ব্যাপারটা ছিল। মুসলমানরা নানা পথ ঘুরে একপর্যায়ে মুসলিম লীগের কাছে গিয়ে সমর্পণ করেছিল। পরবর্তীকালে তাজ হাশমি তার ‘পাকিস্তান অ্যাজ আ পিজ়্যান্ট ইউটোপিয়া: দ্য কমিউনালাইজ়েশন অব ক্লাস পলিটিক্স ইন ইস্ট বেঙ্গল’ বইয়ে  ক্লাসিক্যাল মার্ক্সিস্ট অবস্থান থেকে এটাকে “ফলস কনশাসনেস” বলেছেন। তার যুক্তি—মুসলিম লীগ এক ধরনের ভ্রান্ত চেতনা তৈরি করেছিল মানুষের মধ্যে; তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, পাকিস্তান হলে কৃষকের স্বরাজ আসবে, হিন্দু জমিদারদের হাত থেকে মুসলমান কৃষকরা মুক্তি পাবে। মুসলিম লীগ এই প্রতিশ্রুতি রাখে নি, এবং এটাই শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের ডুবে যাওয়ার অন্যতম কারণ—এটাই তার থিসিস।
এখন, তাজ হাশমির থিসিস যে একেবারেই সত্য নয় সেটা বলা যাবে না। ক্লাস পলিটিক্সকে কমিউনাল এলিমেন্ট ও ধর্মীয় পরিচয় দ্বারা উসকে দিয়ে মুসলিম লীগ তাদের রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। এটা আমাদেরকে মানতে হবে— ভালো অর্থে বলুন, খারাপ অর্থে বলুন। কমিউনালাইজেশনের উপর ভালো বা মন্দ আরোপ করা যাবে না। আমাদেরকে বুঝা লাগবে এবং মেনে নিতে হবে যে, মুসলামানিত্বকে ব্যবহার করে মুসলিম লীগ সফলভাবে রাজনীতি করে গেছে। কিন্তু এখানে তাজ হাশমী একটা পয়েন্টটা মিস করেছেন যেটাকে পরবর্তীকালে পোস্টকলোনিয়াল এবং সাবঅল্টার্ন ইতিহাসবিদরা সামনে নিয়ে এসেছেন। সেটা হচ্ছে যে, ধর্ম তো আগে থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের ভেতরে ছিল। সুতরাং, মুসলিম লীগ ওপর থেকে গলায় ধর্মের “মধু ঢেলে দিল” আর মানুষ ভেবে-না-ভেবে তা গলাধঃকরণ করল—ব্যাপারটা এমন নয়। তারা নিজেরাও এই মাটিতে বিশ্বাসী, ধার্মিক এবং ধর্মচর্চাকারী মানুষ। তাদের জীবনের সাথে তাদের ধর্মীয় পরিচয় এমনভাবে যেভাবে আমার কাছ থেকে আমার ভাষা খুলে নেওয়া যাবে না, তেমনি আমার কাছ থেকে আমার ধর্মীয় পরিচয়ও খুলে নেওয়া যাবে না। ফলে যদি মনে হয় যে, মুসলিম লীগ কেবল “এক্সটারনালি” কমিউনালাইজ করেছে তাহলে থিসিসটা এদিক থেকে ভুল। মুসলিম লীগ যে কমিউনালাইজ করতে পেরেছে তার কারন মানুষের মধ্যে সেই কমিউনাল বা ধর্মীয় বঞ্চনার অভিজ্ঞতা ছিল। যেমনভাবে আবুল মনসুর আহমদের গ্রামের মতো সেই ছোট্ট ছেলেটার চেতনার মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি কাজ করছিল।
১৯২০–৩০ দশকে কলকাতায় বসে যে সব মুসলিম কবি, সাহিত্যিক, লেখক ও সম্পাদকরা বাঙালি মুসলমানের আন্দোলন তৈরি করছেন পক্ষে লিখেছেন তারা ১৯২৭ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের পরিচয়কে ডিফাইন করার চেষ্টা করছেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের পথও প্রস্তুত করছেন। আবুল মনসুর আহমদদের “পাকিস্তান” এবং জিন্নার “পাকিস্তান” মৌলিকভাবে আলাদা। যদিও জিন্নাহকে সবাই দোষারোপ করা হয় যে, তিনি নাকি কমিউনাল পলিটিক্স করে ভারতকে ভাগ করেছেন, দ্বিজাতি তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন ইত্যাদি। কিন্তু আমরা যদি দেখি যে, জিন্নার পাকিস্তান ধারণা কী ছিল, আর কলকাতার বাঙালি মুসলমান লেখক-বুদ্ধিজীবীরা যে তাদের নিজেদের পরিচয় পুনর্নিমাণ করতে চেয়েছিলেন সেটা কী ছিল—তাহলে দেখা যাবে যে, তাদের পাকিস্তানের আকাঙ্ক্ষা থেকে জিন্না পাকিস্তানের ধারনাটা ভিন্ন ছিল। 
এটা বলার আগে আমি শুধু এটুকু বলে নিচ্ছি যে, জিন্না চেয়েছিলেন সকলের জন্য পাকিস্তান। যদিও পার্টিশন হয়ে যাচ্ছে ধর্মভিত্তিতে এবং পার্টিশন করার সময় ব্রিটিশরা যে ভাষা চয়ন করেছিল সেই ভাষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা বলেছিল যে, মুসলিম এবং নন মুসলিম এই দুই ভাগে ভাগ হবে। বলে নাই যে, হিন্দু বনাম মুসলিমে ভাগ হবে। কারন আরেকটা বড় কমিউনিটি ছিল শিখ। তার চাইতে বড় কথা এখানে এই রাজনীতিটাও ছিল যে, পার্টিশনের মূল অনুঘটক বা দায়ী হচ্ছে মুসলিমরা কারন তারা নিজেদের ভূখণ্ড চাচ্ছে। জিন্না যে পাকিস্তান চেয়েছিলেন আর এই ভূখন্ডের বাংলা ভাষী মুসলমানরা যে পাকিস্তান চেয়ছিল সেটার তফাত নিয়ে নীলেশ বোস নামে একজন গবেষক তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা একই সাথে মুসলমান পরিচয়কে সমুন্নত করেছে, আবার পূর্ব পাকিস্তানের “বাঙালিত্ব”কে ধারণ করেছে। ফলে বাঙালি মুসলমানের এই “হাইফেনেটেড” সত্তা—একদিকে বাঙালি, অন্যদিকে মুসলমান। এটা নিয়ে আমরা আজ যেভাবে আলোচনা করি, প্রায় একশ বছর আগে আবুল মনসুর আহমদসহ আমাদের পূর্বসূরিরাও এটা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তারা ডিফাইন করতে চাচ্ছিলেন যে, পাকিস্তান হবে সবার জন্য একটা দেশ, সব ধর্মের মানুষের জন্য একটা দেশ। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার অভিজ্ঞতার কারণে, পাকিস্তানের সাথে আমাদের ২৫ বছরের “অসুখী দাম্পত্যের” কারণে পাকিস্তানকে “আইয়ামে জাহিলিয়া” ছাড়া আর কোনোভাবে দেখি নাই। 
আমাদের কাজের বড় একটা জায়গা হচ্ছে, ইতিহাসকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে ন্যারেটিভ তার বাইরে গিয়ে দেখা এবং আমরা যখন পূর্ব পাকিস্তানকে “আইয়ামে জাহিলিয়া” বলে একচেটিয়াভাবে বাতিল করি তখন ভুলে যাই যে, পূর্ব পাকিস্তান একসময়ে মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদেরই অগ্রজ প্রতিম গবেষকরা পাকিস্তানকে বলেছিলেন “Land of Eternal Eid”—পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরে প্রথম প্রথম প্রত্যেকটা দিন মনে হত যে ঈদের দিন। অতি দ্রুত মানুষের এ স্বপ্ন ধাক্কা খায়। মুসলিম লীগের যে বিশাল ভরাডুবি হয়েছে তার কারণ—মুসলিম লীগ যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেই স্বপ্ন বাস্তবে ফলপ্রসূ হয়নি। প্রথম প্রথম মানুষের পেটে খাবার ছিল না, হাতে টাকা ছিল না কিন্তু তারা একটা দেশ পেয়েছে; তাদের মধ্যে একটা উচ্ছ্বাস ছিল। তখন মানুষের হাতে অস্ত্র বলতে কিছু ছিল না—লাঠি, বল্লম, ট্যাঁটা—এগুলো ছাড়া কিছুই ছিল না; কিন্তু মানুষ বর্ডার এলাকায় পাহারা দেওয়ার জন্য সকালে মার্চ ফরোয়ার্ড করত। রাতের বেলা যদি খবর আসত যে, সীমান্তের ওপারে কোনো গ্রামে মুসলমানদের ঘরবাড়ির উপর হিন্দুরা আক্রমণ করছে তখন এ পার থেকে মানুষজন “নারায়ে তকবীর” তুলে বর্ডারের কাছে গিয়ে দাঁড়াত সাহায্য করার জন্য। যে উচ্ছ্বাস পাকিস্তানের শুরুতে ছিল সে উচ্ছ্বাস সঙ্গত কারনে চলে গেল। পাকিস্তানি শাসকেরা আমাদের সাথে যা কিছু করেছে না গিয়ে উপায় ছিল না। অসমাপ্ত আত্মজীবনী আমাদের বারবার পড়তে হবে, এবং “between the lines” পড়তে হবে। 
কিন্তু ইতিহাসের পর্বে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এড়িয়ে যাই সেটা হচ্ছে যে, যুক্তফ্রন্ট কী করে ভাঙল? আর আওয়ামী লীগ কী করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হল? আওয়ামী লীগ তখনও যুক্তফ্রন্টের ভেতরে একটি বড় দল ছিল ঠিকই—কিন্তু যুক্তফ্রন্ট ভাঙার পরেই আওয়ামী লীগ একক শক্তি হিসেবে উঠে আসে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি— ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে যখন ৭ই মার্চের ভাষণ বাজত আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠত। মনে হতো, এতদিন এই জিনিসটা নিষিদ্ধ ছিল! এর পরে আওয়ামী লীগ এমন অবস্থা করল যে, ৭ই মার্চের ভাষণ শোনার আগে কানে আঙুল দিয়ে সরে যেতাম। আজকে শেখ মুজিব আমাদের কাছে বিরাট প্রভাবশালী নেতা—কিন্তু তার বড় হওয়া, গড়ে ওঠার সময়ে, এই ভূখণ্ডে তার চাইতে বেশি ইনফ্লুয়েনশিয়াল ছিলেন শের-এ বাংলা এ কে ফজলুল হক। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিবের নিজের জবানিতে আছে— তার এলাকায় তিনি বক্তৃতা করতে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে তিনি ফজলুল হকের দুইটা ক্রিটিক করলেন, তখন তার বাবার বন্ধুস্থানীয় এক মুরুব্বি উঠে দাঁড়িয়ে বলছেন, “হক সাহেবকে নিয়ে কোনো কথা বলবেন না; আপনি অন্য কিছু নিয়ে কথা বলুন। হক সাহেব আমাদের নেতা।” এখন হক সাহেব রাজনৈতিক কারনে কমিউনাল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সঙ্গে কী ধরনের আদান-প্রদান করছিলেন? কৃষক প্রজা পার্টি কতদূর পর্যন্ত কৃষকের স্বার্থ নিশ্চিত করছে, আর কতদূর জোতদারের স্বার্থ নিশ্চিত করছে করেছে— আমরা সেই হিসাব না করি। ভাসানীও এরকম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছিলেন।
মুসলিম লীগ পাকিস্তান আনছে বলে মানুষ বিশ্বাস করেছে। সেই মুসলিম লীগকে কয়েক বছরের মধ্যে হটিয়ে যুক্তফ্রন্ট আসল। কিন্তু সেই যুক্তফ্রন্ট কেন কোনোভাবে টিকলো না? এত ক্ষণস্থায়ী যুক্তফন্টের জীবন! এটার মধ্যে-ই বাঙালি মুসলমান বা এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক পরম্পরার ব্যর্থতার সূত্র আছে।। এখনও কেন আমরা এত রক্ত দেই! আমরা যদি যুক্তফ্রন্টের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে দেখি তাহলে সম্ভবত দেখতে পাব যে, আমরা একটা “হাডুডু-খেলা জাতি”। কেউ যখন সামনে এগিয়ে যায় আমরা তাকে টেনে টেনে নামাই। যুক্তফ্রন্টের উত্থান-পতন ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। আমাদের এটা নিয়ে কাজ করা দরকার।
প্রবন্ধকার পলিটিকাল ইন্সটিটিউশিন ধরে কাজ করেছেন। আর আমি আলোচনা করছি—“সত্তা” বা আইডেন্টিটি এবং সোশাল ক্যাটাগরি হিসেবে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক চৈতন্য কীভাবে বিকশিত হলো, সেই দিক। ফলে আমরা যখন সামনে এসব নিয়ে কাজ করব তখন আমাদের খেয়াল করা লাগবে যে, যখন গনতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটছিল, তখন কমিউনিটির ভেতরে কী রকম চিন্তা-ভাবনা হাজির ছিল—তাহলে এই দু’দিকের সমান্তরাল যোগাযোগটা আমরা একসাথে দেখতে পারব।
আরেকটা প্রসঙ্গ এসেছে—“ইসলামিকেট” আমি আগে জানতাম না, পরে খোঁজ নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করেছি। “ইসলামিকেট” বলতে আমি যা বুঝেছি—ধর্ম যখন কোন সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসে অনূদিত হয় তখন সেই সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের আচার ও চর্চায় সে বাঙ্ময় হয়ে উঠে। এই ভূখণ্ডে ইসলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম  কিন্তু ইসলাম ছাড়াও অন্য ধর্মের মানুষজন আছে। তাদের সাথে আমার সম্পর্কও “ইসলামিকেটের” বিষয়বস্তুর মধ্যেই পড়বে। অর্থাৎ, অন্যের সাথে—তথাকথিত “অন্য” বা মাইনরিটির সাথে—আমার যে সম্পর্ক, সেটাও “ইসলামিকেট”-এর আওতাধীন। ফলে “ইসলামিকেট”কে যদি আমরা “ইসলামিক”-এ রিডিউস করে ফেলি তাহলে ভুল হবে।
ফরহাদ মজহারের অনেক ব্যাপারে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু তিনি আমাদের চিন্তকদের মধ্যে সবার আগে চিহ্নিত করেছেন যে, যেভাবে ধর্মকে আমাদের পরিচয়ের অনুষঙ্গ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সেটা একটা বড় ভুল। তাঁর আরেকটা বড় অবদান আছে যেটা আমাদের স্বীকার করা উচিত। সেটা হচ্ছে যে, ১৯৭১ সালের ভিতর দিয়ে আমরা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের চেয়ে একটা ভিন্ন স্তরে উন্নীত হয়। ১৯৭১ আমাদের একটা রাজনৈতিক সত্তা ও পূর্নাঙ্গতা দিয়েছে— হোক সেটা ভারতের ষড়যন্ত্রে। এখন তো আমরিকা বলছে যে, চব্বিশ তারা ঘটিয়ে দিয়েছে। এটা তো পুরোপুরি বিশ্বাস করার সু্যোগ নাই। কিন্তু, আমাদের মধ্যে যদি হতাশা, ক্ষোভ না থাকত এবং আমাদের সাথে যদি শেখ হাসিনা জুলুম না করত তাহলে কি চব্বিশ হত! একইরকমভাবে একাত্তরের বেনিফিট ভারত নিয়েছে। তার মানে এটা না যে, একাত্তরের মধ্য দিয়ে আমরা যা অর্জন করেছি তার গুরুত্ব কোনরকমভাবে কম আছে। একাত্তরের সেই গুরুত্বের কথা আমরা মনে রাখা লাগবে। পাশাপাশি স্মরণ রাখা লাগবে যে, ইসলামকে আমরা আমাদের রাজনীতি থেকে বাদ দিতে পারব না। এটাকে আমাদের ফিরিয়ে আনা লাগবে। আমাদের সেক্যুলার বন্ধু-বান্ধবরা দীর্ঘদিন ধরেই ধরতে পারেননি। তারা ধরে-ই নিয়েছেন যে, ইসলামকে রাজনীতিতে ইনক্লুড করা মানেই কমিউনালাইজড হয়ে যাওয়া; তখনতারা ইসলামকে সরিয়ে রেখেছে।
সেক্যুলারিজম নিয়ে তালাল আসাদের অনেক ক্রিটিক আছে—সেগুলো আলাদা আলোচনার বিষয়। কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ন সেটা হচ্ছে যে,গতকালের মজলুম ও বঞ্চিত মুসলমান সত্তা যদি আজকে এসে মনে করে, “আমাদেরকে এতদিন এক্সক্লুড করা হয়েছে। এবার আমাদের দিন আসছে, এখন আমরা-ই কথা বলব, অন্যদের কথা আর থাকবে না এবং আমরা যে টার্ম ডিফাইন করব সে টার্মে সবাইকে থাকতে হবে”—তাহলে কিন্তু আমরা “ইসলামিকেটের ধারণা” থেকে সরে যাব। 
কেন মুসলমানরা কংগ্রেসের সাথে যায় নাই? কেন গান্ধীর এত লুক্রেটিভ ফিলোসফিতে মুসলমানরা পা দেয় নাই? কারন দিনশেষে কংগ্রেস এমন একটা “প্রাচীন ভারতের” কথা বলে যার সাথে বিজেপির রামরাজ্যের তেমন কোন ফারাক নাই। আজকে আমরা মুসলমানরা মেজরিটি হয়ে যদি এ ভূখণ্ডে ভাবি যে, আমরা যে টার্মস ঠিক করছি সে টার্মসে-ই অন্যদের সাথে সম্পর্ক ঠিক করব এবং অন্যদেরকে সে টার্মসে-ই থাকতে হবে তাহলে তো আমরা সেই এক-ই রকম গর্তে পড়লাম। ফলে আমাদের সতর্ক থাকা লাগবে যে, বাঙালি মুসলমানের রাজনীতিকে ডিফাইন করতে গিয়ে যেন শেষ পর্যন্ত ইসলামি রাজনীতির সত্তাকে চিহ্নিত না করে ফেলি। বরং “ইসলামিকেটের” যে ইনক্লুসিভিটি সম্ভাবনা আছে সেটাকে খোলা রেখেই যেন আমাদের আলোচনা আগায়। 

Share: