ইসলামিকেট বাংলার খোঁজে

রিসার্চ ডিরেক্টর, সেন্টার ফর ইসলামিকেট বেঙ্গল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে স্নাতকোত্তর। পাঠক পরিচয় নিয়েই স্বচ্ছন্দ। আগ্রহ ইতিহাস, ধর্ম, দর্শন ও পুরাণ নিয়ে। প্রকাশিত বই সাইরাস (২০২১), মাহদিয়াত (২০২৩) এবং জীবন কিংবা জিজ্ঞাসার জার্নাল (২০২৪)

Share:

নবীবংশ। মধ্যযুগের সুফি ও কবি সৈয়দ সুলতানের মহাকাব্য। ১৫৮৪ সালে রচিত কাব্যটি দুটি পৃথক খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে রয়েছে সৃষ্টির শুরু থেকে ইসা (আ.) পর্যন্ত সব নবীদের জীবন ও কর্মের বিবরণ। দ্বিতীয় খন্ডে বর্ণিত হয়েছে রাসুল (সা.)-এর জীবনী। তবে সৈয়দ সুলতান গোটা আখ্যানকে সহজবোধ্য করার জন্য মৌলিক এক পথ বেছে নেন। চিত্রকল্পকে স্থাপন করেন স্থানীয় আবহে। ফলে একদিকে সেমেটিক ধারা থেকে শীষ, নুহ, ইবরাহিম, মুসা ও ইসা নবীর জীবন নেয়া হয়েছে; অন্য দিকে হিন্দু পুরাণ থেকে আনা হয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, নরসিংহ, রাম, কৃষ্ণকে। ইসলামের নবি ও হিন্দু দেবতাদের পাশাপাশি স্থাপনের মধ্য দিয়ে এভাবে তিনি নির্মাণ করেছেন সৃষ্টিতত্ত্ব ও ইতিহাস। বিদ্যমান সংস্কৃতিকে অধিগ্রহণ করে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তিনি। এ বাস্তবতা কিন্তু কেবল নবীবংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলায় মুসলমান উপস্থিতির গত এক হাজার বছরের ইতিহাসে এমন অজস্র উপাদান বিদ্যমান, যা প্রচলিত ধর্মীয় অর্থে ইসলামী হয়ে উঠেনি। অথচ ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্নও নয়। ধর্মীয় দ্যোতনায় ইসলামিক ও অনৈসলামিকের বাইরে দাঁড়িয়ে এটা ইসলামের সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত বিস্তার। স্বতন্ত্র এ পরিসরই ইসলামিকেট।

ইসলামিকেট শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন মার্কিন ইতিহাসবিদ মার্শাল হজসন। তার কৈফিয়ত ছিল, ইসলামের সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত বিস্তারে এমন অনেক পরিসরের জন্ম হয়েছে; যা প্রচলিত অর্থে ইসলামি বিশ্বাসের সঙ্গে যায় না। হজসনের মতে, Islamicate এমন সমস্ত সাংস্কৃতিক, নান্দনিক ও সামাজিক রূপ, যা ইসলামি সভ্যতার প্রভাবে গঠিত হলেও সরাসরি ধর্মীয় অনুশাসনের অংশ নয়। অর্থাৎ ইসলামী বললে যেভাবে বিশ্বাসব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসে, ইসলামিকেট সেভাবে দ্যোতনা তৈরি করে সভ্যতাগত ধারার। সেই ধারার ভেতরে ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজ একে অপরের সঙ্গে মিশে নতুন এক রূপ নেয়। মুসলিম শাসনব্যবস্থার অধীনে কিংবা মুসলমানদের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বৌদ্ধিক ও শিল্পগত লেনদেনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতায় যে পরিবর্তন এসেছে; তা-ই ইসলামিকেটের পরিসীমা। সেখানে জিকিরের মজলিস যেভাবে অন্তর্ভুক্ত, একইভাবে অন্তর্ভুক্ত শরাবশিল্প। মার্শাল হজসনের ব্যবহৃত ‘ইসলামিকেট’ পরিভাষা দ্রুত সময়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে একাডেমিয়া ও একাডেমিয়ার বাইরে। যদিও বাংলার প্রেক্ষাপটে এখন পর্যন্ত ইসলামিকেটের অর্থ, পরিসীমা, তাৎপর্য নির্ধারণ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটেনি। সত্যিকার অর্থে বাংলায় ইসলামপ্রভাবিত আলোচনার ইতিহাসের এমন অনেক দিক উন্মোচন করতে পারে; যা আগে বৌদ্ধিক সমাজে অগম্য ছিল।

ইতিহাসের গোড়া থেকেই বাংলা বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মাপুত্রের অববাহিকায় নির্মিত এ ব-দ্বীপে মিলিত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সীমানা। ফলে কেবল নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে নয়; সংস্কৃতির দিক থেকেও গড়ে উঠেছে বহুত্ববাদী বৈশিষ্ট্য। একদিকে আজীবিক, অন্যদিকে জৈন বিশ্বাস; একদিকে বৌদ্ধ ও অন্যদিকে নাথ; একদিকে হিন্দুধর্ম ও অন্যদিকে স্থানীয় লোকজ বিশ্বাস। এ জনপদ যেন সবকিছুকেই একীভূত করে নিয়েছে নিজের মতো করে। ইসলাম আগমন করার পর পূর্বতন ছন্দে ব্যত্যয় ঘটেনি। এখানকার বৌদ্ধ, হিন্দু ও লোকধর্মীয় ঐতিহ্যের মধ্যে যখন থেকে ইসলাম যুক্ত হয়েছে; তখন দৃশ্যমান হয়েছে ভিন্ন এক রূপ। না ইসলাম তার আরব-পারসিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে; না আগের মতো থেকেছে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য। এ মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে গড়ে ওঠেছে এমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারা, যা প্রচলিত অর্থে ‘ইসলামি’ নয়, আবার ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্নও নয়। একে বরং ইসলামপ্রভাবিত কিংবা ইসলামপ্রাণিত বলা অধিক যুৎসই। এখানকার ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণে এ প্রভাব ব্যাপকভাবে ভূমিকা রেখেছে। সেই ভূমিকা ফুটে উঠেছে এখানকার ভাষায়, সাহিত্যে, শিল্পে, স্থাপত্যে, দর্শনে ও দৈনন্দিন জীবনে।

জয়গুনের পুথি, ছবি: ব্রিটিশ লাইব্রেরি

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে ইসলামিকেট চেতনা বিকাশের প্রক্রিয়া গভীর ও ধীর। এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসে নয়, ভাষা ও সাহিত্যে নতুন সংবেদন নিয়ে আসে। আরবি ও ফারসি ভাষার শব্দ, ভাব, উপমা ও কাব্যরীতির সঙ্গে বাংলার লোকভাষা ও পৌরাণিক কল্পনার মেলবন্ধন ঘটে। মধ্যযুগীয় মুসলিম কবিরা এই সংমিশ্রণের প্রধান কারিগর। সৈয়দ সুলতান, আবদুল হাকিম, আলাওল, শাহ মুহম্মদ সগির, দৌলত কাজী ও আলি রাজা একদিকে ইসলামী ভাবধারার কথা বলেছেন, অন্যদিকে আঞ্চলিক লোকবিশ্বাস ও হিন্দু পুরাণের ভাষা ধার করেছেন নির্দ্বিধায়। ইউসুফ-জুলেখা কাব্যে ইউসুফের ভাইকে দেখা যায় মধুপুর বিয়ে করতে; অন্যদিকে সোনাভানের পুথিতে দেখা যায় টঙ্গী নগরী। পুথিসাহত্যের নায়ক হাতেম তাইয়ের জন্ম ইয়েমেনে হলেও তার মধ্যে ফুটে উঠেছে বাংলার কোনো প্রজাবৎসল শাসকের বৈশিষ্ট্য। এমন কি মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের হিন্দু কবিরা পর্যন্ত ভাষিক ও বিষয়বস্তুজনিত প্রভাবে নিজেদের কাব্যঢঙ পরিবর্তন করেছেন। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে রোমান্টিকতা প্রবেশ করেছে মূলত মুসলমান সাহিত্যিকদের তৎপরতার মধ্য দিয়ে। এভাবে যদিও বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে ইসলামী চিন্তার প্রকাশমাধ্যম, কিন্তু ভেতর মিশে থাকে স্থানীয় জীবনের গন্ধ, গ্রামীণ শব্দ, ও প্রাকৃতিক প্রতীক। ফলে ইসলামের প্রভাব হয়ে ওঠে বাংলার নিজস্ব স্বর।

বাংলায় প্রচারিত সুফিবাদে যে স্থানিক উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে; তার আকার বিপুল। এই স্থানীয় স্বভাবের কারণেই সুফিবাদ এখানে সফলতা পেয়েছে। সুফি খানকাগুলোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উরশ ও মাহফিল বাংলার জনজীবনকেই প্রতিফলিত করেছে। এখানকার সুফিরা বাংলা পঞ্জিকাকে অনুসরণ করেই দিন ঠিক করেছেন বিভিন্ন আয়োজনের। মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাগুলো ছিল জনসমাজের মিলনক্ষেত্র। দরগায় হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান আসতেন মানত করতে, শ্রদ্ধা জানাতে। আবার মাজারকে কেন্দ্র বাংলায় প্রচারিত সুফিবাদে যে স্থানিক উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে; তার আকার বিপুল। এই স্থানীয় স্বভাবের কারণেই সুফিবাদ এখানে সফলতা পেয়েছে। সুফি খানকাগুলোর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, উরশ ও মাহফিল বাংলার জনজীবনকেই প্রতিফলিত করেছে। এখানকার সুফিরা বাংলা পঞ্জিকাকে অনুসরণ করেই দিন ঠিক করেছেন বিভিন্ন আয়োজনের। মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাগুলো ছিল জনসমাজের মিলনক্ষেত্র। দরগায় হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান আসতেন মানত করতে, শ্রদ্ধা জানাতে। আবার মাজারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নগরী। শাহ জালালের মাজার সিলেটকে ও শাহ আলির মাজার ঢাকা নগরীর সম্প্রসারণে ভূমিকা পালন করেছে। ঔপনিবেশিক আমলে মাজারগুলো ছিল উপনিবেশিবিরোধী বিদ্রোহের আখড়া। অর্থাৎ একদিকে নগরায়নে ভূমিকা পালন করেছে; অন্যদিকে পূরণ করেছে রাজনৈতিক দায়। এভাবে ধর্মীয় চেতনা পরিণত হয় সমাজ ও সংস্কৃতির অভিন্ন ধারায়। গ্রামীণ সমাজে পীর, দরবেশ ও মাজারকেন্দ্রিক সংস্কৃতি সেই অভিজ্ঞতাকে বাস্তব রূপ দেয়।

গাজীর পট, ছবি: ব্রিটিশ মিউজিয়াম

বাংলায় সুফিবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই হিন্দুধর্মে বিস্তৃত হয়েছে ভক্তিবাদ। বাংলার প্রেক্ষাপটে ভক্তিবাদ তাই ইসলাম ধর্মের বাইরে হলেও ইসলামপ্রভাবের বাইরে নয়। মুসলমানদের হাতে প্রাচীন বাংলার যোগবিদ্যা ও তন্ত্রচিকিৎসা অভিযোজিত হয়েছে। প্রথমটির স্পষ্ট উদাহরণ আলি রাজার জ্ঞান সাগর। দ্বিতীয়টি এখনো গ্রাম বাংলার কবিরাজি চিকিৎসায় দৃশ্যমান। ঔপনিবেশিক আমলে রামমোহন রায় যখন ফারসিতে তুহফাতুল মোয়াহহেদিন বইটি লিখলেন; তার পেছনে মুসলিম দর্শনের প্রভাব ছিল। সত্যিকার অর্থে বিবেকানন্দ ও বিশেষ করে রামমোহনের একত্ববাদী দর্শনের প্রধান অনুঘটক ছিল ইসলাম। সে দিক থেকেই ভক্তিবাদ থেকে ব্রাহ্মসমাজ হয়ে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিস্তৃত ইসলামিকেটের পরিসীমার।

ফরিদপুরের আওলিয়া মসজিদের টেরাকোটা ফলক, ছবি: আলামি

সুলতানি আমলে ইসলামি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠলেও সংস্কৃতি কখনোই সম্পূর্ণ আরবি বা ফারসি রূপ নেয়নি। স্থানীয় শিল্প, সংগীত, স্থাপত্য ও পোশাকের ভেতর ইসলামি রীতির সঙ্গে মিশে গেছে আঞ্চলিক ছোঁয়া।গৌড় বা পাণ্ডুয়ার মসজিদগুলোতে দেখা যায় ইটের কাজ, ফুল-লতা খোদাই, ও দোচালা ছাদের প্রভাব; এগুলো ইসলামের সঙ্গে বাংলার প্রকৃতির মিলনের নিদর্শন। বাংলা অঞ্চলের মসজিদগুলো মাটির তৈরি, যা মধ্য এশিয়ার পাথরনির্মিত স্থাপনার বিপরীতে ভিন্ন নজির স্থাপন করে। আদিনা থেকে আটিয়া মসজিদ পর্যন্ত স্থাপত্যকর্মের মোটিফ নির্বাচন ও প্যাটার্ন সজ্জায় নিজস্বতা পরিলক্ষিত হয়। গৌড়, পাণ্ডুয়া, বাগেরহাট কিংবা সোনারগাঁয়ের মতো বাংলার প্রতিটি ইসলামি স্থাপত্যই যেন স্থানীয় বৈশিষ্ট্যকে অভিযোজনের জীবন্ত দলিল। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদে দেখা যায়, মধ্য এশীয় গম্বুজ ও মিহরাবের রীতিকে কীভাবে স্থানীয় কারিগর রূপ দিয়েছেন ইটের কাজ, পোড়ামাটির অলঙ্করণ ও দোচালা ছাদের মাধ্যমে। এখানকার স্থাপত্যে গাম্ভীর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোমলতা, ধর্মীয় গাম্ভীর্যের সঙ্গে এসেছে আঞ্চলিক রূপের অন্তরঙ্গতা। এখানকার জলবায়ুর মতো এখানকার মানুষের যাপিত জীবনও তাকে প্রভাবিত করেছে। এভাবে মুসলিম পরবর্তী সময়ে মন্দিরের কাঠামোও নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামী স্থাপত্যের গম্বুজ যেমন স্থানিক নান্দনিকতায় বদলে যায়, তেমনি মুসলমান সমাজে চর্চিত কাহিনি মিশে যায় লোকবিশ্বাসের আখ্যানের সঙ্গে।

মুসলিম শাসনামলে যে শহরগুলো গড়ে ওঠে, সেগুলোর বিন্যাস ছিল ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরেও সামাজিক কার্যকারিতার প্রতিফলন। বাজার, মসজিদ, সরাইখানা, হাট ও সড়ক মিলিয়ে এক জীবন্ত শহুরে সংস্কৃতি। সোনারগাঁয়ের মুদ্রাশিল্প, কারুকাজ ও বস্ত্রবয়ন ইসলামি নান্দনিকতা ও স্থানীয় শ্রম-প্রতিভার মিলিত ফসল। এই নগরসংস্কৃতির মধ্যে ইসলামকে কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে, বরং এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক স্পন্দন হিসেবে। ইসলাম পরবর্তী বাংলার সম্পূর্ণ ইতিহাস অনুধাবন করতে কেবল রাজনীতি বা ধর্মচর্চার ইতিহাস দেখা যথেষ্ট নয়; দেখতে হয় মানুষের প্রতিদিনের জীবন, তাদের আচার, উৎসব, খাবার, পোশাক ও পারস্পরিক সম্পর্কের ধরন। একদিকে ছড়িয়ে পড়েছে সংগীতের চর্চা; অন্যদিকে বিকাশ লাভ করেছে চিত্রকলা। মধ্যযুগে সংগীতের ওপর লেখা রাগনামা ও তালনামা এবং সুলতানি আমলে চিত্রকলার নিদর্শন হিসেবে শরফনামা এখনো টিকে রয়েছে। মুসলিম শাসনে শাক্ত, শৈব ও অন্যান্য ধর্মমতের বিকাশ ও বিবর্তনও ছিল লক্ষ্যণীয় মাত্রায়। এসব যতটা না ধর্ম হিসেবে, তার চেয়ে বেশি জীবনের অংশ হয়ে। এটা বাংলার সমাজের বাস্তব ও নিজস্ব রূপ; যেখানে বিশ্বাসের ভেতরও থাকে সহনশীলতা, আর পার্থক্যের ভেতরও থাকে এক অদ্ভুত ঐক্য।

বাংলার সমাজে ঈদ, আশুরা, ঈদে মিলাদুন্নবী, নববর্ষ, কিংবা মাজারের উরশ একসঙ্গে পালিত হতো। খাবারে দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যের মসলার ব্যবহার, পোশাকে আসে নতুন রঙ ও নকশা, নারীদের অলঙ্কারে মিশে যায় আরবি রীতির ছোঁয়া। পারিবারিক জীবনে ইসলামি আচার যেমন বিয়ের কাবিন বা মেহেরের প্রথা এনেছে, তেমনি স্থানীয় উৎসব ও সামাজিক যোগাযোগে বজায় থেকেছে আঞ্চলিক রীতিনীতির প্রাণ। বাংলার মুসলমান গৃহ তাই একসঙ্গে ইসলামি ও দেশজ; একদিকে নামাজের জাননামাজ, অন্যদিকে নববর্ষের পিঠা-পায়েস; একদিকে আরবি দোয়া, অন্যদিকে বাংলার গান।

ব্রিটিশ উপনিবেশিকতার প্রভাব বাংলার সাংস্কৃতিক ধারাকে ভাঙতে বা নতুন আকার দিতে চেষ্টা করলেও স্থানীয় সংস্কৃতি ও সমাজের স্বতন্ত্রতা শক্তভাবে টিকে থাকে। প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও ধর্মীয় সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের মধ্যেও দেখা যায়। বাংলার মুসলিম সমাজ তার আঞ্চলিক চেতনা ধরে রেখেছে। পাশাপাশি বহন করেছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। তারা অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক চেতনায় যেভাবে মিশে যায়নি; তেমনি আশ্রয় নেয়নি বৃহৎ পাকিস্তান ধারণায়। সাংস্কৃতিক এই স্বাতন্ত্র্য উনিশ ও বিশ শতকে বাংলার রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য নির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।

রাষ্ট্র এবং সমাজ ইসলামকে কখনো একক ধর্মীয় নির্দেশ বা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখাতে চেয়েছে, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য এবং সাংস্কৃতিক আচরণ এটি প্রতিরোধ করেছে। ধর্মের সঙ্গে আঞ্চলিক ও নান্দনিক অভিজ্ঞতা মিশে থাকে এমনভাবে যে, মুসলিম পরিচয় কখনো একক নয়, বরং স্থানিক ও সামাজিক চেতনার সঙ্গে যুক্ত। ইসলামকে ধার্মিক শৃঙ্খলার বাইরে ধরে নিয়ে আঞ্চলিক জীবনধারার সঙ্গে মিশিয়ে নেয়া। ঈদ, পীরমেলা, লোকসঙ্গীত, স্থাপত্য, খাবার, পোশাক মিলিয়ে আধুনিক বাংলার ইসলামিকেট অভিজ্ঞতা গড়ে উঠে। এটি কোনো পুরনো ইতিহাস নয়; বরং চলমান এক সংলাপ, যা অতীত ও বর্তমানকে একত্রিত করে।

ইসলাম বাংলায় বেড়ে উঠেছে জীবন্ত সংস্কৃতির অংশ হিসেবে। মধ্যযুগীয় বণিক, সুফি সাধক, কবি, স্থপতি এবং সাধারণ মানুষ এই সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র বাঙালি মুসলিম সমাজ। উপনিবেশিক পুনর্গঠন, রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও বাংলার মুসলিম সমাজ তার স্বতন্ত্র চেতনা ধরে রেখেছে। সে ভাবনা জীবন্ত থেকেছে দৈনন্দিন জীবন, উৎসব, ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার মাধ্যমে। বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত এ ভূ-খণ্ডের সঙ্গে ইসলামের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সম্পর্ক, তার নিভীর পাঠ বাংলা ও বাংলার মুসলমানকে বৈশ্বিক পরিসরে স্বতন্ত্র পরিচয়ে হাজির করে। কারণ, দিনশেষে অতীতের পুনর্পাঠই ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের প্রধান পাথেয়।

Share:

আরো পড়ুন