ইসলামিকেট’ ও ‘ইসলামডম’ পরিভাষা এবং মার্শাল হজসনের কৈফিয়ত

মার্শাল জি. এস. হজসন (Marshall G. S. Hodgson, ১৯২২–১৯৬৮) ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ইতিহাসবিদ, যিনি ইসলামি সভ্যতা ও বিশ্ব-ইতিহাস অধ্যয়নে একটি মৌলিক ও প্রভাবশালী দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করেন। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন অধ্যাপনাকালে ইসলামি ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির বিশ্লেষণে এক নতুন ব্যাখ্যামূলক কাঠামো নির্মাণ করেন। হজসনের সর্বাধিক পরিচিত রচনা The Venture of Islam: Conscience and History in a World Civilization (১৯৭৪)—তিন খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থে—ইসলামি ইতিহাসকে তিনি কেবল ধর্মীয় বিবর্তনের ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং মানব সভ্যতার এক বিশ্বজনীন গতিপ্রবাহের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর এই গ্রন্থ ইসলামি সভ্যতাকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক ইতিহাসচর্চার পরিসরকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।

Share:

‘Islamicate’ ও ‘Islamdom’ পরিভাষাদ্বয় কেন ব্যবহার করেছি তা নিয়ে কৈফিয়ত দেওয়া প্রয়োজন। আমি জোরের সঙ্গে বলছি, আধুনিক জ্ঞানচর্চায় Islam ও Islamic শব্দ দুটির ব্যবহার অনেক বেশি গতানুগতিক হয়ে পড়েছে। তার কারণ, যা কিছুকে আমরা ধর্ম বলি এবং ঐতিহাসিকভাবে ধর্মকে আশ্রয় করে যে সামগ্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, উভয় অর্থেই ‘Islam’ ও ‘Islamic’ শব্দ দুটিকে বাছবিচারহীনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। স্বীকার করছি, স্রেফ একটা সূক্ষ্ম সীমারেখা টেনে ধর্মকে জীবনের অন্যান্য সকল পরিসর থেকে পৃথক করে ফেলা সম্ভব নয়, এমনকি হয়তো সেটা কাম্যও নয়। যদি সেটা করা হয় তাহলে ধর্মকে একপ্রকার বিকৃত করা হবে। তবুও, কোন সমাজ ও সংস্কৃতি ধর্মের দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী ‘ইসলামিক’ হিসাবে অভিহিত হলেও প্রথম অর্থ অনুযায়ী ‘ইসলামিক’ নাও হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, ইসলামকে যারা ধর্ম হিসাবে যাপন করছে এবং যারা সমাজ ও সংস্কৃতি হিসাবে যাপন করছে, ঐতিহাসিকভাবে তারা সবসময় এক ছিল না। এমনকি ইসলামি সভ্যতার অংশ হিসাবে মুসলমানরা এ যাবৎ যা করেছে তার বড় অংশই ‘আন-ইসলামিক’ বিবেচিত হতে পারে যদি ‘ইসলাম’কে পুরোপুরি ধর্মীয় অর্থে ব্যবহার করি। ইসলামিক সাহিত্য, ইসলামিক শিল্পকলা, ইসলামিক ফিলোসোফি, এমনকি ইসলামিক স্বৈরশাসন এর মতো পরিভাষাও কেউ কেউ ব্যবহার করে থাকতে পারেন, কিন্তু এ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করার মাধ্যমে তারা ইসলাম বলতে এমন কিছু বোঝাচ্ছেন যা ইসলামকে ধর্মীয় বিশ্বাস হিসাবে কমই প্রকাশ করে।

সক্রেটিস তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে প্রজ্ঞা ও নৈতিকতার আলোচনায় নিমগ্ন—মুখতার আল-হিকাম ওয়া মাহাসিন আল-কালিম, আল-মুবাশশির ইবন ফাতিক রচিত, সিরিয়া, ১৩শ শতক, উৎস: আলামি

সুতরাং, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য আমাদের পৃথক পরিভাষা ব্যবহার করা উচিত যেন চিন্তার জায়গা থেকে ‘ইসলাম’ শব্দের প্রচলিত দুইটা অর্থকে ফারাক করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ ইসলামিক আইন-এর কথা বলেন, সে এর দ্বারা শরিয়াকে বোঝাতে পারেন। কিন্তু, যদি কেউ আইনকে সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম উপাদান হিসাবে ‘ইসলামিক’ শিল্প বা সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করতে চান, তাহলে তার মধ্যে ‘শরিয়া-বহির্ভূত’ আইনি রীতিনীতিগুলোকেও সমান মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত ঠিক যেমনভাবে ‘ইসলামিক’ শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তাদের ‘শরিয়া-বহির্ভূত’ উপাদানগুলোকে আমলে নেওয়া হয়। অন্যথায়, মিথ্যা ভারসাম্য তৈরি হয়। অথচ বাস্তবে, খুব কম ক্ষেত্রেই শরিয়া-বহির্ভূত আইনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাজেই, পরিভাষা দুটিকে ফারাক না করলে সবসময় এই ধরনের বিভ্রান্তি দৃষ্টির অগোচরে থেকে যাবে। আমাদের সামনে ইসলাম নিয়ে গবেষণাধর্মী যে সমস্ত লেখাজোখা হাজির আছে সেখান থেকে এই বিভ্রান্তিটা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন দেখা যায়, ‘ইসলামিক আন্তর্জাতিক আইন’ বিষয়ক বেশ কিছু গবেষণা কর্ম খিলাফতের সাথে অ-মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল শরীয়া মূলনীতিগুলোকে আমলে নেয় এবং ইসলামকে তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ ধর্মীয়গত অর্থে ব্যবহার করে। কিন্তু, খুব কম গবেষক-ই অন্য ধরনের ‘ইসলামিক আন্তর্জাতিক আইন’ এর দিকে মনোযোগ দিয়েছেন; যে আইন সরাসরি ধর্মীয় না হলেও সত্যিকার অর্থে ইসলামি সভ্যতাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। সর্বোপরি ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে পরিচালনা করেছে। অথচ, পাশ্চাত্য আইন এবং যা কিছুকে আমরা ইসলামিক শিল্পকলা, ইসলামিক সাহিত্য কিংবা ইসলামিক বিজ্ঞান বলি তাদের অধিকাংশের সংঙ্গে শরিয়া আন্তর্জাতিক আইন নয় বরং শরিয়া-বহির্ভূত আন্তর্জাতিক আইন-ই সাংস্কৃতিকভাবে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ফলে আমাদের জন্য আগে দুইটা বিষয়ের মধ‌্যে ফারাক করাটা জরুরি। ‘ইসলাম’ শব্দের প্রচলিত দুইটা ভিন্ন অর্থকে আলাদা করে আমলে না নেওয়ার কারণে পণ্ডিত ব্যক্তিরাও ভুল করেছেন। কারণ, যদি মেডিয়েভ‌্যাল ইসলাম অথবা মর্ডান ইসলাম নিয়ে গবেষণা করা হয়, দেখা যাবে সেটা মুখ্যত একটি ধর্মের গবেষণা, নয়তো একটি সংস্কৃতির গবেষণা যেখানে ধর্ম কেবল একটি উপাদান, নতুবা উভয়ের মিশেলে একপ্রকার জগাখিচুরি, যেখানে গবেষণার একেক অংশ একেক তথ্যসূত্র অনুসরণ করার কারণে ইসলাম বলতে একেক জিনিস বোঝায়। এমনটাও দেখা গেছে যে, একই আলোচনায় ‘মেডিয়েভ‌্যাল ইসলাম’-কে বুঝানো হয়েছে সাংস্কৃতিক অর্থে, আর ‘মডার্ন ইসলাম’কে বুঝানো হয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে ধর্মীয় অর্থে। অর্থ সরে যাওয়ার এ ব্যাপারটা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। তার প্রমাণ বিভিন্ন আলোচক কিংবা একই আলোচক বিভিন্ন সময় ইসলাম বলতে বিভিন্ন জিনিস বুঝিয়েছেন। এর ফলে যে বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে তা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বার্নার্ড লুইস প্রস্তাব দিয়েছেন, ইসলামকে সংস্কৃতিগত অর্থ থেকে ব্যাখ্যা করার সময় ‘ইসলামিক’ বিশেষণটি ব্যবহার করার জন্য। বিপরীতে ধর্মীয়গত অর্থ থেকে ব্যাখ্যার সময় ‘মুসলিম’ বিশেষণটি ব্যবহারের জন‌্য। তবে, প্রস্তাবিত ব্যবহার রীতিটি স্থায়ী হবে বলে মনে হয় না। তবে, কিছু সুবিধা হয়েছে এভাবে ফারাক করায়। ইসলামের কল্পিত আদর্শরূপ অথবা বিশ্বাসকেন্দ্রিক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত প্রথা সম্পর্কিত কোন কিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে ‘ইসলামিক’ বিশেষণটিকে ব্যবহার করা। অন্যদিকে, যে সব মুসলিমরা সেই বিশ্বাসকে ধারন করে কেবল তাদের সংশ্লিষ্ট কিছু বোঝানোর ক্ষেত্রে ‘মুসলিম’ বিশেষণটি ব্যবহার করা। যদিও সামান্য-ই ফারাক করা হয়েছে, তবুও সেটা অনেক সময় ব্যাখা বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। ব্যবহার করতে তুলনামূলকভাবে সহজ।

কেবল নতুন পরিভাষা চালু করার মাধ্যমে-ই সমস্যাটির সমাধান করা সম্ভব। ‘ইসলামডম’ পরিভাষাটিকে ‘ক্রিস্টেনডম’ এর অনুরূপ ধারণা হিসাবে পাঠ করলে আমরা তা সহজে বোঝতে পারব। সুতরাং, ইসলামডম বলতে এমন একটা সমাজকে বোঝানো হয় যেখানে মুসলিম ও তাদের বিশ্বাস সর্বাধিক প্রচলিত এবং সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হিসাবে স্বীকৃত। একটু ভিন্ন ভাবে বললে ‘ইসলামডম’ বলতে এমন সমাজকে বোঝানো হয় যেখানে স্বভাবত অ-মুসলিমরা অধীনস্থ থাকলেও সবসময় অপরিহার্য অংশ হিসাবে বিদ্যমান থেকেছে যেমনভাবে ক্রিস্টানডমে ইহুদিরা ছিল। ‘ইসলামডম’ বলতে সরাসরি কোন ভৌগোলিক অঞ্চলকে বোঝায় না, বরং সামাজিক সম্পর্কের জটিল বুননকে বোঝায়। এটা ঠিক যে, সে সমাজের কম-বেশি সুর্নিদিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান আছে। সুতরাং এটি দারুল ইসলাম পরিভাষার মতো স্রেফ ফিকহী ও ভূ-রাজনৈতিক ধারণার অনুরূপ নয়। তবে, ‘Muslim lands’ বা মুসলমানদের ভূ-খণ্ড পরিভাষার তুলনায় ইসলামডম অনেক বেশি সামগ্রিক ধারনা বহন করে। অনেক ক্ষেত্রে এ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ ইশারা হিসাবে কাজ করে। কখনো কখনো ‘The Islamic World’ বা ‘ইসলামিক বিশ্ব’ পরিভাষাটি ইসলামডমের অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে, আমি তিনটি কারণে এ পরিভাষাটি ব্যবহার করার পক্ষপাতী না। প্রথমত, যৌগিক শব্দবন্ধের ক্ষেত্রে যেখানে Islam-dom যথেষ্ট ব্যবহার উপযোগী, সেখানে তিন শব্দবিশিষ্ট The Islamic World শব্দবন্ধের ব্যবহার অসাবলীল লাগতে পারে। দ্বিতীয়ত, শব্দবন্ধটি নিজে-ই ‘ইসলামিক’ পরিভাষাটিকে অতিরিক্ত বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করেছে। তৃতীয়ত, আমাদের উপলব্ধি করার সময় হয়েছে যে, বিশ্ব একটাই, এমনকি সেটা ইতিহাসের ক্ষেত্রেও। আর, ‘ইসলামিক বিশ্ব’ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে তা কেবল ভবিষ্যতে-ই হতে পারে; বর্তমানে না। 

১৩শ শতকের আল-আন্দালুসে এক ইহুদি ও মুসলমানের দাবা খেলার দৃশ্য — El Libro de los Juegos, আলফন্সো এক্স-এর নির্দেশে রচিত, মাদ্রিদ (১২৫০)। সোর্সঃ Wikimedia

অপর দিকে, ক্রিস্টেনডম ধারণার সাথে ইসলামডম-এর যে সাদৃশ‌্য আছে সেটাকে আমলে নিলে দেখা যায় যে, ‘ইসলামডম’ আলাদা করে কোন সভ্যতা বা সুনির্দিষ্ট কোন সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং এটি কেবল সেই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে যে সমাজ ঐ সংস্কৃতিকে ধারণ ও বহন করে। অথচ, আমরা দেখতে পাই, একটি লিখিত জ্ঞানভিত্তিক পরম্পরাকে কেন্দ্র করে ঐতিহাসিকভাবে একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল যা ছিল ইসলামডম সমাজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যে সংস্কৃতিতে মুসলিমদের পাশাপাশি অ-মুসলিমদেরও হিস্যা আছে যারা ইসলামডম সমাজে সংক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে। এই সংস্কৃতিকে বোঝানোর জন্য-ই আমি ‘Islamicate’ বিশেষণটি ব্যবহার করেছি। কাজেই, আমি ‘ইসলাম’ পরিভাষাটিকে স্রেফ মুসলমানদের ধর্ম অর্থে বোঝানো পর্যন্ত-ই সীমাবদ্ধ করেছি। তার কারণে ইসলামডম সমাজ এবং ইসলামিকেট সংস্কৃতির প্রথার মতো তুলনামূলকভাবে আরো সর্বজনীন বিষয়-আশয় বোঝানোর ক্ষেত্রে ‘ইসলাম’ পরিভাষাটিকে আর ব্যবহার করি নাই

‘ইসলামডম’ বিশেষ্যের ব্যবহার সম্ভবত খুব বেশি আপত্তির জন্ম দিবে না। যদিও এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত নাও হতে পারে (আমি আশা করি, যদি এটি ব্যবহৃত হয় তাহলে পুরো সমাজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হবে, নিছক মুসলমান জনগোষ্ঠী বা উম্মাহকে বোঝাতে নয়)। যা-ই হোক না কেন, সচেতন বিদ্বৎসমাজ অসঙ্গত বোধ করেন, যখন কেউ কোনো স্থানিক ঘটনাকে ‘ইসলামে ঘটেছে’ বলে বর্ণনা করেন বা কোনো ভ্রমণকারীকে ‘ইসলামে গেছে’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন, যেন ইসলাম কোনো দেশ বা ভৌগোলিক স্থানবিশেষ! একইভাবে পুরো ধর্মীয়গত অর্থের জায়গা থেকে ‘ইসলামিক’ বিশেষণটির ব্যবহার কেবল ইসলামসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের জন্য সীমাবদ্ধ করে দেওয়া উচিত, যদিও কারো কারোর জন্য ব্যাপারটা মেনে নেওয়া কঠিন হবে।

তিন চিকিৎসক ঔষধ প্রস্তুত করছেন — ডায়স্কোরাইডিসের মাতেরিয়া মেডিকা’র আরবি অনুবাদ থেকে, ১২২৪, আবদুল্লাহ ইব্‌ন আল-ফাদল, ইরাক।

আমি যখন ‘ইসলামিক সাহিত্য’র কথা বলি তখন আমি কম বেশি শুধু ‘ধর্মীয়’ সাহিত্যেকে-ই বোঝাতে চাই, পার্থিব সুরা-সাকি বিষয়ক গযলকে নয়। যেমনভাবে কেউ যখন খ্রিষ্টান সাহিত্যের কথা বলে সে তো পুরা খ্রিস্টানডমে রচিত সমস্ত সাহিত্যকে বোঝাতে চায় না। যখন আমি ইসলামিক ‘শিল্পকলা’র কথা বলি তখন এক ধরণের ইশারা দেই। বুঝাতে চাই, একদিকে মসজিদের স্থাপত্যশৈলী এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের পুস্তিকাগুলোতে আঁকা অনুচিত্রগুলোর মাঝে পার্থক্য আছে। যদিও স্বীকার করি, এই দুটি বর্গের মাঝে আসলে তেমন কোন সুস্পষ্ট সীমারেখা নাই। দুঃখজনকভাবে, ধর্মীয়গত অর্থের বাহিরে ইসলামডমের যে বিস্তৃত সমাজ ও সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট বিষয়-আশয় আছে সেগুলোকে আলাদাভাবে বোঝাতে কোন বিশেষণবাচক পরিভাষার ব্যবহার বর্তমানে দেখছি না।

পাশ্চাত্য ক্রিস্টিয়ানডমের বিশেষণবাচক শব্দের জন্য ‘Occidental’ বা ‘Western’ নামে সুবিধাজনক একটা পরিভাষা আমরা ব্যবহার করি। যদিও, ‘Western’ পরিভাষাটি প্রায়-ই অতিরঞ্জিত ও অস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়। ‘West Christian’ পরিভাষাটি দিয়ে যা কিছু বোঝানো যেত না ‘Occidental’ পরিভাষাটি সে সব প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এ সব খামতি বিবেচনা করে আমি ‘Islamicate’ পরিভাষাটি কয়েন করতে প্ররোচিত হয়েছি। ‘Italianate’ শব্দটির মতো ‘Islamicate’ শব্দের শেষে দ্বিত্ব বিশেষণবাচক প্রত্যয় আছে। ‘Italianate’ বলতে ‘In the Italian Style’ অর্থাৎ, যা সরাসরিভাবে স্রেফ ইতালিকে বোঝায় না এবং যা কিছুকে ঠিকঠাকভাবে ইতালিয়ান বলা যায় তাকেও না, বরং এমনকিছুকে বোঝায় যা ইতালিয়ান শৈলী, ঢং, ধাঁচ ও রীতির সাথে স্বতন্ত্রভাবে সম্পর্কিত। ফলে, যে কেউ ইংল্যান্ড অথবা তুরস্কে অবস্থিত ইতালীয় শৈলীতে নির্মিত স্থাপত্যকেও ‘ইতালিয়ানেট’ বলতে পারে।

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি’র মসনবী শরীফের পাণ্ডুলিপি, ঊনবিংশ শতাব্দী, ভারত। উৎসঃ Waddington

একইভাবে (যদিও আমি একটু ভিন্নভাবে প্রয়োগ করেছি) ‘ইসলামিকেট’ শব্দটি সরাসরিভাবে খোদ ইসলাম ধর্মকে বোঝায় না, বরং, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জটিল বুননকে বোঝায়, যা ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক রেখে গড়ে ওঠেছে, যার ভেতর মুসলমানরাও আছেন, আবার অমুসলমানরাও অন্তর্ভুক্ত আছেন যারা ইসলামডম সমাজে বসবাস করে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। এই ধরনের দ্বিত্ব বিশেষণবাচক প্রত্যয়ান্ত রীতির ব্যবহার মূল বিষয়ের থেকে দুই ধাপ দূরে গিয়েও সেই বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। এটা এতটাই বিরল যে তা ব্যবহার করতে আমি কিছুটা ইতস্তত বোধ করছি। কিন্তু, এ ছাড়া বিকল্প পরিভাষা আমাদের কাছে বর্তমান নাই। কেউ চাইলে কেবল নির্দিষ্ট কিছু প্রেক্ষিতে ইসলামডম এবং তার সংস্কৃতি সম্পর্কিত বিষয়-আশয়কে বোঝাতে দ্ব্যার্থতা ছাড়া-ই ‘পার্সো-আরবিক সিলসিলা’ কথাটি ব্যবহার করতে পারেন। কারণ ইসলামডমের তাবৎ লিখিত জ্ঞানচর্চার সিলসিলা-ই আরবি বা পারস্য অথবা উভয়টির ভাষা ও সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

এছাড়া, অন্যান্য ক্ষেত্রে, কেউ চাইলে একটু ঘুরিয়ে-পেছিয়ে ব্যাখ্যামূলক পরিভাষা- ‘ইসলামডমের ঐতিহ্য/ সংস্কৃতি/ সমাজ’ ব্যবহার করতে পারেন। সাধারণভাবে বলতে গেলে, সুইডিশ ভাষাকে ‘একটি ক্রিস্টিয়ান ভাষা’ বলা যায় না; এবং যদি এটিকে ‘Occidental’ বা ‘পাশ্চাত্য’ ভাষা বলার সুযোগ না থাকে, তাহলে সরলভাবে শুধু ‘ক্রিস্টিয়ানডমের ভাষা’’ বলাও ঠিক হবে না। এভাবে বললে মনে হতে পারে, কিছুটা হলেও সুইডিশ ভাষা ক্রিস্টিয়ানডমের বিস্তৃত রাজত্বজুড়ে চর্চিত হতো। বরং বলা যেতে পারে যে, সুইডিশ ‘ক্রিস্টিনডমের সংস্কৃতির ভাষা’। ঠিক তেমনি, কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী দাবি করলেও, উর্দুকে ‘ইসলামিক’ ভাষা বলা যৌক্তিক না (কিছু মুসলমানের একরকম জোর করে উর্দুকে ইসলামিক ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা এবং উর্দু ভাষার প্রচারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কোর’আন তেলওয়াত দিয়ে শুরু করার রেওয়াজ উর্দু-প্রিয় হিন্দুদেরকে ভাষার ব্যাপারে বিমুখ করেছিল, শেষ পর্যন্ত এ কারনেই উর্দু নিজ জন্মভূমিতে অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে)। যদি উর্দুকে ইসলামিকেট বলা না-ই যায়, তবে অন্তত এতটুকু তো বলা যায়, উর্দু ছিল ‘ইসলামডমের সংস্কৃতি’র ভাষা। ইবনে মায়মুনকে ইসলামিক দার্শনিক বলা যায় না, কিন্তু এটুকু বলা যায় যে তিনি ‘পার্সো-এরাবিক’ সিলসিলার একজন দার্শনিক ছিলেন। তার চেয়েও ভালো হয় যদি বলা যায়, তিনি ছিলেন ইসলামডমের দার্শনিক সিলসিলার একজন লেখক। কিন্তু, এভাবে ঘুরিয়ে-পেছিয়ে ব্যাখ্যা করে বলার একটা সীমা আছে। ফলত, সুস্পষ্ট পরিভাষা ব্যবহার করলে ভাষাশৈলীর দিক থেকে সহজতর ও সাবলীল হয়। অধিকন্তু, একটি সুস্পষ্ট পরিভাষার ব্যবহার শিক্ষামূলক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, ঘুরিয়ে-পেছিয়ে ব্যাখ্যামূলক পরিভাষা ব্যবহার করলে হয়তো লেখকের খুঁতখুঁত দূর হতে পারে, কিন্তু পাঠকের মনে খুঁতখুঁত রয়ে যেতে পারে।

কর্দোভার জিউইশ স্কোয়ারে অবস্থিত মুসা বিন মায়মুনের (১১৩৮-১২০৪ খ্রি;) ভাস্কর্য।

শুধু আরব এবং মাগরেবী আরববিশারদরা-ই নন, বরং হাল আমলের আজমী মুসলমানরাও মুসা বিন মায়মুনের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘এরাবিক’ পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু, আমরা যদি ইসলামডমের দর্শনের পুরো সিলসিলাকে আমলে নেই, তাহলে এভাবে ‘এরাবিক’ বলে পরিচয় করে দেওয়ার ব্যাপারটা ধোপে টিকবে না। তার অন্যতম কারন হচ্ছে, দর্শনের বেশ কিছু প্রতিনিধিত্বশীল কাজ পার্সি ভাষায় লেখা হয়েছে। জ্ঞানচর্চা ও দর্শনের বাহিরে অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন রাজনীতি ও শিল্পকলায় এ ধরনের পরিভাষার ব্যবহার স্পষ্টত আরো বেশি হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়, যদিও নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক পণ্ডিতরা এর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। ‘এরাবিক’ পরিভাষাটিকে খাস করে দেওয়া উচিত, ইসলামডমের বিস্তৃত সমাজের সেই উপ-সংস্কৃতির জন্য যেখানে আরবি ছিল জ্ঞানশিক্ষার স্বাভাবিক ভাষা। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, কখনো কখনো তার চেয়েও আরো ছোট পরিসরের জন্য আরবি উৎসজাত উপভাষাগুলো প্রচলিত ছিল। আসলে ‘এরাবিক’ পরিভাষাটিকে বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করার যে পশ্চিমা খাহেশাত দেখা যায় তা তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক কাকতালীয় ঘটনা থেকে, যেখান থেকে যত্রতত্র ‘আরব’ এবং ‘মুসলিম’কে সমার্থক মনে করার প্রবণতা কাজ করেছে। অতএব, ‘এরাবিক’ পরিভাষাটিকে ব্যবহার করা কেবল অশুদ্ধ-ই নয়, বরং অসত্য যা ভ্রান্ত পূর্বধারনাকে পরিপুষ্ট করে। এ ধরনের ভুল-ই সবচেয়ে বেশি খতরনাক, যেমনটি আমি ঐতিহাসিক পদ্ধতির উপর আলোচনায় আগেই উল্লেখ করেছি।

(১৯৭৪ সালে প্রকাশিত মার্শাল হজসনের বই The Venture of Islam বইয়ের প্রথম খণ্ড থেকে গৃহীত ও অনূদিত।)

Share:

আরো পড়ুন