বাংলাদেশে ধর্ম নিয়ে বোঝাপড়ায় যে ফাক-ফোঁকর, শাহ ওয়ালিউল্লাহ চর্চাতেই তার সমাধান

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ

Share:

বাংলাদেশের মানুষের ধর্ম নিয়ে যে জানাশোনা, বোঝাপড়া তার মধ্যে যেই ফাঁক-ফোঁকর আছে কিংবা গলদ আছে। এটার সমাধান সম্ভব শুধুমাত্র শাহ ওয়ালিউল্লাহদের চর্চার মধ্য দিয়ে। দেওবন্দের শুরু যেহেতু উনার চিন্তা দর্শনের উপর। যদি আমরা মূলে ফিরে যেতে চাই তাহলে এই ধারাকে পুনর্গঠন করতে হবে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর ‘ফুক্কা কুল্লে নিজাম’ শব্দের মধ্য দিয়ে এ কথা-ই প্রকাশ পেয়েছে। 

আমরা যদি জগতের দিকে তাকাই এক ধরনের ঐকতান দেখতে পাই। গাছ থেকে ফুল হচ্ছে, তারপর বীজ হচ্ছে। বাতাসে সে বীজ ছড়িয়ে অন্য এক জায়গায় গিয়ে নতুন গাছ জন্ম দিচ্ছে এবং সেই গাছ আবার অন্য পশুদের খাদ্য হয়ে উঠছে, এই যে একটা ইকোসিস্টেম যেখানে জগতের প্রত্যেকটা প্রাণী, জড়বস্তু, উদ্ভিদসহ সবকিছু একে অপরের সহযোগী। এক আশ্চর্য সমন্বয়তার মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের সহযোগী হয়ে উঠেছে। আমরা বিশ্বাস করি এটা আল্লাহ তায়ালারই দান। কিন্তু এই যে সহযোগিতার সেটা আমরা জগতের মধ্যে খুব শক্তভাবে পাই। 

তো মানুষের মানুষের মধ্যেও এরকম সহযোগিতার একটা ধারণা আছে। একটা মানুষ যখন একটা সমাজের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠে তখন সে সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটাকে উপলব্ধি করে যে, আমার অপরের সহযোগী হওয়া ছাড়া বেঁচে থাকার কোন উপায় নেই। আমাকে বাঁচতে হলে অবশ্যই অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হবে, দেখ-ভাল করতে হবে এবং দায়িত্ব নিতে হবে। তো এই ব্যাপারগুলো প্রত্যেকটা প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে সহজাত ভাবেই তৈরি হয়েছে। তো শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহমাতুল্লাহ ইরতেফাকাতের যে তত্ত্ব দিয়েছেন সেটার একেবারে প্রথম ধাপেই কিন্তু এই ব্যাপারটা আসছে যে এটা সহযোগিতার ধারণা। ‘ইরতিফাকাত’’ পরিভাষাটি এসেছে আরবি শব্দ ‘رفق’ থেকে যার অর্থ সহযোগিতা। 

আমরা ইসলাম এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার মধ্যে যে একটা দ্বন্দমূলক সম্পর্ক দেখি, দ্বন্ধের উৎসটা আসলে কী? আমি মনে করি যে, এই দ্বন্ধের উৎসটা হচ্ছে সামাজিক বিবর্তন যেটা শাহ ওয়ালিউল্লাহ তার ইরতিফাকাত তত্ত্বের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, আমাদের নবীদের যে সিলসিলা তারা কিন্তু সবাই এক আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দেননি। হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন প্রথম এসেছেন তিনি মানুষকে কৃষি কাজ করা শিখিয়েছেন সেটা ছিল সভ্যতার একেবারে প্রাথমিক কাজ। তারপরে হযরত নূহ আলাইহিস সালাম ছিলেন প্রথম রসূল যিনি মানুষদেরকে আল্লাহর প্রতি ডেকেছেন যে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করতে হবে এবং ইবাদত করতে হবে। তবে যত নবী এসেছেন সমস্ত নবীদের মধ্যে কিন্তু আমরা একটা কমন জিনিস পাই যে, তারা মানুষকে সংস্কৃতি শিখিয়েছেন। তো সভ্যতার যে ধাপ নবীদের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে, হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন তার একদম শেষের আগের জন। তিনি তাঁর সময় মানুষকে পরজাগতিক একটা ধর্মের দাওয়াত দিয়েছেন। এটা কিন্তু আল্লাহ তায়ালাই তখনকার মানুষের জন্য উপযুক্ত মনে করে পাঠিয়েছেন। তারপরে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মধ্য দিয়ে ধর্মের যে পরিপূর্ণতা লাভ করে সেখানে ইহজাগতিকতা ও পরজাগতাতিকতা দুটোর-ই সমন্বয় ছিল। সেটা ছিল সামাজিক বিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ। 

অনেক চিন্তাশীল মানুষদেরকে বলতে শুনি যে, পশ্চিমারা ধর্মকে মানে না বলে তাদের এই সমস্যা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় যে, পশ্চিমের যে খ্রিষ্টধর্ম সেটাই তাদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার প্রধান কারন। তারা যখন খ্রিষ্টধর্মকে ছেড়ে দিয়েছে তাদের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামে ইহজাগতিকতা ও পরজাগতিকতা দুইটা সমন্বিতভাবে ছিল। মুসলমানরা যতদিন দুনিয়া ও আখেরাতকে সমভাবে প্রাধান্য দিয়েছে ততদিন মুসলিম সভ্যতা উন্নতির দিকে গেছে, কিন্তু যেই তারা ইসলাম থেকে দুনিয়ার জায়গাকে ছেড়ে দিয়েছে; ইসলামকে শুধুমাত্র আখেরাতকেন্দ্রিক বানিয়েছে তখনই তারা পিছনে সরে গেছে। ইরতিফাকাত তত্ত্বের মধ্যে চতুর্থ যে ইরতিফাকাত সেটা যদি ভেঙে পড়ে তাহলে সমাজের বিবর্তন তৃতীয় পর্বে চলে আসে। ইসলামের ক্ষেত্রে একদম তাই হয়েছে। আমরা বিবর্তনের ক্ষেত্রে পিছনে চলে আসছি। 

তো সামাজিক বিবর্তনের ইহজাগতিকতা ও পারজাগতিকতার সমন্বয় ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেটা মূলত খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিল না বলেই তাদের মধ্যে এক ধরনের ধর্মবিহীন বিজ্ঞান চর্চা তৈরি হয়েছে এবং সেটার ফলাফলও তারা পাচ্ছেন। তারা জাগতিক ক্ষেত্রে বেশ উন্নতি দেখতে পেয়েছে। যেহেতু তারা ধর্মমুক্ত হয়েছে এবং উন্নতির জন্য কেবল ইহজাগতিকতাকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং পরজাগতিকতাকে পুরাপুরি বাদ দিয়ে দিছে। ফলে সেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম তৈরি হয়েছে। একটা সমাজ যে সমন্বিতভাবে থাকবে এবং জগতের প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যে একে অপরের প্রতি যে সহযোগিতামূলক ব্যাপার আছে, পাশ্চাত্যের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ সেই জায়গাটাকে অস্বীকার করেছে। সেখানে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের নামে ব্যক্তিকে সমাজ থেকে পুরাপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং রাষ্ট্রকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে রাষ্ট্র শুধু ব্যক্তির অর্থনৈতিক রাজনৈতিক জায়গাগুলি দেখবে, কিন্তু তার নীতি নৈতিকতার জায়গাগুলো দেখবে না।

যেমন একজন ব্যক্তি যদি সমকামী হয় তাহলে রাষ্ট্রের এখানে কোন দায় নাই কারণ এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু ইসলামের যেই ধারণা সেখানে এই ব্যাপারটা নেই। সেখানে সমকামিত একটা মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত অপরাধ। এটাকে অনেকেই মনে করে যে, এটা তো একটা মানুষ যৌন কাজ করবে সে পুরুষের কাছে যাচ্ছে নাকি নারীর কাছে যাচ্ছে সেটা বিষয় না। এটা কিভাবে মৃত্যুদন্ড যুক্ত একটা অপরাধ হতে পারে! কিন্তু ইসলামের যে পরস্পর সহযোগিতমূলক ধারণা আছে যার উপর ভিত্তি করে ইসলামের সভ্যতা গড়ে উঠেছে সমকামিতার মধ্য দিয়ে ঠিক সেই জিনিসটাকে লঙ্ঘন করা হয়। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহর ইরতিফাকাত তত্ত্বকে যদি আমরা অনুধাবন করতে পারি তাহলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সাথে আমাদের দ্বন্ধের জায়গাটাকে আরো স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারবো। গণতান্ত্রিক যে ধারণাগুলো আছে যে ধারণার উপর ভিত্তি করে আমাদের সমাজের সেকুলারিজমের উদ্ভব এই সমস্ত জিনিস মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহর তত্ত্ব অনেক প্রয়োজন হতে পারে। 

Share: