[দীন মুহম্মদ খান জাহাঙ্গীরনগরী (১৯০০-১৯৭৪) জন্মগ্রহণ করেন ঢাকায়। দেওবন্দ মাদরাসা থেকে পড়াশোনা করে এসে তিনি বিভিন্ন সময়ে রেঙ্গুনের বাঙালি মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ছিলেন ঢাকার লালবাগ মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সেখানে হাদিস ও তাফসির শিক্ষা দিতেন। কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে না; বাংলার রাজনৈতিক বাঁক পরিবর্তনের দিনগুলোতেও তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মুখ। খেলাফত আন্দোলন এবং পাকিস্তান আন্দোলনে রেখেছেন স্মরণীয় ভূমিকা। বর্তমান লালবাগ শাহী মসজিদ প্রাঙ্গনে তার সমাধি অবস্থিত।
ঢাকা থেকে মক্কায় হজে যাওয়া নিয়ে তার প্রবন্ধ ‘আমার হারমাইন সফর: আত্মকথা’। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে। বাংলা তখন খেলাফত আন্দোলন নিয়ে উত্তপ্ত। ক্ষমতার সমীকরণে হেজাজও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে বাংলা ও হেজাজের অন্য এক চিত্র উঠে এসেছে দীন মুহম্মদ খানের সফর নামায়; যা সমকালীন লেখাপত্রে বিরল। তার এই বর্ণনা মক্কার সঙ্গে বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্কে বিদ্যমান বয়ানকে পুনর্পাঠ করতে বাধ্য করবে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো। অনুবাদ করেছেন আহমেদ দীন রুমি]
ঢাকা থেকে কোলকাতায় পৌঁছলাম শাওয়াল মাসের ৯ তারিখ। দু-তিন দিন কেটে গেল সেখানেই। অনেক ব্যবসায়ীকে দেখতে পেলাম, যারা খেলাফত নিয়ে সরব। আসলে তারা নিজেরাই খেলাফত আন্দোলনের সদস্য ও সক্রিয় কর্মী। তাদের কাছেই জানলাম, এ বছর বাংলা থেকে অনেক মানুষ যাচ্ছে হজ করতে। ফুরফুরার আবু বকর সিদ্দিকী সাহেবও ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি বিপুল সংখ্যক অনুসারী নিয়ে হজ করতে যাচ্ছেন। অনুসারী বেশি নেয়ার কারণ নাকি মওলানা যাচ্ছেন ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে। মক্কায় এবার কনফারেন্স হতে যাচ্ছে, যেখানে মওলানা মুরিদদের নিয়ে শরিফ হোসায়েনের হাতে বায়াত গ্রহণ করবেন। শরিফ হোসায়েন হেজাজের ওয়ালি; নিজেকে তিনি খলিফা দাবি করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত এসব কেবল বাজারি কথাবার্তাই। আমি কেবল শুনলাম আর চুপ থাকলাম।
রাতের বৈঠকে শুনলাম আরেক আজব তথ্য। ব্রিটিশ সরকার মওলানাকে ২ লাখ রুপি দিয়েছে। সেই সঙ্গে দিয়েছে বিশেষ ট্রেন। ট্রেনটি পরবর্তী দিন বোম্বের উদ্দেশ্যে কোলকাতা ছেড়ে যাবে। পরদিন সকালে জানলাম নয়টার দিকেই সেই স্পেশাল ট্রেন ছেড়ে গেছে বোম্বের উদ্দেশ্যে।

পরের দিন আমি এবং আমার সঙ্গীরা বোম্বের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের মেইল ট্রেন বোম্বে গিয়ে পৌঁছলো মওলানার স্পেশাল ট্রেনেরও চার ঘণ্টা আগে। সঙ্গীদের সঙ্গে আমি বোরি বন্দরের মুসাফিরখানায় পৌছলাম। আমাদের একজন সঙ্গী ছিলেন মওলানার অনুসারী। তিনি তার পীরের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ফিরে আসলেন বিকাল চারটার দিকে। ফিরে এসেই তিনি আমাদের জানালেন, পীর সাহেব থাকা ও খাওয়ার সব ধরণের ব্যবস্থা করে রেখেছেন তার অনুসারীদের জন্য। সেখানে থাকার জন্য আমাদের দাওয়াত দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই সবাই সেখানে গেল। আমি অধমও ছিলাম তাদের একজন।
মওলানা তখন অবস্থান করছেন গ্রাফট রোডের মোজাফফরাবাদ হল (হাজি কাসিমের কুঠি)। তার সঙ্গে ১৪০০ অনুসরী। সরকার এই জায়গাটা খালি করে দিয়েছে; বিশেষভাবে বরাদ্দ করা হয়েছে মওলানার জন্য। যাহোক, আমরা অপেক্ষা করছিলাম জাহাজের জন্য। মওলানা তার মুরিদদের জন্য নামাজী কোম্পানি থেকে আরবিস্তান ও ফারাঙ্গিস্তান নামে দুইটি জাহাজের ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু যাত্রীদের ভিড় দেখে কোম্পানি জাহাজের ভাড়া দ্বিগুণ করে দিল। ফলে ৫০-৬০ রূপির বদলে টিকেটের দাম উঠলো ১২৫ রূপিতে। মওলানা সবার জন্য ৮০ রূপিতে টিকেটের ব্যবস্থা করলেন।
জাহাজ তখনো জেদ্দা থেকে ফেরেনি। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে কঠিন সময় পার করতে লাগলাম আমরা। বাধ্য হলাম সেখানে ২০-২২ দিন অবস্থান করতে। শেষমেশ বন্দরে দেখা গেল জাহাজ। সেটা পরিষ্কার করতে লাগলো আরো ২-৩ দিন। সাকুল্যে ২৫ দিন পর আরবিস্তান তৈরি হলো ফের। ক্যাপ্টেন জাহাজ ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন। জেদ্দার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো জাহাজটি।
ছয় থেকে সাত দিন সফর করার পর আমাদের জাহাজ সুকুতরায় এসে আটকে গেল। ভেঙে গেলো একটা প্রপেলারও। ঘটনার আকষ্মিকতায় সবাই অস্থির। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল যাত্রীদের সমস্যা, বমি। সুকুতরার হালচাল হজযাত্রীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। জাহাজ যখন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করছিল, তখন মনের অজান্তেই আমার ঠোটে চলে আসলো নিম্নোক্ত চরণ—
“অন্তর ভীত, ভীত প্রিয়রা, শত্রু সামনে, ভাগ্য বিরূপ
ওহ খোদা, দুনিয়ার কোনো প্রাণী যেন এমন পরিস্থিতে না পড়ে।”
দুর্দশা ও অনুশোচনা গ্রাস করে ফেলেছিল। চারদিক ঘিরে ফেলেছিল হতাশা। যতটুকু বিশ্বাস ছিল, তা কেবল খোদার ওপর। সকল অন্তর তার দিকে ঘুরে গেল। খোদা তা’আলাও তার সাহায্যের হাত প্রসারিত করলেন। হাজিদের দোয়া কবুল হলো। জাহাজও আসতে শুরু করলো নিয়ন্ত্রণে। তকদির সহজ হলো। জাহাজ চলতে শুরু করলো। এভাবে ১৩ দিন পর খোদার রহমতে আমরা এডেন বন্দরে পৌঁছলাম। সেখানে এক রাত অবস্থান করে প্রোপেলার ঠিক করা হলো।
এডেন ত্যাগ করার ৬ষ্ঠ দিনে জেদ্দার উপকূল নজরে পড়লো। জাহাজে উঠলো হাজিদের তত্ত্বাবধায়ক কর্তৃক নিযুক্ত মিসরী চিকিৎসক। কোয়ারেন্টাইনের অর্ডার দিয়ে তিনি আমাদের তীরে নোঙর করার অনুমতি দিলেন। আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম এই ভেবে যে, আমাদের আরবিস্তানকে না আবার কোয়ারেন্টাইন স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বুঝলাম ডাক্তার সাহেব আমাদের স্থলের কোয়ারেন্টাইন মাফ করে দিয়েছেন। এজন্যই মূলত জাহাজে কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশনা।
যেহেতু দুই জাহাজের হজযাত্রীরা নামতে শুরু করেছে। বুঝতে পারলাম পরদিন আমরা নামতে পারবো। পর দিন সকালে জাহাজে এল আরব মাল্লা ও আবিসিনীয় কুলি। তারা জাহাজের মালপত্র নামাতে শুরু করলো। আমরাও তৈরি হলাম নামার জন্য। যেহেতু জাহাজ ভূমি থেকে বেশ দূরে নোঙর করেছিল; ফলে আমাদের একটা নৌকা ভাড়া করতে হয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই জেদ্দা পৌছে গেলাম।
জেদ্দার অবস্থা
আমি হেজাজ সরকারের কর্মচারীদের কাছ থেকে টিকেট নিয়ে বের হলাম। সেখানে বিপুল সংখ্যক হজ গাইড জমায়েত ছিলেন। যে হাজির নাম যে মুয়াল্লিমের সঙ্গে যুক্ত, সেই মুয়াল্লিমের প্রতিনিধি তাকে নিয়ে যায়। আমি আমার মুয়াল্লিমের নাম দিলাম, তার নাম আহমদ সুলতান। তার প্রতিনিধি আমাকে নিয়ে গেলেন। গেটের পাশেই হেজাজের বিচারকের দফতর। সেখানে সবার নাম লেখা। হাজিদের বিপুল ভির সেখানে। তারা হাজিদের পাসপোর্ট যাচাই করছেন। জনপ্রতি দেড় রূপি করে শুল্ক নিয়ে তারপর অনুমতি দিচ্ছেন শহরের ভেতরে প্রবেশের।
কুলিরা ব্যাগ ও মালপত্র নিয়ে নিয়ে কাস্টম হাউসে রেখে দিল। সেখানে বাক্স ও সুটকেস খুলে তল্লাশী চালানো হয়। মূলত তল্লাশির পরই আমাদের শুল্ক দেয়ার অনুমতি দেয়া হলো। এই তল্লাশির কারণে বেশ ভোগান্তি হলো। শেষ পর্যন্ত এই পক্রিয়া শেষ করার পর আমি সহযাত্রীদের নিয়ে একটা হোটেলে উঠলাম। সেখানে থাকলাম দুই দিন। সুযোগ পেলাম সমস্ত স্থান ঘুরে দেখার। সেখানে পানির খুবই সংকট। মশার উপদ্রবও প্রচুর। বাজারের জিনিসপাতির দাম অনেক। তবে বাজারগুলোয় সব ধরনের খাদ্য ও পানীয় পাওয়া যায়।
শহরটি একটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এখানেই হেজাজের গভর্নরের তোপখানা ও পদাতিক বাহিনী নিরাপত্তার জন্য সক্রিয়। ভেতরের স্থাপনার মধ্যে দুয়েকটি দোকান রয়েছে; যেগুলোর মালিক খ্রিস্টান। দোকানে কেবল জাহাজীদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। সেখানে রয়েছে ব্রিটিশ সরকারের কনসালও। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় হাজিরা ব্যাপক সহযোগিতা লাভ করে। কনসালের কর্মচারীদের মধ্যে যেমন মুসলমান রয়েছে; একইভাবে রয়েছে ইংরেজ।
জেয়ারত করার মতো বেশ কিছু জায়গা রয়েছে এখানে। সবচেয়ে বড় হলো হযরত হাওয়া (আ.)-এর কবর। এটা শহরের বাইরে অবস্থিত। শরিফ হোসাইনের দূর্গের পাশে। মাজারটি পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেখানে দুটি তোরণ রয়েছে। একটা প্রধান তোরণ আর অন্যটি বিপরীতে পাশের ছোট তোরণ। হযরত হাওয়া (আ.)-এর সমাধি অনেক লম্বা; আনুমানিক ২০০ ফুট। একটি গম্বুজ সমাধির ঠিক মধ্যখানে; আরেকটা মাথা বরাবর। অর্ধেকটাই লোনা পানির তলে চলে গেছে। এই গোরস্তানে আরো অনেক কবর বিদ্যমান। কবরগুলো শহরের নাগরিকদের। এখানে মিসকিনরা হামেশাই ঘোরাঘুরি করে। নগরীর জনসংখ্যা আনুমানিক ৫০ হাজার।
মাজারের ব্যাপারে নানা রকমের মতামত রয়েছে। তবে সত্যিকার তথ্য আল্লাহ ভালো জানেন। মোটা দাগে আমি জেদ্দায় অবস্থান করেছি সাকুল্যে দুই দিন। যখন হাজিদের কাফেলা তৈরি হলো; আমিও বাহনে আরোহন করে তালবিয়া মুখে প্রস্তুতি নিলাম মক্কা যাওয়ার জন্য। রাস্তার চারধারে হোটেল ও খাবার পানির দোকান। কিছু দূরত্ব পর পর তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট কেল্লা। সেই কেল্লায় রয়েছে হাবশী সৈনিকরা। পাহাড়ি ডাকাতদের সঙ্গে একটা যৌক্তিক সমঝোতা হয়েছে সরকারের, যেন হজযাত্রীদের ওপর কোনো আক্রমণ না হয়। যেতে যেতে দেখলাম, দোকানদারা চিৎকার করে বলতেছে — ‘ঠান্ডা পানি’ রয়েছে।
সুবে সাদিকের সময় আমরা বাহরা নামে একটা জায়গায় পৌছলাম। সেখানে ছোট ছোট ছাউনি পেতে বেদুইনরা দোকান খুলেছে। সেখানে রুটি, গোশত, আটা, ডাল, চাউল, ডিম, ঘি, মুরগি এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। আসরের সময় শোনা গেল ইরফাউ ওয়া শিদ্দু। (হজের সময় ঐতিহ্যবাহী তাগাদা, তৈরি হওয়ার জন্য) সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। কাফেলার সবাই নড়েচড়ে বসলো ও তৈরি হতে লাগলো। পর দিন সকালে আমরা নগরীতে প্রবেশ করলাম। কফি হাউসে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন আমাদের মুয়াল্লিম ও তার সন্তান। তিনি আমাদের সঙ্গে দেখা করলেন।
আরো সামনে এগিয়ে দেখা গেল আরব সওয়ারিরা ব্যান্ড বাজাচ্ছে। দেখলাম বিপুল সংখ্যক সৈন্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কাফেলার সঙ্গে এগিয়ে চলছে। দৃশ্য দেখে আমি উচ্ছাসিত হলাম। সেই উচ্ছাস কেবল তিনিই উপলব্ধি করতে পারবেন; যার হৃদয়ে ইসলামি জজবা রয়েছে। মনে হচ্ছিল, ইসলামি ফৌজ আমাদের কাফেলাকে স্বাগত জানাতে এসেছে। কিন্তু ভুল ভাঙলো দ্রুত। বুঝতে পারলাম শরিফ হোসায়েনের বড় ছেলে শরিফ আলি তায়েফ থেকে মক্কায় আসছেন। তাকে স্বাগত জানানোর জন্যই এখানে এসেছে সৈন্যদের এই রেজিমেন্ট।
নামাজ পড়ে আমরা প্রবেশ করলাম মক্কা মুয়াজ্জামায়।