চিন্তক ও গবেষক

যুক্তি ও বিশ্বাস পরস্পর বিপরীত নয়

মুসলিম সমাজের সমস্যাবিচার ও উত্তরণভাবনা: মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় আধুনিকতা

চিন্তক ও গবেষক

Share:

বাংলাদেশের ট্রেডিশনালিস্ট এন্ড নন ট্রেডিশনালিস্টদের মধ্যকার বিতর্কগুলাতে আমাদের এংগেজ হওয়া জরুরি। অনেকে মনে করে যে, ‘জামায়াতে ইসলামি’ হচ্ছে নন ট্রেডিশনালিস্ট। কিন্তু কথাটা আসলে ঠিক না। জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের ট্রেডিশনালিস্ট ইসলামের বয়ানের একটা পার্ট। কিন্তু, এখানে খেয়াল করার একটা বিষয় আছে— যে কোন ট্রেডিশনের ভিতরে নানান রকমের তর্ক-বিতর্ক ও মত থাকে। কোন মত আমরা কখন-কোথায় আমল করব তার জন্য ট্রেডিশনের ভিতরে বিতর্ক জারি থাকা দরকার; অন্যথায় ট্রেডিশন ফাংশন করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের ট্রেডিশনালিস্টরা কল্পিত কিছু শত্রু বানিয়েছে এবং তাদের সাথে তারা ফাইট করে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তর্কটা আসলে হয় না। আসলে ট্রেডিশনের বিষয়ে যে নানান রকমের প্রশ্ন এবং বিতর্কগুলো আছে সেগুলোর সাথে আমাদের এংগেজ হওয়া দরকার। আমি ট্রেডিশনের জায়গা থেকে কিছু কথা বলব।
মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের চিন্তায় একটা মোটা দাগে কিছু জায়গায় সমস্যা আছে। গত ১০০ বছর আগে মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদের মতো যারা মর্ডানিস্ট ছিলেন তারা জিনিসগুলোকে একভাবে দেখতেন। গত ১০০ বছরের স্কলারশিপের মধ্যে নানান রকমের আলোচনার প্রেক্ষিতে এখন বোঝা যায় জিনিসগুলো এত সিম্পল না। মীর্জা দেলোয়ারদের আলোচনার মধ্যে মোটা একটা আইডিয়া ছিল যে, ‘রেশনালিটি’ বনাম ‘বিলিফ’ মানে হচ্ছে যৌক্তিকতা বনাম ট্রেডিশন অথবা ট্রেডিশনাল জ্ঞান চর্চা—এটা আসলে ঠিক না। কারণ ওই সময়ে যারা ‘ট্রেডিশনালিস্ট’ ছিলেন তারাও কিন্তু যুক্তি নিয়ে আলোচনা করতেছেন। কাসেম নানুতুবী রহমাতুল্লাহ, আহমদ রেজা খান এবং আশরাফ আলী থানবী— প্রত্যেকেই কিন্তু লজিক নিয়ে আলোচনা করেছেন, রেশনালিটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সুতরাং, যারা মডার্নিস্ট তাদের মধ্যে একটা আইডিয়া আছে যে, আমরা-ই কেবল rationality এর চর্চা করতেছি আর আমাদের বাইরে যারা তারা irrational—এই আইডিয়াটা আসলে প্রবলেমেটিক।
ইমানুয়েল কান্টের ‘What is enlightenment?’ বা ‘চেরাগায়ন’ নামে যে বইটা বা প্রবন্ধটা আছে সেটা আলোচনা শুরু করে এ কথা দিয়ে যে, ‘আলোকায়ন’ কী?/ ‘চেরাগায়ন’ কী?— তো চেরাগায়ন হচ্ছে যে, মানুষ যখন নিজে বাইরের বরাত দেওয়া ছাড়া নিজে চিন্তা করে। কিন্তু এই বক্তব্যটা আসলে প্রবলেমেটিক একটা বক্তব্য। আসলে ট্রেডিশনকে বরাত দেওয়া বা বরাত না দেওয়াকে বিলিভ বনাম রেশনালিটি দিয়ে ফ্রেমিং করার যে ব্যাপারটা এবং এই যে বাইনারি গুলা করা হচ্ছে এটা কি আসলে exist করে? যে যুক্তি দেয় তার মাথায় তো আসলে নানান রকম বিশ্বাস কাজ করে। মানুষ তো বিশ্বাস ছাড়া হতে পারে না। ধরেন, আপনি বরাত দিচ্ছেন না ঠিকই, কিন্তু আপনি তো হিস্ট্রির বাইরের কেউ না। সুতরাং, মুসলমানরা অথবা ‘ট্রেডিশনালিস্ট’রা বরাত ছাড়া কথা বলতে পারে না অথবা বরাতে যা আছে তারা সেটা সরাসরি নকল করে—বিষয়টা এত সিম্পল না; জিনিসটা যথেষ্ট ক্রিটিক্যাল। আমরা যখন ট্রেডিশনালিস্ট এবং মর্ডানিস্ট সিলসিলার কথা বলি তখন আসলে আমাদের জন্য এই বাইনারি গুলো ভাঙ্গা দরকার এবং সেটা উভয় পক্ষের জন্য-ই ভালো। ট্রেডিশনালিস্টরাও যে খুব ভদ্র অথবা তারাও যে খুব ভালোএমন না। তারাও মানুষকে বলে যে, আমরা ধর্মের বরাত দিয়ে কথা বলি আর মর্ডানিস্টরা যুক্তি দিয়ে কথা বলে। মানে যে যুক্তি দিয়ে কথা বলছে সেটারও তো আসলে একটা এথিক্যাল ভিত্তি থাকতে পারে। যুক্তি মাত্রই খারাপ অথবা বরাত মাত্রই খারাপ— এই যে বাইনারি গুলা এটা আসলে প্রবলেমেটিক।
আমি আরো দুইটা পয়েন্ট নিয়ে কথা বলি। সেটা হচ্ছে যে মীর্জা দেলোয়ার সাহেব তিনি সেকুলারিজমের আলোচনায় এক জায়গায় বলতেছেন যে, আধ্যাত্মিক এবং দুনিয়াবী জীবনের ভাগ করা। এটা মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং, মুসলিম হিস্ট্রিতে রিলিজিয়াস অথরিটি বলতে কিছু ছিল না যেটা ছিল ইউরোপে একটা প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি হিসাবে। ইউরোপিয়ান হিস্ট্রিটা কেউ যদি না পড়ে অথবা ধরেন চার্চ কিভাবে ফাংশন করে এটা কেউ যদি না বুঝে তাইলে বোঝা কঠিন যে মুসলিম সোসাইটিতে অথবা মুসলিম হিস্ট্রিতে যে রিলিজিস অথরিটি ছিল না। কারণ চার্চে কিন্তু আপনার তার মতটা মানতে বাধ্য। কিন্তু, ইসলামে আপনি নির্দিষ্ট কোন ধর্মীয় অথরিটির বক্তব্য মানতে বাধ্য না। হাটহাজারী অথবা জামাতে ইসলাম তারা ফতোয়া দিলো যে এটা আপনার মানতে হবে। কিন্তু আপনি বিরোধিতা করতে পারেন এবং আপনি যদি বিরোধিতা করেন আপনি কম মুসলমান হয়ে যাবেন না।
কিন্তু ইউরোপে রিলিজিয়াস অথরিটিটার বিরুদ্ধে আপনার দ্বিমত করার জায়গাটা আসলে ছিল না। কারণ সে হচ্ছে ডিভাইন রিপ্রেজেন্টেশন মানে ধর্মীয় অথরিটি হচ্ছে একটা ডিভাইন রিপ্রেজেন্টেশন। এখন ডিভাইন রিপ্রেজেন্টেশনের বিরুদ্ধে তো আপনি বলতে পারেন না। সুতরাং, এইখানে যদি Wael Hallaq এর আলোচনায় দেখেন এবং তার ‘impossible state’ যে বইটা এই বইটার মধ্যে উনি কেন মনে করছেন যে, হচ্ছে মর্ডানিটির মধ্যে, মডার্ন স্টেটের মধ্যে ইসলাম সম্ভব না। উনি বলতেছেন যে, মুসলিম সোসাইটিতে নির্বাহী বিভাগ অর্থাৎ লিগাল অথরিটি আর এক্সিকিউটিভ অথরিটি দুইটা যে আলাদা এবং মুসলিম হিস্ট্রিতে যেভাবে চর্চা হইছে এইটা মর্ডান রাষ্ট্রের মধ্যে কল্পনাই করা যায় না। সুতরাং, Wael Hallaq দের বক্তব্য কিন্তু মির্জা সাহেবদের বক্তব্য কিন্তু ঠিক এটার বিপরীত। হয়তো তিনি যদি আমাদের সময় বেঁচে থাকতেন তাহলে সম্ভবত এইভাবে তিনি বলতেন না।
ধর্ম বনাম জ্ঞানের আলোচনায় মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদ বলছেন যে, যেহেতু ধর্মীয় গ্রন্থের বক্তব্যই চূড়ান্ত হিসেবে পরিগণিত হয় ফলে জ্ঞান কখনোই একটি নির্দিষ্ট সীমার বাইরে যেতে পারে নি। এটা কি সত্য? প্রিন্সিপালের আলোচনা করতে গিয়ে আপনি কোরআনের একটা আয়াত আনছেন অথবা হাদিস নিয়ে আসছেন;আরেকজন এটার বিপরীতে আরেকটা নীতি দাঁড় করাতে পারে ভিন্ন আয়াত ও হাদিসের দলিল দিয়ে। ফলে,বরাত দিলেই যে ক্রিটিকশূন্য হয়ে যায়— ব্যাপারটা এমন না। তালাল আসাদের ডিসকার্সিভ ট্রেডিশনের যে আলোচনা, সেটার মধ্যে ঢুকছি না। কিন্তু এটা আসলে খুব সিম্পলিস্টিক চিন্তা যে, মুসলমানরা কখনোই একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির ভিতর থেকে বের হইতে পারে নি। যদি তাই হতো তাইলে তো এত মাযহাব তৈরি হতো না, এত মতামত তৈরি হতো না। চারটা মাজহাবকে তো আমরা বলছি যে তারা ঠিক ছিল। আকিদার ক্ষেত্রে তাদের আসলে বিভিন্ন মত ছিল। ফলে যুক্তি বনাম যুক্তিহীনতা, বরাত বনাম বরাতহীনতা মতো আলোচনা সমস্যাপূর্ণ। বিষয়ে আরেকটু ক্রিটিক্যাল হওয়া দরকার। এটাও ভাবা দরকার যে, আমরা এই সময় এসে বিষয়গুলোকে যেভাবে দেখছি ১০০ বছর আগে আসলে এত লিটারেচার এভেলেবল ছিল না, এত ক্রিটিকগুলো এভেলেবল ছিল না। খোদ ওয়েস্টার্ন লিটারেচারে-ই দেখানো সম্ভব, পশ্চিমা একাডেমিকরা বাইনারিগুলো মানছেন না। তো ওই সময় আসলে মির্জা দেলোয়ারদের হাতে এত লিটারেচার ছিল না এবং তাদেরকে আসলে এগুলার জন্য দোষও দেওয়া যাবে না। কারণ, ট্রেডিশনালিস্টরা যেভাবে মডার্নিস্টদেরকে ডিল করে এটাও প্রবলেমেটিক। কারণ তারা মনে করে যে, যুক্তি মাত্রই খারাপ বা এরকম একটা এপ্রোচ আছে তাদের মধ্যে যেটাও আসলে একই সাথে ঝামেলাপূর্ণ।
ইমাম গাজ্জালী এবং ইমাম রাজি একটা প্যারাডাইম অথবা একটা মডেল তৈরি করছিলেন যে, যদি টেক্সট এর সাথে যুক্তির বিরোধ হয় তাহলে আমরা সেটাকে কিভাবে ডিল করব এবং এটার পসিবিলিটি আছে কি নাই এবং এটার বিরুদ্ধে ইমাম ইবনে তাইমিয়ার দশ খন্ডের একটা বই আছে “The Refutation of the Contradiction of Reason and Revelation”। মানে কখনো যে টেক্সটের সাথে বাস্তবতার অথবা যুক্তির বিরোধ হতে পারে বা বিরোধ দেখা যেতে পারে এবং এটারও যে একটা আলোচনার মধ্যে আনতে হবে আমাদের ট্রেডিশনের মধ্যে কিন্তু এ ধরনের চর্চা আছে। আল-গাজ্জালী এবং ইমাম রাজির বইটার নাম হচ্ছে ‘قانون التاويل’এটা খুবই ছোট একটা বই।
মুসলিম একাডেমি এর মধ্যে এখন দুইটা ক্যাটাগরি দাঁড়াইছেএকটা হচ্ছে ফিকহের বা লিগ্যাল ক্যাটাগরি আরেকটা হচ্ছে থটের ক্যাটাগরি। একটাকে বলা হচ্ছে ‘ইসলামিক ল’ আরেকটাকে বলা হচ্ছে ‘ইসলামিক থট’। মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েনসহ অই সময়ের মডার্নিস্ট চিন্তকদের চিন্তার একটা ফলাফল হচ্ছে যে, ইসলামিক থট বলতে আমরা বর্তমানে পাই সেটা। কারণ, ট্রেডিশনাল যে চর্চা ইসলামের সেখানেও বেশ কিছু জটিলতা আছে। ইসলামিক থটের যে আলোচনা সেখানে সোশিওলজি হিস্ট্রি এবং সাইকোলজি থাকে— একটা মাল্টিপ্লিপ্লিনারী এপ্রোচ থাকে। এইখান থেকে একটা ক্রিটিক্যাল ধারা বেড়ে ওঠে। ‘ইসলামিক থট’ এবং ‘ইসলামিক ল’ তারা যদি পরস্পরকে খারিজ করা ছাড়া একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা, আলাপ-আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্ক হেলদি কম্পিটিশন, একটা ডিবেট ডিসকাশন চালাতে পারে তাহলে আমরা উভয়ের জন্যই একটা ভালো ফলাফল দেখতে পাব। যেমন, আপনি মালেক বিন নাবির (Malek Bennabi) কথা ধরেন, ইবনে খালদুনের‘আল-মোকাদ্দিমা’ বইটা কিন্তু ফিকহের বই না। মালেক বেন্নাবির কাজগুলো তো আসলে আইন সম্পর্কিত কাজ না। তার একটা বই আছে The Quranic Phenomenon। এইটা ছাড়া অন্য যে বইগুলো আছে সেগুলো অধিকাংশ ফিকই বা আইনের বই না। ইমাম আল-গাজালি গ্রিক ফিলোসফি এবং মুসলিম ফিলোসফারদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন ‘ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ বইয়ে ethics কে ডিফাইন এবং বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করতে গিয়েছেন, তখন তিনি গ্রীক দার্শনিক প্লেটো থেকে প্যারাডাইমটা নিয়েছেন। ফলে একটা সভ্য উপায়ে ‘ইসলামিক থট’ এবং ‘ইসলামিক ল’— এ দুইটা ডিসিপ্লিনের আলাপ-আলোচনাকে যদি আমরা এগিয়ে নিতে পারি তাহলে সম্ভবত মীর্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমদরা ১০০ বছর আগে যে কথাগুলো বলছেন সে কথাগুলোর সীমাবদ্ধতা সহ আজকে একটা তুলনামূলক ভালো ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারব।

Share: