জনপরিসর ও গণের সার্বভৌমত্বের ধারণা

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের গণতান্ত্রিক তৎপরতা

Share:

“Islamic” আর “Islamicate” এই দুইটা পরিভাষার মধ্যে পার্থক্য আছে, আবার Islamicate এবং Muslim-ও এক জিনিস না—এই জায়গাটা আমাদের খেয়াল করতে হবে। আমরা “Islamicate” পরিভাষাটা মূলত পেয়েছি মার্শাল হজসনের কাছ থেকে। তিনি The ‘Venture of Islam’ নামে তিন খণ্ডের একটা বই লিখেছেন সেখানে তিনি “Islamicate” বর্গটা কয়েন করেছেন। সেখানে তিনি বলছেন, Islamicate বলতে আমরা বুঝব যেটা সরাসরি শুধুমাত্র মুসলমানদেরও না, আবার শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মেরও না; বরং ইসলাম যখন কোনো সমাজের মধ্যে বা কোনো নির্দিষ্ট পরিসরে হাজির হয়েছে, তখন তা থেকে যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক রূপের জন্ম হয়েছে, যেগুলো পরবর্তীতে ইসলামি সভ্যতা বা ঐতিহাসিক ইসলামিক সাম্রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এখন, Islamicate ধারণাটা মাথায় রেখে যখন আমরা “Center for Islamicate Bengal” বলি, তখন প্রশ্ন আসে—আমরা কি হজসনের সেই অর্থেই শব্দটা ব্যবহার করছি, নাকি নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছি? মানে আমি যখন বাংলার ইতিহাসে Islamicate বর্গ ধরে গণতান্ত্রিক তৎপরতার আলোচনা করছি সেখানে Islamicate বর্গটার ভেতরে যে আলাদা তাৎপর্য আছে সেটা খেয়াল রাখছি কি না? আমরা যখন ঔপনিবেশিক আমলে গণতান্ত্রিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা শুরু করছি, তখন অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতরে থেকে আলাপ করতে হবে। তবে এটা একটা বিতর্কের জায়গা যে, গণতান্ত্রিক তৎপরতা কি সত্যিই শুধু উপনিবেশিক সময় থেকেই শুরু, নাকি তার আগেও মুসলিম সমাজের ভেতরে কিছু ছিল? এখানে হয়তো অ্যাসেম্বলি, মজলিসে শূরা, কিংবা খোলাফায়ে রাশেদীনের সময় থেকে খলিফা নির্বাচনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ আসতে পারে।

বর্তমান দুনিয়ায় যে রাজনৈতিক বিতর্কটা চলছে সেখানে এ প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইসলামের খিলাফত, খলিফার ধারণার সাথে গণের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের ভাবা প্রয়োজন। এখনো বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক দল বা বড় সংগঠনগুলো “খিলাফত”কে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করেন। তারা খিলাফত বলতে বোঝেন যে, কিছু জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তি একজন আরেকজনকে নির্বাচিত করবেন। হেফাজতে ইসলাম থেকে শুরু করে খেলাফত মজলিশ ধরনের সংগঠনগুলো গণ বা সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক কর্তাস্বত্ত্বা এবং শাসন ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক সেটাকে আগেই আলগা করে ফেলছেন। ফলে আমাদের স্পষ্ট হওয়া লাগবে যে, প্রাক-উপনিবেশিক জমানায় গণতন্ত্রকে আমরা ইতিহাসের ভেতরে কিভাবে লোকেট করব।

Islamicate Bengal বলতে আমি যদি শুধু উপনিবেশিক বা প্রাক-উপনিবেশিক যুগের বিবেচনা করি এবং সে বিবেচনায় যখন বলা হয় “বেঙ্গল রেনেসাঁর মধ্যে ডি-ইসলামাইজেশন ঘটেছে”— সেটার মানে বিভিন্ন অর্থে-ই হতে পারে। কিন্তু “Islamic” বা “Muslim” ধারনার বিপরীতে আমি যখন Islamicate বলছি তখন আমাকে খেয়াল করতে হবে যে, “হিন্দু সমাজ” একটি জটিল ধারণা, যার একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। হিন্দু সমাজকে—যেটা চৈতন্যের আমল বা আরও আগে থেকে শুরু হয়েছে এবং পরে উপনিবেশিক জমানায় কলকাতা-কেন্দ্রিক কায়স্থ, বৈদ্য এবং ব্রাহ্মণ প্রাধান্যশীল যে ভদ্রলোক সমাজ গড়ে ওঠেছে—যদি আমরা একমাত্রিকভাবে “de-Islamization” দিয়ে ব্যাখ্যা করি, সেটা একটু সরলীকরণ হবে। কারণ Islamicate বর্গটা বিবেচনা করতে হলে আমাকে খেয়াল রাখতে হবে যে, রামমোহন রায় থেকে শুরু করে দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ ১৯ শতকের ভদ্রলোক সমাজের চিন্তার মধ্যে বিভিন্ন rupture বা বিচ্যুতি/ভাঙন এবং প্রবণতা আছে। ফলে, কেউ চাইলে সেই রামমোহনের ভেতর থেকেও একটি Islamicate ধারা বা পরম্পরা খুঁজে পেতে পারেন যেটা প্রাক-উপনিবেশিক সময়ের সঙ্গেও সংযুক্ত—এগুলো আমাদের জন্য অনুসন্ধানের জায়গা হতে পারে। আমি সেখান থেকে-ই বলার চেষ্টা করছি।

ফলে ঔপনিবেশিক আমলে গণতান্ত্রিক তৎপরতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে দুই ধরনের প্যারাডাইম বিবেচনা করা যেতে পারে: একটা হলো Political Theory, আরেকটা Political Anthropology। পলিটিক্যাল থিওরির মধ্যে আছে- এরিস্টল, হবস, লক ও রুশোরদের তত্ত্ব, আসতে পারে কিছু পরিমাণে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল থিওরি, এবং আল-মাওয়ার্দি, আল-ফারাবিপ্রমুখদের ইসলামি পলিটিক্যাল থিওরি। আরেকটা হলো Political Anthropology।

১৯ শতকের বাংলার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলো বুঝতে হলে সম্ভবত এই দুইটারই সমন্বয় দরকার। একটা হলো—“Popular Sovereignty”—মানে গণের সার্বভৌমত্ব। কারণ পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্বে—Popular Sovereignty, General Will, Democracy—এই ধারণাগুলো ঐতিহাসিকভাবে খুব সুস্পষ্টভাবে আর্টিকুলেটেড হয়েছে। তাহলে আমরা গণতন্ত্রকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব—এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফলে প্লেটো, এরিস্টটল, ম্যাকেয়াভিলী ও হবসের পরে জন লক ও রুশোরা ডেমোক্রেসি ধারণার মধ্যে কী কী জিনিস যুক্ত করেছেন—সেটা আমাদের দেখতে হয়। যেমন, লকের চিন্তায় জনসাধারণের রেভ্যুলেশন করার অধিকার আছে। অন্যদিকে রুশো ‘general will’ বা সামষ্টিক ইচ্ছা এবং ‘popular sovereignty’র কথা বলছেন। এখন আমরা ‘People as Sovereign’ ধারণা নিতে পারি কি না? ইসলামের ভেতর থেকে যদি আমি বিবেচনা করতে চাই, তাহলে people কি sovereign হতে পারে কি না—সে ব্যাপারে আমাদের ভাবতে হবে।

ঢাকার বাজারে ওয়ায়েল হাল্লাকের বই অনুবাদ প্রকাশের প্রেক্ষিত এ আলাপগুলো আবার হাজির হচ্ছে। যদিও আগে থেকে-ই মওদূদী, কুতুবসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইসলামে কি ‘জনগণ সার্বভৌম’ হতে পারে, নাকি সার্বভৌমত্ব সবসময় আল্লাহর? কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে—আমরা যদি ‘খিলাফত’-এর ধারণা উদাহরণ হিসাবে নেই, তাহলে ‘people’ নিজেই কি খলিফা হতে পারে কি না ? অর্থাৎ, People himself as Khalifa of Allah বা পিপলের মধ্যে দিয়ে সে রিপ্রেজেন্টশনটা আসছে—এভাবে দেখা যায় কি না? আমরা যদি ‘popular sovereignty’ ধারণাটা নেই সেটাকে কি আমি সরাসরি ফরাসি বিপ্লব থেকে নিয়ে আসব নাকি অন্যভাবে ভাবব। যেমন নাজমুল সুলতান খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন তাত্ত্বিক। ‘people’-এর ধারণাটা কীভাবে ভারতবর্ষের ইতিহাসে হাজির হচ্ছে—এই নিয়ে তিনি খুব ভালো গবেষণা করেছেন। কিন্তু আমার মনে হয় যে, আমরা যদি উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক তৎপরতা, গণতান্ত্রিক তৎপরতা পাঠ করতে চাই, তাহলে শুধু ‘history of ideas’ দিয়ে—মানে ‘people’ ও ‘popular sovereignty’ -এর ধারণা কিভাবে ইউরোপ এবং ফরাসি ট্র্যাডিশন থেকে সরাসরি আমরা নিয়ে আসব— বুঝলেই যথেষ্ট হবে না।

আমার মনে হয়, এখানে কিছু anthropological insight লাগবে—এই অঞ্চলের বিভিন্ন ইনস্টিটিউশনের মধ্যে এই ধারণাগুলো কিভাবে চর্চিত হয়েছে। আমি ছোট ছোট উদাহরণ দেব—বক্তৃতায়  আমরা পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করতে পারব না। যেমন ১৮৫০-এর দশক থেকে বিভিন্ন আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া ইত্যাদি গড়ে উঠছিল, এ সময়কে আমরা ‘জনপরিসর’ বা public sphere-এর উদ্ভবকাল হিসাবে ট্রেস করব কি না? তৈমুর রেজা নামের এক তরুণ গবেষক আছেন তিনি দেখিয়েছেন, ‘বাহাস’ নামে এক ধরনের ইনস্টিটিউশন মুসলমানদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। এখন সেটি কি জনপরিসর বা রাজনৈতিক পরিসর গঠনের আদি উপাদান কি না? আমাদের একটা গবেষোণায় আমরা দেখিয়েছি যে, ঈসা খাঁর আমলে public sphere-এর মতো করে এখানে ধর্মতাত্ত্বিক ‘বাহাস’ হয়েছিল—খ্রিস্টানদের সাথে মুসলমানদের, আবার মুসলমানদের ভেতরেও।

যখন আমরা বলি যে,  আমীর আলী বা আবদুল লতিফরা এসে জনপরিসর গঠন করছেন, অথবা মুসলিম লীগ ইত্যাদি ইনস্টিটিউশন এসে ‘আধুনিক রাজনীতি’ গঠন করছে, এবং জনগণকে রাজনীতির মধ্যে শরিক করিয়েছে তখন এ আলাপের মানে হচ্ছে যে, আধুনিক print media যেটা উপনিবেশিক প্রক্রিয়ায় এসেছে, শাসিত জনগোষ্ঠী এবং ম্যাজিস্ট্রেসি বা উপনিবেশিক শাসনযন্ত্র—এই তিনটির মধ্যে যখন সমন্বয় তৈরি হচ্ছে সে সময়কে public sphere-এর উদ্ভবনকাল হিসাবে বুঝানো হচ্ছে। ফলে এখন আমাকে অবশ্যই ঐতিহাসিকভাবে বিবেচনা করতে হবে যে, এটাই কি একমাত্র জনপরিসর, নাকি এর আগে অন্য ধরনের জনপরিসর ছিল?—এই আলাপগুলোকে স্পষ্ট করা দরকার। এবং ‘people’ এবং ‘elite’-এর যে কানেকশন—এটাও কি শুধু নবাব সলিমুল্লাহদের সময় থেকে তৈরি হয়েছে, নাকি তারও আগে অন্যভাবে ছিল—সেটাও আমাদের ভাবতে হবে। ‘people’ এবং ‘elite’-এর কানেকশন সলিমুল্লাহদের সময়ে এসে ঘটছে ব্যাপারটা এমন না বরং সেটা আগে অন্যভাবে ছিল এবং সেটার মেডিয়েশন অন্যভাবে ঘটত এবং সেটার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কও অন্যভাবে ছিল।

ফলে আমার প্রস্তাব হবে যে, আমি যখন বলি, “জনগণ নবাব সলিমুল্লাহ বা আমীর আলীদের সময়ে এসে রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে শরিক হয়েছে”, তখন আমাকে পাশাপাশি আরেকটা hypothetical argumentও ভাবতে হবে। ধরা যাক, যখন ব্রিটিশরা আসছে—তখন শাহ ওয়ালিউল্লাহ থেকে শুরু করে পিপলের মধ্যে এক ধরনের ‘counter-sovereignty’-এর ধারণা হাজির ছিল। ফরায়েজি আন্দোলন থেকে শুরু করে তরিকায়ে-মোহাম্মদিয়া—এগুলো আসলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের sovereignty-কে চ্যালেঞ্জ করছে। তাদের গোটা বিতর্কটা ছিল— সমাজের ভেতর থেকে অন্য ধরনের sovereignty চর্চার চেষ্টা করা। আপনি সেটাকে sovereignty বলবেন নাকি খিলাফত বলবেন? কারন, তারা তো নিজেদেরকে sovereign সরাসরি দাবি করবে কি না—সেটা আল্লাহর সাথে people এর সরাসরি সম্পর্ক ইত্যাদির ব্যাপার। ফলে তারা ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের বিপরীতে সমাজের ভিতরে আরেক ধরনের সার্বভৌমত্বের স্তর তৈরি করছিল। যার ফলে দেখা যায়—হিজরত, জিহাদ, আফগান ফ্রন্টিয়ারে গিয়ে লড়াই ইত্যাদি—এসব ঘটনা ঘটছে। আমরা ইসমাইল শহীদ এবং আহমদ সীরহিন্দিদের ট্র্যাডিশনে সেটি পাচ্ছি। যদি বিষয়টা এমন হয় তাহলে আমার মনে হয় যে, খিলাফত আন্দোলনে এসে এই প্রক্রিয়াটা এক ধরনের নিঃশেষ হয়ে আসে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ, আমার যতদূর মনে হয় (ভুল হলে সংশোধন করে নিবেন) প্রথম বলেছিলেন যে, আকবরের পর জাহাঙ্গীরের সময় খিলাফতের ধারণাটা এখন তুর্কিদের হাতে চলে গেছে এবং তারা-ই এখন খলিফা। তখনও বিট্রিশ sovereignty প্রতিষ্ঠা হয় নাই। সেই সময় থেকে ফরায়েজি আন্দোলন পর্যন্ত পুরো ইতিহাস ধরে এমনকি খিলাফত আন্দোলনে এসে আমরা দেখি যে, ব্রিটিশ sovereignty কে সরাসরি গ্রহণ না করে সমাজের ভিতর থেকে আরেক ধরনের sovereignty ভাবনা হাজির হচ্ছে। ওয়ায়েল হাল্লাক যেমন বলেন—‘Islamic state’ বলে আলাদা কিছু সম্ভব নয়; বরং একদিকে আছে modern state, অর্থাৎ পশ্চিমা ধাঁচের রাষ্ট্র, আরেকদিকে আছে Islamic mode of governance, যা সমাজের ভেতর থেকে আসে। তিনি বলেন—মুফতিরা যেটা করেন সেটা লেজিসলেটিভ প্রক্রিয়া, আর কাজিরা যেটা করেন সেটা জুডিশিয়াল পক্রিয়া—এসব সমাজের ভিতর থেকেই আসে। আমরা দেখি যে, দুদু মিয়ারা যখন সমাজের ভিতরে বিচার-আচারের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক sovereignty থেকে আলগা হয়ে আরেক ধরনের সার্বভৌমত্বের চর্চা করছেন—তখন সেটাকে আমি ‘democratic’ বলব কিনা? এই জায়গাটা যদি আমরা অনুসন্ধান করি, আমার মনে হয় তা খুব জরুরি একটা অনুসন্ধান হবে। তখনই আমি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটাকে আরেকটু তলিয়ে বিবেচনা করতে পারব।

আমি তিনটা ছোট গল্পের উদাহরণ দিয়ে আলাপটা শেষ করব। প্রথমত, আমরা যখন গণতন্ত্রের কথা বলি—গ্রিকের গণতন্ত্র হোক বা আধুনিক গণতন্ত্র—সবসময় আমাদের কাছে ‘class’ বা সামাজিক শ্রেণীর প্রশ্নটি খুব স্পষ্ট থাকতে হবে, এবং ‘gender’ বা লিঙ্গ-সম্পর্কও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, আমি যখন বলি—মুসলমানদের জন্য আলাদা ধরনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দরকার, কংগ্রেসের ভেতরে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটা ধারণ করা যায়নি—তখন প্রশ্ন আসে যে, ডেমোক্রেসি কি শুধুই শাসনব্যবস্থা নাকি ডেমোক্রেসি হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন মতভেদ ও এখতেলাফকে শাসন-কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসে নেগোশিয়েট করা হয়? জাক রঁসিয়েরসহ অনেক তাত্ত্বিক বলেন যে, ডেমোক্রেসি আসলে শাসনের কাঠামো নয়; বরং শাসন-কাঠামো অনেককে এক্সক্লুড করে, অনেককে শরিকানার বাইরে রেখে দেয় এবং এর ফলে সমাজে এন্টাগনিজম তৈরি হয় আর এই এক্সক্লুশনগুলোকে নেগোশিয়েট করার যে প্রক্রিয়া, সেটাই হচ্ছে গণতন্ত্র। তাহলে কংগ্রেস—যে নিজেকে অসাম্প্রদায়িক ভারতীয় সংগঠন হিসেবে ভাবত—মুসলমানদের প্রশ্নটাকে ঠিকমতো সামলাতে না পারার কারনে একটার পর একটা নতুন সংগঠন এসেছে—মুসলিম লীগ, প্রজা সমিতি ইত্যাদি। একইভাবে আমাদের জিজ্ঞেস করতে হবে যে, শ্রেণী এবং নারী–পুরুষ সম্পর্কের প্রশ্নটা কংগ্রেস কতটা সামলাতে পেরেছে? পাশাপাশি সেই সময়কার গণতান্ত্রিক তৎপরতার মধ্যে মুসলমানদের পরিচয়বাদী যে রাজনীতিটা গঠিত হল সেটার খামতি নিয়েও আমাদের আলাপ করা প্রয়োজন।

তাই আমি দুটো ছোট গল্পের উল্লেখ করে আমার আলোচনা শেষ করব। একটা হচ্ছে, মুসলমানরা একসাথে একটি শ্রেণী এবং একটি সম্প্রদায়—এই দুইটির যে সম্পর্ক, এটাকে আমরা বলতে পারি overdetermination। অর্থাৎ, দুই ধরনের contradiction একসঙ্গে সমাপতিত হয়েছে। মুসলমানদের যে রাজনীতি, তা একই সঙ্গে “মুসলিম” নামেও হচ্ছে, আবার একই সঙ্গে সেটা “কৃষক–প্রজা” নামেও চলছে। অর্থাৎ, শ্রেণী এবং সাম্প্রদায়িক—এই দুই ধরনের স্বার্থের প্রশ্ন একত্রে হয়ে গেছে। এর ফলে পাকিস্তান আন্দোলনটা শুধুমাত্র সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল না; একই সঙ্গে সেটা শ্রেণী-আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

আবুল মনসুর আহমদ, যিনি ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলন থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যে পরিচয়বাদ, তার এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী, তাঁর একটা গল্প আছে। ফ্রয়েডের ভাষায় এক ধরনের original sin-এর মতো যেটা তাঁর সারা জীবনের রাজনৈতিক চিন্তাকে এক ধরনের কাঠামো দিয়েছে। ছোটবেলায় তিনি একটা পুকুরে মাছ ধরছিলেন। সেখানে এক নায়েব ছিলেন—নায়েবটি ছিল হিন্দু। তিনি এসে আবুল মনসুরকে বকা দিতে শুরু করলেন যে, তুমি এখানে কেন মাছ ধরছো ইত্যাদি…। তখন আবুল মনসুরের যিনি মুরুব্বি ছিলেন, তিনি এসে নায়েবের সঙ্গে কথা বললেন এবং বকা-বকি থামানোর চেষ্টা করলেন। সে মুহূর্তে আবুল মনসুর আহমদ তার মুরুব্বিকে প্রশ্ন করল যে, “নায়েব আপনাকে কেন ‘তুই’ বলে সম্বোধন করছে, ‘আপনি’ বলে না কেন, আপনি তো তার চেয়ে বয়সে বড়।” এই ঘটনাটা তিনি তাঁর জীবনীর একদম শুরুতে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মুসলমান সমাজ কীভাবে এক ধরনের অপমান নিয়ে বেঁচে ছিল; আর এই অপমান তাদের আত্মসম্মানবোধকে ধ্বংস করছিল।

আরেকটা উদাহরণ দিই—কামরুদ্দিন আহমদ নামে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী আছেন। তাঁর ‘বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ’ বইয়ে তিনি এরকম একটি গল্প উল্লেখ করেছেন। সেখানেও বিষয়টা পুকুর থেকে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে। তবে এখানে কনটেক্সট আলাদা—এখানে একজন মুসলমান জমিদার উপস্থিত আছেন। তো মুসলমান জমিদার এবং মুসলমান প্রজা—তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদার যে সংকট, সেটা কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটা তিনি দেখিয়েছেন।

আবুল মনসুর আহমদ এবং কামরুদ্দিন আহমদ দুজন-ই কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে যে বিভিন্ন আন্দোলন হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু আবুল মনসুর যেখানে কলকাতা-কেন্দ্রিক আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন, কামরুদ্দিন আহমদ সেখানে ঢাকাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে—বিশেষ করে ঢাকার নবাব ও নায়েবদের বিরুদ্ধে যে লড়াই সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের বিবেচনা করতে হবে যে, আসলে কীভাবে শ্রেণী এবং সম্প্রদায়-প্রশ্নের মধ্যে একটা গভীর সংযোগ আছে। কারন গণতান্ত্রিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত যে রূপে দানা বেঁধেছে সেটা মূলত প্রজা-রাজনীতি। প্রজা মানে আইডেন্টিটি; প্রজা মানে কৃষক, আবার প্রজা মানে জোতদার। ফলে প্রজা-পরিচয়ের ভেতরে অনেকগুলো স্তর আছে। প্রজা একজন পুরুষ, প্রজা আবার নির্দিষ্ট ক্লাসের অন্তর্গত—এভাবে আমরা প্রজা ধারণাটাকে আরও গভীরভাবে ঘেটে দেখতে পারি।

 

Share: