আধুনিকতা ও গণতন্ত্র নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে সাধারণত দুই ধরনের প্রিমাইজ কাজ করে। প্রথমত, আধুনিকতা ও গণতন্ত্র একটা পশ্চিমা জিনিস এবং পশ্চিমের মাধ্যমেই সবকিছু আমাদের কাছে এসেছে। দ্বিতীয়ত, আমরা গণতন্ত্রকে কী হিসাবে বুঝব—শাসন পদ্ধতি নাকি সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রক্রিয়া?
নৃবিজ্ঞানী ডেভিড গ্রেইবারের There Never Was a West নামে একটি প্রবন্ধ আছে।[1] সেখানে তিনি বলছেন যে, যদি আমরা গণতন্ত্রকে সিদ্ধান্ত প্রণয়নের জায়গা থেকে কল্পনা করি, তাহলে “পশ্চিমা” বলে আলাদা করে কিছু থাকে না। আবার, আধুনিকতা বা মডার্নিটি যে পশ্চিমাদের আবিষ্কার, এই দাবিকেও এখন অনেকে পর্যালোচনা করেছেন। মডার্নিটির যত উপাদান—টেকনিক্যাল, টেকনোলজিক্যাল বা অন্য যা কিছু—এগুলো দুনিয়ার নানা জায়গা থেকে, মুসলিম দুনিয়া থেকে, চীনা দুনিয়া থেকে, বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট কারণে এই কনফিগারেশনটা ইউরোপে উদ্ভব হয়েছে—এটা সত্য। কিন্তু এর যাবতীয় উপাদান দুনিয়ার নানা জায়গা থেকেই নেওয়া। কিন্তু যখন ঘটনাটা ইউরোপে ঘটে গেল, তার পর থেকে বলা শুরু হলো—“এটা আমাদের জিনিস”, এবং এমনভাবে বলা হলো যেন বাকি দুনিয়া যেন আন্ধাইরে বা অন্ধকারে ছিল এবং তাদের নিজের কোনো কার্যকলাপ ছিল না, সবকিছু নাকি ইউরোপীয় আবিষ্কারের ফল। আদিত্য নিগম খুব সম্প্রতি তাঁর বই Decolonizing Theory-তে দেখাচ্ছেন যে, বিষয়টা আসলে এমন সরল না; বরং বিভিন্ন ট্র্যাডিশনের মধ্যে এক ধরনের গতায়াত আছে।[2] মডার্নিটিকে একেবারে এমনভাবে হাজির করা যেন এটা কেবলই পশ্চিমা জিনিস এবং তার বাইরে আর কিছুই নেই—এটা আসলে মডার্নিটির “আবিষ্কার”-এর পরের আবিষ্কার।
গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলমানের পরিচয়টা কীভাবে গড়ে উঠছে—বিশেষ করে ২০-এর দশক থেকে যে ঘটনাটা শুরু হলো সেটা আমাদের খেয়াল করা দরকার। বাঙালি মুসলমান যখনই নিজের পরিচয় নিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তখন দুইটা জিনিস একসাথে ঘটছে। একটা হচ্ছে কৃষক প্রশ্ন; আরেকটা হচ্ছে ইসলাম প্রশ্ন। মানে মুসলমান পরিচয় আর বাঙালি পরিচয় ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়েছিল। এটা কোনো অবাক হওয়ার বিষয় না যে কাজী নজরুল ইসলাম যখন পত্রিকা করেন, তার পত্রিকার নাম হয় লাঙল। অথবা দেখি, বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ যখনই কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম করতে গেছে, তাদের সবার আগে কৃষকের সমস্যার সঙ্গে ডিল করতে হয়েছে। আর লাঙল পত্রিকায় তখন হসরৎ মোহানি এবং আজাদ সুবহানীর লেখা ছাপা হচ্ছে—সেসব লেখায় তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ইসলাম কীভাবে কমিউনিজমের ভেতরে যেতে পারে, ইসলামের সঙ্গে কমিউনিজমের সম্পর্ক কী হতে পারে। তাঁরা যাকাতের ধারণা মাধ্যমে তা ব্যাখ্যা করছেন—আর সেটা হচ্ছে লাঙল–এই পত্রিকায়। আমি যদি এটাকে সাংকেতিকভাবে পড়তে চাই, তাহলে এখানে বড় একটি ইশারা দেখতে পাই।
আমাদের এখানে একটা আলাপ আছে, যেমনটা তাজ হাশমি Pakistan As A Peasant Utopia বইয়ে বলেন যে, পাকিস্তান আন্দোলন ছিল ক্লাস পলিটিক্স, পরবর্তীতে পলিটিশিয়ানরা একে কমিউনাল বানিয়ে ফেলেছিলেন।[3] এ আলাপের একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এখানে ‘ক্লাস’কে বিশুদ্ধ বর্গ হিসাবে পূর্বানুমান করা হয়। কিন্তু, আদতে ক্লাস আইডেন্টি হিসাবে অন্যান্য আইডেন্টিকে বাহিরে রাখে না। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বাঙালি মুসলমান যখনই রাজনীতি করতে গিয়েছে তার ক্লাস এবং ধর্মীয় পরিচয়কে খুব একটা আলাদা করে যেতে হয় নাই। বরং, দুটো মিলেই সে গঠিত হয়েছে। ফলে যখন আমরা এই সমালোচনা করি যে—“পাকিস্তান আন্দোলন আসলে ক্লাস-স্ট্রাগল ছিল, রাজনীতিবিদরা এটাকে কমিউনাল বানিয়ে ফেলছেন”—তখন মূলত আমাদের মাথায় তখন পূর্বানুমান হিসেবে থাকে যে, ‘ক্লাস’ একটা বিশুদ্ধ আইডেন্টিটি ও বর্গ, তার সাথে কোন কিছুই যেন মিশে না। কিন্তু আদতে এটা হয় না। এটা একটা ইউটোপিয়ান কল্পনা হিসেবে রয়ে যায় আসলে।[4]
বাঙালি মুসলমান যখন নিজস্ব পরিচয় নির্মাণ করছে, তখন তার সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ উপস্থিত ছিল। একটা হচ্ছে—সে একটা কলোনির অধীনে।, ফলে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকেই তাকে নেগোশিয়েশন করে চলতে হচ্ছে; তার ব্যক্তিগত চাওয়া–না–চাওয়ার বাইরে গিয়েও কিছু প্রভাব তাকে বহন করতে হচ্ছে। আবার “বাঙালি রেনেসাঁ”, যেটা রামমোহন রায় এবং বিদ্যাসাগররা গড়ে তুলছিলেন সেটা দ্বারা সে প্রভাবিত। বিশের দশকের বাঙালি মুসলমান শিক্ষিত গোষ্ঠী তাদেরকে নিজের পূর্বসূরি হিসেবে মনে করতেন। কিন্তু একই সঙ্গে তার আবার নিজস্ব একটা আলাদা আইডেন্টিটিরও প্রয়োজন পড়ে। ফলে দেখা যায়, সে একটা ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে—একদিকে উপনিবেশ শক্তির সাথে কখনো সমঝোতা করা লাগছে কখনো উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে যাওয়া লাগছে, আরেকদিকে কলকাতার হিন্দু রেনেসাঁর প্রশংসা করা লাগছে, আবার এর বাহিরে এসে তার নিজেরও একটা পরিচয় নির্মাণের আপ্রান প্রয়াস আছে। ফলে উপনিবেশ এবং হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিপরীতে গিয়ে তাকে নিজের পরিচয় নির্মাণ করতে হচ্ছে। আমি এটা বললাম কেন? কারণ আমরা পুরো ঘটনাটার একটা চরম পর্যায় দেখতে পাই পাকিস্তান আন্দোলনে।
এখন, এই সময় দাঁড়িয়ে আমরা বিশেষ করে সমকালীন জাতীয়তাবাদী হিস্টোরিওগ্রাফিতে যেভাবে আলোচনা করি, সেখানে বাঙালি মুসলমানের মুসলমান–কৃষক পরিচয় সব মিলিয়ে যে সংগ্রাম সেটা খুব সহজভাবে স্বীকার করতে চাই না। ফলে যা হয়, বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান আন্দোলন আর বাংলাদেশ আন্দোলন—যেটাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ বলছি—এই দুটোকে ধারাবাহিকভাবে দেখতে পারিনা। বারবার আমাদের কাছে মনে হয়, একটা যদি “থিসিস” হয়, আরেকটা তার “এন্টিথিসিস”—একটাকে ভুল, আরেকটাকে ভুলের সংশোধন হিসেবে দেখতে শুরু করি। এখানে আমি একটা নোক্তা দিয়ে রাখি যে, ১৯৭১ সালে কলকাতার অজস্র পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লেখালেখি হচ্ছিল। তৎকালীন বিদ্বৎসমাজের অনেকেই লিখছিলেন—বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন। আমরা সবাই জানি, এটা আমরা খুব প্রশংসা করেই দেখি। কিন্তু তাঁদের অনেকের যুক্তি ছিল—বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়ে একটা ভুল করেছিল, বাংলাদেশ আন্দোলন হচ্ছে সেই ভুলের খেসারত। এমনকি এ আলাপও চলছিল —পাকিস্তান আন্দোলনে যে ভুলটা হয়েছিল, মিলিটারি অ্যাকশনের মাধ্যমে তার মোহ ভেঙে গেছে, ভুলটা উন্মোচিত হয়েছে। মানে, তাঁদের আর্গুমেন্ট এই পরিসরে চলে গিয়েছিল। এরপর ৮০–৯০-এর দশকের দিকে এসে আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তান আন্দোলন আলোচনা করি, আমাদের বিদ্বৎ সমাজে, মানে যাকে এখন বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাস বলি, সেখানে এই ধারণাটা আবার প্রবল আকারে ফিরে আসে। আমরা দাবি করতে শুরু করি—পাকিস্তান আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ/বাংলাদেশ আন্দোলন দুটো পরস্পরের বিপরীত ছিল। একটা ভ্রান্তি, আরেকটা তার সংশোধন। মূলধারা ইতিহাস এই ধারণাটাই অনেকটা কবুল করে ফেলে। আমাদের খুব পছন্দের লেখক আকবর আলী খান সুন্দর করে বললেন যে আমি যেন আমার অর্বিট থেকে ছুটে গেছিলাম, আবার ফিরে এসেছি। অর্থাৎ, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে কক্ষপথ থেকে ছুটে যাওয়া হিসাবে কল্পনা করেছিলেন। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই কলকাতার বুদ্ধিজীবী বৃত্ত থেকে এই ফ্রেমটা ধার করি।
এইখানে একটা মজার ব্যাপার বিষয় হচ্ছে, এই মুহুর্তে আমরা যাদের জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে কল্পনা করি, উদযাপন করি, একদম শেখ মুজিব থেকে শুরু করে মাওলানা ভাসানী পর্যন্ত—তাঁদের সবারই আবার আরেকটা পরিচয় আছে। তাঁরা সবাই পাকিস্তান আন্দোলনের সাথেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং খুব ভোকাল ছিলেন। আমরা এখন যেভাবে বলছি যে, দুইটা আন্দোলন পরস্পর বিপরীতধর্মী ছিল; যাকে মূলধারার ইতিহাস একদম কবুল করে ফেলছে। এ বয়ানটা মূলত আমরা কলকাতা থেকে গ্রহণ করেছি। তো আমার খুব জানার আগ্রহ ছিল যে, যারা পাকিস্তান আন্দোলনে ছিলেন, পরে আবার বাংলাদেশ আন্দোলনও করেছেন— এইসব নেতারা কী ভাবছিলেন? তখন আমি দেখলাম যে, আসলে ভিন্ন চেহারা। যেমন, আবুল মনসুর আহমদের ১৯৪২ সালে লেখা একটা আর্টিকেল আছে পাকিস্তান কেন প্রয়োজন তা নিয়ে। তিনি সেখানে যুক্তি দিচ্ছেন—পাকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী ধারণা। তিনি সেখানে থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন—বলছেন, আল্লাহ মানুষকে নানা রূপে, নানা জাতি–গোত্রে সৃষ্টি করেছেন; সবাইকে একই রূপে, একই জাতিতে, একই দেশে বানাননি। আল্লাহ যে সবাইকে এক-ই রূপে বানালেন না; এক-ই দেশ ও জাতিতে পাঠালেন না—এটা আসলে আল্লাহ যে গণতন্ত্র ও বৈচিত্র্য চান তার একটা পরিচয়। অখণ্ড ভারতের কল্পনা আসলে একটা ফ্যাসিস্ট কল্পনা যেখানে সবাইকে একরূপী হিসাবে দেখতে চাওয়া হয়। এটা ব্রিটিশদের কায়দায় কল্পনা করার মতোই— এক জায়গার সম্পত্তি আরেক জায়গায় নিয়ে পুঞ্জিভূত করা। এই যে অখণ্ড ভারতের একরূপী, টোটালিটেরিয়ান কল্পনা তার বিপরীতে পাকিস্তান হচ্ছে আল্লাহ–প্রদত্ত এই বহুরূপীতাকে মেনে নেওয়া—এইভাবে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন।[5]
তারপর দেখি, ১৯৭২ সালে আবুল মনসুর আহমদ আরেকটা প্রবন্ধ লিখছেন। তিনি ‘শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু’ বইটার ভূমিকাটা লিখছেন—বইটা হচ্ছে মূলত পাকিস্তান আমল জুড়ে তাঁর নানা প্রবন্ধের সংকলন, আর ভূমিকাটা তিনি ১৯৭২ সালে লিখছেন।[6] তখন তাঁর সামনে বড় একটা প্রশ্ন—তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, পাকিস্তান আমলজুড়ে সক্রিয় ছিলেন, আবার এখন বাংলাদেশ হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে তখন স্লোগান উঠছে—দ্বিজাতিতত্ত্ব ভুল, পাকিস্তান আন্দোলন ভুল আন্দোলন ছিল, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এখানে আমার প্রশ্ন ছিল, কিভাবে আবুল মনসুর আহমেদ কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানান? তিনি বলছেন—যে কারণে পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছিল, সেই কারণটা পূরণ হয়নি বলেই পাকিস্তান ভেঙে গেছে। তিনি বলছেন—কায়েদে আজম জিন্নাহর কল্পনা ছিল “সেকুলার ডেমোক্রেসি”; পাকিস্তানের মূল আকাঙ্ক্ষার ভেতরে সেকুলার ডেমোক্রেসি ছিল, এবং সেটা কায়েম করা যায় না বলেই পাকিস্তান ভেঙে গেছে। তিনি আরও বলছেন—লাহোর প্রস্তাবের ভেতরে মূলত তিনটা রাষ্ট্রের কল্পনা ছিল, দুটো রাষ্ট্রের না। আরেকটা ‘অদ্ভুত’ সিদ্ধান্ত তিনি দিচ্ছেন, যেটা আমাদের এখানে একদম জনপ্রিয় না, আলোচনায়ও খুব আসে না—তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আন্দোলন হচ্ছে লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব থেকে সরে যাওয়ার কারণে এই ২৫ বছর গ্যাঞ্জাম পোহাতে হয়েছে, এবার লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন ঘটল। তাঁর কাছে ডেমোক্রেসির প্রশ্নটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুরো পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশ হওয়ার পরে তাঁর যে সক্রিয়তা সবটাই ছিল গণতন্ত্রকে কেন্দ্র করে।
সম্প্রতি অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে এখন যে বিতর্ক চলছে—“একজন পুলিশ অফিসার নাকি এটা লিখেছেন”—এটা আসলে আমাদের এখানে একটা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে। মূলত ইস্যুটা সিক্রেট ডকুমেন্টসের ক্ষেত্রে করা হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে একজন পুলিশ অফিসার শেখ মুজিব ও অন্যান্যদের নিয়ে সিক্রেট ডকুমেন্টস শেখ হাসিনার কাছে জমা দেন। সেখান থেকে শেখ হাসিনা শেখ মুজিবেরটা বের করে আনেন। খুব অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, একটা ঐতিহাসিক দলিল বের করা হচ্ছে অথচ সেখানে কোন ইতিহাসবিদের সংশ্লিষ্টতা নাই; পুরো ব্যপারাটাই পুলিশ অফিসারদের অধীনে সম্পাদনা করা হচ্ছে। এর সাথে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সম্পর্ক নাই। এখানে এমন অসংখ্য তথ্য আছে সেগুলো সিক্রেট ডকুমেন্টসের সাথে মিলে না। তাছাড়া, অসমাপ্ত আত্মজীবনী যে বয়ানটা দেয় সেটা আমাদের এখানকার বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের গত ৩০–৪০ বছরের প্রচলিত বয়ানের সঙ্গে একদমই মেলে না। আমি মাঝে মাঝে বলি, শেখ হাসিনা অসমাপ্ত আত্মজীবনী প্রচার করে ভুল করে ফেলছেন। কারন বইটির কোনভাবে তার বয়ানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না। কারন, সেখানে দেখা যায়, পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে শেখ মুজিবের যে স্বপ্ন এবং পাকিস্তান হওয়ার পরে তাঁর যে সক্রিয়তা পুরোটাই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত।
একইভাবে কামরুদ্দিন আহমদের লেখাতে দেখি[7]—একাত্তরে তিনি তখন জেলে, লিখছেন: আমি তো পাকিস্তান আন্দোলন করলাম, এখন বাংলাদেশ আন্দোলন করলাম—তাহলে কি আগেরটা ভুল ছিল? তিনি নিজেই উত্তর দিচ্ছেন—না, আমি ভুল করিনি; আমি ইতিহাসের ধারাবাহিকতার ভিতরেই আছি। ওটা ছিল সেই সময়ের ইতিহাসের প্রয়োজন, আর এখন আরেকটা নতুন ইতিহাসের প্রয়োজন এসেছে। খেয়াল করে দেখবেন, কামরুদ্দিন আহমদের মতো বাঙালি মুসলমানদের এ দুটো আন্দোলনকে পরস্পরবিরোধী হিসাবে না দেখার একটা আলাদা তরিকা আছে।
৮০–এর দশক থেকে আমাদের মেইনস্ট্রিম পলিটিক্স এবং হিস্টোরিওগ্রাফি তাঁর এই তরিকাটাকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। বাদ দেওয়ার ফলে পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে, বা ওই সময়ের তৎপরতা নিয়ে কোনো আলাপ দাঁড়ায়নি, কিংবা তারা করতেও চায়নি। কারণ তারা সবসময় কল্পনা করেছে—“বাঙালিত্ব” আর “মুসলমানিত্ব”–এর মধ্যে এক ধরনের এন্টাগোনিজম আছে, পার্থক্য আছে। কিন্তু ২০–এর দশক থেকে গড়ে ওঠা আমাদের এই গঠনটাকে যদি বিচার-বিশ্লেষণ করি তাহলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা, তার পরিচয় নির্মাণ, এবং সেই পরিচয় নির্মাণের ভেতরে শ্রেণী ও ধর্মসহ নানাবিধ পরিচয়ের মিশেলের সন্ধান করতে পারব।
বিশেষত, আমার মনে হয়, আমরা যে সংকটে আছি—যে কারণে এখন আমাদের এইসব আলোচনা আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে, বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রের মধ্যে ঢুকে পড়ার ইতিহাস প্রায় ৭৫ বছরের উপরে হবে যদি আমি ৪৭ থেকে হিসাব করি। আর আমি যদি ৭১ থেকে হিসাব করি তাহলে প্রায় ৫৫ বছরের উপরে হবে। আমাদের ৫৫ বছর পরে এসে কেন আমাকে আসলে এই আলোচনা শুরু করা লাগছে, যেখান থেকে শিক্ষা নিতে হচ্ছে—এর মানে কোন একটা গণ্ডগোল আমাদের মাঝে রয়েছে। আমার বিবেচনায় একটা গণ্ডগোলটা হচ্ছে, এই জনগোষ্ঠীর তৎপরতাকে কীভাবে পাঠ করব আমাদের হিস্টোরিওগ্রাফিতে তা ঠিক করা হয় নাই। আমাকে একটা আন্দোলনকে আরেকটা আন্দোলনের নিরিখে সহি অথবা অসহি করে তুলতে হয়। যদি একটা আন্দোলনকে “শুদ্ধ” বলি আরেকটা আন্দোলনকে “ভুল” বলতে হচ্ছে! এই জায়গা থেকে বের হয়ে যদি আমি আমার নিজের জনগণের আকাঙ্ক্ষা, গণতান্ত্রিক তৎপরতার জায়গা থেকে আমার ইতিহাসকে বুঝতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা যে কানাগলির কথা বলছি, সেখান থেকে বের হতে পারব।[8]
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, একটা জায়গায় এসে আমাদের আবার থেমে যেতে হয়। আমরা এত কিছু প্রমাণ করে দেখাচ্ছি—আমাদের এত গণতান্ত্রিক তৎপরতা ছিল, তৈমুর রেজা ভাইয়ের ভাষায় বললে আমাদের একটা “গণতান্ত্রিক রসম” ছিল—যেটা তিনি বাহাসের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।[9] এগুলোও যদি আমি বিবেচনা করি তবু আমাদেরকে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন মোকাবেলা করতে-ই হবে। সেটা হলো, এত কিছুর পরও, এত গণতান্ত্রিক রসম, এত উদাহরণ উদ্ধার করার পরও, এই ভূখণ্ডের মানুষ—যাদের আমরা বাঙালি মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করছি, যারা নিজেদেরকে বাঙালি মুসলমান বলি— গত ৭০ বছরে আমরা কেন টানা দুইবার কেন ‘নির্বাচন’ দিতে পারলাম না? টানা দুইবার কেন এখনো সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারলাম না?
গণতন্ত্রকে আপনি সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রক্রিয়া বলেন, শাসন পদ্ধতি–ই বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা। কেন এমন হচ্ছে যে, যে–ই ক্ষমতায় থাকে, তাকে রক্তাক্ত কর্মকাণ্ড ছাড়া আর নামানো যায় না? এটা আসলে আমাদের পুরো আলোচনার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে টানা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা আমাদের দুঃখজনক অধ্যায়ও যে, আমরা একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড বসে কথা বলছি। এরকম ট্রানজিশন পিরিয়ড আর এরকম রক্তাক্ত কর্মকাণ্ড কেন আমাদের বারবার ঘটাতে হচ্ছে “গণতান্ত্রিক তৎপরতা”র অংশ হিসেবে! এটাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় এবং ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে যাচ্ছে।
[1] David Graeber, ‘There Never Was a West Or, Democracy Emerges From the Spaces In Between’, Possibilities: Essays on Hierarchy, Rebellion, and Desire, AK Press, 2007
[2] Aditya Nigam, Decolonizing Theory: Thinking across Traditions, Bloomsbury Publishing India Pvt. Ltd, 2020
[3] Taj Ul-islam Hashmi, Pakistan As A Peasant Utopia: The Communalization Of Class Politics In East Bengal, 1920-1947, Rutledge, 1992
[4] Aditya Nigam, ‘Identity illusions, unclassified categories’, The Daily Star, Dec 22, 2017
[5] মনসুর আহমদ, পাকিস্তানের বিপ্লবী ভূমিকা, সরদার ফজলুল করিম (সম্পাদনা), পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য, হাওলাদার প্রকাশনী, ২০১৮ (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৮)
[6] আবুল মনসুর আহমদ, শেরে বাংলা হইতে বঙ্গবন্ধু, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ২০১৭
[7] কামরুদ্দীন আহমদ, বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী, প্রথমা, ২০১৮
[8] এই বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ আছে লেখকের প্রকাশিতব্য বইয়ে: সহুল আহমদ, ইতিহাস ও বয়ান : পাকিস্তান আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, গ্রন্থিক প্রকাশন, ২০২৫
[9] তৈমুর রেজা, ‘উপনিবেশি বঙ্গে বাহাছ ও গণতান্ত্রিক রসম: মহাম্মদ নইমুদ্দীনের আদেল্লায় হানিফীয়া’, আহমেদ কামাল ও অন্যান্য (সম্পা.) সময়ের কুয়াশায়: দীপেশ চক্রবর্তীর সম্মানে প্রবন্ধগুচ্ছ, ইউপিএল, জানুয়ারি ২০২৩