শিক্ষক ও গবেষক

শাহ ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন হেজাজকেন্দ্রিক এনলাইটেনমেন্টের উত্তরসূরী

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির ইরতিফাকাত তত্ত্ব: সভ্যতার অগ্রগতির দার্শনিক পাঠ

শিক্ষক ও গবেষক

Share:

প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে আমরা শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তকে কিভাবে দেখবো? গত শতাব্দীর ৯০ এর দশকে জার্মান একাডেমিয়ায় ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ভিতরে মর্ডানিটি নিয়ে একটা বিতর্ক চালু ছিল। বিশেষ করে Reinhard Schulze নামের একজন গবেষক বলছেন, ইউরোপীয়রা মর্ডানিটির যে বয়ান তৈরি করেছে সেখানে তারা অরিজিন হিসাবে ইউরোপকে দেখাতে চাচ্ছে। কিন্তু মূলত মর্ডানিটির অরিজিন ছিল বৈশ্বিক। ফলে আমরা বলতে পারি না যে, এনলাইটেনমেন্ট ইউরোপে হয়েছে বা বিশেষভাবে সেন্ট্রাল ইউরোপে হয়েছে যেহেতু এনলাইটেনমেন্ট তৈরি হওয়ার শর্তগুলো পুরা দুনিয়াতে ইতোমধ্যে হাজির হয়েছিল। Enrique Dusselদের সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণায় এটা একদম পরিষ্কার। তারা বলছেন যে, ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের সমান্তরালে মক্কা মদিনায় মানে হেজাজে আরেকটা এনলাইটেনমেন্ট ঘটেছে যার সাথে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের কোন সম্পর্ক নাই। তো শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি মক্কা ও মদিনাকেন্দ্রিক সেই এনলাইটেনমেন্ট আবহের উত্তরসূরী ছিলেন। বিশেষভাবে তখনকার মক্কা-মদিনার হাদিস চর্চার দরসগাহগুলার প্রধান ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ইব্রাহিম কাওরানি। দেখা যাচ্ছে যে, ইব্রাহিম কাওরানির সাথে একদিকে উত্তর আফ্রিকার সানুসিয়া আন্দোলনের প্রবর্তকরা সম্পর্কিত। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার মোহাম্মদিয়া আন্দোলনের লোকজনও সম্পর্কিত। আবার দেখা যাচ্ছে যে, মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদিও ইব্রাহিম কাওরানীর সাথে সম্পর্কিত। আবার, শাহ ওয়ালিউল্লাহও ইব্রাহিম কাওরানীর ছেলে আবু তাহের কাওরানীর মধ‌্য দিয়ে ইব্রাহিম কাওরানীর সাথে সম্পর্কিত।

বইটির প্রচ্ছদ

তাহলে তখনকার ঐ বুদ্ধিবৃত্তিক আবহটা কেমন ছিল? সেখানের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য ছিল হাদিস চর্চার দিক; সেটা ছিল কসমোপলিটান। সেখানে তিন ধরনের হাদিস চর্চার সিলসিলার সমন্বয় ঘটেছিল। প্রথমত, ভারতীয় হাদিস চর্চার সিলসিলা। এটা বিশেষভাবে সিন্ধ থেকে হেজাযে স্থানান্তরিত হয়েছিল আব্দুল হাই সিন্ধিদের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, উত্তর আফ্রিকার হাদিসের সিলসিলা। তৃতীয়, আরবের হাদিস চর্চার সিলসিলা। এই তিন সিলসিলা মিলে হাদিস চর্চার একটা স্বতন্ত্র সমন্বয় আরব দুনিয়ায় ঘটেছিল। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, হাদিসের ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলবি প্রাধান্য দিয়েছেন মুয়াত্তাকে। আবার ইজতেহাদি মাসলা-মাসায়েলের ক্ষেত্রে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন শাফেয়ি মাজহাবকে। কিন্তু তিনি আমল করছেন হানাফী ফিকাহের উপর। 

ঐ সময় আরব দুনিয়ায় ইব্রাহিম কাওরানি ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের দুইটা মেরুকে একত্রে এক ফ্রেমে ব্যাখ্যা করছেন। তিনি ইবনে আরাবির ‘ওহাদাতুল ওজুদ’কে ব্যাখ্যা করছেন ইবনে তাইমিয়ার থিওরিটিক্যাল ফ্রেমে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ ইবনে তাইমিয়ার লেখাজোখার সাথে পরিচিত হইয়েছেন ইব্রাহিম কাওরানির মাধ্যমে। কয়েক বছর আগে ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে লেখা শাহ ওয়ালিউল্লাহর একটা ছোট কিতাব আবিষ্কৃত হয়েছে। ২০১৮ সালে জার্নাল অফ অফ ইসলামিক স্টাডিজ থেকে ইংরেজিতে বইটির ভাষ্যসহ তরজমা বের হয়েছে।

শাহওয়ালিউল্লাহর চিন্তার তিনটা ভিত্তি প্রস্তর আছে। যথাঃ- ‘তাদবিক’, ‘ইজতেহাদ’ এবং ‘মাসলাহা’। যেহেতু শাহ ওয়ালিউল্লাহ পরিবর্তিত সময়ের ডাইনামিক্সকে ধরার চেষ্টা করছেন ফলে উনি মনে করছেন, ইজতিহাদ অবশ্যাম্ভাবী; ইজতেহাদ আমাদেরকে করতে হবে। তাহলে ইজতেহাদের পন্থা কী হবে? আমরা কি সবকিছু খারিজ করে দিব মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহবের মতো? আমাদের তো সামাজিক-বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ সিলসিলা আছে। এটাকে কি আমরা সিম্পলি নাকচ করে দিব? তো শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি বলছেন যে, এর জন্য আমাদেরকে তাদবিক করতে হবে। তাদবিক কেন করব? কারন, জগৎ সৃষ্টির একটা কল্যানকামী উদ্দ্যেশ্য আছে। কারন, আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা জগতকে একটা কল্যানকামী উদ্দ্যেশ্য উপর তৈরি করেছেন। জগত কাকতালীয়ভাবে তৈরি হয়ে যায় নাই। ফলে জগতের কল্যাণকামী উদ্দ্যেশ্যকে সময়ের পরিবর্তনের আলোকে বুঝা এবং সমাধান দেওয়ার কাজটা করতে হবে তাদবিকের মাধ্যমে। ফলে তাদবিক একই সাথে আল্লাহর মাসলাহা এবং জগৎ সৃষ্টির পিছনে কল্যানকামী উদ্দ্যেশ্যকে নিশ্চিত করবে। 

এই ক্ষেত্রে প্রথমে উনি ইরতিফাকাতের আলোচনা করেছেন। হুজ্জাতুল্লাহিল বালাগার বইয়ের তৃতীয় খণ্ডের ১৬ বা ১৭তম অধ্যায় থেকে ইরতিফাকেতের আলোচনা শুরু হয়। মোকাদ্দামর শুরুতে তিনি হুবহু এভাবে ভাষা ব্যবহার করছেন যে, মানুষ তার প্রবণতার কারনে নয়, বরং মানুষ তার প্রয়োজনে একে-অপরেরে সাথে লেন-দেন করে। ফলে উনি মূলত গ্রিকো-মরমী মনস্তত্ব (Greek Mystic Psychology) থেকে পুরোপুরিভাবে ইসলামি অভিজ্ঞতাবাদী মনস্তত্বতে চলে আসছেন। কী রকম সেটা? এরিস্টটলের মতে, মানুষের একটা অদ্ভুত প্রবণতা হচ্ছে যে, সে একত্রে থাকতে চায়। কেন সেটা আমরা জানি না; এই কারনটা ব্যাখ্যা যোগ্য না। কিন্তু শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলছেন যে, আমি যেহেতু কৃষক আমি ধান উৎপাদন করি, কিন্তু আমার মাছের প্রয়োজন আছে। আরেকজন মাছ চাষ করে তার আবার ধানের প্রয়োজন আছে। সুতরাং আমি তাকে ধান দেই, সে আমার কাছ থেকে মাছ নেয়। এভাবে আমরা আমাদের প্রয়োজনে এভাবে জোট গঠন করি এবং সমাজবদ্ধ হই। আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য মিস্টেরিয়াস কোন ঘটনার দরকার নাই। কারন, আল্লাহ জগৎকে কাকতালীয়ভাবে সৃষ্টি করেন নাই; জগতের সুনির্দিষ্ট উদ্দ্যেশ্য আছে। ফলে মানুষের কোন আচরণকে মিষ্টিফাই করার সুযোগ নাই। সবকিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দ্যেশ্যের দিকে চালিত হচ্ছে।

তার মানে মানুষের প্রত্যেকটা কাজ উদ্দ্যেশ্য ও গন্তব্যমুখী। প্রত্যেকটা কাজের একটা উদ্দেশ্য আছে। সেটা খারাপ উদ্দেশ্য অথবা ভালো উদ্দেশ্য কিংবা লাভের কারনে করছি অথবা ক্ষতির কারণে করছি। শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতে, মানুষের সাইকোলজির অভিজ্ঞতা ভিত্তিক একটা অন্যরকম দিক আছে। এগুলোকে তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। এইদিক থেকে যেহেতু আল্লাহ তায়ালা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে খলিফা হিসাবে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে সে দুনিয়াতে সবকিছু করবে একটা নির্দিষ্ট উদ্দ্যেশ্যের নিরিখে যা একই সাথে আল্লাহর কল্যানকামী উদ্দ্যেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবির চিন্তায় ওহী, কাশফের মাধ্যমে অন্তর খুলে যাওয়া এবং মানব অভিজ্ঞতায় হ্রাস-বৃদ্ধিএই তিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওহীর নির্দেশনা কী? কাশফের মাধ্যমে আমাদের অন্তর কতটুকু খোলছে এবং বাস্তবে যখন আমি পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি তখন আমি যা ভাবছি তা হুবহু করতে পারছি নাকি এখানে একটু হ্রাস-বৃদ্ধি পাচ্ছে এই জিনিসগুলো উনি খেয়াল করছেন। এই নিরিখে উনি বলছেন, মানুষের কোন কাজ সিম্পলি কম্পালসিভ না। পক্ষান্তরে, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মানুষ কম্পালসিভ অর্থাৎ স্নায়ুতন্ত্র যে নির্দেশনা দিচ্ছে তার বাইরে গিয়ে মানুষের কিছু করার নাই। কিন্তু, এখানে শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলছেন যে, মানুষের প্রত্যেকটা কাজ উদ্দ্যেশ্যমুখী। তাই যখন সে কাজ করতে চায় তখন সে সবকিছু্কে সামগ্রিকভাবে ভাবার চেষ্টা করে এবং যেন-তেনভাবে করার চেষ্টা করে না। সে এমনভাবে করার চেষ্টা করে যেন রুচিপূর্ণ হয়। কাজের মধ্যে একটা পরিমিতিবোধ ও নান্দনিকতা থাকে। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ আমাদেরকে ওহী দিয়েছেন; ওহীর একটা নির্দেশনা আছে। তারপরে, আমার যদি আল্লাহর সাথে খুব সম্পর্ক থাকে এবং আল্লাহর রহমতে আমার ভিতর যদি আল্লাহ কোন ধরনের সহি কাশফ দান করেন তার মাধ্যমেও বুঝতে পারবো যে, আমাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কিভাবে কাজ করতে হবে। এরপরেও এমন কিছু মানুষ আছে যারা এই তিনটার সাথে তার বুদ্ধিকেও যথাযথভাবে ব্যবহার করে। এই ক্ষেত্রে, ইরতিফাকাতের আলোচনাটা ইরতিকাবের আলোচনা ছাড়া সম্ভব না। কারন, মানুষের কাজ যেহেতু উদ্দ্যেশ্যমুখী তাই আল্লাহর কল্যানকামী উদ্দ্যেশ্যকে অনুসন্ধান এবং নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একটা নৈতিক প্রেষণা থাকবে। 

তো এজন্য এখানে দেখা যাচ্ছে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ সাসানীয় এবং রোমান সাম্রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটকে ইসলামের উদ্ভবের জায়গা থেকে চিন্তা করছেন। উনি বলছেন যে, এই দুই সাম্রাজ্যের অতিরিক্ত করারোপ, সামাজিক বৈষম্য এবং সমাজের নীচু শ্রেণীর মানুষজনের হীন জীবনযাপনকে নৈতিকভাবে বিনাশ করার ঘটনা হিসেবে ইসলামের অভ্যুদয় ঘটছে। এই দিক থেকে যদি আমরা বর্তমান পুজিবাদী ব্যবস্থাকে দেখি, তাহলে দেখা যায় যে, পুজিবাদী শোষণ একই সাথে নৈতিক অধঃপতনের ঘটনাকে হাজির করছে। শাহ ওয়ালিউল্লাহর ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে বিবেচনা করার মতো ঘটনা এটি। কারন, উনার মতে, সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট ও সভ্যতা বা যে কোন সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তির একদিকে থাকবে ইরতিফাকাত আরেকদিকে থাকবে ইকতিরাব। এই দুইটা পরস্পর পরিপূরক এবং সম্পর্কিত। 

আমরা শাহ ওয়ালিউল্লাহ থেকে কী শিখবো আমাদের জুলাই অভ্যুত্থানোত্তর পরিস্থিতিতে? বাংলাদেশে আমাদের এমন একটা রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দরকার যেটা হবে গ্রাউন্ডলেস গ্রাউন্ডের উপর। গ্রাউন্ডলেস গ্রাউন্ডটা কী রকম? গ্রাউন্ডলেস গ্রাউন্ড বলতে আমি বুঝাচ্ছি, এটা হচ্ছে না ধর্মীয় রাষ্ট্র; না সেকুলার রাষ্ট্র। কারন, আমরা অনেকদিন ধরে বলছি যে, সেকুলার রাষ্ট্রের মধ্যেও ভ্যালু জাজমেন্ট ক্রাইটেরিয়া এবং অন্টোলজিক্যাল প্রায়রিটি আছে। কী রকম? ধরেন, খুব প্রচলিত একটা উদাহরণ দেই। আপনার বাক-স্বাধীনতা হিসেবে আপনি আল্লাহ ও রাসূল নিয়ে কথা বলতে পারবেন। যেহেতু সম্পত্তির ক্ষতি হয় না। মানে এটা সরাসরি ফৌজদারি আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে আল্লাহ রাসূল যেহেতু একটা এবস্ট্রাকট বিষয় তাই এ নিয়ে আপনি কথা বলতে পারবেন। এটা বাকস্বাধীনতার মধ্যে পড়বে। কিন্তু আম-মানুষ যখন এটা নিয়ে বিরোধিতা করবে তখন আপনি বলবেন যে, তোমরা তো মানুষের বাকস্বাধীনতাকে ব্যাহত করছো। কিন্তু এই ফাঁকে আমি যে বাকস্বাধীনতা চর্চা করার মধ্য দিয়ে আমমানুষদেরকে নৈতিকভাবে আহত করলাম তার কোন প্রতিকার সেকুলার রাষ্ট্র ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে নাই। এ ক্ষেত্রে শাহ ওয়ালিউল্লাহ যে কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার ভিত্তি হিসাবে আর্থ-সামাজিক এবং নৈতিক ভিত্তির কথা বলছেন। সোশিও-ইকোনমিক বেস এবং মোরাল বেস বলছে। এখানে আমাদের জন্য শিক্ষা আছে। পারে। এক, কোন কমিউনিটিকে আমরা নৈতিকভাবে আহত করব না এমন একটা ব্যবস্থাপনা আমাদের দরকার। দুই, আমরা আসলে একে অপরকে কিভাবে গ্রহণ করব? এটাকে আমরা কসমোপলিটনিজম বলতেছি। 

শাহ ওয়ালিউল্লাহর সময় ইউরোপে একধরনের কসমোপলিটনিজমের বিকাশ ঘটে। বিশেষভাবে কান্টের লেখাজোখা থেকে আমরা জানি যে, রাইট টু হসপিটালিটি ফর হোস্ট কমিউনিটি। মানে হচ্ছে, ইউরোপ থেকে এখানে কেউ আসছে, হোস্ট কমিউনিটি হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে তাকে হসপিটালিটি দেয়া। ঔপনিবেশিকরা ভারতবর্ষে আসার পর তাদেরকে হসপিটালিটি দেওয়া হয়েছিল, তারপরে তারা এখানকার মানুষদের কচুকাটা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞ বলছে যে, পুরা দুনিয়াতে কলোনিয়ালিজমকে জাস্টিফাই করা হয়েছে কান্টের কসমোপলিটনিজমের আইডিয়া দিয়ে। কিন্তু, শাহ ওয়ালিউল্লাহ যে ধরনের কসমোপলিটন আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন সেটা কেমন ছিল? মানে অন্যের সাবজেক্টিভিটিকে ব্যাহত না করে তাকে আপনি ‘ইন্টিগ্রেট’ করে নেবেন। কিন্তু, ‘সিন্থেসিস’ করবেন না। ইন্টিগ্রেট এবং সিন্থেসিস দুইটা দুই জিনিস। সিন্থেসিস কী রকম? সিন্থেসিস হচ্ছে যে, ধরেন, আপনি আম গাছের একটা ঢাল কাটলেন, সেখানে লেবু গাছের একটা ঢাল কেটে এনে গ্রাফটিং করে বসিয়ে দিলেন। 

অন‌্যদিকে ইন্টিগ্রেশন হচ্ছে এমন একটা প্রক্রিয়ার যার ভিতর দিয়ে আপনি গেলে সেটা আপনার বিষয়ে পরিণত হবে। সেটা কী রকম? একটা খুব কনক্রিট একটা উদাহরণ দেই! আলী রজা খান ছিলেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা এলাকার খুব বড় একজন বুজুর্গ। উনার ‘জ্ঞানসাগর’ নামে একটা বিখ্যাত বই আছে। উনাকে চার তরিকার খেলাফত প্রাপ্ত বিখ্যাত বুজুর্গ হিসাবে মনে করা হয়। কিন্তু উনার জ্ঞান সাগর বই পড়লে আপনি বুঝবেন যে, এগুলো তো নাথপন্থীদের কবিতা! এখানে তো অন্য কোন কিছু নাই! এটা কী জিনিস! উনি খুব কড়াকড়িভাবে শরীয়া মানতেন তাইলে এই লোক এগুলো কী লিখছেন! এখানে আসলে ব্যাপার হচ্ছে, উনারা ছিলেন হাল ও মাকামের গ্র্যান্ডমাস্টার। ফলে এই নাথপন্থাগুলা কী ধরনের হাল-হালিকত নির্দেশ করে উনারা এগুলোর পিছনে পিছনে গিয়ে দেখে আসছেন। ফলে সেগুলোর ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতা সব উনারা জানেন। উনারা যেহেতু উনারা হাল ও মকাম সম্পর্কে জানতেন সেগুলোকে উনারা নিজেদের মত করে ইন্টিগ্রেট করে ফেলছেন। সেগুলো তখন আর নাথ বা যোগশাস্ত্র থাকে নাই। একই কথা সত্য চিশতিয়া সাবেরিয়ার তরিকার ক্ষেত্রে যখন তিনি আব্দুল কুদ্দুস গঙ্গহির ভিতর দিয়ে যোগকে তাসাউফ সাধনার মধ্যে ইন্টিগ্রেট করেছেন তখন সেটা আর যোগ শাস্ত্র থাকে নাই। এটা লতিফার চিহ্নায়ন হয়ে গেছে। লতিফার ধারনা শাহ ওয়ালিউল্লার মধ্যে আছে। কিন্তু এটা যোগশাস্ত্রও না; অন্য কোন কিছুও না, বরং এটা ইসলামের-ই অংশ হয়ে গেছে। এটা হচ্ছে তাদাব্বুর; তাফাক্কুর না। তাদাব্বুর মানে হচ্ছে কোন কিছুর পিছনে পিছনে গিয়ে সেটার হাকিকত দেখে আসা; সিম্পলি চিন্তা করে কোন একটা কথা বলে দেয়া না।

Share: